তিন ইঞ্চি নদীতে পড়ে সাড়ে তিন হাত নৌকা শেষ...

শনিবার, সেপ্টেম্বর ২৩, ২০১৭ ১০:০৯ PM | বিভাগ : সমাজ/গবেষণা


কাম, ক্রোধ, লোভ— এই ত্রিমুখি সংঘাতে মানুষের জীবন বিপর্যস্ত। বিশেষ ক’রে পুরুষের, এ কারণেই যে, যুগ যুগ ধরে পুরুষ নারীর ওপর নিয়ন্ত্রণ আরোপ করেছে পেশী দ্বারা, এড়িয়ে গেছে নারীর মনস্তত্ত্ব। জ্ঞানে যে লৈঙ্গিক বৈষম্য নেই, এই আপাত নিরীহ বাক্যটি বুঝতে মানুষের কতদিন লাগবে জানা নেই। যেমন জানা নেই শুধু লৈঙ্গিক কারণে নারীকে কতদিন নিগ্রহের শিকার হতে হবে। বাংলার বাউলেরা সেই লৈঙ্গিক বৈষম্য, জাতপাত ও নারীর ওপর আরোপিত কুসংস্কার ছুঁড়ে ফেলতে সবসময় সচেষ্ট ছিলেন। তাঁরা গানে-গানে তা প্রচার ক’রে গেছেন। মানুষের হৃদয়ে সুরের শর বিদ্ধ ক’রে জানিয়েছেন জীবনরহস্য। অনুসন্ধান ক’রে গেছেন মানুষের মুক্তির উপায়। আর উদগ্র কামনা যে মানুষের বিকাশের পথে অন্তরায়, তাও বলে গেছেন তারা। আত্মনিয়ন্ত্রণের এ শিক্ষাই আমরা পাই বাউলগানে।

 

বাউল গাইছেন :

‘দুটো মাংসপিণ্ড লণ্ডভণ্ড করিল এই সোনার দেশ, তিন ইঞ্চি নদীতে প’ড়ে সাড়ে তিন হাত নৌকা শেষ’...

বাউলগানে আমরা যে দেহতত্ত্বের কথা শুনি, তা প্রতীকী। মানবদেহ যেসব উপাদানে গঠিত, সেসব এই বিশ্বব্রহ্মাণ্ডের উপাদানই। বাউল যখন দেহের বর্ণনা করেন, তখন বিশ্বব্রহ্মাণ্ডেরই বর্ণনা করেন। আক্ষরিক অর্থে আমরা অনেক গানে পাই সঙ্গমবর্ণনা বা মিলনের সুর। বাউল যেহেতু মানুষের সম্মিলন চান, তাই ‘মিলন’ এক্ষেত্রে প্রাথমিক ভিত্তি। জীবের উৎপত্তির মৌলিক কারণ মিলন। মিলনহীনতাই সৃষ্টির বিনাশ। আর এই মিলনরূপকে ‘সম্মিলন’-এ রূপ দিয়ে তার বিকাশ সাধনই বাউলের সাধনা। তাতেই জীবের মুক্তির উপায়।

নারী ও পুরুষের লিঙ্গ— দুটোই মাংসপিণ্ড। কিন্তু এ মাংসপিণ্ডদ্বয় কেন ‘সোনার দেশ’ ‘লণ্ডভণ্ড’ করছে? লণ্ডভণ্ড করছে এ কারণে যে মানুষ লোভাতুর, আত্মনিয়ন্ত্রণহীন কামুক। আর পুরুষের মনুস্তত্ত্বে যেহেতু ‘পেশীজোর’, তাই এই আত্মনিয়ন্ত্রণহীনতার শিকার নারী। সর্বোপরি ‘সোনার দেশ’, এ পৃথিবী। ‘তিন ইঞ্চি নদী’ নারীযোনীর প্রতীক আর ‘সাড়ে তিন হাত’ মানুষ। এই যোনীলোভই সাড়ে তিন হাত মানুষকে লণ্ডভণ্ড করছে। বিশেষত পুরুষকে, যার উদগ্র কামনার শিকার নারী। আর এতেই পুরুষের ‘রসাতল’। বাউল তাই বলছেন, তিন ইঞ্চি নদীতে প’ড়ে সাড়ে তিন হাত নৌকা শেষ।

বাউল গাইছেন : ‘সেই নদীটির মাঝখানে ভাই তিনকোণা এক চর, কামিনী-বাঘিনী নাচে চরেরও ওপর’...

