নো ভ্যাট ফর প্যাড

সোমবার, জুলাই ১, ২০১৯ ২:২৪ AM | বিভাগ : সাম্প্রতিক


স্যানিটারি ন্যাপকিনের উপর ভ্যাট আরও বেড়েছে। ফলে স্বভাবতই দাম আরও বাড়বে। স্যানিটারি ন্যাপকিনের মতো একটা প্রয়োজনীয় জিনিসকে কী করে লাক্সারি পণ্য ধরে নিয়ে তার উপর আরও ট্যাক্স বসানো হয় বুঝতে পারলাম না। বাংলাদেশের অধিকাংশ মেয়েই যেখানে প্যাডের পরিবর্তে কাপড় ব্যবহার করে। কিছু ব্যবহার করে তুলা, টয়লেট পেপার। কাপড় ব্যবহার করাটা যে কী পরিমাণ আনহাইজেনিক সেইটা না দেখলে বিশ্বাস করা কঠিন।

গ্রামে থাকতে ওখানকার মহিলাদের দেখতাম পুরোনা শাড়ি, লুঙ্গি, গামছা যা একেবারেই আর কোনোভাবে ব্যবহার করার মতো নেই তাই ইউজ করতে। আর এইগুলারে বাড়ির পাশের নোংরা কালো জলের ডোবা, খালে নিয়ে গিয়ে সকলের অগোচরে ধুয়ে নিয়ে আসতো। টিউবওয়েল বা পুকুরে তো আর এইগুলা ধু'বে না। এরপর শুকানোর ব্যবস্থা ছিলো আরও ভয়াবহ। খড়ের গাদা, ছনের চালের কর্ণার, গোয়ালঘর, খাটের কোনা, ঘরের অন্ধকার কোনো স্থান ইত্যাদি যে সব জায়গায় অন্যকারো চোখে পরবার কথা না। যা তারা ব্যবহার করে, যেখানে পরিস্কার করে আর যেখানে শুকায় পুরো প্রক্রিয়াটা একবার ভাবুন।

আবার ইদানীং দেখলাম মেয়েরা তুলা, টিস্যু এসব ব্যবহার করে। এরও ভয়ানক স্বাস্থ্যঝুঁকি রয়েছে। তুলা টিস্যু মেল্ট হয়ে জরায়ুর ভেতরে চলে যেতে পারে। একটা প্যাড চার থেকে ছয় ঘন্টার বেশি ব্যবহার করা ঠিক না। তাতে ইনফেকশন হতে পারে। কিন্তু প্যাডের দাম বেশি হওয়ার কারণে বেশিক্ষণ ইউজ করতে চায় বলে মেয়েদেরকে এর সাথে টিস্যু ইউজ করতে দেখেছি। এমনকি রোকেয়া হলে থাকার সময়ও অনেক মেয়েকে এ কাজ করতে দেখতাম।

আমার জীবনে একটা অদ্ভুত ঘটনা ঘটেছিলো একবার। মনে হয় ২০০৯ সালের কথা। হলে থাকতাম। আশুলিয়ায় গেলাম ছোটবেলার বান্ধবীর বাসায়। ও আর ওর বর হামিম গার্মেন্টসে জব করতো। আমার পিরিয়ডের ডেইট মনে ছিলো না এবং হঠ্যাৎ পিরিয়ড হয়। কিন্তু ওর কাছে প্যাড নেই, সেপ্যাড ইউজ করে না। আমরা দু'জন ওর বাসা থেকে বের হয়ে রাস্তায় গেলাম। ছোটো ছোটো বেশ কয়টা ফার্মেসী পেলাম। কিন্তু কোথাও কোন প্যাড নেই। বলে কেউ কিনে না, তাই রাখি না। আমি এতো অবাক হয়েছিলাম! এতো এতো মেয়ে কাজ করে এখানকার গার্মেন্টসগুলোতে আর কেউ প্যাড ব্যবহার করে না! অথচ আমার গ্রামের ছোট ফার্মেসিতেও অল্প করে হলেও ন্যাপকিনের প্যাকেট থাকে। কিন্তু গার্মেন্টস এরিয়াতে পাইনি। কারণ কী? কারণ একটাই, দাম। কতো আর বেতন পায় যারা গার্মেন্টেসে কাজ করে?

