নারী তুমি মানুষ হও

শনিবার, জানুয়ারী ৪, ২০২০ ৮:০২ PM | বিভাগ : সাম্প্রতিক


বাংলাদেশের নারী আন্দোলনের ইতিহাসে বেগম রোকেয়ার অবদান চিরস্মরণীয়। বেগম রোকেয়ার আদর্শ অনুপ্রাণিত করেছে রোকেয়ার সময়কার ও রোকেয়া পরবর্তী নারী সমাজকে। বেগম রোকেয়ার পরে সময় অনেক গড়িয়েছে। কিন্তু যখন এখনো  দেখি, শিক্ষিত ও অর্থনৈতিকভাবে স্বাধীন হয়েও অনেক নারী নিজের অধিকারটুকুও আদায় করতে পারছেন না, তখন খুবই কষ্ট হয়। নারীরা আজো মানুষ হয়ে বেড়ে উঠতে পারছে না।
 
একটি শিশু জন্ম নেওয়ার পর থেকে তার জগতকে সে চোখ দিয়ে দেখে, হাত দিয়ে অনুভব করে এবং মন দিয়ে শেখার চেষ্টা করে। কিন্তু আমাদের দেশের সামাজিক বিভিন্ন নিয়ম ,নীতি,প্রথা আস্তে আস্তে একটি শিশু মনকে তাদেরই মত করে গড়ে তুলতে বাধ্য করে। সামাজিক নিয়ম অনুযায়ী একটি ছেলে তৈরি হয় ভবিষ্যতের পৃথিবীতে সংঘর্ষ করে বেঁচে থাকতে আর মেয়েদের তৈরি হতে হয় সংসারের একঘেয়ে চার দেয়ালের ভিতরে গৃহস্থালি কাজের পুনরাবৃত্তি করে জীবন কাটিয়ে দিতে।
 
শিশু থেকে যখন একটি মেয়ে বালিকা হয়ে ওঠে, তখন বাইরের জগতটা তার জন্য হয়ে পড়ে আরো ছোট। বয়ঃসন্ধিকালে ঋতুস্রাবের পর থেকে একটি মেয়ের জীবন আরো বেশি জটিল হয়ে পড়ে। সেই প্রথম শারীরিকভাবে সে নারী হয়ে উঠতে থাকে। আস্তে আস্তে খেলাধুলোর মাঠ, দৌড় ঝাপ, তার জন্য নিষিদ্ধ হয়ে উঠতে থাকে। স্কুল ,কলেজ,বাসে, ট্রেনে, এমনকি নিজের ঘরে বাবা ভাইদের সামনে খুব সাবধানে নিজেকে কাপড় দিয়ে মুড়ে চলতে হবে তাকে এমন একটি নিয়ম বেঁধে দেয়া হয়। রাত বারোটার দিকেও যখন তার ভাই ঘরে ফিরে কিন্তু রাত হওয়ার সাথে সাথেই খামারের মুরগির মতো তাকে ঘরে ঢুকে বসে থাকতে হবে। সমাজের কাছে সে নিতান্তই একটি জড়বস্তু। তার নিজস্ব কোনো ইচ্ছে থাকতে নেই। টিভির পর্দায় বিজ্ঞাপন সংস্থায় বেশিরভাগ বিজ্ঞাপনেই থাকে শুধু নারীর সাজ উপকরণ দিয়ে। যেখানে বিজ্ঞাপনের কাহিনীর ধরনগুলোও প্রতিফলিত করে সমাজে নারীর সঠিক অবস্থানটি।
 
