অমিমাংসিত - পর্ব ০২

শনিবার, এপ্রিল ১৮, ২০২০ ৪:১১ AM | বিভাগ : সাহিত্য


(প্রথম পর্বের পর) সেই নির্মম বাস্তবতার প্রতীক মনিকা নিজেই। ডাক্তার যেদিন বললেন ওর পেটে ছোট্ট একটা টিউমার হয়েছে, যেটা খুব দ্রুত অপসারন না করলে সমস্যা হয়ে যাবে। যদিও লাইফ রিস্ক নেই তবে জীবনে কোনোদিনও মা হতে পারবেনা। কথাটা শুনেই রেখা মানে মনিকার মা এক মুহূর্তেই যেনো পাথর হয়ে গিয়েছিলো। কিন্তু মনিকার তো ভেঙে পড়লে চলবে না।

মনিকা ডাক্তরকে বলেছিলো যে ও যে কোনো সিদ্ধান্ত মেনে নিতে পারবে, সেই মনোবল ওর আছে, তাই নির্দ্বিধায় বলে দেয় যেনো। তারপর থেকে আজ পর্যন্ত একা একাই কষ্টের গ্লানি বয়ে বেড়াচ্ছে। রেখা বুঝতে পেরেই হয়তো একটু বেশি প্রশ্রয় দেয় ওকে। ওর সব অন্যায় আবদার খুনসুটি হাসিমুখে মেনে নেয়, পাছে মনিকা কষ্ট পায়, সেজন্য।

সেবার পহেলা বৈশাখের সময় সমর যখন লুকিয়ে প্রথম চুমু খেয়েছিলো সেটাও মাকে বলে দিয়েছিলো। রেখা একটু কপট রাগ করেছিলো তবে খুব একটা আপত্তি করেনি। শুধু এটুকুই বলেছিলো যে নিজের মনের বিরুদ্ধে কখনও কিছু না করে। আর যাকে ভালোবাসো তার কাছে কোনো কথা গোপন করবে না। সে জন্যইতো সমরকে ওর সমস্যার কথাটা বলে দিয়েছিলো।

ব্যাস আর কই যায়, এক মুহূর্তেই চেনা মানুষটা অচেনা হয়ে গেলো। কী অপমানটাই না করেছিলো সেদিন! অথচ প্রথম থেকেই একটু আধটু ইঙ্গিত দিয়েছিলো, সমর পাত্তাই দেয়নি। হয়তো মনিকার স্নিদ্ধ সুন্দর মুখখানা দেখেই সমর মোহাবিষ্ট হয়েছিলো। সত্যিই কি সমর মনিকাকে ভালোবেসেছিলো? আজো জানা হলো না মনিকার। বিষয়টা অমিমাংসিতই রয়ে গেলো। থাক না কিছু বিষয় অমিমাংসিত। তাতে জগতের কীই বা তেমন যায় আসে!

মনিকাও এখন আর মনে করতে চায় না। শুধু সেদিনকার অপমানের কথাটা ভুলতে পারেনি, পারে না। বাসায় ফিরে একদম চুপ হয়ে ছিলো। এতোটা শান্ত কখনও দেখেনি মেয়েকে, তাইতো রেখা বেশ ভয় পেয়েছিলো। বুঝতে পেরেছিলো প্রচন্ডরকম মানসিক আঘাত পেয়েছে মনিকা। আস্তে করে মেয়ের রুমে এসে দরজা বন্ধ করে মনিকার পাশে বসেছিলো।

মাকে পাশে পেয়ে মনিকার বুকের কষ্টটা দলা পাকিয়ে যেনো বের হয়ে আসলো। ঢুকরে কেঁদে উঠলো মায়ের বুকে মাথা রেখে। রেখা কোনো কথা বললো না, কাঁদতে দিলো মনিকাকে। উভয়েই নীরব, মাঝে মাঝে ফুলে উঠে মনিকার কান্না আর রেখার দীর্ঘশ্বাস। দু'জনে কোনো কথা বললো না অথচ এই নীরবতাই অনেক কথা বলে দিলো।

আজ এতোদিন পর সেসব কথা মনে পড়ে যায় মনিকার। এতোদিন কাজের প্রেশারে ভুলেই গিয়েছিলো সমর নামের এক ভীরু ওর জীবনে এসেছিলো। এখন এসব ভেবে বরং ওর খারাপই লাগে। মনেহয় অল্প বয়সের কোনো আবেগের বসে এমন ভুল করেছিলো যার জন্য জীবনটা একটু হলেও থমকে গিয়েছিলো। শুধু রেখার মতো একজন সাহসী মায়ের সন্তান বলেই আজও মাথা উঁচু করে বাঁচতে শিখেছে। নিজেকে জানতে শিখেছে, নিজের ভালো লাগা মন্দ লাগার মূল্যায়ন করতে পেরেছে।

সাত পাঁচ ভাবতে ভাবতে অস্ফুটস্বরে বলে উঠলো, ভালোবাসি, তোমায় খুব ভালোবাসি মা। রিক্তা পাশ থেকে ফোঁড়ন কাটলো কেনো দিদি আগে কী মাকে ভালোবাসতি না? একটু লজ্জা পেয়েই গেলো মনিকা। কিছু বলতে যাবে এর মধ্যেই ফোনটা বেজে উঠলো। অপর প্রান্ত থেকে বসের কন্ঠ পেয়ে শান্ত স্বভাবজাত স্বরে বললো স্যার কীছু হয়েছে ? বস বললেন তুমি একটু আসতে পারবে অফিসে? কিছু না ভেবেই বললো, ওকে স্যার, আমি আসছি। বলে ফোনটা কেটে দিলো।

(প্রথম পর্ব পড়তে এখানে ক্লিক করুন)


  • ২১৪ বার পড়া হয়েছে

পূর্ববর্তী লেখা পরবর্তী লেখা

বিঃদ্রঃ নারী'তে প্রকাশিত প্রতিটি লেখার বিষয়বস্তু, ক্রিয়া-প্রতিক্রিয়া ও মন্তব্যসমুহ সম্পূর্ণ লেখকের নিজস্ব। প্রকাশিত সকল লেখার বিষয়বস্তু ও মতামত নারী'র সম্পাদকীয় নীতির সাথে সম্পুর্নভাবে মিলে যাবে এমন নয়। লেখকের কোনো লেখার বিষয়বস্তু বা বক্তব্যের যথার্থতার আইনগত বা অন্যকোনো দায় নারী কর্তৃপক্ষ বহন করতে বাধ্য নয়। নারীতে প্রকাশিত কোনো লেখা বিনা অনুমতিতে অন্য কোথাও প্রকাশ কপিরাইট আইনের লংঘন বলে গণ্য হবে।


মন্তব্য টি

লেখক পরিচিতি

প্রতিভা রানী

প্রবাসী প্রতিভা রানী পেশাগত জীবনে বাংলাদেশে একজন শিক্ষক হিসেবে কর্মরত ছিলেন।

ফেসবুকে আমরা