রাফী শামস

অনলাইন এক্টিভিস্ট

সমকামিতা: শাস্তি মৃত্যুদণ্ড?

দণ্ডবিধি ৩৭৭ ধারায় সমকামিতা-কে চিহ্নিত করা হয়েছে 'প্রকৃতবিরুদ্ধ' অপরাধ হিসেবে এবং এর শাস্তি হিসেবে আজীবন বা নির্দিষ্ট মেয়াদে জেল এবং জরিমানার বিধান রাখা হয়েছে। দু’জন প্রাপ্তবয়স্ক মানুষ (নারী-পুরুষ/পুরুষ-পুরুষ) যদি পরস্পর সম্মতিক্রমে পায়ুমৈথুনে নিয়োজিত হয় (সমকামী বা বিপরীতকামী যে-কেউ) সেটা ৩৭৭ ধারা অনুযায়ী দণ্ডনীয় অপরাধ। অর্থাৎ রাষ্ট্র আইন করে ঠিক করে দিচ্ছে যে আপনি বেডরুমে কেমন আচরণ করবেন!

সমকামীদের মৃত্যুদণ্ড দেওয়ার আইন রয়েছে পৃথিবীর বেশ কিছু দেশে। অন্যদিকে, সমকাম কোনো অপরাধ নয়, দীর্ঘ দিন ধরেই তা দাবি করছে আন্তর্জাতিক মানবাধিকার সংগঠনগুলো। সে দাবির প্রেক্ষিতেই সমকামীদের মৃত্যুদণ্ডের শাস্তি তুলে দেওয়া হোক, এই মর্মে একটি প্রস্তাব আনা হয় সুইজারল্যান্ডের জেনেভায় অবস্থিত জাতিসংঘের মানবাধিকার কাউন্সিলে। জাতিসংঘের মানবাধিকার কাউন্সিলের ৪৭ টি দেশের মধ্যে ২৭ টি সদস্য দেশ মৃত্যুদণ্ড তুলে দেওয়ার পক্ষে ভোট দেয়। ১৩টি দেশ ভোট দেয় বিপক্ষে, অর্থাৎ মৃত্যুদণ্ড সমর্থন করে। সেই ১৩টির মধ্যে রয়েছে বাংলাদেশও।

এতে অবশ্য অবাক হওয়ার কিছু নেই। লক্ষ্য করলে দেখা যাবে, যে দেশগুলো মৃত্যুদণ্ডের পক্ষে ভোট দিয়েছে চীন ছাড়া বাকি সবগুলোই বর্তমানে ধর্মভিত্তিক প্রতিক্রিয়াশীলদের নিয়ন্ত্রণে (আমেরিকা, ভারত, সৌদিসহ অন্যান্য ইসলামিক দেশ)। সারা বিশ্ব জুড়েই সমকামীদের অধিকার আদায়ের সংগ্রাম দীর্ঘ এবং কন্টকাকীর্ণ। ব্রিটেনে অ্যালান ট্যুরিং এর মতো যুগশ্রেষ্ঠ কম্পিউটার বিজ্ঞানীকে সমকামীতার 'অপরাধে' তিলে তিলে নিঃশেষ হয়ে যেতে হয়েছে। জার্মানিতে মাত্র কয়েকমাস আগে সমকামীদের বিয়ের অধিকার স্বীকৃত হলো। সেখানে বাংলাদেশের মতো দেশে, যেখানে সব কিছু দেখা হয় ধর্মের চোখ দিয়ে, সমকামীদের অধিকার প্রতিষ্ঠা করা খুবই কঠিন কাজ। আপনাদের হয়তো মনে আছে, সমকামীদের নিয়ে প্রকাশিত রূপবান পত্রিকার কুশলীদের জঙ্গিরা কী নৃশংসতার সাথে হত্যা করেছিলো।

সমকামীতা নিয়ে আমাদের অধিকাংশেরই কনসেপ্ট পরিষ্কার না। অনেক ভুল ধারণা লালন করি আমরা অনেকেই। পিএইচডি ধারী থেকে বকলম মূর্খ, এমনকি অনেক চিকিৎসক- এই ভুল ধারণাগুলো লালন করে। যার ফলেই সমকামিতাকে আমাদের দেশে মৃত্যুদণ্ড পাওয়ার মতো 'অপরাধ' হিসেবে বিবেচনা করা হয়! কয়েকটি বিষয় মাথার মধ্যে গেঁথে নিলেই এই ভুল ধারণাগুলো আর থাকবে না।

১. কেউ চাইলেই সমকামী হয়ে যেতে পারে না। আবার কোনো সমকামী চাইলেই বিপরীতকামী (আপনারা যেটাকে বলেন স্বাভাবিক) হয়ে যেতে পারে না। এটা পুরোপুরি জন্মগত বৈশিষ্ট্য। কাউকে জোর করে সমকামী বানানো সম্ভব নয়, আবার সমকামীদের 'স্বাভাবিক' (যদিও সমকামিতাও স্বাভাবিক) বানানো সম্ভব নয়।

