লীনা হাসিনা হক

উন্নয়ন কর্মী

পূর্ব আফ্রিকার ডায়রী -৫

কিছুদিন আগে  আমাদের এডমিনিস্ট্রাশনের ম্যানেজার এসে বললেন, ‘আপা, এন্টোনিকে (ছদ্মনাম) ছাড়িয়ে দিতে হবে, আর পারা যাচ্ছে না।’  এন্টোনি আমাদের  একজন গাড়ি চালক।  সে  চাকরিতে জয়েন করার কিছুদিন পর থেকেই নানা কথা  শুনি তার সম্পর্কে, এবার  অভিযোগের পাল্লা বেশ ভারী, সে একদম সময় মেনটেইন করে না! আমি হাসি, এ আর এমন কি অভিযোগ উগান্ডার পরিপ্রেক্ষিতে, কেইইবা সময় মেনে চলে এইদেশে! আর এই ড্রাইভার তো  প্রায় মাস পাঁচেকের বেশি হলো কাজ করছে, এমন কি ঘটলো!

ম্যানেজার ক্ষিপ্ত সুরে বলে, ‘আপা, ড্রাইভার ঠিক সময়ে না এলে মিটিং মিছিলে সময় মতো যাওয়া যায় না, গত সপ্তাহে হেড অফিস থেকে আসা ভিজিটরের ডিউটি দেয়া হয়েছিলো এন্টোনিকে, সে খুব ঝামেলা করেছে সময় নিয়ে।’  বুঝলাম হেড অফিসের বড় কর্মকর্তার ফিডব্যাকের সুতোয় এন্টোনির চাকরি ঝুলছে। ম্যানেজার আরও জানান, সে এখনো প্রবেশনে আছে, তাই শর্ট নোটিশে ছাড়িয়ে দিতে সমস্যা হবে না, উল্লেখ করা যেতে পারে উগান্ডাতে কাউকে চাকরি থেকে বরখাস্ত করতে  হলে, সে যে কারণেই হোক না কেনো, আইন আদালত পর্যন্ত দৌড়াতে হয়। একটা রিপোর্ট বানাতে বলি, রিপোর্ট ছাড়া কোনো একশনে যাওয়া যাবে না। রিপোর্টে দেখা গেলো, এন্টোনি সময় না মানা ছাড়াও, এলোমেলো আচরণ করে, উল্টাপাল্টা কথা বলে, রাতের ডিউটি করতে চায় না, ইত্যাদি ইত্যাদি। 

এলোমেলো কথাবার্তার উদাহরণ হিসাবে জানা গেলো, সে নাকি বলে, “এত সময় সময় করে কি লাভ?  কেউ কি জানে কখন তাকে পৃথিবী থেকে চলে যেতে হবে?” একদিন নাকি বলেছে, ‘ভোরে উঠে নিজেকে জীবিত পাওয়াটাই তো ভাগ্যের ব্যাপার,  পাঁচ দশ মিনিট দেরি হলে কি এমন আসমান ভেঙ্গে পড়ে!”  এত দেখি পুরাই দার্শনিক। যাই হোক, এইসব  কমপ্লেইনে কাউকে চাকরি থেকে বাদ দেয়া যায় না, এন্টোনিকে ডেকে সাবধান করা হলো, আর তার প্রবেশন তিনমাস বাড়ানো হলো।

এর মধ্যে এক রবিবার বিকালে এন্টোনি আমার ডিউটিতে এসেছে, আমার নিয়মিত চালক অসুস্থ।  বলার দরকার নাই মনে হয় যে সে নির্ধারিত  সময়ের প্রায় পনেরো মিনিট দেরি করে এসেছে। দেরির  কারণ জানতে চাইলে, গাল ভরা হাসিতে আশ্বস্ত করে,  আজ রবিবার, রাস্তায় জ্যাম নাই, তাই দেরি হলেও সমস্যা হবে না। মোক্ষম এই যুক্তির পিঠে আমার আর কিই বা বলার থাকে!