নারীর শিক্ষা-পদ্ধতিতেও রয়েছে ভিন্নতা। মাধ্যমিক লেভেলে তাকে দেয়া হয় গার্হস্থ্য অর্থনীতি নামক একটি বিষয় যেখানে সুন্দরভাবে বর্ণনা করা থাকে আদর্শ গৃহিণীর করণীয় বিষয়াবলী। একটি মেয়ের বাবা মায়ের সবচেয়ে বড়ো দুশ্চিন্তা তার মেয়ের বিয়ে নিয়ে! উচ্চ মাধ্যমিক লেভেল পাশ করার সাথে সাথেই শুরু হয়ে যায় পাত্র খোঁজা। যেখানে মেয়ে শুধুই একটি বোঝা সেখানে অনেকেই বিশেষ করে গ্রামে মেয়ের পরিবার বিয়ের বয়স ১৮ পর্যন্ত অপেক্ষা করতেও নারাজ! তাই আজো বাল্যবিবাহ সগৌরবে রমরমিয়ে চলছে বাংলাদেশে। বিয়ের বাজারে কড়া মূল্যে বিক্রি হয় সুন্দরী মেয়েরা। পাত্রীর ক্ষেত্রে সুন্দর হওয়া থাকে প্রথম শর্ত।
 
এছাড়া মেয়েকে হতে হবে নম্র, বড়দের সামনে যে চোখ নামিয়ে নিচু স্বরে কথা বলে। পুরুষতান্ত্রিক সমাজে যে বৃত্ত তৈরি করা, আবদ্ধ করে রাখতে নারীকে। নারী তা আজও ভাঙ্গতে পারেনি। কেনোনা নারী এখনও পূর্ণ শক্তিতে জ্বলে উঠতে পারেনি। আর কিছুটা পারলেও পুরুষদের মতে,নারীরা যতোটুকু পেয়েছে তার প্রায় সবই পুরুষের দেয়া। নারী নিজে কিছুই অর্জন করেনি। পুরুষেরা নিজেরাই নারীকে অবলা হয়ে থাকতে বাধ্য করে। তাকে সক্রিয় করে তোলার সকল পথ বন্ধ করে বলে প্রচার করে- নারী অক্রিয়।
 
তাই নারীকে জেগে উঠতে হবে।সমাজে প্রতিষ্ঠিত হতে হবে মানুষ হিসেবে। সমাজের যে পুরুষেরা ভুলে গেছে যে নারীও মানুষ। তাদের সেই কথা স্মরণ করিয়ে দিতে হবে। নারীত্বের শক্তি নিয়ে নিজেকেই নিজের জায়গা করে নিতে হবে।
 

  • ২২১ বার পড়া হয়েছে

পূর্ববর্তী লেখা পরবর্তী লেখা

বিঃদ্রঃ নারী'তে প্রকাশিত প্রতিটি লেখার বিষয়বস্তু, ক্রিয়া-প্রতিক্রিয়া ও মন্তব্যসমুহ সম্পূর্ণ লেখকের নিজস্ব। প্রকাশিত সকল লেখার বিষয়বস্তু ও মতামত নারী'র সম্পাদকীয় নীতির সাথে সম্পুর্নভাবে মিলে যাবে এমন নয়। লেখকের কোনো লেখার বিষয়বস্তু বা বক্তব্যের যথার্থতার আইনগত বা অন্যকোনো দায় নারী কর্তৃপক্ষ বহন করতে বাধ্য নয়। নারীতে প্রকাশিত কোনো লেখা বিনা অনুমতিতে অন্য কোথাও প্রকাশ কপিরাইট আইনের লংঘন বলে গণ্য হবে।


মন্তব্য টি

লেখক পরিচিতি

প্রেমা চক্রবর্তী

ছোটবেলা থেকেই সাহিত্যচর্চার ওপর আলাদা একটা টান আছে। লেখালেখি জীবনেরই অংশ। বিশ্ববিদ্যালয়ের পাট চুকিয়ে বর্তমানে একটি বেসরকারি প্রতিষ্ঠানে কর্মরত আছেন। দৈনিক আজাদী,দৈনিক পূর্বদেশ,বীর চট্টগ্রাম মঞ্চ, দৈনিক আলাপের মত বিভিন্ন দৈনিক পত্রিকায় বহুবার লেখা প্রকাশিত হয়েছে। তাছাড়া “ঝাড়বাতি” নামক একটি সংগঠনের সাথে জড়িত আছেন ।ঝাড়বাতি লিটল ম্যাগের বিভিন্ন সংখ্যাতে কবিতা প্রকাশিত হয়েছে।

ফেসবুকে আমরা