২. সমকামীতা কোনো রোগ নয় যে চিকিৎসা করে সারিয়ে তোলা যাবে। আগে এটাকে মানসিক রোগ হিসেবে মনে করা হতো। কিন্তু ক্রমাগত গবেষণায় প্রমাণীত হয়েছে যে এটা কোনো রোগ নয়।

৩. সমকামীতা কোনো বিকৃতি নয়। সম্পূর্ণ প্রাকৃতিক। বিবর্তনের ধারায় স্বাভাবিক ভাবেই এদের সংখ্যা কম, কিন্তু এটা প্রকৃতিবিরুদ্ধ কোনো ঘটনা নয়। একজন বিপরীতকামী মানুষ যেমন বিপরীত লিঙ্গের প্রতি আকর্ষণ অনুভব করে, একজন সমকামী তেমনি সম লিঙ্গের মানুষের প্রতি আকর্ষণ অনুভব করে। তাছাড়া মানুষ ছাড়াও প্রকৃতিতে আরো অনেক প্রাণীর মধ্যে সমকামিতার প্রবণতা দেখা যায়, মানুষের থেকে বেশিই দেখা যায়।

৪. সমকামীদের অধিকার দিলেই সবাই দলে দলে সমকামী হয়ে যাবে ব্যাপারটা এমন নয়। আগেই বলেছি, কাউকে জোর করে সমকামী বানানো যায় না। যে সমকামী সে অধিকার দিলেও সমকামী, না দিলেও সমকামী। পার্থক্য এই যে, অধিকার দিলে সে প্রকাশ্যে স্বাভাবিক ভাবে সঙ্গীর সাথে বসবাস করতে পারতো, এখন বাস করে লুকিয়ে। অনেক সময় সমাজের চাপে বিয়ে করতে বাধ্য হয় এবং সেক্ষেত্রে নিজের আর যার সাথে বিয়ে হলো তার- উভয়ের জীবন হয়ে ওঠে দুর্বিষহ।

সমকামীদের অধিকার-দান বলতে আমরা বুঝি তাদেরকে তাদের মতো করে থাকতে দেয়া। অধিকার দিলেই তারা আপনাকে ধরে সমকামী বানিয়ে দেবে, ব্যাপারটা এমন নয়। বরঞ্চ অধিকার দিলে সমাজে স্বাভাবিক ভাবে তাদের বাস করার সুযোগ সৃষ্টি হবে। রাষ্ট্র নাগরিকদের বেডরুম পাহারা দিতে না পারলেও, বেডরুমে তারা কী আচরণ করবে সেটা আইন করে ঠিক করে দেয়! সভ্য রাষ্ট্র কখনো নাগরিকদের ব্যক্তিগত জীবন নিয়ে চিন্তিত নয়। যতক্ষণ পর্যন্ত কারো কর্মকাণ্ডে অন্য কারো ক্ষতি না হচ্ছে ততক্ষণ পর্যন্ত তার ব্যক্তিগত ব্যাপারে হস্তক্ষেপ করার অধিকার কারো নেই। অথচ সমকামীতার মতো একটি স্বাভাবিক এবং একান্ত ব্যক্তিগত ব্যাপারকে আমরা মনে করি 'মৃত্যুদণ্ড' পাবার মতো অপরাধ!

আমি জানি, আমাদের মতো দেশের সামাজিক প্রেক্ষাপটে সমকামীদের অধিকার আদায় আপাতদৃষ্টিতে অসম্ভব। কিন্তু বর্তমান প্রজন্ম, যারা পড়াশুনা করে, পৃথিবীর খোঁজ খবর রাখে, যারা সংবেদনশীল- তারা যদি ভুল ধারণা থেকে বেরিয়ে এসে সমকামীদের স্বাভাবিক ভাবে গ্রহণ করে, তাহলে আইনে যাই-ই থাক, মানুষের অধিকার আদায় অনেকটাই সহজ হয়ে যাবে।

বিঃদ্রঃ নারী'তে প্রকাশিত প্রতিটি লেখার বিষয়বস্তু, ক্রিয়া-প্রতিক্রিয়া ও মন্তব্যসমুহ সম্পূর্ণ লেখকের নিজস্ব। প্রকাশিত সকল লেখার বিষয়বস্তু ও মতামত নারী'র সম্পাদকীয় নীতির সাথে সম্পুর্নভাবে মিলে যাবে এমন নয়। লেখকের কোনো লেখার বিষয়বস্তু বা বক্তব্যের যথার্থতার আইনগত বা অন্যকোনো দায় নারী কর্তৃপক্ষ বহন করতে বাধ্য নয়। নারীতে প্রকাশিত কোনো লেখা বিনা অনুমতিতে অন্য কোথাও প্রকাশ কপিরাইট আইনের লংঘন বলে গণ্য হবে।