টুকিটাকি  কেনা কাটা সেরে, কাপ দু’য়েক এরাবিকা  কফি পান করে ফিরছি যখন তখন সন্ধ্যা উতরে গেছে। আমার বাসা শহর থেকে খানিক বাইরে এয়ারপোর্টের পথে, অনেকটা  উত্তরার  মতন জায়গায়, সিটি সেন্টার থেকে রবিবারের ফাঁকা  রাস্তায় তিরিশ মিনিটের মতন লাগবে। তাই এন্টোনির  সাথে হালকা গল্প করার চেষ্টা করি, ওর পরিবারের  খবর নেই। এন্টোনির পরিবারে স্ত্রী আর তিন সন্তান, কাম্পালাতেই থাকে, এম্বারারাতে ওর মা থাকে, বাবা বেঁচে নাই, এম্বারারা রুয়ান্ডান সীমান্তের কাছে একটা জেলা। এন্টোনি দেখতে একহারা, লম্বা প্রায় ছয় ফিট, বড় বড় চোখ, টিকলো নাক, হাত দু’টো যাকে বলে আজানুলম্বা, গায়ের রং মোটেও মিশকালো নয় বরং আফ্রিকার ভাষায়, ‘লাইটার  স্কিন’ মানে কালো বাদামীর মাঝামাঝি। উগানডানরা সাধারণত এতটা  ‘লাইট  স্কিন’ হয় না। ধারনা করি, স্বভাবে এলোমেলো হলেও সুদর্শন এন্টোনির বউ পেতে সমস্যা হয় নাই! প্রথম জীবনে সে পুলিশে ভরতি হয়েছিলো  কিন্তু সেখানে টিকতে পারে নাই (অস্বাভাবিক নয়),  পরে একটা চাইনিজ কোম্পানিতে কাজ করেছে কিছুদিন, সেখানে সমস্যা হয়েছিলো (কি সমস্যা সেটা এন্টোনিও বলে না, আমিও জানতে চাই না যদিও অনুমান করি সময় না মানা টাইপের কিছু হবে), ট্যাক্সি চালিয়েছে বেশ  কিছুদিন, ট্যুর  কোম্পানিতে  কাজ করেছে, এখন ব্র্যাকের এই চাকরিটা সে খুব পছন্দ করে, এখান থেকে সে আর কোথাও যেতে চায় না। যেহেতু ম্যাডাম তাকে সুযোগ দিয়েছেন নিজেকে  ঠিক করবার, সে এই সুযোগ হারাতে চায় না। মনে মনে বলি, বাপু, এই তিনমাসের মধ্যে আবার কোনো কমপ্লেইন এলে ম্যাডামও কিছু করতে পারবে না, তাই সময় থাকতে সময় মানতে শিখে যাও। 

হঠাৎ ফিল করলাম এন্টোনি আর কথা বলছে না, খুব  মন দিয়ে গাড়ি চালাচ্ছে, দুইবার একটা কালো জীপকে নিজে থেকেই পাশ কাটাতে দিলো। আমি  ফোন খুলে  ফেসবুক ইত্যাদিতে মন দিলাম। বাসার প্রায় কাছাকাছি  যখন হঠাৎ আমাদের গাড়িটা রাস্তার  পাশে একটা সুপার মার্কেটের চত্বরে ঢুকিয়ে দিলো,  বিশাল ঝাঁকুনি  খেলাম। চত্বরের মধ্যে সবজি ফল নিয়ে বসে থাকা  বিক্রেতার গায়ের উপরে অল্পের জন্য গাড়ি  উঠলো না। হার্ড ব্রেকের  ঘ্যাচাৎ শব্দে সুপারমার্কেটের  ভিতর থেকে লোকজন বেরিয়ে এলো কি হয়েছে দেখবার জন্য।

