প্রতিভা রানী

প্রবাসী প্রতিভা রানী পেশাগত জীবনে বাংলাদেশে একজন শিক্ষক হিসেবে কর্মরত ছিলেন।

অমিমাংসিত - পর্ব ০১

বহুকাল হয়েছে ভাতঘুমের অভ্যাসটা চলে গেছে মনিকার। কী করেইবা থাকবে! নিয়মমাফিক ৯টা ৪টা অফিস হলেও মাঝে মাঝেই বসের কথামত ওভারটাইম করতে হয়। আজ এতোদিন পর ইচ্ছে করেই অফিস ফাঁকি দিলো। বড্ড ক্লান্ত লাগছে আজকাল। হাঁপিয়ে যাচ্ছে যেনো।

সেই বছর চারেক আগে একদিন এক বন্ধুর হাত ধরে অফিসে এসেছিলো। তারপর থেকে একটানা বিরতীহীন ভাবেই কাজ করে যাচ্ছে। কাজ বলতে বসের ফুট ফরমায়েশ খাটা আর কৃত্রিম হাসিটা মুখে ঝুলিয়ে রাখা। এই বাজারে চাকুরী যে সোনার হরিনের থেকেও বেশি তা ও বেশ ভালো করেই জানে। তাইতো সব কষ্টের মাঝে নকল হাসিটা হাসতে জানে। তবে বস খুব ভালো মানুষ।

অন্যান্যদের মুখে যা শোনে বসদের সম্পর্কে সেরকম না ভদ্রলোক একেবারেই। যদিও প্রচন্ড বদমেজাজী, রাগ হলে যে কতো বকাঝকা করে তার কোনো শেষ নেই। এই একটা দোষ বাদ দিলে বস একদম দেবতা। যদিও কানাঘুষায় শুনেছে বস নাকি বাসায় একদম ভিজে বেড়াল। বৌয়ের সাত চড়েও রা করেন না। হয়তোবা সেই রাগগুলোই অফিসের স্টাফদের সাথে ঝাড়ে।

আহারে বেচারা! মনিকা আনমনেই হাসলো। বসের করুণ মুখটা কল্পনা করে ফিক করেই হেসে উঠলো। ওপাশ থেকে মনিকার বোন রিক্তা অবাক হয়ে বললো, এই দিদি, তুই পাগল হয়েছিস নাকি? না আবার ভূতে ধরলো। একা একা হাসছিস যে? মনিকা সম্বিৎ ফিরে পেয়ে বললো, নাহ্ কিছু না। একটা কথা মনে পড়ে গেলো তাই হাসছি। মা, ছোট বোন রিক্তা আর বড় দাদা রবীন এই নিয়ে মনিকার সংসার।

রবীন বছর তিনেক আগে বিশ্ববিদ্যালয়ের সর্বোচ্চ ডিগ্রী শেষ করে এখন চাকুরীর জন্য হন্য হয়ে এ অফিস ও অফিস ছোটাছুটি করে। প্রতিদিন ভাবে আজ বুঝি কোনো ভালো খবর আসবে, কিন্তু সে চাকুরী নামের সোনার হরিণ যে অধরাই আজ পর্যন্ত। তবু চেষ্টা করেই যাচ্ছে। সোমা প্রতিদিন তাগাদা দেয় একটা কিছু অন্তত করে দেখাও যাতে বাবার সামনে বলতে পারি তুমি বেকার নও।

এটা আসলে সব প্রেমিকারাই চায় তার পছন্দের মানুষকে বেকার না দেখতে। সেক্ষেত্রে সোমার এই চাওয়াটা অযৌক্তিক মনে হয় না রবীনের কাছে। সোমা নিম্ম মধ্যবিত্ত পরিবারের মেয়ে। অনার্স ফাইনাল ইয়ারে পড়ে সাথে একটা বুটিকে পার্ট টাইম জব করে। ও জানে কোনো কাজই ছোট নয়। তাইতো রিটায়ার করা বাবার কাছ থেকে টাকা চাইতে ইচ্ছা করে না। বরং মাঝে মাঝে ছোট ভাইটার ছোটখাটো আবদার পূরণ করতে পারে। তাছাড়া রবীনকেও ছোটখাটো গিফট করে।

