প্রিয় ইশ্বর/খোদা/ভগবান

বৃহস্পতিবার, মার্চ ২৯, ২০১৮ ৮:৫৩ PM | বিভাগ : প্রতিক্রিয়া


খুব ক্লান্ত বুঝি? ঘুমোচ্ছ? বিশ্রাম নিচ্ছো? অনেক অনেক কান্না’র শব্দে তুমি পর্যুদস্ত কি? তনু’কে ভাল্লুকে খেয়ে ফেললো এই কষ্টে তনু’র মা আজও বিলাপ করে কাঁদে, তনু’র বাবা শয্যাশয়ী। এর মধ্যে আর কত শত বিলাপের রোল, বিউটি, নুসরাত, এক বছর দশ মাস বয়সী শিশুর কান্না…..।

তারা জানে সব তোমার ইচ্ছেতেই হচ্ছে কিন্তু তারপরও অসহায় এই মায়ে’রা, এই পরিবার গুলো তোমার নাম নিয়েই বিলাপ করে চলছে, তোমার কাছেই লাগাতার তাদের ফরিয়াদ। এই পরিবার গুলো আর কখনও স্বাভাবিক জীবন যাপন করতে পারবে না, কখনও ঈদ, পূজা, বৈশাখ তাদের বাড়িতে সেই আনন্দ নিয়ে আসবে না। এমনকি তাদের পরের বংশধর’রাও এই জেনেই বড় হবে, তাদের ফুপি, খালা এই দেশে বিনা দোষে নির্যাতিত হয়ে মারা গেছে যার বিচার পর্যন্ত হয় নি। তুমি সব কেড়ে নিয়েছো জেনেও, তোমাকেই বলছে, হে খোদা, তুমি এর বিচার করো। তোমার ইচ্ছেতে সব হারিয়েও তারা বিশ্বাস করে, তুমি ছাড়া তাদের আর কেউ নেই।  পুলিশ তো নেইই, আইন নেই, দেশ নেই, মন্ত্রী নেই, তাদের কিছু নেই শুধু তুমিই আছো।

অনেকদিন তো পশ্চিমে আরাম করলে এখন তুমি পূর্ব দিকে যাও, ওদের তোমাকে খুব প্রয়োজন। এখানে তো সব চলছে ঠিক মতো, আজকাল এরা তোমাকে নিয়ে মাথা ও ঘামায় না, তেমন চাহিদা বা যত্ন আত্তিও নেই তোমার। ওদের বাজারে তোমার প্রয়োজন শেষ। যেদিকে তোমাকে সবাই অকাতরে ডেকে চলছে, সেদিকেই আছো তুমি মুখ ফিরিয়ে! কত চাহিদা তোমার ঐ বাজারে, তোমার অনুপস্থিতিতে তোমার নাম নিয়ে কত খেলায় না চলছে। “তুমি কি এমনি করে থাকবে দূরে?”

আচ্ছা, তুমি কি পূর্বের খবর কিছু রাখো? অত্যাচার-নির্যাতনের কারণ হিসেবে তারা মেয়েদের জামা কাপড়ের দোষ দেয়। তুমি তো অনেকদিন পশ্চিমে আছো, পশ্চিমের মেয়েদের জামা কাপড় কি তাহলে আকর্ষনীয় নয়? নাকি এখানকার পুরুষদের মধ্যে কিছু সমস্যা আছে? তারা কি যথাযথ পুরুষ নয়? তারা এসব স্বল্প বসনা মেয়ে দেখেও কেনো তাদের আক্রমণ করার মতো যথেষ্ঠ উত্তেজনা অনুভব করে না? মজার কথা কি জানো, পূর্বের এই বীর পুরুষেরা, যারা সেখানে ছয় গজ কাপড় পরা মেয়ে দেখেও নিজের উত্তেজনা সামলাতে পারে না সেই তারাই পশ্চিমে এসে কোনো স্বলপ বসনা মেয়ের দিকে সোজাসুজি তাকানোর সাহস পর্যন্ত করে না, পুলিশ ডাকলে খবর হয়ে যাবে সেই ভয়ে। আমার অবাক লাগে, এই বীর পুরুষেরা নিজেদের পরিবার, বউ, বান্ধবী, প্রেমিকা, মেয়ে, বোন পাশে থাকার পরও সেখানে নিজেকে সামলাতে পারে না কিন্তু প্রবাসে কেউ পাশে না থাকা সত্বেও নিজেকে সামলে রাখতে পারে, জানো? এখানে তারা “মানসিক” ভাবে ব্যালান্সড থাকে, অদ্ভূত লাগে না? উলটো হওয়ার কথা ছিলো না? সামথিং ইজ ভেরি রঙ, ইজ’ন্ট ইট?