ঘটনা কি জিজ্ঞেস করলে এন্টোনি জানালো একটা জীপ নাকি আমাদেরকে ফলো করছিলো ক্লক টাওয়ার বলে একটা জায়গা থেকে, সে দুইবার জীপটাকে ওভারটেক করার সুযোগ দিয়েছে কিন্তু জীপটা কিছু সময় সামনে থেকে আবার এন্টেবে রোডে উঠে আমাদের পিছে পিছে আসছিলো। নার্ভাস লাগছিলো তাই  এন্টোনি  এই চত্বরে গাড়ি থামিয়েছে।  জীপটা গেলো কোথায়? না ওটা আমাদেরকে পাশ কাটিয়ে সামনে  চলে গেছে!  নার্ভাস লাগলো কেনো? এন্টোনির মনে হচ্ছিলো জীপটা  আমাদের আক্রমণ  করবে! সে তো আমাকে বলতে পারতো যে জীপটাকে সন্দেহজনক মনে হচ্ছে, আমরা পুলিশকে  জানাতে পারতাম! এইভাবে গাড়ি থামানোতে এক্সিডেন্ট হতে পারতো! এন্টোনির একটাই কথা, “ম্যাডাম, আই ওয়ান্টেড টু এস্কেপ, আই ওয়াজ নার্ভাস, ফ্রাইটেন্ড।” একটু  অস্বাভাবিক  লাগলেও  ওকে আর কিছু বললাম না, অফিসকে  জানিয়ে রাখলাম। 

এন্টোনির প্রবেশনের বর্ধিত মেয়াদ ভালোমতোই শেষ হয়েছে, তেমন কোনো কমপ্লেইন আসে নাই, সময় নিয়ে সমস্যা সে কাটিয়ে উঠার চেষ্টা করছে, অফিস থেকেও সময়ের ব্যাপারে ফলো আপ করা হয়,  কিছুটা রয়ে গেলেও, আমরা এন্টোনিকে চাকরিতে  বহাল রেখেছি। জীবনের অনিত্যতা সম্পর্কিত তার দার্শনিক কথাবার্তা নিয়ে সবাই হাসি ঠাট্টা করলেও মেনে নিয়েছে।

ক্রিসমাসের ছুটিতে মেয়েকেসহ সহকর্মীদের সাথে জিঞ্জা  গেছি বেড়াতে। দুই গাড়ির মধ্যে এন্টোনি চালাচ্ছে একটা। আমরা মুসলিমদেরকে ঈদের সময় আর  ক্রিশ্চিয়ানদের কে ইস্টার বা ক্রিসমাসের সময় ডিউটি দেই না, উগান্ডাতে কোনো হিন্দু বা বৌদ্ধ ধর্মের লোক নাই। এন্টোনি কেনো ডিউটিতে তাহলে? জানা গেলো বাচ্চাদের স্কুলের ক্রিসমাস ব্রেকের শুরুতেই  তার পরিবার রুয়ান্ডা চলে গেছে, এখন বাস ভাড়া প্রায় চারগুণ করেছে বাস কোম্পানি, তাই এন্টোনি ক্রিসমাসে বাড়ি যায় নাই।

রুয়ান্ডা কেনো? বেড়াতে গেছে পরিবার? এন্টোনি জানায়, তার স্ত্রী রুয়ান্ডান, কিগালির কাছেই  এন্টোনির স্ত্রীর পরিবার থাকে। উগান্ডান হয়ে সে কিভাবে রুয়ান্ডান মেয়েকে বিয়ে করলো জিজ্ঞেস করি,  এন্টোনি জানায়, আমি তো রুয়ান্ডান। কেমনে কি? এন্টোনি আমাকে আরও কনফিউজ করে তুলে, ম্যাডাম, আমি আসলে জাতিসত্তায় রুয়ান্ডান, কিন্তু জাতীয়তায় উগান্ডান। ওরে আমার বাবা, এযে দেখি বাঙ্গালি  আর বাংলাদেশীর ব্যাপার। 