একমনে কতো কীই ভাবছে মনিকা বিছানায় আধাশোয়া হয়ে। কতো কী সপ্ন দেখতো একটা সময়। অথচ হঠাৎ করে বাবার মৃত্যু আর ওর দূর্ঘটনা সব স্বপ্নকে এক মুহূর্তেই ধূলিস্যাৎ করে দিলো।  আজো মনে পড়লে ঢুকরে কেঁদে উঠে। কীইবা এমন ক্ষতি হতো আজ বাবা বেঁচে থাকলে! এসব ভাবে আর দীর্ঘশ্বাস ফেলে।

এইতো সেদিন মনে হয় হয়, অথচ আজ সাতটা বছর পার হয়ে গেলো বাবা নেই এই পৃথিবীতে। একটা দূর্ঘটনা একটা পরিবারকে একটা সদ্য কৈশোর পেরোনো মেয়েকে নির্মম বাস্তবতার সামনে এসে দাড় করিয়ে দেয়। জানান দেয় পৃথিবী আসলেই কতো নিষ্ঠুর। সেদিন যদি বাবা আমাকে না বাঁচাতে যেতো তাহলে হয়তো বাবা আজ বেঁচে থাকতো। না হয় আমিই মরে যেতাম। আমি মরে গেলে কিইবা ক্ষতি হতো!

আমি মরে গেলেইতো ভালো হতো এই অভিশপ্ত জীবনের বোঝা অন্তত বয়ে বেড়াতে হতো না। মা, দাদা মুখে না বললেও বুঝতে পারে মনিকা, তারা ভেতরে ভেতরে কতোটা যন্ত্রণা পাচ্ছে। যন্ত্রণা পাবেই না বা কেনো? বলুন তো কোনো পরিবার যদি জানে যে তাদের মেয়ে কোনোদিন মা হতে পারবে না, তাহলে বড়োদের তো কোনোদিন ঘুম হবার কথা ? আজ খুব করে অদৃশ্য ঈশ্বরকে ডাকতে ইচ্ছা করছে মনিকার।

সত্যিই কি ঈশ্বরের অস্থিত্ব আছে? নাকি নেই? এই সাত পাঁচ ভাবতে থাকে। একবার ভাবে, মা'তো ঈশ্বরে বিশ্বাসী, তাহলে মা কেনো কষ্ট পাচ্ছেন? কেনো প্রতিদিন পাড়া প্রতিবেশিদের কাছে শুনতে হচ্ছে, মেয়েকে বিয়ে না দিয়ে তার পয়সা খাচ্ছো তোমরা। অথচ গল্পটা তো সম্পূর্নই ভিন্ন। দু একটা প্রস্তাব যে আসেনি তা নয় কিন্তু।

মনিকা নিজেই সেসব ভেস্তে দিয়েছে, পাত্রের সাথে নিজে কথা বলেই সব ভেঙে দিয়েছে। তারা যদিও আহা উহু করে সমবেদনা জানিয়েছে কিন্তু মনিকা ও সবের তোয়াক্কা কখনোই করে না। ও জানে বাস্তব কতোটা নির্মম।

691 times read

নারী'তে প্রকাশিত প্রতিটি লেখার বিষয়বস্তু, ক্রিয়া-প্রতিক্রিয়া ও মন্তব্যসমুহ সম্পূর্ণ লেখকের নিজস্ব। প্রকাশিত সকল লেখার বিষয়বস্তু ও মতামত নারী'র সম্পাদকীয় নীতির সাথে সম্পুর্নভাবে মিলে যাবে এমন নয়। লেখকের কোনো লেখার বিষয়বস্তু বা বক্তব্যের যথার্থতার আইনগত বা অন্যকোনো দায় নারী কর্তৃপক্ষ বহন করতে বাধ্য নয়। নারীতে প্রকাশিত কোনো লেখা বিনা অনুমতিতে অন্য কোথাও প্রকাশ কপিরাইট আইনের লংঘন বলে গণ্য হবে।