একজন জোহরা

শনিবার, মার্চ ৩, ২০১৮ ৪:১৪ AM | বিভাগ : ওলো সই


জোহরা আর আমি বসেছিলাম মুখোমুখি দুটো চেয়ারে, দুবাই এয়ারপোর্টের ডিপার্টচার গেটের সামনে। অপেক্ষা করছি ঢাকাগামী এমিরাতস ফ্লাইট বোর্ডিং এর। আমি একটা বই কোলে রেখে পড়ছি আর জোহরা পাশের এক ভদ্রলোকের সাথে কথা বলছে। লোকটার সাথে তার এইমাত্রই পরিচয় কথায় বুঝা যাচ্ছিলো।

জোহরার পরনে কালো বোরখা। সামনের নেটটা উলটিয়ে মাথার উপর ফেলা তাই মুখমণ্ডল খুব সুন্দর দেখা যাচ্ছিলো। সে সুন্দরী নয় কিন্তু তাকে বারবার আড়চোখে দেখতে ইচ্ছে করছিলো। প্রসাধনহীন মুখে নির্মল হাসিটা দেখে বুঝাই যাচ্ছে এটাই তার সার্বক্ষণিক প্রসাধন। সে ঠিক শুদ্ধ বাংলায় কথা বলছিলো না আবার ঠিক গ্রাম্য ভাষাও নয়।

জোহরার দীপ্ত চেহারা আর কথাবার্তায় বইয়ে আমার মনযোগ রইলো না। দীপ্ত ব্যক্তিত্বের মানুষ আমাকে খুব টানে, বিশেষ করে খেটে খাওয়া নারীরা। আমি জোহরার সাথে কথা বলার সুযোগ খুঁজতে লাগলাম। পাশের লোকটা টয়লেটের সন্ধানে উঠতেই আমি সুযোগ লুফে নিলাম। শুরু করলাম "কোথা থেকে এসেছেন?" দিয়ে তারপর চলতেই থাকলো কথা।

জোহরা জর্ডানে গিয়েছিলো। দুই বছর গৃহ পরিচারিকার কাজ করেছে কোনো এক শেখের বাড়ীতে। কন্ট্রাক্ট শেষ, এখন দেশে ফিরে যাচ্ছে তিন সন্তানের কাছে যাদের সে রেখে এসেছিলো তার মায়ের কাছে।

শেখের বাড়ীতে সে খুব ভালো ছিলো। শেখের বউ আর মা তাকে যথেষ্ট সম্মান করতো। কন্ট্রাক্ট শেষ হলেও রিনিউ করা যেতো কিন্তু জোহরার জরায়ুতে সমস্যা দেখা দিয়েছে। চিকিৎসার দরকার যেটা জর্ডানে করানো সম্ভব ছিলো না।

তাও নাকি সে মাটি কামড় দিয়ে পড়ে থাকতো কিন্ত পাঁচ বছর বয়সের ছোট মেয়েটার কান্না নাকি আর সইতে পারছে না। ছেলেমেয়ে তিনজনের আবদার "মা, আইয়া পড়ো। আমগো ট্যাকার দরকার নাই। একলগে থাকলে একটা ব্যবস্থা কইরাই নিমু।"

ছেলেমেয়েদের এই হাহাকার তার খুব বিঁধে তাই সিদ্ধান্ত নিয়েছে দেশে ফেরার।

আমি কাউকে ব্যক্তিগত প্রশ্ন করি না কিন্তু কোনো এক কারনে জোহরাকে কত কি নির্দ্বিধায় জিজ্ঞেস করে ফেললাম। কি জানি হয়তো গভীর মায়াবোধ থেকেই! কত টাকা খরচ করে গিয়েছিলো আর সব বাদে কত জমিয়েছে তাও জিজ্ঞেস করে ফেললাম। স্বামীর কথাও।

জোহরা কি সুন্দর হাসিমুখে গল্প করে চললো।

সব খরচ বাদে দু’বছরে ছয় লাখ টাকা জমিয়েছে। ব্যাংকে আছে। স্বামীর সাথে তালাক হয় নি কিন্তু সে নতুন বউ নিয়ে এখন কোথায় থাকে তা সে জানে না। ছোট মেয়েটা পেটে আসার পর স্বামী নতুন বিয়ে করে তাদের ছেড়ে গিয়েছে আর কখনো খোঁজ নেয় নি।

জোহরা আফসুস করে না। সে হাল ধরেছে সংসারের। সে ভালোই থাকবে। এত সারল্য নিয়ে মানুষ ভালোই থাকে।

হঠাৎ কেনো যেন মনে হলো আমি জোহরাকে হিংসা করছি। জীবনকে এত সহজ করে নেয়ার ক্ষমতাকেই হয়তো আমি হিংসে করছি।

আমি তাও জানি জোহরার অকপট নির্মল হাসিটা কেবলই প্রকৃতি প্রদত্ত। প্রকৃতি সবার ক্ষেত্রে সবকিছুতে উদার হয় না।


  • ৪৯৮ বার পড়া হয়েছে

পূর্ববর্তী লেখা পরবর্তী লেখা

বিঃদ্রঃ নারী'তে প্রকাশিত প্রতিটি লেখার বিষয়বস্তু, ক্রিয়া-প্রতিক্রিয়া ও মন্তব্যসমুহ সম্পূর্ণ লেখকের নিজস্ব। প্রকাশিত সকল লেখার বিষয়বস্তু ও মতামত নারী'র সম্পাদকীয় নীতির সাথে সম্পুর্নভাবে মিলে যাবে এমন নয়। লেখকের কোনো লেখার বিষয়বস্তু বা বক্তব্যের যথার্থতার আইনগত বা অন্যকোনো দায় নারী কর্তৃপক্ষ বহন করতে বাধ্য নয়। নারীতে প্রকাশিত কোনো লেখা বিনা অনুমতিতে অন্য কোথাও প্রকাশ কপিরাইট আইনের লংঘন বলে গণ্য হবে।


মন্তব্য টি

লেখক পরিচিতি

সানজিদা রোমান

লেখক একজন প্রবাসী

ফেসবুকে আমরা