উৎসবের দিন বেচারা এন্টোনি পরিবার ছাড়া একা একা, আবার কাজ করতে হচ্ছে, তাই বিকালে এন্টোনির জন্য ক্রিসমাস কেক কিনে আনি। সবাই মিলে চা খাই। চায়ের কাপে চুমুক দিয়ে আমি একটু ঠাট্টার  সুরে বলি, এন্টোনি, তো এই রুয়ান্ডান আর উগান্ডান বিষয়টা খুলে বলতো বাপু। বিয়ে করবার জন্য রুয়ান্ডান সেজেছ নাকি।

এন্টোনির  উত্তর শুনে গরম চা নিজ থেকেই আমার নির্মম দয়ামায়াহীন জিভকে পুড়িয়ে দিয়ে শাস্তি  দেয়, “ম্যাডাম, আমি  টুটসি, জেনোসাইডের সময় রুয়ান্ডা থেকে পালিয়ে উগান্ডায় এসেছিলাম। আমার বাবা আর ভাই বোনসহ সবাই জেনোসাইডের শিকার, আমার মা অনেক পরে এম্বারাতে আমাকে নিয়ে সেটল করেছে। তাই আমি উগান্ডান! সেই সময় আমার বয়স ছিল ৯ বছর।” 

রাজনীতির আর ইতিহাসের  খোঁজ রাখা সকল মানুষ জানেন, বেশিদিন আগে নয়, মাত্রই পঁচিশ বছর আগে, ১৯৯৪ সালের এপ্রিল থেকে জুলাই -তিন মাসের মধ্যে আফ্রিকার দেশ রুয়ান্ডাতে প্রায় দশ লাখ মানুষকে হত্যা করা হয়। যাদেরকে খুন করা হয় তারা সংখ্যালঘু  টুটসি জাতিসত্তার মানুষ আর তাদেরকে খুন করেছিলো তাদেরই প্রতিবেশী সংখ্যসগুরু হুতু সম্প্রদায়ের মানুষরা। মোট ১০০ দিনের  মধ্যে দশ লাখ মানুষকে খুন করবার জন্য গোলা বারুদ পিস্তল  রাইফেল মিসাইল গ্রেনেড বা বোমা নয়, ব্যবহার করা হয়েছিলো ম্যাসেটি বা চাপাতি, চাকু, ছুরি আর হাতুড়ি। মডারেট হুতু যারা টুটসি হত্যায় সমর্থন দেয় নাই তাদেরকেও খুন করা হয়েছিলো। প্রায় ১০০০০  হুতু মানুষও খুন হয়েছিলেন। এই গণহত্যার সংবাদ আন্তর্জাতিক মিডিয়াতে খুব কমই স্থান পেয়েছিলো। এই সুযোগেই গণহত্যা বিভৎস রূপ ধারণ করেছিলো। রুয়ান্ডা জেনোসাইডের সময় জাতিসঙ্ঘের ভূমিকা চরম বিতর্কিত। এ বিষয়ে আমার অভিজ্ঞতা পরে লিখবো।

রুয়ান্ডা জেনোসাইডে নারী বা শিশু কেউ রেহাই পায় নি সেই হত্যাযজ্ঞ থেকে। গির্জার নিরাপদ আশ্রয়ে গিয়েছিলো হাজার হাজার টুটসি মানুষ বিশেষ করে নারী শিশুরা, হুতু পাদ্রিরা ঘাতকদেরকে খবর দিয়ে এনে এইসব অসহায় মানুষকে হত্যা করার জন্য তুলে দিয়েছিলো। প্রায় দুই লাখের বেশি নারী ধর্ষিত হয়েছিলেন এবং এক লাখের বেশি শিশু খুন হয়েছিলো।  রুয়ান্ডা জেনোসাইডের তুলনা করা যায় দ্বিতীয় মহাযুদ্ধের সময় ফ্যাসিস্ট জার্মানির হাতে ইহুদি হত্যায় এবং ১৯৭১ সালে পাকিস্তান ও তার দোসরদের হাতে বাঙালি নিধনে!”  

