পোশাক কথন

রবিবার, সেপ্টেম্বর ১, ২০১৯ ১১:০৩ PM | বিভাগ : প্রতিক্রিয়া


শাড়ি নিয়ে অধ্যাপক আবদুল্লাহ আবু সায়ীদ এর একটি লেখার বিপরীতে অনেক নারীপুরুষেরই প্রতিবাদ দেখলাম। কোনটাই ঠিক নিজের কথাগুলো ফুটে উঠবার মত করে মনঃপুত হচ্ছিল না বলে কাজ, বিরতি, যাত্রাপথ মিলে সময় বের করে একটা লেখা দাঁড় করাবার চেষ্টা করলাম। উনার পুরো লেখাটিই আমি খুঁটিয়ে পড়েছি এবং যা আমার কাছে অগ্রহণযোগ্য মনে হয়েছে, সেটাই লেখার চেষ্টা করেছি। 
 
 
প্রথম বাক্য থেকে শুরু করি, "শাড়ি পৃথিবীর সবচেয়ে যৌনাবেদনপূর্ণ অথচ শালীন পোশাক। "
 
আজকের সকল মত, সকল পথকে সম্মান জানানোর যুগে, এমন স্টেটমেন্ট দিয়ে দেয়া অন্যায়। শাড়ি আমাদের উপমহাদেশের নারীদের অনেকেরই প্রিয় পোশাক। কিন্তু আমার পছন্দের পোশাকটি পৃথিবীর সবচেয়ে 'শালীন'(?) পোশাক বাকিগুলো নয়, এই যে সিদ্ধান্তে চলে আসা, বাকি সকল পোশাকরুচিকে অপমান করারই সমান। এটা কট্টর ধর্মান্ধদের মতই বক্তব্য। যেমন তারা বলে থাকেন, বোরখা পৃথিবীর সবচাইতে শালীন, রুচিসম্মত পোশাক। আমি বলতে পারি অমুক পোশাকটি আমার প্রিয়, সারা পৃথিবীর রুচির সার্টিফিকেট আমি দিতে পারি না। 
 
"বিশালদেহী আফ্রিকার নারীর জন্য এ পোশাক নয়"।
কোনো দেহী নারীর জন্য কোন পোশাক নয়, সেটি তার পোশাকরুচি এবং সংস্কৃতি ঠিক করে। 
 
আমার পোশাক তোমার জন্য নয়, সেটিও আজকের এই এক পৃথিবীগ্রামে যখন আমরা সাংস্কৃতিক বৈচিত্র‍্য ভাগাভাগি করে একসাথে বাঁচতে চাইছি তাদের জন্য জাতি বিভেদ করে অসম্মানজনকভাবে দূরে ঠেলে দেয়ারই নামান্তরই। অনেক আফ্রিকান, শেতাঙ্গ নারীই শাড়ি পরতে ভালবাসে এবং পরিয়ে দিলে আবেগে আপ্লুত হয়, দেখতেও অপরূপ লাগে। দেখার চোখ তো থাকা চাই!
 
"অধিকাংশ বাঙালি মেয়েকে শাড়ি ছাড়া আর হয়তো কিছুতেই মানায় না।"
 
আসলে বলা উচিৎ ছিলো, আর কিছুতেই উনার কাছে ভালো লাগে না। আবারো বলতে হয়, কাকে কোন পোশাকে মানাবে, সেটি অন্য কেউ ঠিক করে দিতে পারেন না। সেটি তার আর তার কাছের মানুষদের প্রাধান্য অনুযায়ী তার নিজের পোশাকরুচির ওপর নির্ভর করে। এটি নারী পুরুষ উভয়ের বেলাতেই প্রযোজ্য। আমি আমার ব্যক্তিগত অভিরুচি, অনুভূতির ছাঁচে সামগ্রিকভাবে একটি জাতিকে ফেলে দিতে পারি না। এটি ভীষন ভীষন জাজমেন্টাল একটি স্টেটমেন্ট।
 
