ভোর নামুক প্রতিটি দুঃস্বপ্নে

সোমবার, জানুয়ারী ৮, ২০১৮ ১২:৩৪ AM | বিভাগ : দেশ/রাজনীতি


হালদা মুভি দেখতে যাচ্ছি। বিকেলের টিকেট কেটেছি। বিকেল সাড়ে পাঁচটায়, শ্যামলী সিনেমা হল। সিনেমা দেখতে যাওয়ার সময় থেকেই কেমন যেন সব কিছু অদ্ভুত লাগছে। ঘরটা চেনা না, রাস্তা চেনা না, কেমন জানি অদ্ভুতুড়ে। রিকশা চলছে তো চলছেই। ঘড়ির দিকে তাকিয়ে দেখি রাত সাড়ে দশটা বাজে। আমি বুঝলাম না, কি করে বিকেল থেকে রাত সাড়ে দশটা হয়ে গেল। এখনো কি মুভি চলছে নাকি? আমি দেখলাম প্রচুর মানুষ সিনেমা হলের আশ পাশটায়, যেন কিসের উৎসব। নাহ মানুষ আছে, মানুষ থাকলে আর কোনো সমস্যা নেই। আমি সিনেমা হলে ঢুকলাম। হল ভর্তি দর্শক। বাহ! এতো মানুষ এসেছে। কিন্তু অনেক বেশি মানুষ মনে হচ্ছে, কেমন যেন গিজ গিজ করছে। আমি আমার সিট খুঁজে বসে পড়লাম। মানুষগুলো বেশ পরিচিত লাগছে। কেমন করে সবাইকে এতো চেনা লাগছে বুঝতে পারলাম না। কারণ কি? এদের কে ফেসবুকে দেখেছি? হয়তো, কিন্তু এতো মানুষ একসাথে পরিচিত লাগছে কেনো বুঝতে পারছি না। আমি হালদা দেখতে এসেছি, মানুষ, প্রকৃতি জীবন সংগ্রাম আর স্বপ্নের গল্প নিয়ে হালদা ছবি।.

আশে পাশের মানুষের কথা শুনছি। খুব বেশি কথা বলছে। কেমন জানি বাজার বানিয়ে ফেলেছে। হলের আলো কমানো। কাউকে দেখা যাচ্ছে না। আমার পেছনে বসা এক ভদ্রলোক, উচ্চস্বরে মোবাইলে কথা বলছে। নিশ্চয়ই কোনো ব্যাবসার কথা, বলেই যাচ্ছে, এক কথা, ও দিকে বন্যার কি অবস্থা, আমি তো এই অবস্থায় ওখানে যেতেও পারবো না, বুঝতেই পারছো কি অবস্থায় এসেছি এখানে ইত্যাদি। আর ডান দিকের কিছু দূরে বেশ কয়েকজন লোক, তাদের মধ্যে বেশ জ্ঞানী কথা বার্তা চলছে। তাদের মধ্যে একজন বললো, আরে না এই বাংলা চলচ্চিত্র জগত দেখবেন ঘুরে দাঁড়াবে, তাই তো এই মুভি দেখতে এসেছি। আরেকজন বললো যে, মুভির হাত থাকলেই হয় না, দেশ সমাজ রাষ্ট্রের প্রতি একটা কমিটমেন্ট থাকতে হয়, নইলে তো জানেনই সেই পপুলার লাইনটা, সব কিছু নষ্টদের অধিকারে যাবে, হাহাহাহ।

বাম দিকের পাশের এক জায়গা থেকে এক বাচ্চা বার বার করে বলছে, আমাকে কেনো এনেছো? বাসায় যাবো, বাসায় যাব্বোওওওও ... উফ বাবা মাগুলো যে কেনো বোঝে না। শিশুরা সিনেমার কি বোঝে, এই পিচ্চিগুলোকে নিয়ে কেনো আসে সিনেমা হলে। আর আমার পাশে বসা এক যুবক, বার বার কাকে যেন টেক্সট করছে, একটা চোখে পড়লো, ম্যাসেজে লেখা বাবু খাইছো? তাঁর হাতের তালুর চাইতে বড় মোবাইলের স্ক্রীনে ভেসে উঠছে তাঁর প্রেম নামা। উফ মুভি টা কখন শুরু হবে!