রুয়ান্ডার জেনোসাইড নিয়ে অনেক বই, ডকুমেন্টারি, চলচিত্র তৈরি হয়েছে। ফিলিপ গুরিইয়েভিচ লিখেছেন একটি অসাধারণ প্রামাণ্য গ্রন্থ ‘আই উইশ টু ইনফরম ইউ দ্যাট টুমরো উই উইল বি কিলড উইথ আওয়ার ফামিলিস’ অথবা ‘১৯৯৪ সালে রুয়ান্ডায় শান্তি রক্ষার কাজে নিয়োজিত জাতিসঙ্ঘের জেনারেল ডালেরি রোমেরিও’র ‘সেক হ্যান্ড উইথ ডেভিল’ বা ‘হোটেল রুয়ান্ডা’, ‘হোয়েন গুড ম্যান ডু নাথিং’  ইত্যাদি চলচিত্র।

আমার মনের মধ্যে ঘুরতে থাকে যে এন্টোনির সাথে কথা বলতে হবে, জানতে হবে। অফিসে ডেকে নিয়ে এসব কথা জিজ্ঞেস করার প্রশ্নই আসে না।  সুযোগ হয়ে গেলো, নির্ধারিত ড্রাইভার ছুটিতে গেছে, অন্য ড্রাইভাররাও সবাই ডিউটিতে, এডমিন ম্যানেজার ইতস্তত হয়ে বললেন, এন্টোনি ছাড়া আর কেউ নাই এই সপ্তাহে’, আমার তড়িৎ সম্মতিতে তিনি একটু অবাকই হলেন কারণ এর আগে আমিই বলেছিলাম এন্টোনিকে যেন আমার ডিউটিতে না দেয়া হয় মূলত সময় রাখতে না পারার জন্য। সপ্তাহ জুড়ে টুকটুক করে এন্টোনির সাথে আলাপ জুড়ি, “ও এন্টোনি, তো বউয়ের কথা বলো তো বাপু। দেখ্যতে কেমন, স্বভাবে কেমন, তোমাকে আদর যত্ন করে কিনা ঠিক মতন এইসব ইতং বিতং দিয়ে শুরু করি। এন্টোনির বউ টুটসি সম্প্রদায়ের মেয়ে, কিগালির উপকণ্ঠে একটি গাড়ির ওয়ার্কশপে গাড়ি ধোয়াপাকলা করার কাজ করতো, এন্টোনি ট্যুর কোম্পানিতে কাজ করার সময়ে প্রায়ই কিগালি যেতো, তো গাড়ি ধুতে ধুতে কোন সময়ে টুটসি সুন্দরী তার মন দিয়ে ফেলেছে আরেক টুটসি তরুণকে। এন্টোনির বউও জেনোসাইডে তার মা বাবা আর পবিরার অনেক সদস্যকে হারিয়ে খালার কাছে বড় হয়েছে। রুয়ান্ডা জেনোসাইডের পরিবারবিহীন শিশুদেরকে অন্যান্য জীবিত আত্মীয়স্বজন বা প্রতিবেশীরা এডপ্ট করে। যাদের জন্য কোনো পরিবার পাওয়া যায় নাই, তাদেরকে অরফ্যানেজে পাঠিয়ে দেয়া হয়।

জেনোসাইডের সময় এন্টনির বয়স ৯ বছর। তার আরও চার ভাই আর দুই বোন ছিলো। এন্টোনির বাবা পল কাগামের রুয়ান্ডান প্যাটিয়াট্রিক ফ্রন্ট এর একজন সৈনিক ছিলেন। ১৯৯৪ এর এপ্রিলের শুরুতেই তিনি খুন হন। এন্টোনির দুই বোন, একজনের আঠারো আরেকজন পনেরো, আরো অনেক টুটসি নারীর মতন ধর্ষণের পরে কল্লা কেটে হত্যা করা হয় তাদের। এন্টোনির বোনেদের মধ্যে ছোটজন ফেইথ ছিলো অপরূপ সুন্দরী, ধর্ষণ ঠেকানোর জন্য ধস্তাধস্তি করে মেয়েটি, চিৎকার করেছিলো, গালি দিয়েছিলো, প্রতিরোধ করবার শাস্তি হিসাবে ধর্ষণের পরে হুতু খুনিরা একটা একটা করে মেয়েটির অঙ্গ কেটে নেয়।

