রাজনীতির পেছনের রাজনীতি

শনিবার, জুলাই ৬, ২০১৯ ৪:৫৭ AM | বিভাগ : দেশ/রাজনীতি


'পলিটিক্স বিহাইন্ড পলিটিক্স' নামের একটা টার্ম আছে। বাংলাদেশে সেই পলিটিক্সের পেছনের পলিটিক্স হচ্ছে খেলা। খেলা দিয়ে শিক্ষকের গায়ে কেরোসিন তেল ঢেলে অপমান করা, ট্রেন দূর্ঘটনা, রেপ, গ্যাসের দাম বাড়া, সুন্দরবনের পাশে পাঁচ সিমেন্ট কারখানায় অনুমোদন সব ঢেকে দেওয়া যায়! হত্যাকারীর বিচার চাওয়া থেকে শুরু করে প্যাডের দাম কমানো সবখানে প্রধানমন্ত্রীর হস্তের দারস্থ হওয়া লাগে! প্রধানমন্ত্রীকে বকাঝকা দিয়ে নালিশ জানালে তিনি সালিশ উপহার দেওয়ার পর সেই পলিটিক্স মোতাবেক 'প্রধানমন্ত্রীকে ধন্যবাদ' লেখা লাগে! অর্থাৎ তারা সর্প হইয়া বাজেট পাশ করবেন, আমরা আন্দোলন করলে ওঝা হইয়া ঝাড়বেন! কিন্তু সর্প ও ওঝা সেই একই ব্যক্তি!

মাশরাফি ভালো খেললে নাচানাচি করেন, খারাপ খেললে বিদায় নিতে বলেন, কিন্তু মাশরাফিকে নিয়ে পোস্ট দেওয়ার কারণে যে একজন রাঙামাটি বদলী হয়ে যান সেইটা দেখতে পাননা?

আপনি আমি যখন টিভি খুলে সাকিব তামিমদের খেলা নিয়ে উল্লাস করছি সেসময় একটা অদ্ভুত বাজেট পাশ হয়ে গেলো। সেই বাজেটে কালো টাকা সাদার বৈধতা দেওয়া হলো, বিকাশে কয়টা টাকা আছে সেটা দেখার জন্য চল্লিশ পয়সা কেটে নেওয়ার নির্দেশনা এলো, ইলেকট্রনিক গেজেটের ওপর আরও বেশি করারোপ করা হলো, শিক্ষাখাতে সবচেয়ে কম বরাদ্দ দেয়া হলো। সেই একই সময়ে কৃষক ধানের দাম পেলো না, ফসলে আগুন লাগিয়ে দিলো, লিচু কিনে না দিতে পেরে বাবা আত্নহত্যা করলো, নুসরাত জাহান রাফি থেকে শুরু করে অসংখ্য মেয়ে রেপ হলো, রিফাতকে কোপানো হলো। আমরা তখনো খেলা দেখলাম! অথচ একজন ক্রিকেটার কি একটা সিংগেল ওয়ার্ড বলেছে? একটা প্রতিবাদ করেছে? অথচ এরা নাকি দেশের প্রতিনিধি!(?)

খেয়াল করে দেখুন ক্রিকেটারদের মাঝে মাঝেই যে জিতে যাওয়ার জন্য প্রধানমন্ত্রী কোটি খানেক টাকা করে উপহার দেন সেটা ওনার নিজস্ব টাকশাল থেকে আসে না। সেইগুলা আসে জনগণের ট্যাক্স থেকে। যে মেয়ের বাবাকে র‍্যাব গুম করে ফেলেছে, যে মেয়ে রেপ হয়েছে, যে বাবা সন্তানকে পড়াতে জুতা সেলাই করে তার দেয়া ট্যাক্স থেকে। এজন্য যখনই কোথাও 'প্রধানমন্ত্রীর উপহার' লেখা দেখি, তখনই একগাল হেসে নিই। কইয়ের তেলে কই ভাজা আর আমাদের দেওয়া টাকা থেকে আমাদেরই উপহার দেওয়া দেখে হেসে ফেলি!