তিন ইঞ্চি এই সরু নদী বা যোনির ‘তিনকোণা চরে’ই মানুষের লোভাতুর দৃষ্টি। ‘কামিনী-বাঘিনী’ ওই চরের ওপর নাচছে। আর সেই লোভাতুর মুখে এসে পড়ছে মানুষ। বাঘিনীর থাবা উপেক্ষা ক’রে সেই ‘নাচে’ মাতোয়ারা পুরুষ। কিন্তু এই উদগ্র কামনা যে তার ধ্বংসের কারণ, সে বুঝতেই পারছে না বা চাইছে না। এই কাণ্ডজ্ঞানবিলুপ্তির আত্মধ্বংসী পথ থেকে বাউল তাই মুক্তি চাইছেন। বলছেন আত্মমুক্তির কথা।

এর পরই বাউল গাইছেন : ‘জীবের যাওয়া-আসা নদীর ভেতর— স্বর্গ-নরক, দুঃখ-ক্লেশ; তিন ইঞ্চি নদীতে প’ড়ে সাড়ে তিন হাত নৌকা শেষ’...

‘দুটো মাংসপিণ্ডের’ মিলনের ফলে ডিম্বাণুর যে শুক্রাণুপ্রত্যাশা, তা বাস্তবে পরিণত হয়। প্রাকৃতিকভাবেই শুক্রাণু গ্রহণের স্বাধীনতা যেহেতু ডিম্বাণুর, তাই নতুন জীবের আবির্ভাবে নারীর স্বাধীনতা প্রাকৃতিক। যোনিরূপ নদীর ভেতর ‘যাওয়া-আসা’র ফল জীব। পেশীর জোরে পুরুষ নারীকে বারবার ‘প্যাসিভ’ বানানোর অহম প্রকাশ করলেও নারী মূলত ‘অ্যাক্টিভ’। পুরুষ যেহেতু শারীরিক উপস্থাপনাকে গুরুত্ব দিয়েছে, তাই বেশিরভাগ ক্ষেত্রে মিলনকালে নারীর শয়নভঙ্গিকে ‘প্যাসিভ’ ভেবেছে, যদিও ওই শয়নভঙ্গির তৃপ্তিকর রচয়িতা পুরুষ। মিলনে উভয়ের শয়নভঙ্গিই প্রাকৃতিক, তৃপ্তিদায়ক। কিন্তু পুরুষ ওই প্রাকৃতিক বা জৈবিকভাবে নারীর ‘অ্যাক্টিভনেস’-কে মেনে নিতে পারেনি। তাই শয়নভঙ্গিতে দেখিয়েছে পেশী। আর তাই ‘স্বর্গ-নরক, দুঃখ-ক্লেশ’-এর উদ্ভব। এই স্বর্গ-নরক আকাশবাহিত নয়, পারলৌকিক দুঃস্বপ্ন নয়, তা এ জীবদেহে, এ পৃথিবীতেই। যে যোনিরূপ নদীর ভেতর থেকে জীবের আসা, সে নদীর উত্তাল ঢেউয়ে নিজেকে কাণ্ডজ্ঞানহীন সমর্পণ তাই আত্মধ্বংস, সাড়ে তিন হাত নৌকা শেষ।

বাউল আরও বলছেন : ‘সেই নদীটির চৌদিকে ভাই ভয়ংকর জঙ্গল; তারই মাঝে পাতা আছে বাঘমারা এক কল; যত লোভী-কামী যায় রসাতল, দেখে নদীর পরিবেশ’...

আগেই বলেছি, বাউলেরা দেহকেই প্রতীকরূপে উপস্থাপন করেছেন। যেহেতু ব্রহ্মাণ্ডের উপাদান আর দেহের উপাদান ভিন্ন নয়, পারলৌকিক ইশারা এখানে বাহুল্য, তাই দেহের ‘পরিবেশ’ বর্ণনার দ্বারা উপস্থাপন করা হয় ব্রহ্মাণ্ডের পরিবেশ, স্থূল অর্থে পৃথিবীর পরিবেশ। যোনির চারপাশে যে ‘জঙ্গল’ তা ‘পিউবিক হেয়ার’-এর রূপক। বৃহদার্থে এই পৃথিবী জঙ্গলময় ছিল। প্রাণীর অস্তিত্বের কারণেই ‘খাদ্য ও খাদকের’ প্রকাশ। সেখানে যৌনতা অবধারিত নতুন প্রাণের জন্যই। কিন্তু লোভী-কামী রসাতলে যায় সেই পথনির্দেশনাহীন জঙ্গলে। তার পথভ্রম হয়। তার আর মনে থাকে না সেখানে এক বাঘমারা ‘কল’ আছে। আত্মনিয়ন্ত্রণহীন হ’লে সেই ‘কলে’ তার বিনাশ। কাম-ক্রোধ-লোভ— এই ত্রিধ্বংসাত্মক মনস্তাত্ত্বিক উপাদান ‘কামিনী-বাঘিনী’র নাচে সাড়া দিতে প্রলুব্ধ করছে, কিন্তু নিয়ন্ত্রণহীনতাই মানুষের ‘রসাতল’-এ যাওয়ার মোক্ষম অস্ত্র। বাউল এই নিয়ন্ত্রণহীনতার ‍মুক্তি চাইছেন।

বাউল আরও গাইছেন : ‘কেউ জানে না সেই নদীটি গভীর যে কত; ব্রহ্মা-বিষ্ণু-মহেশ্বর তার জানে না তত; ডুবাইতে স্বর্গ-মর্ত্য লাগে নদীর এক নিমেষ’...