এন্টোনির চার ভাইয়ের মধ্যে একজনকে প্রথমেই ম্যাসেটি (চাপাতির মতন বিশাল লম্বা ধারালো চাকু বা কিরিচ) দিয়ে কেটে ফেলে, অন্য তিনজনকে আরো অনেক টুটসি কিশোরদের সাথে ধরে নিয়ে যায়। ছোট্ট এন্টোনিকেও নিয়ে যায় তারা, পরে চার্চের ইউরোপিয়ান পাদ্রিরা অন্তত শিশুদেরকে ছাড়িয়ে আনতে পারেন। এন্টোনি ভাগ্যবান! এন্টোনির ভাইদের হাতে হাতুড়ি দিয়ে একে অপরকে খুন করতে বলেছিলো হুতুরা, এক ভাই আরেকজনকে মেরে নিজের মাথায় নিজেই হাতুড়ি মেরে মরে যায়, এই ঘটনাটা এন্টোনির সামনেই ঘটে। তৃতীয় জনকে কেটে টুকরো টুকরো করে ফেলে হুতুরা। জেনোসাইড শেষ হবার পরে তার ভাইদের মৃতদেহ সনাক্ত করা যায় নাই, তারা গণ কবরে আছে বলে এন্টোনি মনে করে।

এন্টোনির মা আরো অনেক টুটসি মানুষের সাথে পালিয়ে কঙ্গো চলে যায়, পরে উগান্ডায় আসে, সেই সময় উগান্ডা তার সীমান্ত খুলে দিয়েছিলো শরণার্থী মানুষের জন্য।

ইউরোপিয়ান পাদ্রিরা এন্টোনিদের গ্রাম আর আশে পাশের টুটসি গ্রাম থেকে প্রায় পাঁচশ বা আরো বেশি শিশুকে উগান্ডান সীমান্তবর্তী এম্বারারার চার্চে নিয়ে আসে, সেখানেই অরফ্যানেজ খুলে এই শিশুদেরকে লালন পালন করতে থাকে। কঙ্গো আর বুরুন্ডি সীমান্তেও অনেকগুলি অরফ্যানেজ খোলা হয়েছিলো সেই সময়।

প্রায় বছর খানেক পরে মায়ের সাথে দেখা হয় এন্টোনির কিন্তু তার মা একেতো গরীব তার উপরে স্বামী সন্তান হারিয়ে মানসিক স্থিতিশীলতা হারিয়ে ফেলেছেন। এন্টোনি অরফ্যানেজেই বেড়ে ওঠে, স্কুল পাশ করে ড্রাইভিং শিখে। পড়ালেখায় সে ভালো ছিলো না, ড্রাইভিং করতে তার ভালো লাগে, রাস্তায় চলতে থাকলে চোখের সামনে খুন হওয়া ভাই বোনের কথা কিছু সময় ভুলে থাকত পারে।