জাতীয় সঙ্গীতের আগে সিনেমা হলের স্ক্রীনে ভেসে উঠলো একটা বিজ্ঞাপন, “এখানে সৃজনশীল পদ্ধতিতে, সহনশীল মাত্রায় ঘুষ খাওয়ার উপযুক্ত করে তোলা হয়” হলের দর্শকদের অনেকেই হেসে উঠলো। জাতীয় সঙ্গীতের সুর বেজে উঠলো, আমি দাঁড়ালাম যতক্ষণ সুর বাজলো কোথা থেকে একটা কান্নার আওয়াজ আসতে লাগলো। কেমন যেন ভালো লাগছে না আমার। এই সিনেমা এমন কেনো? আমি একা এসে ভুল করেছি। আমার অন্যদিন আসা উচিৎ ছিলো। সিনেমা শুরু হলো। একি!! এটা তো হালদা সিনেমা না, কোথায় মোশাররফ করিম, তিশা, জাহিদ হাসান? এরা কারা? এই দৃশ্য তো ছিলো না ট্রেইলারে।

নৌপরিবহন শ্রমিক লীগের নেতা হয়ে স্লোগান দিচ্ছে এক যুবক, আর অন্যদিক থেকে একজন ডায়লগ দিলো, কি কুবের মিছিল কিবা? কুবের বললো, এই গণেশ এই দিকে আয়।
গণেশ এসে বললো, মাঝি, আমারে নিবা লীগে?

নাহ এই সিনেমা আমি দেখতে চাই না। নিশ্চয়ই কোনো ঘাপলা আছে। হলে ঢোকার আগে, পপকর্ণ কিনতে গিয়ে দেখি একটা মেয়ে বারো তেরো বয়স, সে বললো এখানে পপকর্ণ পাওয়া যায় না। আমি বললাম তো চিপ্স দাও, বললো ভাত ছাড়া এখানে কিছুই নাই। আশ্চর্য, নিশ্চয়ই এখানে সমস্যা আছে। আমি উঠে দাঁড়িয়ে চলে যেতে লাগলাম, মোবাইলের লাইট জ্বালাতে গিয়ে দেখি মোবাইল ফোন বন্ধ হয়ে গেছে। আমাকে সেই পিছনে বসা ভদ্র লোক তাঁর হাতের মোবাইলের আলো জ্বালিয়ে দিলেন, আমি আঁতকে উঠলাম, আমি ভয়ে আতঙ্কে স্তব্ধ হয়ে গেলাম। ভয়ে আমার শিরদাঁড়া দিয়ে একটা ঠান্ডা স্রোত নেমে গেলো, আমি কাকে দেখছি, আমি এ কাদের দেখছি। আলো জ্বালিয়ে রাখা ভদ্র লোককে আমি চিনি তিনি অভিজিৎ রায়, তাঁর পাশে বসে আছে অনন্ত বিজয় দাশ, সাথে রাজীব হায়দার, সাথে নীলয় নীল, সাথে আরেফিন দ্বীপন, আমি ভয়ে আতঙ্কে ছুটে যেতে গিয়ে ডান দিকে বের হতে অদ্ভুত এক আলো জ্বলে উঠলো পুরো হল জুড়ে। সিনেমা আর হচ্ছে না, সব একদম নীরব। সবাই কেমন যেন ভেসে ভেসে যাচ্ছে। ডান দিকে বের হওয়ার রাস্তা ছিলো, আমি শরীরের সব শক্তি দিয়ে ছুটে বের হতে গিয়ে ধাক্কা খেলাম, পায়ে প্রচন্ড চোট পেয়েছি, একজন বললো এই মেয়ে দেখে চলতে পারো না, ব্যথা পেলে তো, আমি অসম্ভব ভয়ে তাকে বললাম, আমাকে ধরার দরকার নেই, তিনি মমতা নিয়ে বললেন, আরে ভয় পাচ্ছ কেনো? আমি প্রাণ পণ চেষ্টা করে উঠে দাঁড়িয়ে দৌড়তে লাগলাম, কারণ আমি তাদের সবাইকে চিনে ফেলেছি। আমি জেনে গেছি, ধমক দিয়েও আবার আমাকে তুলতে আসা লোকটি ডঃ হুমায়ুন আজাদ, তাঁর পাশে বসে গল্প করছিলেন মিশুক মুনীর আর তারেক মাসুদ।