বাউলগানে ব্রহ্মা-বিষ্ণু-মহেশ্বর সনাতন ধর্মের দেবতাপূজার নির্ণায়ক নয়। এখানে ব্রহ্মা-বিষ্ণু-মহেশ্বর মানেই সৃষ্টি-স্থিতি-প্রলয়। সনাতন ধর্মেও এই দেবতাগণকে সৃষ্টি-স্থিতি-প্রলয়ের অধিকর্তা বলা হয়েছে। আর তা রূপক অর্থেই। বাউল সেই রূপককে ব্যবহার করেন কথায়। যোনিরূপ নদীর গভীরতা যে কত তা সৃষ্টি-স্থিতি-প্রলয়ের অধিকর্তাও জানেন না— এই শ্লেষ বা সত্যবাক্য বাউল জানাচ্ছেন আমাদের। জীব নিজেই তার অধিকর্তা। কোনো পারলৌকিক ইশারা নেই। প্রাকৃতিক নির্বাচনেই তার উদ্ভব-বিনাশ। মানুষের কল্পনার যে ‘স্বর্গ-মর্ত্য’ বা ভোগের দুরাচার, তা এক নিমিষে শেষ করতে পারে যোনিরূপ নদী। অসীম ব্রহ্মাণ্ডকে জানতে তাই কাম-ক্রোধ-লোভ ত্যাগ করা চাই। জীবের প্রতি প্রেমময় হওয়া চাই।

বাউল শেষে বলছেন : ‘সেই নদীতে মাসে মাসে আসে রে ভাই বান; রসিক যারা চিনে ধারা করিতেছে স্নান; গুরু অসীম না জানিয়া সন্ধান ধরলো ভবার ভাবাবেশ; তিন ইঞ্চি নদীতে প’ড়ে সাড়ে তিন হাত নৌকা শেষ’...

যোনিরূপ নদীতে মাসে মাসে বান আসার অর্থ পিরিয়ড বা ঋতুস্রাব। আটাশ দিন অন্তর ডিম্বাণুর পরিপক্কতা আর শুক্রাণুপ্রত্যাশা। ডিম্বের শুক্রনির্বাচন আর প্রাণের উদ্ভব। কিন্তু শুক্রাণুপ্রত্যাশার বিপত্তি হ’লে ডিম্বাণুবিভক্তি ও রক্তঝিল্লির যে ক্ষরণ হয়, তাই-ই ঋতুস্রাব। প্রেমপর্বের প্রথম যে বিচ্ছেদ ও তার ক্ষরণ, তা বাউলমন অনুধাবন করেন। ঋতুস্রাব নিয়ে ধর্মীয় ও সামাজিক যে কুসংস্কার তাতে বাউলমনে বেদনার জন্ম দেয়। তাই বাউল বলছেন, ‘রসিক যারা চিনে ধারা করিতেছে স্নান’। যদিও বাউলদের এক অংশ আক্ষরিক অর্থেই তা মেনে নিয়েছেন। বাউল জীবনচরিত নিয়ে গবেষকরা যা লিখেছেন; তাতে পাওয়া যায়, বালিকা থেকে সাবালিকা হওয়ার প্রাক্কালে অর্থাৎ প্রথম ঋতুরক্ত পান করেন অনেকে। সামাজিক কারণেই নারীর প্রথম ঋতুরক্ত পাওয়া দুর্লভ। তাই কোনো কোনো বাউল এর জন্য হাহাকার করেন। বাউলের ভাষায় ‘রজঃপান’ তার হয় না। আমরা গূঢ় অর্থে যা দেখতে পাই, তা হল ঋতুস্রাব নিয়ে ধর্মীয় ও সামাজিক যে কুসংস্কার, তা থেকে মুক্তির কথা বলছেন বাউল। বলছেন রসিক হতে আর সেই মাসিক রসে স্নান করতে। মানুষ যে আক্ষরিক অর্থকেই ধরে নেয়, আর গূঢ় অর্থকে অবজ্ঞা করে, তাও বলে গেছেন বাউল। বলছেন : ‘গুরু অসীম না জানিয়া সন্ধান ধরলো ভবার ভাবাবেশ’। আর তাই মানুষ যতদিন সন্ধানরত থাকবে না, ততদিন ‘তিন ইঞ্চি নদীতে প’ড়ে সাড়ে তিন হাত নৌকা’ অর্থাৎ মানুষের ধ্বংস অনিবার্য।

