একটু ভালোবাসা, একক অভিবাবক (single mom) মায়েদের জন্য

মঙ্গলবার, মার্চ ১৩, ২০১৮ ৩:৪৯ AM | বিভাগ : সমাজ/গবেষণা


single mom শব্দটা বর্তমানে আমাদের সমাজে বিষফোঁড়ার মতো ক্রমশ পেকে উঠছে। তবে সিঙ্গেল মাদার শব্দটা আদৌ যুক্তিযুক্ত কিনা, তা ভাববার সময় এসেছে। আমি সিঙ্গেল মাদারকে বলি সন্তানের একক অভিবাবক। পুরুষেরা হয়তো গর্জে উঠবে। কিন্ত বর্তমান সময়ে আশেপাশে একক অভিবাক মায়েদেরকে দেখে এ শব্দের বিকল্প অন্য শব্দ হতে পারে, তা আমি ভাবতেও চাই না।একটা সময় পর্যন্ত শুনেছি, অনেক পুরুষেরা বিয়ে করতে ভয় পায়! প্রেম করতে ভয় নেই! বিয়ে মানেই তাদের কাছে আপদ! বিয়ে শব্দটাই পুরুষ সিংহকে টলিয়ে দিতে যথেষ্ট। কিন্তু প্রেমে বুদ হতে তাদের বাঁধে না। বরং প্রেমটাকে রসিয়ে রসিয়ে উপভোগ করায় তাদের থেকে পারঙ্গম দ্বিতীয়টি নেই। প্রেমটাকে রসিয়ে রসিয়ে যখন বিয়ের কথা ওঠে, তখনই পুরুষ সিংহটি প্রেমিকার সামনে বিড়াল সেজে ”মিউ মিউ” করে। তাদের মধ্যে অনেকে পালায়। অনেকে মুখটি গোমড়া করে বাধ্য ছেলের মতো বিয়ের পিড়িতে বসে যায়। তবে তাতে সেই ছলাকলা পটিয়সী পুরুষের মন ভেজে না। হানিমুন শেষ হতে না হতেই হানি ও মুন দু’ই উধাও হয়।

কিন্তু বর্তমানে চারিদিকে একক অভিভাবক (single mom) মায়েদের বেশ একটা রাজত্ব চলছে। এ থেকে বোঝা যায় কিছু অকালকুষ্মান্ড পুরুষ, যারা বিয়ে করাকে কোনো ব্যপার মনে করে না! কিন্তু বউ বাচ্চার দায়িত্ব নিতে চায় না! কিন্তু দাবি রাখে ষোল আনা! ডিভোর্স না দিয়ে দেনমোহরের টাকা বাঁচায়। ভরণ পোষণ না দিয়ে দু’চারটা প্রেম করে বেড়ায়। আমাদের সর্বংসহা আইনও তাদের রক্ষা কবজের কাজ করে। যে বাবা জন্ম থেকে যে সন্তানের খোঁজ নেয় না সেই বাবাই সর্বময় ক্ষমতার মালিক, যাকে বলে একছত্র অধিপতি! আইন বলে’ “মুসলিম আইন অনুযায়ী, বাবাই অপ্রাপ্তবয়স্ক সন্তানের আইনগত অভিভাবক আর মা হচ্ছেন সন্তানের তত্ত্বাবধায়ক। সন্তানের মা যদি বাবার কাছ থেকে আলাদা থাকেন কিংবা তাঁদের মধ্যে বিচ্ছেদ হয়ে যায়, তাহলে মা তাঁর সন্তানের তত্ত্বাবধান করার ক্ষমতা হারাবেন না। ছেলের ক্ষেত্রে সাত বছর বয়স পর্যন্ত এবং মেয়েসন্তানের বয়ঃসন্ধি বয়স পর্যন্ত মা সন্তানদের নিজের কাছে রাখতে পারবেন । “যে মা সন্তানের জন্য তার সব চাওয়া পাওয়া বিসর্জন দিলেন তিনি হলেন শুধুমাত্র একজন কেয়ারটেকার। আর লম্পট, চরিত্রহীন, দায়িত্ব অবহেলাকারী বাবাই হলেন তার অভিবাবক।

এধরণের পুরুষেরা ২/৪ টা বিয়েকে ডাল-ভাত মনে করে। সাথে চালায় পরকিয়া! বউদের নামে মিথ্যা কুৎসা রটিয়ে নিজে সর্বদা সাধু পুরুষ থাকে! অল্প বয়সী প্রেমিকা নিয়ে রেস্টুরেন্টে লাঞ্চ করার ছবি ফেবুতে দিয়ে ক্যাপশন দেয়, ‘আমার আদরের ছোট বোন’। বেশী বয়সী প্রেমিকা নিয়ে রেস্টুরেন্টে লাঞ্চ করার ছবি ফেবুতে দিয়ে ক্যাপশন দেয়, ‘আমার শ্রদ্ধেও ভাবী’। কিছু তেলবাজ নারীও তাদেরকে আঁচল বা কোনো কোনো ক্ষেত্রে বুকের মাঝে আগলে রাখে! আর এসব কুলাঙ্গারকে আরও নোংরা কাজ করতে উৎসাহিত করে।

