মিন্নিকে এই দেশ ছাড়বে না

শুক্রবার, জুলাই ১২, ২০১৯ ১২:৫৩ AM | বিভাগ : আলোচিত


আমি আজকে পর্যন্ত রিফাত হত্যার ভিডিওটা দেখি নাই। আমার দেখতে ইচ্ছা হয় নাই। নিউজফিডে এই ভিডিও আসলেই আমি দ্রুত নিচে স্ক্রল করেছি। রিফাতের স্ত্রী সম্প্রতি বলেছেন, ‘বিয়ের মাত্র দুই মাসের মাথায় স্বামীকে নির্মমভাবে কুপিয়ে হত্যার দৃশ্য দেখেছি। মানসিকভাবে আমি বিধ্বস্ত। আমার অনুরোধ, আমি তো আপনাদের মেয়ে বা বোন হতে পারতাম, আপনারা না জেনে কোনো মন্তব্য করবেন না। আমি চরম মানসিক নিপীড়নে ভুগছি। কেউ আমাদের পাশে নেই, সবাই শুধু সমালোচনায় মুখর। আমি সবার সহযোগিতা চাই।’

একটু ভেবে দেখেন। দুই মাসের বউ মানে আমাদের দেশের আইডিয়ায় একেবারে নববধূ। আমাদের কতোবড় বুকের পাঁটা, আমরা তার বরটাকে তো মাঝ রাস্তায় প্রকাশ্য দিবালোকে কুপিয়ে মেরে ফেলেছিই, আবার তাকেও প্রতিদিন মৃত্যুর মুখে ঠেলে দিচ্ছি। "ফেলেছি", "দিচ্ছি" এই দুই শব্দ বলার কারণ হলো, আমি মনে করি এই হত্যাকান্ডের দায়ভার আমার আপনার সবার। রিফাতের খুনিদের সাহস করে দেয়ার জন্য একটা প্রতিবাদহীন, বিচারহীন দেশ আমি-আপনি তৈরি করেছি। একইভাবে আমরাই তৈরি করেছি চরম অনৈতিক, মৌলবাদী এবং পুরুষতান্ত্রিক একটা সমাজ, যে সমাজে মিন্নির মতো একজন নারীকে এই স্টেটমেন্ট দিতে হয়েছে।

শিল্প একটা ভয়ংকর মাধ্যম। কখনো সেটা ভয়ংকর সুন্দর, আবার কখনো সেটা নিতান্তই নোংরামো। সেই নোংরামো করতে ধরেন শিল্পীর মেধা খরচ হয়, কিন্তু একইসাথে তার শিল্পীসত্তা কতটা পৈশাচিক তার প্রমাণ সেখান থেকে পাওয়া যায়। একুশ শতকের এই পর্যায়ে এসে অনলাইন ট্রলিং বা মিম বানানো আসলেই এক ধরণের শিল্পের পর্যায়ে পৌঁছেছে। কিন্তু আপনার ট্রলিং যদি একটা মানুষের মেন্টাল ব্রেকডাউনের কারণ হয়, তাহলে আপনি শিল্পী না। আপনি স্রেফ একজন খুনি।

সেদিন দেখলাম নিজেকে খুব প্রগতিশীল দাবি করা এক বড় ভাইও "রিফাত ও নয়নকে হারিয়ে মিন্নির এখন কেউ নাই। মিন্নির দায়িত্ব নেয়ার মতো বন্ধুকে মেনশন করুন" লেখা মিন্নির একটা ছবি আরামসে শেয়ার দিয়ে দিলেন। এটা আসলে আমরা করতে পারি একটাই কারণে। সেটা হলো, মিন্নি একজন নারী এবং মিন্নির নামের সাথে ছোট্ট একটা পরকীয়ার আলাপ জড়ানো হয়েছে। অথবা মিন্নি বিয়ের আগে একটা প্রেম করেছে। ব্যাস, মিন্নিকে ছিঁড়ে-খুবলে খেয়ে ফেলার জন্য এই সমাজের কাছে এইটুকুই যথেষ্ট। এইটুকুই মিন্নিকে চরম ধর্ম অবমাননাকারী বানিয়ে ফেলতে পারে, এইটুকুর জন্যই তাকে পুরো সমাজ মানসিক চাপে মেরে ফেলতে পারে এবং সেটা একদম জায়েজ।

রিফাতের মৃত্যুর পর শাহবাগে হয়তো দাঁড়ালাম। মিন্নিকে কিন্তু এই দেশ ছাড়বে না। তার মানসিক মৃত্যু ঘটবে। আমরা একদম দাঁড়াবো না, দেখবোও না। সেটা দোষ না, সেটা একটা অভ্যাস। আমরা জানিও না মানসিক অত্যাচারেরও প্রতিবাদ হতে পারে। এই রাষ্ট্র মানুষকে বাঁচতে দিবে না। আমাকে-আপনাকে কাউকে না। যদি কোনোভাবে ফাঁক গলে আপনি শারীরিক মৃত্যু থেকে বেঁচেও যান, আপনার মনকে ওরা বাঁচতে দিবে না। পায়ে পিষে নেরে ফেলবে। সেই মৃত্যুতে জাতি উল্লসিত হবে। মিন্নির মৃত্যুতে মানুষ উল্লসিত হয়ে বলবে, "খুব ভালো হইসে। বেশরম, বেহায়া মাগীটার উচিৎ শিক্ষা হইসে।"

উল্লেখ্য, পরকীয়া, প্রেম, ভালোবাসা, প্রকাশ্যে চুম্বন, বিবাহপূর্ব যৌন সম্পর্কের বিরুদ্ধে সদাজাগ্রত এই দেশে গত একশো দিনে চারশো নারী ও শিশু ধর্ষণ হয়েছে।


  • ৪৭৪ বার পড়া হয়েছে

পূর্ববর্তী লেখা পরবর্তী লেখা

বিঃদ্রঃ নারী'তে প্রকাশিত প্রতিটি লেখার বিষয়বস্তু, ক্রিয়া-প্রতিক্রিয়া ও মন্তব্যসমুহ সম্পূর্ণ লেখকের নিজস্ব। প্রকাশিত সকল লেখার বিষয়বস্তু ও মতামত নারী'র সম্পাদকীয় নীতির সাথে সম্পুর্নভাবে মিলে যাবে এমন নয়। লেখকের কোনো লেখার বিষয়বস্তু বা বক্তব্যের যথার্থতার আইনগত বা অন্যকোনো দায় নারী কর্তৃপক্ষ বহন করতে বাধ্য নয়। নারীতে প্রকাশিত কোনো লেখা বিনা অনুমতিতে অন্য কোথাও প্রকাশ কপিরাইট আইনের লংঘন বলে গণ্য হবে।


মন্তব্য টি

লেখক পরিচিতি

ঋদ্ধ অনিন্দ্য

ছাত্রনেতা এবং এক্টিভিস্ট

ফেসবুকে আমরা