"ইংল্যান্ডের কথা বলতে গিয়ে রবীন্দ্রনাথ লিখেছিলেন: এখানে রাস্তায় বেরোনোর বড় সুবিধা যে থেকে থেকেই সুন্দর মুখ দেখতে পাওয়া যায়। বাঙালি জাতির বেলায় কথাটা হয়তো ওভাবে খাটবে না।"
 
হায় ঈশ্বর, কী ভীষন বর্ণবাদী বক্তব্য! রবীন্দ্রনাথ যদি এটি বলে থাকেন, তবে তার জন্যও একই হবে আমার প্রতিক্রিয়া। তাও সময়ের দাবীতে রবীন্দ্রনাথ কিছুটা পার পেলেও আজকে এই একুশ শতকে এসে এমন একটি তীব্র বর্ণবাদী বক্তব্যকে উপমা হিসেবে, উদাহরণ হিসেবে প্রয়োগ করা শুধু দৃষ্টিকটুই নয়, অপরাধও বটে।
 
উচ্চতা অংশ নিয়ে কোনো মন্তব্য করবো না, এই জন্য যে আমার উচ্চতা লেখকের হিসাবের বাইরে রকমের কম। সেটা বাকিরা করুক। পাঠককে এটা বলার সুযোগ দিতে চাই না যে আমি ব্যক্তিগতভাবে নিয়ে এটা লিখছি।
 
কিন্তু এই লাইনটি নিয়ে না বললেই নয়,
"ইউরোপ বা ভারতের ওই সব পোশাক পরা সুন্দরীদের সমকক্ষ ভেবে হয়তো কিছুটা হাস্যকর আত্মতৃপ্তিও পাচ্ছে।"
 
না মানে, আসলেই উনি এটা লিখতে পারলেন? একটা সমগ্র জাতির নারীকে উনি বলছেন, শুধু পোশাক রুচির জন্য, অন্যদের মত সুন্দরী নয়, কিন্তু সেটা হবার ব্যর্থ চেষ্টা করছে? এটিও ভীষন ভীষন বর্ণবাদী আর অসম্মানজনক স্টেইটমেন্ট। আজকের এই আধুনিক বিশ্বে যে কোনো অবস্থার কোনো একজন মানুষকেও অসুন্দর বলে স্টেইটমেন্ট দেয়া যায় না। এটা ঘৃণ্য, বাজে, জঘন্য!
 
"আমরা যেন না ভুলি যে এসব পোশাক বাঙালি মেয়েদের দেহ গঠনের একেবারেই অনুকূল নয়।"
 
কোন পোশাক কার জন্য অনুকূল, আরামদায়ক, যুগোপোযোগী সেটি একমাত্র সে-ই ঠিক করতে পারে। সর্বোচ্চ কাছের মানুষেরা প্রভাবিত করতে পারে। অন্য কেউ বলে দিতে পারে না। এমনকি, অস্ট্রেলীয় শর্ট, টি শার্ট পরা মানুষটিও বলে দিতে পারে না, বাংলাদেশের এমন আগুন গরম আবহাওয়ায় আমাদের মানুষদের জন্য এত কাপড়চোপড় পরা অনুকূল নয়। এটা যার যার সহ্যক্ষমতা, সংস্কৃতি, রুচি, ইত্যাদির প্রশ্ন, আপনি কাউকে বলতে পারেন না এই এই পোশাক আমার জন্য অনুকূল নয়। আমিও আপনাকে এটা বলতে পারিনা।
 
"সালোয়ার-কামিজ, টাইট জিনস, মিনি স্কার্ট কি এর সমকক্ষ? শেষেরগুলো তো প্রায় পোশাক না থাকারই শামিল।"
 