যৌনতা প্রাণীর স্বাভাবিক প্রবৃত্তি। কিন্তু কাম-ক্রোধ-লোভ মানুষকে অস্তিত্বসংকটে ফেলছে। নারী হচ্ছে সেই লোভের শিকার। অথচ প্রকৃতিতে লিঙ্গবৈষম্য নেই। নারী নিপীড়নের এ দুঃসহ সময়ে আমরা বাউলের তত্ত্বকথার রস আস্বাদন করতে পারি। আমরা বারবার শুনতে পারি বাউল অসীম সরকার রচিত এ গান :

দুটো মাংসপিণ্ড লণ্ডভণ্ড করিল এই সোনার দেশ

তিন ইঞ্চি নদীতে প’ড়ে সাড়ে তিন হাত নৌকা শেষ

দুটো মাংসপিণ্ড লণ্ডভণ্ড করিল এই সোনার দেশ

তিন ইঞ্চি নদীতে প’ড়ে সাড়ে তিন হাত নৌকা শেষ

 

সেই নদীটির মাঝখানে ভাই তিনকোণা এক চর

কামিনী-বাঘিনী নাচে চরেরও ওপর

জীবের যাওয়া-আসা নদীর ভিতর স্বর্গ-নরক দুঃখ-ক্লেশ

তিন ইঞ্চি নদীতে প’ড়ে সাড়ে তিন হাত নৌকা শেষ

 

সেই নদীটির চৌদিকে ভাই ভয়ংকর জঙ্গল

তারই মাঝে পাতা আছে বাঘমারা এক কল

যত লোভী-কামী যায় রসাতল দেখে নদীর পরিবেশ

তিন ইঞ্চি নদীতে প’ড়ে সাড়ে তিন হাত নৌকা শেষ

 

কেউ জানে না সেই নদীটি গভীর যে কত

ব্রহ্মা-বিষ্ণু-মহেশ্বর তার জানে না তত

ডুবাইতে স্বর্গ-মর্ত্য লাগে নদীর এক নিমেষ

তিন ইঞ্চি নদীতে প’ড়ে সাড়ে তিন হাত নৌকা শেষ

 

সেই নদীতে আসে রে ভাই মাসে মাসে বান

রসিক যারা চিনে ধারা করিতেছে স্নান

গুরু অসীম না জানিয়া সন্ধান ধরলো ভবার ভাবাবেশ

তিন ইঞ্চি নদীতে পড়ে সাড়ে তিন হাত নৌকা শেষ

 

দুটো মাংসপিণ্ড লণ্ডভণ্ড করিল এই সোনার দেশ

তিন ইঞ্চি নদীতে প’ড়ে সাড়ে তিন হাত নৌকা শেষ


  • ১৩৩০০ বার পড়া হয়েছে

পূর্ববর্তী লেখা পরবর্তী লেখা

বিঃদ্রঃ নারী'তে প্রকাশিত প্রতিটি লেখার বিষয়বস্তু, ক্রিয়া-প্রতিক্রিয়া ও মন্তব্যসমুহ সম্পূর্ণ লেখকের নিজস্ব। প্রকাশিত সকল লেখার বিষয়বস্তু ও মতামত নারী'র সম্পাদকীয় নীতির সাথে সম্পুর্নভাবে মিলে যাবে এমন নয়। লেখকের কোনো লেখার বিষয়বস্তু বা বক্তব্যের যথার্থতার আইনগত বা অন্যকোনো দায় নারী কর্তৃপক্ষ বহন করতে বাধ্য নয়। নারীতে প্রকাশিত কোনো লেখা বিনা অনুমতিতে অন্য কোথাও প্রকাশ কপিরাইট আইনের লংঘন বলে গণ্য হবে।


মন্তব্য টি

লেখক পরিচিতি

প্রান্ত পলাশ

জন্ম ৬ সেপ্টেম্বর ১৯৮৪, চুয়াডাঙ্গা জেলার সীমান্তশহর দর্শনায়। পৈতৃক ভিটা চট্টগ্রামের বোয়ালখালি জেলার উত্তরভূর্ষি গ্রামে। হিশাববিজ্ঞানে স্নাতকোত্তর। পেশায় সাংবাদিক। প্রকাশিত কবিতার বই : ‘সাধুখালির রাত’ (ঐতিহ্য-২০১২), ‘জরায়ুর কান্না’ (ঐতিহ্য-২০১৫) ও ‘আমার কীরাম জানি লাগে’ (চৈতন্য-২০১৭)।

ফেসবুকে আমরা