সুষুপ্ত পাঠক

বাংলা অন্তর্জালে পরিচিত "সুষুপ্ত পাঠক" একজন সমাজ সচেতন অনলাইন একটিভিস্ট ও ব্লগার।

পরকীয়া একই সঙ্গে দুটি পরিবারকে ধ্বংস করে

বিয়ে ব্যাপারটা যে কেবল ধর্মীয় বিষয় তেমন নয়। ধর্মীয় বিয়ের সামাজিক কোনো গ্রহণযোগ্যতা না থাকায় রাষ্ট্র পরবর্তীকালে রেজিস্ট্রি করে কাগজপত্রে আইনগতভাবে স্বামী-স্ত্রীর স্বীকৃতি দিয়েছে। হিন্দু, মুসলিম, ইহুদী, খ্রিস্টান ইত্যাদি ধর্মীয় বিয়ে অস্বীকার করলে প্রমাণ করার কোনো উপায় নেই।

বাংলাদেশে এখনো দরিদ্র শ্রেণিতে মোল্লা ডেকে ধর্মীয় রীতিতে বিয়ে পড়ানো হয়। ঢাকা শহরের বস্তিতে নারীদের একটা বড় অংশ স্বামী পরিত্যাক্ত। রিকশাচালক এই স্বামীরা পেটে বাচ্চা দিয়েই কেটে পড়ে। এত্তবড় ঢাকা শহরে গা ঢাকা দেয়া খুব সহজ। বিয়ের যেহেতু কোনো কাগজ নেই তাই এইসব প্রতারিত নারীরা কোনো সুবিচার পায় না। এরকম যাতে না করতে পারে তাই রাষ্ট্রীয় বিয়ের বিধান করা হয়েছে।

এই সামাজিক বিয়েও একটা গলার ফাঁস হয়ে আছে। চাইলেই বিয়ে ভেঙ্গে দিতে গেলে পুরুষদের অর্থ খরচ করতে হবে। বাংলাদেশী একজন নারী আদালতে নানা রকম দাবি তুলে অর্থ আদায় করতে পারবে। এটি নারী হিসেবে তাদের জন্য খুব সন্মানের কিছু নয়। কিন্তু যে দেশের নারীরা এখনো পুরুষের সম্পত্তি, যাদেরকে আমরা অর্ধমানুষ করে রেখেছি- তাদের ভবিষ্যত খাওয়া পরার একটা নিশ্চিয়তা দিতে গিয়েই রাষ্ট্র বিয়েকে এইরকম সুরক্ষা দিয়ে টিকিয়ে রাখার চেষ্টা করেছে।

ধরা যাক -যে সমাজে নারী পুরুষের মুখাপেক্ষ নয়। সে নিজেই পুরুষের মতো সমান ক্ষমতা রাখে। সেরকম সমাজে বিয়ে ভাঙ্গতে যদি কোনো সমস্যা না থাকে তাহলে রাতে শুয়ে সকালে সম্পর্ক ভাঙ্গা তো কোনো ব্যাপারই না। আইন মানুষের এই ইচ্ছা শক্তিকে সুরক্ষা দিতেই সব রকম বাধন থেকে তাদের মুক্তি দিবে।

কিন্তু এর বাইরে আমাদের যে পরিবার ও সমাজ আছে এবার সে কথায় আসি। এই যে বিয়ে- এটি এখনো টিকে রয়েছে একটা কারণেই, তা হচ্ছে সমাজের শান্তি শৃঙ্খলার জন্য। না হলে লাঠালাঠি লেগে যেতো। কোনো রকম ধর্মীয় নিয়মকানুন ছাড়াই বিয়ে করা যায়। স্বামী স্ত্রীর এই রাষ্ট্রীয় সার্টিফিকেট নেয়া হয় আইনত সুবিধাগুলো নিশ্চিত করতে। সম্পত্তির উত্তরাধিকার নিশ্চিত করতে। আপনি হঠাৎ মারা গেলে আপনার লাশটি কি আপনার বান্ধবীকে হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ বুঝিয়ে দিবে? দিবে আপনার বিবাহিত স্ত্রীকে। একইভাবে সন্তানের জন্যও এখনো বিয়ে টিকে আছে। সত্যি বলতে সুখী পরিবার একটা কৃত্রিম ধারণা। মানুষ মননে জিনগতভাবে বহুগামী মানুষিকতার। কিন্তু আমাদের এই আদিম প্রবণতাকে আমরা নীতি নৈতিকতা তৈরি করে চাপা দিয়ে রাখি কারণ পরিবার সন্তানের মুখের দিকে চেয়ে। তাছাড়া সমাজে শৃঙ্খলা রক্ষা করতে গিয়েও এটা করতে হবে।