অনেকেই বলে, তুমি নাকি ঈমানের পরীক্ষা নাও, ভগবান দুঃসময় দিয়ে পরীক্ষা করে দেখে। সত্যিই তাই? একটানা এই পরীক্ষা তুমি তৃতীয় বিশ্বের দরিদ্র থুক্কু উন্নয়নশীল দেশের ওপরই নাও কেনো গো? এদের তোমার চোখে পড়ে না, হ্যাঁ, এদের কথাই বলছি, এদের, যেখানে তুমি গ্যাঁট হয়ে বসে ফায়ার প্লেসে আগুন পোহাচ্ছো। আর যদিও তৃতীয় বিশ্বকেই গিনিপিগ ধরলে, তাহলেও অবিরাম পরীক্ষা দিয়ে যাচ্ছো, পাহাড়ি মেয়ে গুলো’র, সংখ্যালঘু মেয়ে গুলো’র, দরিদ্র শিশু-কিশোরী কিংবা মাদ্রাসা’র ছাত্রদের। এ কেমন অসম পরীক্ষা? তাদের তো এমনিই কিছু নেই তাদের কি পরীক্ষা নাও তুমি প্রত্যেকদিন? হ্যাঁ প্রত্যেকদিন? পরীক্ষা নিতে হয়, তাহলে নাও মন্ত্রী’র মেয়ের, বিত্তবান ব্যবসায়ী’র মেয়ের, কিংবা সামরিক বা উচ্চপদস্থ সরকারি কর্মকর্তা’দের মেয়েদের। তাদের তো অনেক আছে, তাদের ধরো তো দেখি। নাকি তাদের মেয়ে’রা যথেষ্ঠ আকর্ষনীয় পোষাক পরে না? তাদের বেলায় ঈমানী জোশ কাজ করে না? সব ক্ষমতা বুঝি দরিদ্রের মুখের হাসি কেঁড়ে নেয়ার বেলায়?

অভিনেতা মোশাররফ করিম একটি টক শো পরিচালনা করতেন, সেখানে তিনি দৃঢ় কন্ঠে উচ্চারণ করেছিলেন, “সমস্যা পোষাকে নয়, সমস্যা মানসিকতায়”। আশ্চর্য হলেও সত্যি, সমস্ত মৌলবাদি জনগন এই কারণে ক্ষেপে গিয়ে তাকে আক্রমণ করে। এর চেয়ে অত্যাশ্চার্য ঘটনা হলো, তার একজন সহকর্মী’ও তার পাশে এসে দাঁড়ায় নি, তার পক্ষ হয়ে প্রতিবাদ করে নি। কিন্তু গাজি রাকায়েতের লুচ্চামি ধরা পড়ার পর তাকে সহায়তা দিতে প্রায় পুরো নাটক পাড়া তার পাশে দাঁড়িয়ে গেলো। তুমি বুঝতে পারো কোথায় নেমেছি আমরা? এই দেশে মাত্র চল্লিশ বছর আগেও সাংস্কৃতিক বিপ্লব ঘটেছে। শিল্পী’রা তাদের গানে, কবিতায়, নাটকে অন্যায়ের প্রতিবাদ করেছে। পাকিস্তানী শাসকদের ব্যাঙ্গ করেছে, মুক্তিযোদ্ধা’রা তাদের থেকে অনুপ্রেরণা পেয়েছে। এই দেশেই গান হয়েছিলো, “একটি ফুলকে বাঁচাবো বলে মোরা যুদ্ধ করি, একটি ফুলের হাসি’র জন্যে মোরা অস্ত্র ধরি”, “ও, আমার সাত কোটি ফুল দেখো গো মালি, শক্ত হাতেই বাইন্ধো মালি, লোহারও ডালি”। এই বিপ্লব যারা ঘটিয়েছিলেন তাদের অনেকেই আজও সুস্থ সবল বেঁচে বর্তে আছে কিন্তু টুঁ শব্দটিও করে নি।  