বছর কয়েক আগেও ঘুমের মধ্যে দুঃস্বপ্নে জেগে উঠতো সে, তার পিঠাপিঠি ভাই তাকে ডাকতো, ‘টেন্টে (ছোটন), খেলতে চল’ তারপরে সে দেখতো তার ভাই হাতুড়ি নিয়ে তার মাথায় মারছে। এন্টোনির মতন শ’য়ে শ’য়ে ট্রমাটাইজড শিশু কিশোরকে সাইকোসোশ্যাল ট্রিটমেন্ট বা কাউন্সেলিং দেয়া সম্ভব হয় নাই। প্রকৃতি নিজেই কিছুটা উপশম করেছে, তার ছোট ছেলেটি জন্মের পরে এই দুঃস্বপ্ন দেখা বন্ধ হয়েছে, ছেলেটি একদম তার মরে যাওয়া ভাইয়ের মতন দেখতে, এন্টোনি মৃত ভাইয়ের নামে নাম রেখেছে। এন্টোনির সব ছেলে মেয়ের নাম তার ভাই বোনের নামে। এক মনে ড্রাইভ করে এন্টোনি আর আমি চুপ করে থাকি। কি কথা বলবো বুঝে উঠতে পারি না। ভাবি, এন্টোনির জন্য একটা সাইক্রিয়াট্রিক কাউন্সেলিং এর ব্যাবস্থা করাই যায়।

এন্টোনি যে বেঁচে আছে বা স্কুল পাশ করেছে বা চাকরি করছে, সবটাই কেমন অবিশাস্য লাগে। সংসার হয়েছে তার, সন্তানাদি হয়েছে, পরিবার হারানোর ক্ষত সামলে হয়তো উঠে নাই পুরোপুরি তবু জীবন থেমে থাকে না। পরিবেশ হাল্কা করার জন্য বলি, তো এন্টোনি, কোনো উগান্ডান মেয়েকে মনে ধরলো না তোমার? বিয়ের জন্য রুয়ান্ডা যেতে হলো? কেমন কথা বাপু! মুখ ফিরিয়ে হাসে এন্টোনি, “ম্যাডাম, আমি তো টুটসি কাউকেই বিয়ে করতে চেয়েছিলাম। আমাদের ছেলে মেয়েরা জেনুইন টুটসি, অন্য কোনো রক্ত মিশে নাই ওদের শরীরে। আমার ভাই বোনেরা খুন হয়েছে কিন্তু আমি বেঁচে আছি কারণ যীশু আমার মাধ্যমেই আমার পরিবারকে রক্ষা করতে চেয়েছেন।” আমি চুপ করে থাকি, জাতিসত্তার এই  শুদ্ধ অশুদ্ধতার ধারনা এবং এর উপরে ভিত্তি করে সামাজিক বিভাজনের কারণেই হুতুরা এন্টোনির নিজের সম্প্রদায় টুটসিদের প্রায় নিঃশ্চিহ্ন করে ফেলছিলো। রুয়ান্ডাতে এখন আর কেউ টুটসি বা হুতু নয়, সবাই রুয়ান্ডান। তবু  এন্টোনি মনে করে, তার সন্তানরা শুদ্ধ টুটসি এথনিসিটির বাহক হবে ভবিষ্যতে, কিন্তু উগান্ডায় থাকার জন্য তাদের টুটসি সত্তা কোনো হুমকি নয়। 

এন্টোনি ১৯৯৯ সালে রুয়ান্ডাতে নিজের গ্রামে গিয়েছিলো, যদি তাদের জায়গা জমির কিছু ব্যবস্থা করা যায়। চৌদ্দ বছরের কিশোর, পরিবারের সবাইকে হারিয়ে আবারও জীবন শুরু করতে চেয়েছিলো নিজের মাটিতে। কিন্তু ততদিনে জমি বাড়ি দখল হয়ে গেছে। সবাই এন্টোনিকে পরামর্শ দিলো, পরিবারের একমাত্র সারভাইভার হিসাবে সে বরং উগান্ডাতে ফিরে গিয়ে নূতন জীবন শুরু করুক, দখল হওয়া জমির কারণে নিজের প্রাণ খোয়ানোর দরকার কি? রুয়ান্ডান টুটসি এন্টোনির উগান্ডান পরিচয়ের শুরু।