মুখোশধারী এসব পুরুষ ও নারীরা সমাজের পরিবেশকে শুধু দুষিতই করছে না, বরং পরবর্তি প্রজন্মকে এক অনিশ্চিত ভবিষ্যতের দিকে ঠেলে দিচ্ছে। প্রতিটি সন্তান বাবাকে মিস করবে এটাই প্রাকৃতিক নিয়ম। বাবাদের ক্ষেত্রেও তার ব্যতিক্রম নয়। কিন্তু এসব বাবারা প্রকৃতির এ নিয়মে বাধাঁ নয়। কিন্তু তার সন্তানেরা আশে পাশে অন্য শিশুদের বাবা, বিশেষ করে তার নিজের মায়ের বাবাকে দেখে তার বাবাকে মিস করতে শেখে। সে কষ্ট পায়। তার বাবার অবহেলা তাকে সবসময় ব্যথিত করে। তাই ছোট্ট অবুঝ মন থেকেই কষ্টের সাথে তাদের জীবন বাঁধা পড়ে যায়। নীল কষ্টগুলো শুধু তাকেই ব্যথিত করে না। তাকে যারা ভালোবাসে, তারাও তার সাথে সাথে ব্যথার যন্ত্রণা ভোগ করে। বিশেষ করে তার মা। তথাকথিত সিঙ্গেল মা! সমাজের কাছে সে এক বিশেষ চিড়িয়া! দায়- দ্বায়িত্ব তার, কিন্তু সন্তানের অভিবাবক সে নয়! সে হলো গিয়ে কেয়ারটেকার!

অন্যদিকে এই পুরুষগুলো এত জঘন্য কাজ করেও সমাজের অনুকুলতা পায় এবং পাচ্ছে। এরা সমাজে বুক ফুলিয়ে ঘুরে ঘুরে তার অনৈতিক কাজের পরিধি বিস্তার করছে। আর তাদের শিকার নারী ও তার সন্তান সমাজে নিকৃষ্ট শ্রেণির জীবের মতো কোনো মতে জীবনধারণ করছে। হাসতে তাদের মানা। কারো সামনে মন খুলে কাঁদতেও তাদের মানা!

এই একক অভিভাবক মায়েরা মন খুলে হাসতে ভুলে গেছে! তাদের হাসিটা কান্নার প্রতিশব্দ হয়েছে তাদের চেহারায়। সন্তান তার বাবাকে মিস করার যাতনাটা মায়ের বুকেও বেজে চলছে নিরন্তন। সমাজ থেকে এই মা-সন্তানের ছোট্ট পরিবারটি বিচ্ছিন্ন। মাকে নিরাভরণ আর আনন্দহীন দেখতে দেখতে সন্তানেরাও পাগলপারা। তাদের দু’জন দু’জনের দুঃখে শুধু দীর্ঘনিঃশ্বাস টুকুই ফেলতে পারে।কোনো কোনো ক্ষেত্রে মায়েরা ও তার সন্তানেরা মানসিকভাবেও অসুস্থ হয়ে পড়ে। মুলতঃ এর জন্য সামাজিক চাপই মুখ্য ভূমিকা রাখে। সমাজ তাদেরকে রংহীন জীবন যাপনে বাধ্য করতে চায়! বেশির ভাগ মা ও সন্তান সে চাপ থেকে বেরিয়ে সুস্থভাবে জীবন চালাতে পারে না। বুকে দুখঃ চেপে অমানবিক জীবনের বোঝা টেনে যায় জীবনভর।

তবে আশার কথা হলো, তাদের মাঝে যে ব্যতিক্রম নেই তা নয়। যারা একটা বেঈমান ও বিশ্বাসঘাতক পুরুষের অতীত ও বর্তমান থেকে বের হয়ে আসতে পারে এবং সুন্দরভাবে নিজেদের জীবনটাকে দুঃস্বপ্নের হাত থেকে বাঁচাতে পারে।

যার জন্য আমাদের ভালোবাসাটাও জরুরি। আসুন সুন্দর মনের মানুষেরা, আমরা তাদের জয়গান গাই এবং বাকিদেরকেও আলোর পথে আসতে সহায়তা করি। একটু ভালোবাসা থাক, এসব একক অভিভাবক (single mom) মায়েদের জন্য।

 


  • ৬৭৬ বার পড়া হয়েছে

পূর্ববর্তী লেখা পরবর্তী লেখা

বিঃদ্রঃ নারী'তে প্রকাশিত প্রতিটি লেখার বিষয়বস্তু, ক্রিয়া-প্রতিক্রিয়া ও মন্তব্যসমুহ সম্পূর্ণ লেখকের নিজস্ব। প্রকাশিত সকল লেখার বিষয়বস্তু ও মতামত নারী'র সম্পাদকীয় নীতির সাথে সম্পুর্নভাবে মিলে যাবে এমন নয়। লেখকের কোনো লেখার বিষয়বস্তু বা বক্তব্যের যথার্থতার আইনগত বা অন্যকোনো দায় নারী কর্তৃপক্ষ বহন করতে বাধ্য নয়। নারীতে প্রকাশিত কোনো লেখা বিনা অনুমতিতে অন্য কোথাও প্রকাশ কপিরাইট আইনের লংঘন বলে গণ্য হবে।


মন্তব্য টি

লেখক পরিচিতি

রুকাইয়া সাওম লীনা

ফ্যাশন ডিজাইনার।

ফেসবুকে আমরা