আমি দৌড়চ্ছি কারণ সেই হল ভর্তি সমস্ত মৃত মানুষ যাদের এইভাবে মারা যাবার কথা ছিলো না। আমি দৌড়াচ্ছি কারণ তাদের নাম আমি জেনে গেছি, ছোট বাচ্চাটাকে কোলে নিয়ে বেড়িয়ে যেতে চেয়েছিলো যে সে মিঠুন চাকমা, যে মেয়েটি আমাকে পপকর্ণ না দিয়ে ভাত দিতে চেয়েছিলো সে কণিকা। আমার হাত পা অবশ হয়ে যাচ্ছে, আমি তবুও প্রচন্ড জোরে ছুটতে চাইছি কারণ, আমার মনে পড়েছে হলে ঢোকার মুখে যে দুটি মেয়ে দাঁড়িয়ে ছিলো তাদের একজন রূপা। তাদের সাথে নিশ্চয়ই আছে তনু, এবং নিশ্চয়ই একই সাথে বসে ছিলো শাজনীন আর সুখিয়া রবি দাস। আমার পায়ে প্রচন্ড চোট লেগেছে। আমার গলা শুকিয়ে আসছে। আমার ডান পায়ের বুড়ো আঙ্গুল উলটে গেছে, ইস কি কষ্ট! কি কষ্ট! আমি দৌড়াতে পারছি না।

আমি ছুটছি, ছুটছি, আমি বাঁচার লোভে ছুটছি। তবুও আমি নির্লজ্জের মতো বাঁচার লোভে ছুটছি। আমার মস্তিষ্ক আমাকে ছুটতে বলছে, আমার নিউরণ থেকে আমাকে সিগন্যাল দিয়েছে, বারবার করে বলছে, তবুও বাঁচতে হয়, তবুও মানুষ বেঁচে থাকে। আর পেছন থেকে সারি সারি কন্ঠস্বর আমাকে বলছে, তুমি দৌড়িও না, সাবধানে যাও, তুমি বেঁচে আছো, যেন আমাদের কথা তুমি ওখানে গিয়ে বলতে পারো।

আমি হঠাৎ একটু শান্ত হলাম। সামনে আমার চেনা রাস্তা দেখতে পাচ্ছি। আমি শেষ বারের মতো সবাইকে একটু দেখে নিতে গেলাম, এবং হোঁচট খেয়ে আবারো পড়ে গেলাম, হঠাৎ আমার কানে কাছে এসে কে যেন বলে চলে গেলো, বললো ব্যথা পেয়েছো? আদর সোনা।

আমার ঘুম ভাঙ্গে, আমি দেখি আমি বাস্তবে আছি, পাশের জানালা খুলে দেই, চুপচাপ এক ভোর, আমার ঘরে এসে বসে।

এ দেশেও ভোর নেমে আসুক। ভোর নামুক প্রতিটি দুঃস্বপ্নে।


  • ১৫২০ বার পড়া হয়েছে

পূর্ববর্তী লেখা পরবর্তী লেখা

বিঃদ্রঃ নারী'তে প্রকাশিত প্রতিটি লেখার বিষয়বস্তু, ক্রিয়া-প্রতিক্রিয়া ও মন্তব্যসমুহ সম্পূর্ণ লেখকের নিজস্ব। প্রকাশিত সকল লেখার বিষয়বস্তু ও মতামত নারী'র সম্পাদকীয় নীতির সাথে সম্পুর্নভাবে মিলে যাবে এমন নয়। লেখকের কোনো লেখার বিষয়বস্তু বা বক্তব্যের যথার্থতার আইনগত বা অন্যকোনো দায় নারী কর্তৃপক্ষ বহন করতে বাধ্য নয়। নারীতে প্রকাশিত কোনো লেখা বিনা অনুমতিতে অন্য কোথাও প্রকাশ কপিরাইট আইনের লংঘন বলে গণ্য হবে।


মন্তব্য টি

লেখক পরিচিতি

প্রমা ইসরাত

আইনজীবী ও মানবাধিকার কর্মী

ফেসবুকে আমরা