এই একবিংশ শতাব্দীতে পোশাকের প্রতি এত ঘৃণা, বিদ্বেষ রেখে একজন মানুষ নিজেকে আধুনিক মানুষ হিসেবে দাবীই তো করতে পারে না। প্রত্যেক পোশাকের নিজস্ব সংস্কৃতি, উপযোগিতা, ঐতিহ্য আছে। কোনো পোশাককেই কেউ পোশাক নয় বলে তাচ্ছিল্য করতে পারে না। এই যে শাড়ি নিয়ে যে তার এত মুগ্ধতা, সেই শাড়িকেও কোনো পোশাকের মধ্যে পড়ে না বললে যে রকম অন্যায় হবে সেই একই রকমের অন্যায় উনি করেছেন উল্লেখ্য পোশাকগুলোকে পোশাক নয় বলে।
 
"বাকি পৃথিবীর অধিকাংশ দেশেই পোশাক হয় শরীরটাকে রমণীয় গুদামঘর বানিয়ে রাখে, নয়তো প্রায় বিবসনা করে রগরগে যৌনতার মৌতাত উদ্​যাপন করে।"
 
এরকমের সেক্সিস্ট কথাও এত গর্ব করে এমন সম্মানিত জায়গা থেকে মানুষ লিখতে পারেন? গুদামঘর বলতে উনি কী ইঙ্গিত করলেন? আর রগরগে মৌতাত উপভোগ করার পোশাক বলতেই বা তিনি কী ইঙ্গিত করলেন? যেটাকেই ইঙ্গিত করে থাকেন না কেনো, অন্যায় করেছেন। যেইসমস্ত পোশাককে উনি গুদামঘর আর রগরগে বলছেন, আসলে এটা করে উনি উনার ভেতরের আধুনিক সমাজে অগ্রহণযোগ্য, ঘৃণ্য দৃষ্টিভঙ্গিকেই তুলে ধরেছেন।
 
"এ যুগ সৌন্দর্যের পরিশীলনকে জানে না। সে বোঝে শুধু একটা জিনিস; লেস ইজ মোর। এই লেসের আক্রমণে মানুষের পোশাকরুচি তার শরীরের সমস্তরে নেমে গেছে।"
 
যুগের পতাকাবাহী হিসেবে বলতে পারি, যুগ সৌন্দর্যের পরিশীলনকে জানে বলেই একপৃথিবীর যত বৈচিত্রময় পোশাক, বৈচিত্রময় সংস্কৃতির, রঙের, গঠনের মানুষের মাঝে মিলেমিশে একাকার হয়ে এগিয়ে যাচ্ছে। পোশাকরুচি নামেনি স্যার, আপনার নেমে থাকা দৃষ্টিভঙ্গি উন্মোচিত হয়েছে।
 

  • ৪৯৯ বার পড়া হয়েছে

পূর্ববর্তী লেখা পরবর্তী লেখা

বিঃদ্রঃ নারী'তে প্রকাশিত প্রতিটি লেখার বিষয়বস্তু, ক্রিয়া-প্রতিক্রিয়া ও মন্তব্যসমুহ সম্পূর্ণ লেখকের নিজস্ব। প্রকাশিত সকল লেখার বিষয়বস্তু ও মতামত নারী'র সম্পাদকীয় নীতির সাথে সম্পুর্নভাবে মিলে যাবে এমন নয়। লেখকের কোনো লেখার বিষয়বস্তু বা বক্তব্যের যথার্থতার আইনগত বা অন্যকোনো দায় নারী কর্তৃপক্ষ বহন করতে বাধ্য নয়। নারীতে প্রকাশিত কোনো লেখা বিনা অনুমতিতে অন্য কোথাও প্রকাশ কপিরাইট আইনের লংঘন বলে গণ্য হবে।


মন্তব্য টি

লেখক পরিচিতি

সানজিদা সুলতানা

হিউম্যানিস্ট এক্টিভিস্ট

ফেসবুকে আমরা