এথিনিক ক্লিনজিং এর পথে বাংলাদেশ?

মঙ্গলবার, নভেম্বর ২৮, ২০১৭ ৪:২৭ PM | বিভাগ : দেশ/রাজনীতি


ছোটবেলায় ওয়েস্টার্ন মুভিগুলোর খুব ভক্ত ছিলাম। এখনো আছি। কাঠফাটা রোদের মাঝে ঘোড়ার পিঠে বসা রোদেপোড়া রুক্ষ চেহারার সাহসী মানুষগুলো মুগ্ধ করতো প্রতিনিয়ত। জন ওয়েইন বা ক্লিন্ট ইস্টউডের ইস্পাত কঠিন ব্যক্তিত্ব আকর্ষণ করতো তীব্রভাবেই। নির্লিপ্ত ভঙ্গিতে তামাক চিবুনো , বিশেষ ভঙ্গিতে চুরুট ফোকা , চোখের পলকে হোলস্টার থেকে রিভলবার বের করে নির্ভুল নিশানায় গুলি চালানোর ভঙ্গিমা ভীষণভাবে নাড়া দিয়েছিলো আমার কিশোর মনকে। Bruce Cassidy and the Sundance Kid, The searchers , For a few dollars more, Good Bad Ugly, Mackana's gold এর মতো মুভিগুলো যে কতশতবার দেখা হয়েছে তার ইয়ত্তা নেই। স্কুল জীবনে হাতে এসে পড়ে সেবা প্রকাশনীর ওয়েস্টার্ন সিরিজগুলো। সেইসাথে বৃদ্ধি পায় মুগ্ধতা। যা টিকে আছে আজ পর্যন্ত।

অনুসন্ধিৎসু মন নিয়ে বেপরোয়া পশ্চিমের সুলুকসন্ধান করেছি ইন্টারনেটেও। আর বিস্মিত হয়েছি Doc Holiday, Billy the kid, John Hardin,Wyatt Earp এর মতে দুর্ধর্ষ গান ফাইটারদের কাহিনী পড়ে। এরা হয়ে উঠেছিলেন তখন স্বপ্নের নায়ক। সেইসাথে আরো একটা ব্যাপার মাথায় ঘুরপাক খেতো। এরা এভাবে হাতিয়ার বহন করতেন কেনো? একটি ওয়েবসাইটে একবার পেয়েছিলাম এর উত্তর্। সেখানে লেখা ছিলো, আমেরিকার আদিবাসী রেড ইণ্ডিয়ানদের আক্রমণ থেকে রক্ষা পাওয়ার জন্যেই নাকি অনুমোদন ছিলো এই হাতিয়ার ব্যবহারের্। বলাবাহুল্য, পপুলার কালচারে, চলচ্চিত্র বা উপন্যাসে রেড ইণ্ডিয়ানদের কিন্তু দেখানো হয় রক্তপিপাসু বর্বর অসভ্য উপজাতি হিসেবেই। তাই সিনেমাতে নায়কের নির্ভুল নিশানায় দু’একটা বর্বর কুপোকাত হতে দেখলে হাততালি দিতাম চরম উল্লাসে, পুলকিত মনে। পরবর্তী কালে বয়স বাড়ার সাথে সাথে রেড ইণ্ডিয়ানদের নিয়ে বেশ কিছু তথ্য হাতে এসে পড়ায় তাদের সম্পর্কে ধারণা আমুল পাল্টে যায়। বুঝতে পারি আসলে এরাই হলো শ্বেতবর্ণ মানুষদের গ্রেট আমেরিকা গড়ে তোলার কর্মযজ্ঞের প্রকৃত ভিকটিম। বিশেষ করে "Bury me at wounded knee" বইটি পড়ার পরে রীতিমতো শিউরে উঠি। কিভাবে ঠান্ডা মাথায় ধীরে ধীরে নিশ্চিহ্ন করে দেয়া হলো একটি পুরো জনগোষ্ঠীকে তা ভাবলেই বিস্মিত হতে হয়। হতে হয় মর্মাহত।