আগা থেকে গোঁড়া পর্যন্ত যখন কিছু পঁচে যায় তখন তার ধ্বংসই ভালো। “শেষ থেকে শুরু যে এবার” --- একটা প্রচন্ড সুনামি, ভূমিকম্প কিছু দিয়ে তুমি সব লন্ডভন্ড করে দিয়ে আবার একটি ভোর আনো, বিশুদ্ধ ভোর। পঁচে যাওয়া এই ভূখন্ড তাকিয়ে আছে আজ একটি বিশুদ্ধ শুরু’র দিকে। “ভোর হয় নি, আজ হলো না, কাল হবে কি না, তাও জানা নেই।” এক বছরের, তিন বছরের, পাঁচ বছরের শিশু গুলোকে তুমি নির্যাতন করে না মেরে, এমনিতেই ভূমিকম্পে মেরে ফেলো, তাদের পরিবারগুলো কোথাও তো স্বান্ত্বনা পাক। একটা তিন বছরের শিশু নির্যাতিতা হয়ে মারা গেলে তার বাবা-মা, ভাই-বোন কি কখনো আর স্বাভাবিক আচরণ করতে পারে, শিশুটি শুধু মারা যায় না, পুরো পরিবারটা জীবন্মৃত হয়ে যায়। শুধু নিঃশ্বাস নেবার নামই কি বেঁচে থাকা? ঠোঁট বাঁকা’র নামই হাসি?

 পাকিস্তানী’রা আর দেয় না হানা, নেই তো রাজাকার

তবু কেন এ দেশ জুড়ে, লাশের পাহাড়

জেনেছো দেশ তো স্বাধীন, আছে ওরা বেশ

দুঃখ কষ্টের আর নেই কোন রেশ

একদন্ড নিরাপত্তা নেই সেখানে, নেই সান্ত্বনা

শরৎবাবু এ চিঠি পাবে কি না জানি না আমি

এ চিঠি পাবে কি না জানি না আমি


  • ৩১২ বার পড়া হয়েছে

পূর্ববর্তী লেখা পরবর্তী লেখা

বিঃদ্রঃ নারী'তে প্রকাশিত প্রতিটি লেখার বিষয়বস্তু, ক্রিয়া-প্রতিক্রিয়া ও মন্তব্যসমুহ সম্পূর্ণ লেখকের নিজস্ব। প্রকাশিত সকল লেখার বিষয়বস্তু ও মতামত নারী'র সম্পাদকীয় নীতির সাথে সম্পুর্নভাবে মিলে যাবে এমন নয়। লেখকের কোনো লেখার বিষয়বস্তু বা বক্তব্যের যথার্থতার আইনগত বা অন্যকোনো দায় নারী কর্তৃপক্ষ বহন করতে বাধ্য নয়। নারীতে প্রকাশিত কোনো লেখা বিনা অনুমতিতে অন্য কোথাও প্রকাশ কপিরাইট আইনের লংঘন বলে গণ্য হবে।


মন্তব্য টি

লেখক পরিচিতি

তানবীরা তালুকদার

জন্ম ২৯শে আষাঢ়, ঢাকা। আপাতত নেদারল্যান্ডস প্রবাসিনী। কিন্তু দেশের সাথে নাড়ির যোগাযোগ কাটেনি। পেশায় একাউনটেন্ট। বাংলাদেশ ও নেদারল্যান্ডসের নানান সামাজিক ও সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ডে সক্রিয়ভাবে জড়িয়ে আছেন। অবসর সময়ে আবৃত্তি, নাচ ও নাটকের পাশাপাশি লেখালেখি করার চেষ্টা করেন। তাঁর লেখায় নিছক গল্প নেই; রয়েছে সত্যের ওপর দাঁড়ানো এবং জীবন দিয়ে উপলব্ধি করা অনুভূতির কথা। লিখছেন ছোটবেলা থেকেই। প্রকাশিত গল্পগ্রন্থ “পাহাড় আর নদীর গল্প” (২০১৩) এবং উপন্যাস “একদিন অহনার অভিবাসন” (২০১৪)। ২০১১ সালে ডয়েচে ভেল আয়োজিত “ববস” সেরা ব্লগ নির্বাচন প্রতিযোগিতায় তাঁর নিজস্ব ব্লগ http://ratjagapakhi.blogspot.nl/ মনোনয়ন পেয়েছিল। “ইয়েপ আর ইয়ান্নেকে” ডাচ ভাষা থেকে বাংলায় তাঁর প্রথম অনূদিত বই।

ফেসবুকে আমরা