জীবন শুরুর পথে ব্রাইটন

রবিবার, আগস্ট ১৯, ২০১৮ ২:৪৭ PM | বিভাগ : ওলো সই


সালটা ছিলো ২০০৫ এর শেষের দিক। দ্বিতীয়বারের মতো ইংল্যান্ড ফিরে এলাম মালয়েশিয়া থেকে। কোলে মেয়েটা আর হাতে ব্যাগ নিয়ে এয়ারপোর্ট থেকে একদম শুন্য ফ্ল্যাটে উঠলাম। মেয়ের বয়স তখন আড়াইয়ের মতো।

হাতে টাকা-পয়সা সামান্য, কয়েকমাস চলার মতো। সুপার মার্কেটে গিয়ে দুইটা লেপসহ নিতান্তই প্রয়োজনীয় জিনিস কিছু কিনে আনলাম বিকেলে। পুরো ফ্ল্যাটে কিছুই নেই। একটা লেপ ফ্লোরে বিছিয়ে আরেকটা লেপ গায়ে দিয়ে রাত কাটিয়ে শুরু করলাম যাত্রা।

চাকরি খুঁজি হন্যে হয়ে। জমা টাকার অনেকাংশ দিয়ে একটা পুরনো গাড়ি কিনলাম। গাড়ি ছাড়া চাকরি পাওয়াটা কঠিন। যে এলাকায় থাকি সেখানে পাব্লিক ট্রান্সপোর্টের সুবিধা ওরকম নয়।

চার সপ্তাহ চলে গেলো চাকরি ছাড়া৷ টাকা ফুরিয়ে আসছে। রাতে ঘুম হয় না। ওজন কমেছে অনেক। হঠাৎ একদিন ফোন এলো বিবিসি থেকে চাকরির ইন্টারভিউতে ডেকেছে।

বাসা থেকে অনেক দূর। ৭০ মাইল দূরে ব্রাইটন নামের এক শহরে। প্রতিদিন যাওয়া আসা সম্ভব নয় তার উপর মেয়েটা এত ছোট! সিদ্ধান্ত নিলাম যদি চাকরি হয় তবে বাসা বদলে ওখানে চলে যাবো।

ইন্টার্ভিউ ছিলো বিকেল তিনটায়। সকাল দশটায় এক পরিচিতা মহিলার কাছে মেয়েকে রেখে রওনা হলাম আগেভাগেই। তখনও জিপিএস হাতের নাগালে আসে নি। ইন্টারনেটে ম্যাপ দেখে, কাগজের ম্যাপ গাড়ীতে নিয়ে রওনা দিলাম। অনেকক্ষণ ড্রাইভ করার পর দেখি সামনে সমুদ্র, আর রাস্তা নেই। গাড়ি থামিয়ে এক দোকানে গিয়ে কাঁদোকাঁদো গলায় সব খুলে বলাতে লোকটা বেশ সহানুভূতি নিয়ে বললো - তুমি ডোভার চলে এসেছো ডার্লি। ভুল পথে প্রায় পঞ্চাশ মাইল!

তারপর সব বিস্তারিত বুঝিয়ে কাগজে এঁকে দিলো। সে বুঝতে পারছিলো চাকরিটা আমার কত দরকার!

ব্যাপারটা এরকম যে ঢাকা থেকে সিলেট যাওয়ার কথা ছিলো। গিয়ে দেখলাম কুমিল্লা চলে এসেছি। এখন কুমিল্লা থেকে সিলেট যেতে হবে।

গাড়ীতে পেট্রোল নিয়ে আবার শুরু করলাম। তখন বাজে দুইটার মতো। এত মন খারাপ লাগছিলো। নিজেকে এত অসহায় লাগছিলো! তা বুঝানো সম্ভব নয়। ড্রাইভ করছিলাম আর চোখ দিয়ে গড়িয়ে পানি পড়ছিলো। দেখি আড়াইটার মতো বাজে। আজ তো তাহলে ইন্টারভিউতে যেতেই পারবো না! এই চিন্তা আসতেই ফোপানো কান্না শুরু হলো। একটু পর গাড়ীটা এক যায়গায় থামিয়ে ইচ্ছে মতো চিৎকার করে কাঁদলাম কতক্ষণ নিজেকে হালকা করার জন্য।