আজ আমার সাথে এন্টোনির ডিউটি শেষ, প্রায় দশদিন সে আমার ডিউটি করলো। বিকেলে অফিস থেকে ফেরার পথে কফি শপে নেমে ডাকলাম এন্টোনিকে, “চলো তোমাকে ট্রিট দেই, কারণ তুমি একদিনও দেরী করে ডিউটিতে আসো নাই, মিটিঙের জায়গাগুলো ঠিকঠাক মতন চিনে নিয়ে গেছো, আয়াম সো প্রাউড অফ ইউ এন্টোনি।”

কফির কাপে চুমুক দিতে দিতে আবার আলাপ জুড়ি, এন্টোনি কখনো কি রুয়ান্ডা ফিরে যেতে চাও? এখন তো কোনো সমস্যা নাই, কেউ আর হুতু বা টুঁটসি নয়, সবাই রুয়ান্ডান।” এন্টোনি কফি শপের চত্বর ছাড়িয়ে দূরে তাকায়, “না ম্যাডাম, আমি পারবো না আর রুয়ান্ডা গিয়ে জীবন শুরু করতে। আমার সন্তানেরা জাতীয়তায় উগান্ডান, ওরা এখানেই বড় হোক, উগান্ডাতে অনেক সমস্যা থাকলেও জাতিগত খুনোখুনি হয় না। আর এই প্রেসিডেন্ট, লোকে তাঁকে যত নিন্দাই করুক, কিন্তু তিনি তো দেশের মানুষকে একে ওপরের হাতে খুন হতে দেন নাই। উগান্ডানরা যখন পরিবর্তনের কথা বলে তখন আমার ভয় লাগে। ক্ষমতার চাহিদা (এন্টোনি ডিমান্ড বললেও আমি বুঝি সে লালসার কথা বুঝাতে চেয়েছে) মানুষকে পশু করে দেয়, সে যখন শুধু অজুহাত খুঁজে অন্যকে নির্মূল করার। আমি কোনো পরিবর্তন চাই না। আমি কেবল আমার সন্তানদের জন্য নিরাপত্তা চাই, স্ট্যাবিলিটি চাই। এই সরকার চুরি করুক, দেশের সম্পদ কুক্ষিগত করুক, নিজের পরিবারকে ক্ষমতায় বসাক, আমার কোনো আপত্তি নাই, তারা দেশটাকে স্ট্যাবল রেখেছে। আমার সন্তানরা জাতিগত সহিংসতার হুমকির বাইরে, আমি এতেই খুশী ম্যাডাম!”    

ডেমোক্রাসি হিউম্যান রাইটস সুশাসন ইত্যাদি নিয়ে আমি লম্বা বক্তৃতা দিতে পারতাম, কিন্তু সেটা এমনই বেখাপ্পা হাস্যকর শুনাতো তাই চুপ থাকলাম। পৃথিবীব্যাপী মানুষের সেই আদিম অকৃত্রিম একমাত্র চাওয়া ‘আমার সন্তান যেন থাকে দুধে ভাতে!’ জেনোসাইড সারভাইভার এন্টোনির এই চাওয়ার কাছে গণতন্ত্র, দুর্নীতি, স্বজনপ্রীতি, স্বৈরতন্ত্র সব পরাজিত।

1820 times read

নারী'তে প্রকাশিত প্রতিটি লেখার বিষয়বস্তু, ক্রিয়া-প্রতিক্রিয়া ও মন্তব্যসমুহ সম্পূর্ণ লেখকের নিজস্ব। প্রকাশিত সকল লেখার বিষয়বস্তু ও মতামত নারী'র সম্পাদকীয় নীতির সাথে সম্পুর্নভাবে মিলে যাবে এমন নয়। লেখকের কোনো লেখার বিষয়বস্তু বা বক্তব্যের যথার্থতার আইনগত বা অন্যকোনো দায় নারী কর্তৃপক্ষ বহন করতে বাধ্য নয়। নারীতে প্রকাশিত কোনো লেখা বিনা অনুমতিতে অন্য কোথাও প্রকাশ কপিরাইট আইনের লংঘন বলে গণ্য হবে।