পরকীয়া একই সঙ্গে দুটি পরিবারকে ধ্বংস করে। অথচ প্রকৃতি আমাদের বহুগামী করে সৃষ্টি করেছে। কারণ প্রকৃতির প্রয়োজন বিপুল পরিমাণে বশংধর। প্রকৃতি মানুষের সমাজ শান্তি সুখ শৃঙ্খলা বুঝে না। এসব সে তৈরি করে নি। সে শুধু বংশ বিস্তারের জন্য প্রেমের ফাঁদ পেতে রেখেছে। পরিবার ভেঙ্গে গেলে তার কিছু যায় আসে না। ব্রোকেন ফ্যামিলির অসুখী শিশুর কথা তো প্রকৃতি জানে না। তার চোখ নেই, বিবেক নেই, সে ঈশ্বরও নয়, মানুষও নয়, প্রকৃতি হচ্ছে জগতের উর্বরতার সজীব স্তর যা জীব জগতকে কেবল বংশ বিস্তার করে টিকিয়ে রাখতে কাজ করে চলে। মানুষ তার দেহ নিয়ে তাই সমাজের সঙ্গে লড়ে। ধর্মের সঙ্গে লড়ে। বিবেকের সঙ্গে লড়ে।

তাই নারী পুরুষ নিজের ভেতর বহুগামীতাকে মাটি চাপা দিয়ে এক ছাদের নিচে জীবন কাটিয়ে দিতে চায়। এর বাইরেও সম্পর্ক টিকিয়ে রাখা না রাখায় বহু যৌক্তিক কারণ থাকে। থাকতে পারে আমাদের জীবনের বহু ঘটনা প্রবাহ। কোনো মানবিক সমাজই তাই মানুষকে হাত পা বেধে রাখতে পারে না নির্দিষ্ট কোনো সম্পর্কে আবদ্ধ রাখতে। বিষেশত নারীদের আমরা আইন করে নিজেদের সম্পত্তি করে রেখেছি। ভারতীয় আদালত নারীকে পুরুষের সম্পত্তি হওয়া থেকে কেবল মুক্তি দিয়েছে। সংসার ভাঙ্গতে বলে নি। বলে নি সঙ্গীর সঙ্গে প্রতারণা করাটা নৈতিক অধিকার- নারী পুরুষ কাউকেই বলে নি…।

1320 times read

নারী'তে প্রকাশিত প্রতিটি লেখার বিষয়বস্তু, ক্রিয়া-প্রতিক্রিয়া ও মন্তব্যসমুহ সম্পূর্ণ লেখকের নিজস্ব। প্রকাশিত সকল লেখার বিষয়বস্তু ও মতামত নারী'র সম্পাদকীয় নীতির সাথে সম্পুর্নভাবে মিলে যাবে এমন নয়। লেখকের কোনো লেখার বিষয়বস্তু বা বক্তব্যের যথার্থতার আইনগত বা অন্যকোনো দায় নারী কর্তৃপক্ষ বহন করতে বাধ্য নয়। নারীতে প্রকাশিত কোনো লেখা বিনা অনুমতিতে অন্য কোথাও প্রকাশ কপিরাইট আইনের লংঘন বলে গণ্য হবে।