অনেকে আবার টাকা থাকার পরও বাড়ির মেয়েদের পিরিয়ডের মতো তুচ্ছ কারনের জন্য প্যাড কিনে টাকা নষ্ট করতে চান না। অথচ দেশের মেয়েদের জরায়ু মুখ ক্যান্সারের একটা বড় কারণ এই অস্বাস্থ্যকর কাপড় অথবা এইগুলা ব্যবহার করা। কিন্তু এই দরকারি জিনিসটার উপর আবারও ট্যাক্স বাড়ানো হলো।

যুগান্তরের একটা প্রতিবেদনে দেখলাম আন্তর্জাতিক মানের ন্যাপকিন তৈরীর যে কাঁচামাল বাইরে থেকে আনতে হয় তার টোটাল ট্যাক্স ইনসিডেন্ট (টিটিআই) ১২৭.৮৪ শতাংশ! স্যানিটারি ন্যাপকিন কোনো বিলাসী পণ্য নয়, অত্যাবশ্যকীয় পণ্য। বাংলাদেশের মতো একটা দেশে যেখানে অধিকাংশ মেয়েই স্যানিটারী ন্যাপকিন ব্যবহারই করতে পারে না সেখানে তার উপর ভ্যাট আরও কী করে বাড়ানো হয়। বরং ভ্যাট তুলে নিয়ে ভর্তুকি দেওয়া উচিৎ।

এমনিতেই পিরিয়ড প্যাড এসব এখনও ট্যাবু আমাদের সমাজে। একটু জোরে প্যাড চাইলে দোকানে সবাই এমনভাবে তাকায় আর আশেপাশের লোক এমন চোরা হাসি দিবে যেনো একটা অনৈতিক কাজ করতে যাচ্ছি। প্যাড কিনতে হবে লাজুক মুখে ফিসফিস করে। এইবার দেশে গেলে বর আমার জন্য প্যাড এনে বলেছে যে দোকানি তারে এমন করে লুকিয়ে প্যাকেট করে দিলো যেনো কোনো ক্রাইম করতে যাচ্ছে সে। আমি তারে বলেছিলাম তাহলে বোঝো একটা মেয়ে গেলে তাহলে এরা কী করে তাকায়?

পিরিয়ড কোনো গোপন রোগ না। প্রতিটা মেয়ের শরীরের স্বাভাবিক প্রক্রিয়া। এরে ট্যাবু বানানোর কিছু নেই। আর প্যাড কোনো বিলাসী পণ্য না, প্রতিটি মেয়ে এই স্বাস্থ্যসুবিধা পাওয়ার অধিকার রাখে। যেহেতু বাংলাদেশ দরিদ্র দেশ, আর পরিবারের অন্যরাও অধিকাংশ ক্ষেত্রে মেয়েদের এই বিষয়টা নিয়ে তেমন ভাবে না, মেয়েরা নিজেরাও নিজেদের শরীর নিয়ে সচেতন না বা চাইলেও পারে না, তাই এদেশে প্যাডের উপর ট্যাক্স না বাড়িয়ে বরং তারে সহজলভ্য করা উচিৎ। সবধরনের ট্যাক্স তুলে দেওয়া উচিৎ। স্কুল কলেজে ফ্রি প্যাড সরবরাহ করা উচিৎ। স্যানিটারী ন্যাপকিন উপর ভ্যাট বাড়ানোর প্রতিবাদ জানাই।

#Happy_bleeding

#No_Vat_For_Pads


  • ৭৭১ বার পড়া হয়েছে

পূর্ববর্তী লেখা পরবর্তী লেখা

বিঃদ্রঃ নারী'তে প্রকাশিত প্রতিটি লেখার বিষয়বস্তু, ক্রিয়া-প্রতিক্রিয়া ও মন্তব্যসমুহ সম্পূর্ণ লেখকের নিজস্ব। প্রকাশিত সকল লেখার বিষয়বস্তু ও মতামত নারী'র সম্পাদকীয় নীতির সাথে সম্পুর্নভাবে মিলে যাবে এমন নয়। লেখকের কোনো লেখার বিষয়বস্তু বা বক্তব্যের যথার্থতার আইনগত বা অন্যকোনো দায় নারী কর্তৃপক্ষ বহন করতে বাধ্য নয়। নারীতে প্রকাশিত কোনো লেখা বিনা অনুমতিতে অন্য কোথাও প্রকাশ কপিরাইট আইনের লংঘন বলে গণ্য হবে।


মন্তব্য টি

লেখক পরিচিতি

পুষ্পিতা মন্ডল

বর্তমানে প্রবাসী পুষ্পিতা বাংলাদেশ সরকারের সাবেক কর্মকর্তা ছিলেন।

ফেসবুকে আমরা