কান্না থামিয়ে চোখ মুছে ফোন করলাম বিবিসিতে। সব খুলে বললাম। বললাম চাকরিটা আমার লাগবেই যদি তোমাদের মনে হয় আমিই যোগ্য ব্যক্তি তবে আজ পৌঁছাতে দেরী হবে। লোকটা বললো - ঠিক আছে আমি ইন্টারভিউ প্যানেলকে বুঝিয়ে বলবো। যদি পাঁচটার আগে আসতে পারো তবে ইন্টারভিউ নেবো। অনেক কৃতজ্ঞতা জানিয়ে আবার ড্রাইভ করতে শুরু করলাম।

সেদিন কিসের যেন একটা জেদ চেপে বসেছিলো। ইন্টারভিউ হোক না হোক, আজ আমি ব্রাইটন যাবোই!

বিবিসি অফিস গিয়ে পৌঁছলাম সাড়ে চারটার দিকে। ইন্টারভিউ হলো। প্যানেলের একজন ডাইরেক্টরকে অলরেডি চলে যেতে হয়েছিলো কিন্তু বাকী তিনজন সুন্দর ইন্টারভিউ নিলেন। রুম থেকে বের হওয়ার সময় বললো যেন রিসেপশনে কিছুক্ষণ বসে অপেক্ষা করি।

তখন ছয়টার মতো বাজে। অফিসে লোকজন তেমন নেই৷ প্যানেলের একজন এসে বললো - আজকের দিনটা তোমার খুব খারাপ গেছে আমরা বুঝতে পারছি তবে তোমার সাহস আর ডেডিকেশন আমাদের মুগ্ধ করেছে। আর অপেক্ষা না করিয়ে পজিশনটা তোমাকে অফার করতে চাই। যত তাড়াতাড়ি সম্ভব জয়েন করো।

আমি দুনিয়া ভুলে একটা লাফ দিয়ে লোকটাকে কি ভীষণ জোড়ে জড়িয়ে ধরে থ্যাংক ইউ বললাম। আনন্দে কেঁদেও দিলাম। লোকটা হেসে বললো - গুড লাক।

বাসায় আসার পথেও কেঁদেছি। স্বপ্নগুলি বুঝি এভাবেই পুরণ হয়! যার যার কিসমত নিয়ে সে সে বেঁচে থাকে! যা হওয়ার তা এমন করে হলেও হয়!

ব্রাইটন বাসা নিয়ে মেয়েকে চাইল্ড কেয়ারে দিয়ে বিবিসিতে সফটওয়্যার ট্রেইনারের চাকরিটা শুরু করার পর থেকে আর পিছনে ফিরে তাকাতে হয় নি।

মেয়ে আর আমি! আমাদের ব্রাইটনের দিনগুলো অনেক সুন্দর ছিলো। অন্যদিন লিখবো - ব্রাইটনের দিনগুলোর কথা।


  • ৪৫৭ বার পড়া হয়েছে

পূর্ববর্তী লেখা পরবর্তী লেখা

বিঃদ্রঃ নারী'তে প্রকাশিত প্রতিটি লেখার বিষয়বস্তু, ক্রিয়া-প্রতিক্রিয়া ও মন্তব্যসমুহ সম্পূর্ণ লেখকের নিজস্ব। প্রকাশিত সকল লেখার বিষয়বস্তু ও মতামত নারী'র সম্পাদকীয় নীতির সাথে সম্পুর্নভাবে মিলে যাবে এমন নয়। লেখকের কোনো লেখার বিষয়বস্তু বা বক্তব্যের যথার্থতার আইনগত বা অন্যকোনো দায় নারী কর্তৃপক্ষ বহন করতে বাধ্য নয়। নারীতে প্রকাশিত কোনো লেখা বিনা অনুমতিতে অন্য কোথাও প্রকাশ কপিরাইট আইনের লংঘন বলে গণ্য হবে।


মন্তব্য টি

লেখক পরিচিতি

সানজিদা রোমান

লেখক একজন প্রবাসী

ফেসবুকে আমরা