আঞ্জুমান রোজী

লেখক

রোকেয়া সাখাওয়াত হোসেন: চির শ্রদ্ধাঞ্জলি

রোকেয়া সাখাওয়াত হোসেন আমাদের জীবনে অপরিহার্য একটি নাম। জীবন চলার পথে প্রতিটি মহূর্তে অনুসরণীয়, অবিস্মরণীয় একটি নাম। তাঁকে নিয়ে কথা বলা, আলোচনা করা, লেখালেখি করা, সেইসাথে তাঁর সমস্ত কর্মযজ্ঞ নিয়ে গবেষণা করা এবং পড়াশোনা করা আমাদের নিত্যদিনের চিন্তাচেতনায় ও কর্মের মধ্যে একটি অংশে জুড়ে থাকবে এমনটাই প্রত্যাশা করি। কারণ, রোকেয়া শুধু নারীর অগ্রযাত্রার নেতৃত্বই দেন নি, তিনি সমগ্র মানবজাতির কল্যাণের প্রতিক হয়ে এসেছেন। তিনি নিবেদিত মন নিয়ে নিষ্ঠার সঙ্গে যেভাবে দিনের পর দিন কাজ করে গেছেন, তা আমাদের চলার পথে দৃষ্টান্ত হয়ে আছে। তিনি সমাজ সংস্কারকের ভূমিকায় ঐতিহাসিক অবদান রেখেছেন।  একাডেমিক শিক্ষা তাঁর তেমন ছিলো না। বলতে গেলে স্বশিক্ষিত হয়ে নিজ বিবেক বুদ্ধি বিবেচনায় জাগ্রত মননের স্ফুরণ ঘটিয়েছেন। যা মহাকালের আলোকবর্তিকা হয়ে কাজ করে যাচ্ছে। যদিও তাঁর  স্কুল 'সাখাওয়াত মেমোরিয়াল গার্লস স্কুল' পরিচালনা করতে গিয়ে তিনি অনেক বিড়ম্বনার শিকার হয়েছেন। এক চিঠিতে লিখেছেন, "আমার ম্যাট্রিক পরীক্ষা কেয়ামতের পরদিন দেওয়া হইবে। এখন পড়া তৈরি করিতেছি।"
 
রোকেয়ার কর্মের বহর দেখলে অবাক হতে হয়। তাঁর কর্মের পেছনে কোনো লাভ বা লোভের আস্ফালন ছিলো না। ব্যক্তিগত আরাম আয়েশকে জলাঞ্জলি দিয়ে মানুষের দ্বারে দ্বারে গেছেন, কলম ধরেছেন, অজস্র চিঠি লিখে তাঁর কর্মের কথা জানিয়েছেন। উদ্দেশ্য একটাই বঙ্গ সমাজের নারীকুলকে অন্ধকার থেকে উদ্ধার করবেন। তিনি উপলব্ধি করেছিলেন, "সহস্রজনের বাধা ঠেলিয়া অগ্রসর হওয়া একজনের কার্য নহে। "তাই তিনি সহস্রজনকেই চেতনাগতভাবে জাগিয়ে তোলার জন্য এক দূরদর্শী দীর্ঘস্থায়ী বিঘ্ন সংকুল সংস্কার-আন্দোলনে ব্রতী হয়েছিলেন। তিনি লিখেছেন, "নর ও নারী উভয়েই একই বস্তুর অঙ্গবিশেষ। যেমন একজনের দু‘টি হাত কিম্বা কোনো শকটের দুইটি চক্র; সুতরাং উভয়ে সমতুল্য অথবা মিলিয়া একই বস্তু হয়। তাই একটিকে ছাড়িয়া অপরটি সম্পূর্ণ উন্নতি লাভ করিতে পারিবে না। এক চক্ষু বিশিষ্ট ব্যক্তিকে লোকে কানা বলে। "নারী পুরুষের সম্পর্কের অন্তর্দ্বন্দ্বের কথা কখনো তিনি বিস্মৃত হন নি। এর জন্য তাঁর কোনো দর্শনের বই পড়ার কিম্বা কোনো মতাদর্শের অনুসারী হওয়ার দরকার হয় নি। অন্তর্গত কাণ্ডজ্ঞান, বিবেক এবং বিচারশক্তিই ছিলো কর্মক্ষেত্রে তাঁর পথপ্রদর্শক। তাই প্রতিকূলতার মুখে কখনও তিনি মাত্রাজ্ঞান হারান নি। রোকেয়া লিখেছেন,
 