অর্থনীতিবিদ আবুল বারাকাত স্যারের সাম্প্রতিক গবেষণাটি সম্পর্কে জানার পরে কেনো জানি ওয়াইল্ড ওয়েস্ট এর রেড ইণ্ডিয়ানদের কথা হঠাৎ করেই মনে পড়ে গেলো। অদ্ভুত মিল দুটো কাহিনীতে। শুধু আমেরিকার স্থলে বাংলাদেশ আর রেড ইণ্ডিয়ানদের জায়গায় হিন্দু সম্প্রদায় বসিয়ে নিলেই যথেষ্ঠ। ইতিহাস এভাবেই ফিরে ফিরে আসে। বারাকাত স্যারের গবেষণায় দেখা গেছে, "৯৬৪ সাল থেকে ২০১৩ সাল পর্যন্ত ৫ দশকে মোট ১ কোটি ১৩ লাখ হিন্দু ধর্মাবলম্বি মানুষ দেশত্যাগে বাধ্য হয়েছেন। অর্থাৎ প্রতি বছর গড়ে ২ লাখ ৩০ হাজার ৬১২ জন হিন্দু ধর্মাবলম্বি মানুষ নিরুদ্দিষ্ট বা দেশত্যাগে বাধ্য হয়েছেন। আর প্রতিদিন দেশ ছেড়েছেন গড়ে ৬৩২ জন হিন্দু। "গবেষণাপত্রে আরো বলা হয়েছে, বিভিন্ন সময়কালে প্রতিদিন গড়ে নিরুদ্দেশ হওয়া হিন্দুদের সংখ্যা সমান নয়, যেমন-১৯৬৪ থেকে ১৯৭১ পাকিস্তানের শেষ ৭ বছর প্রতিদিন নিরুদ্দেশ হয়েছেন ৭০৫ জন হিন্দু। ১৯৭১ থেকে ১৯৮১ সাল পর্যন্ত প্রতিদিন নিরুদ্দেশ হয়েছেন ৫২১ জন। ১৯৮১ সাল থেকে ১৯৯১ সাল পর্যন্ত প্রতিদিন নিরুদ্দেশ হয়েছেন ৪৩৮ জন। ১৯৯১ থেকে ২০০১ পর্যন্ত প্রতিদিন ৭৬৭ জন হিন্দু দেশ ছাড়তে বাধ্য হয়েছেন। আর ২০০১ থেকে ২০১২ সাল পর্যন্ত প্রতিদিন গড়ে ৬৭৪ জন হিন্দু সম্প্রদায়ের মানুষ দেশ থেকে নিরুদ্দেশ হয়েছেন। "এ প্রসঙ্গে অধ্যাপক আবুল বারকাত বলেন, "এটি একটি ভয়ঙ্কর ব্যাপার যে এই দেশে জন্ম নিয়ে দেশ ছেড়ে চলে যাওয়া। তিনি বলেন, যেভাবে হিন্দুরা হারিয়ে যাচ্ছে, তাতে এই নিরুদ্দেশ প্রক্রিয়ার প্রবণতা বজায় থাকলে আগামী দু’তিন দশক পরে এদেশে হিন্দু ধর্মাবলম্বী কোনও মানুষ আর খুঁজে পাওয়া যাবে না"

বিগত কিছুদিন ধরে হঠাৎ করেই যেন বেড়ে গেছে এই জাতিগত নির্মূলাভিযান। সুনির্দিষ্টভাবে বলতে গেলে বিগত দু’বছর ধরে বৃদ্ধি পেয়েছে এর ব্যাপকতা। আর এই নির্মূলাভিযানের অন্যতম হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহৃত হচ্ছে অনলাইন- বিশেষত ফেসবুক। গতবারের নাসিরনগর আর এবারের রংপুরের সামপ্রতিক তাণ্ডবলীলার পেছনে রয়েছে অনলাইনের একটি বিশেষ গোষ্ঠীর উস্কানি। কোনো কোনো আইডি আর পেইজ থেকে দেয়া হচ্ছে এসকল সাম্প্রদায়িক উস্কানি -তা অজানা নয় কারো। কিন্তু অসংখ্যবার অনুরোধ করার পরেও নেয়া হয়নি কার্যকর ব্যবস্থা। উপরন্তু মুস্টিমেয় যে কয়েকজন এক্টিভিস্ট সোচ্চার আছেন এসবের বিরুদ্ধে তাদের প্রতিনিয়ত টেনশনে কাটাতে হয় একদিকে চাপাতি আরেকদিকে ৫৭ ধারার যাতাকলে পড়ে। সাম্প্রদায়িকদের পাশাপাশি তথাকথিত সোকলড অসম্প্রদায়িকদেরও ক্রমশই চক্ষুশূল হয়ে পড়ছেন তারা। ফলে কেউ হচ্ছেন দেশান্তরী -কেউবা বিদায় জানাচ্ছেন লেখালেখির জগৎকে। ঘরের খেয়ে বনের মোষ আর কতইবা তাড়ানো সম্ভব?

ফলে এক প্রকার বাঁধাহীনভাবেই পুনঃপ্রতিষ্ঠিত হচ্ছে পাকিস্তানবাদের one country two nation theory. মাত্র ৪৬ বছর আগে ৩০ লক্ষ শহীদের এক যমুনা রক্ত ধুয়ে মুছে ফেলেছিলো যে থিউরীর নিশানা। আজ স্বাধীনতার চার দশক পরে এসে তা বংশবিস্তার করছে রক্তবীজের উল্লাসে। বিফল হতে বসেছে লাখো শহীদের আত্মত্যাগের বিনিময়ে অর্জিত অসম্প্রদায়িক বাংলাদেশ গঠনের স্বপ্ন। ৭৫ এর ১৫ই আগস্ট স্বপরিবারে বঙ্গবন্ধুর হত্যাকাণ্ডের পরে খুনী মেজর ডালিম ঢাকা বেতারে ঘোষণা দিয়েছিলো যে "এখন থেকে দেশের নাম হবে ইসলামিক রিপাবলিক অফ বাংলাদেশ"! সেই ঘোষণাই বাস্তবায়নের পথে কদম কদম করে এগিয়ে যাওয়া হচ্ছে যেনো। আপন মনে প্রশ্ন জাগে, এই যদি হবে তাহলে আর "ইসলামিক স্টেট অফ পাকিস্তান ভেঙে "পিপলস রিপাবলিক অফ বাংলাদেশ" গড়ার আসলেই কি প্রয়োজন ছিলো?