পদ্মাসেতু তৈরি নিয়ে একগাদা নিউজ হলো। প্রতিটা স্প্যান বসানোর সময় একটা করে নিউজ। অথচ পদ্মাসেতুর টাকাটা প্রধানমন্ত্রী বা মন্ত্রীসভার পৈত্রিক সম্পত্তি থেকে হয় নাই। ওই টাকা আপনার আর আমার দেয়া কর থেকে এসেছে, যে কৃষক ধানের দাম পায়নি সেই কৃষকের পকেট থেকে এসেছে, যে বাবা বাচ্চার জন্য গুড়ো দুধ চুরি করেছে তার পকেট থেকেও এসেছে। তখনও আমরা খেলা দেখছি!

একজনকে কয়দিন দেখলাম চাকরির জন্য ঘুষ দিচ্ছেন চল্লিশ লাখ টাকা। অথচ বাংলাদেশের একটা দূর্নীতি দমন কমিশন আছে। একবার দেখলাম সেই কমিশনের লোকেরাই দূর্নীতির সাথে জড়িত! মানে সিস্টেম যাদের চেঞ্জ করে দেওয়ার কথা, সিস্টেম তাদেরকেই চেঞ্জ করে দিয়েছে! তারা দূর্নীতি দমন করতে যেয়ে নিজেরাই দূর্নীতি দিয়ে দমে গেছেন!

আমি জানি এই কথাগুলো লিখেও কোনো লাভ হবে না। বেশি লেখালিখির কারণে আমাকে শহিদুল আলমের মতো ধরে নিয়ে যাওয়া হতে পারে, গুম করে দেওয়া হতে পারে অথবা আমি দেশের বাইরে গেলে তসলিমা নাসরিন বা দাউদ হায়দারের মতো পাসপোর্ট ফেরত না দেয়া হতে পারে। তবে আমার লেখালেখির একটা সান্ত্বনা আছে। সেটা কি জানেন? They have killed the system and the system will kill them soon!

তারা নিজেরা যে সিস্টেম শেষ করে দিয়েছে, সেই একই সিস্টেমই তাদের শেষ করে দেবে!- এই কথাটা কেবল আমিই বলতে পারি! সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়ের মতো করে আরও বলতে পারি - দেশপ্রেম একটা মিথ।

খেলায় জিতলে বা হারলে সেটা জ্বলে ওঠে আর দেশ নিজে সমস্ত সততায় হেরে গেলে সেটা নিভে যায়! এইজন্য দেশের শেষ হয়ে যাওয়ার চেয়ে দেশপ্রেম বড়ো হয়ে যায়! এই দেশপ্রেম ওরফে 'পলিটিক্স বিহাইন্ড পলিটিক্স' লইয়া আমরা কই যাইব?


  • ২৬৩ বার পড়া হয়েছে

পূর্ববর্তী লেখা পরবর্তী লেখা

বিঃদ্রঃ নারী'তে প্রকাশিত প্রতিটি লেখার বিষয়বস্তু, ক্রিয়া-প্রতিক্রিয়া ও মন্তব্যসমুহ সম্পূর্ণ লেখকের নিজস্ব। প্রকাশিত সকল লেখার বিষয়বস্তু ও মতামত নারী'র সম্পাদকীয় নীতির সাথে সম্পুর্নভাবে মিলে যাবে এমন নয়। লেখকের কোনো লেখার বিষয়বস্তু বা বক্তব্যের যথার্থতার আইনগত বা অন্যকোনো দায় নারী কর্তৃপক্ষ বহন করতে বাধ্য নয়। নারীতে প্রকাশিত কোনো লেখা বিনা অনুমতিতে অন্য কোথাও প্রকাশ কপিরাইট আইনের লংঘন বলে গণ্য হবে।


মন্তব্য টি

ফেসবুকে আমরা