"আমরা সমাজের অর্ধ অঙ্গ। আমরা পড়িয়া থাকিলে সমাজ উঠবে কিরূপে? কোনো ব্যক্তির এক পা বাঁধিয়া রাখিলে সে খোঁড়াইয়া খোঁড়াইয়া কতদূর চলিবে? পুরুষদের স্বার্থ এবং আমাদের স্বার্থ ভিন্ন নহে, বরং একই। তাহাদের জীবনের উদ্দেশ্য বা লক্ষ্য যাহা, আমাদের লক্ষ্যও তাহাই। শিশুর জন্য পিতামাতার উভয়েরই সমান দরকার।
 
জগতের যেসকল সমাজের পুরুষেরা সঙ্গিনীসহ অগ্রসর হইতেছেন, তাহারা উন্নতির চরমসীমায় উপনীত হইতে চলিয়াছেন। আমাদের উচিৎ যে তাহাদের সংসারে এক গুরুতর বোঝা বিশেষ না-হইয়া তাহাদের সহায়তা করি৷ আমরা অকর্মণ্য পুতুল জীবন বহন করিবার জন্য সৃষ্টি হই নাই, একথা নিশ্চিত।" এমন মানসিকতা নিয়ে রোকেয়া আমৃত্যু কর্মযজ্ঞ চালিয়েছেন। জাতি-ধর্ম, স্ত্রী-পুরুষ এবং পূর্ব বাংলা, পশ্চিম বাংলা নির্বিশেষে সকলের প্রতি দৃষ্টি নিবন্ধ করে কাজ করেছেন। তিনি বলেছেন, "আমি ভগিনীদের কল্যাণ কামনা করি, তাহাদের ধর্মবন্ধন বা সমাজবন্ধন ছিন্ন করিয়া তাহাদিগকে একটা উন্মুক্ত প্রান্তরে বাহির করিতে চাহি না। মানসিক উন্নতি করিতে হইলে হিন্দুকে হিন্দুত্ব বা খ্রিস্টানকে খ্রিস্টানী ছাড়িতে হইবে এমন কোনো কথা নাই। আপন আপন সম্প্রদায়ের পার্থক্য রক্ষা করিয়াও মনটাকে স্বাধীনতা দেওয়া যায়। আমরা যে কেবল উপযুক্ত শিক্ষার অভাবে অবনত হইয়াছি, তাই বুঝিতে ও বুঝাইতে চাই।" 
 
রোকেয়াকে সাধারণত স্মরণ করা হয় বাঙালি মুসলমান সমাজে নারীমুক্তি আন্দোলনের অগ্রদূত রূপে। তাঁর এই নারীমুক্তি আন্দোলনের প্রকৃতি বুঝতে চেষ্টা করলেই জাতির জন্য তাঁর অবদানের পরিচয় অনেকখানি পাওয়া যাবে। এ ব্যাপারে তাঁর রচনাবলি আমাদের প্রধান সহায়। আজ রোকেয়া দিবসে রোকেয়া সাখাওয়াত হোসেনকে স্মরণ করি তাঁর সামগ্রিকতা নিয়ে। শ্রদ্ধাঞ্জলি জানাই তাঁকে।
 

642 times read

নারী'তে প্রকাশিত প্রতিটি লেখার বিষয়বস্তু, ক্রিয়া-প্রতিক্রিয়া ও মন্তব্যসমুহ সম্পূর্ণ লেখকের নিজস্ব। প্রকাশিত সকল লেখার বিষয়বস্তু ও মতামত নারী'র সম্পাদকীয় নীতির সাথে সম্পুর্নভাবে মিলে যাবে এমন নয়। লেখকের কোনো লেখার বিষয়বস্তু বা বক্তব্যের যথার্থতার আইনগত বা অন্যকোনো দায় নারী কর্তৃপক্ষ বহন করতে বাধ্য নয়। নারীতে প্রকাশিত কোনো লেখা বিনা অনুমতিতে অন্য কোথাও প্রকাশ কপিরাইট আইনের লংঘন বলে গণ্য হবে।