আবহমান কাল থেকেই এই সম্প্রদায়টি শিক্ষা, দীক্ষা, শিল্প, সাহিত্য, সংস্কৃতিতে গুরুত্বপূর্ণ অবদান রেখে এসেছে, রাখছে আজো। কিন্তু ক্রমাগত জাতিবিদ্বেষ আর বৈষম্যের শিকার হতে হতে আজ ক্রমশঃ ধীরে ধীরে এদেশের মাটি হতে বিলুপ্তির পথেই এগিয়ে চলছে তারা। সম্প্রতি নাসিরনগর আর রংপুরের তাণ্ডবলীলা সে আশংকার ইঙ্গিতই প্রদান করে। হয়তো এভাবে কয়েক দশকের মধ্যেই এই সম্প্রদায়টি একেবারেই বিলুপ্ত হয়ে যাবে এদেশের মাটি হতে। সেই সাথে সাথে বিলুপ্ত হবে বৌদ্ধ, খ্রিস্টান, সাওতালসহ অন্যান্য ক্ষুদ্র সম্প্রদায়গুলোও। কিন্তু তখন কি নিরাপদে শান্তিতে বসবাস করতে পারবেন সংখ্যাগরিষ্ঠতার অহমিকার দাবীদাররা? নাকি ওয়াইল্ড ওয়েস্ট এর শ্বেতাঙ্গ কাউবয়দের মতোই রেড ইণ্ডিয়ান বিতাড়ণ শেষে নিজেরাই কনফেডারেট আর ইউওনিয়নওয়ালাদের মতোই জড়িয়ে পড়বেন গেটিসবার্গের ভাতৃঘাতী সংঘাতে? ইরাক, সিরিয়া, পাকিস্তান, আফগানিস্তানের ইতিহাস কিন্তু সতর্কবাণীর পতাকাই বহন করে চলেছে প্রতিনিয়ত।

তবু আজো স্বপ্ন দেখি বাংলাদেশ টিকে রইবে তার অসম্প্রদায়িক চরিত্র নিয়েই। যেখানে রোজা আর পূজার আনন্দ ভাগাভাগি করে নেবে সবাই মিলে। মিলনমেলা বসবে বৌদ্ধ পূর্ণিমা আর বড়দিনে। সবার হৃদয়ে রবীন্দ্রনাথ আর চেতনাতে নজরুল ঠিকই জায়গা করে নেবেন। ভূপেন হাজারিকার মতোই উদাত্ত কন্ঠে গেয়ে ওঠা যাবে ..

"এই সেই দেশ এখনো যেখানে ওঠে আজানের ধ্বনি .
গীতা বাইবেল ত্রিপিটক আর শোনা যায় রামায়ণী"

এথনিক ক্লিনজিং এর ডামাডোলের মাঝেও আজো তাই চিৎকার করে বলে যাই ..

"আমার বাংলা আমার মা, পাকিস্তান আর হবেনা"

রাতের শেষে দিন আসেই, শীতের পরে বসন্ত। অসহায় শীতের রাতে সেই বসন্তের প্রতীক্ষাতেই রইলাম।


  • ২০৮৬ বার পড়া হয়েছে

পূর্ববর্তী লেখা পরবর্তী লেখা

বিঃদ্রঃ নারী'তে প্রকাশিত প্রতিটি লেখার বিষয়বস্তু, ক্রিয়া-প্রতিক্রিয়া ও মন্তব্যসমুহ সম্পূর্ণ লেখকের নিজস্ব। প্রকাশিত সকল লেখার বিষয়বস্তু ও মতামত নারী'র সম্পাদকীয় নীতির সাথে সম্পুর্নভাবে মিলে যাবে এমন নয়। লেখকের কোনো লেখার বিষয়বস্তু বা বক্তব্যের যথার্থতার আইনগত বা অন্যকোনো দায় নারী কর্তৃপক্ষ বহন করতে বাধ্য নয়। নারীতে প্রকাশিত কোনো লেখা বিনা অনুমতিতে অন্য কোথাও প্রকাশ কপিরাইট আইনের লংঘন বলে গণ্য হবে।


মন্তব্য টি

লেখক পরিচিতি

রাজেশ পাল

প্রগতিশীল লেখক রাজেশ পাল পেশাগত জীবনে একজন আইনজীবী।

ফেসবুকে আমরা