শামীম আরা নীপা

এক্টিভিস্ট

পরকীয়া: একটি বিধ্বংসী ভাইরাস

পরকীয়া মানুষ কেন করে- এই প্রশ্নের আসলে কি কোন উত্তর আছে? মানুষ এই প্রশ্নের উত্তর খুঁজে চলে কিন্তু আমার মনে হয়না মানুষ তার আকাঙ্ক্ষিত কোন উত্তর খুঁজে পায়। পরকীয়া শব্দটি তখনই আসে যখন তার আগে বিয়ে নামক এক সামাজিক বন্ধনের ব্যপার থাকে। বিয়েটা আসলে কি? প্রেম করে বিয়ে হোক কিংবা বাবা মা'র পছন্দে বিয়ে হোক, বিয়ে বিষয়টা একটা পারস্পরিক প্রতিশ্রুতির বিষয়, পারস্পরিক দায়িত্ববোধের বিষয়। দুইজন মানুষ পরস্পরকে বিয়ে করে, এখানে মানুষ কথাটা খুব গুরুত্বপূর্ণ। মানুষ মাত্রই সহজাতভাবে কিছু বৈশিষ্ট্য পাওয়ার সাথে সাথে তাকে কিছু গুণ অর্জন করতে হয়। সেই গুণের ভেতর সততা, বিশ্বস্ততা, মমতা, মহানুভবতা, উদারতা, প্রেম, ভালোবাসা, সম্মান বিষয়গুলো থাকে। পরকীয়ায় জড়াতে গেলে এইসবগুলো মানবিক গুণগুলোকে লঙ্ঘন করতে হয়। সবাই এই মানবিক গুণগুলোকে অতিক্রম করতে পারে না আবার অনেকেই পারে আর পারে জন্যই পরকীয়ার মতো ঘটনা ঘটে।

পরকীয়া হলো বিবাহিত নারী বা পুরুষ কোনো ব্যক্তির স্বামী বা স্ত্রী ছাড়া অন্য কোনো ব্যক্তির সাথে বিবাহোত্তর বা বিবাহবহির্ভূত প্রেম, যৌন সম্পর্ক ও যৌন কর্মকান্ড। মানবসমাজে এটি লঘু বা গুরুভাবে নেতিবাচক হিসেবে গণ্য।

কোনো ব্যাক্তি যখন পরকীয়ায় জড়ায় তখন তার সঙ্গী ক্ষতিগ্রস্ত হয় খুব বাজেভাবে। মানুষের সবচেয়ে কষ্টের এবং অপমানের অনুভূতি হলো নিজেকে যখন সে প্রবঞ্চিত হিসেবে দেখতে পায়। পরকীয়ার ফলে ভূক্তভোগী ব্যক্তি নিজেকে সবচেয়ে তুচ্ছ ও প্রবঞ্চিত অবস্থায় নিজেকে খুঁজে পায় এবং ফলস্বরুপ তার আত্মসম্মান ও আত্মবিশ্বাস দু‘টোই সমানভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়। মানসিক চাপের কোনো সীমা থাকে না। মানুষ হিসেবে ভুক্তভোগী ব্যক্তি ভেঙেচুড়ে যায়। সম্পর্কে দু’জনের মধ্যে একজন পরকীয়ায় জড়িয়ে পড়লে অন্যজন ক্রমশ কোণঠাসা হতে থাকেন। মানসিক অবসাদ, দুশ্চিন্তা, হতাশা, একাকিত্ব ক্রমশ তাকে গ্রাস করতে থাকে। শুধু দুইজন ব্যক্তি নিয়ে তো আর সংসার না, একটা সংসারে কত মানুষ থাকে, সেই সকল মানুষ একটা পরকীয়ার জন্য মানসিকভাবে, পারিবারিকভাবে, সামাজিকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়। মনোচিকিৎসায় একথা স্বীকৃত যে, পিতামাতার পরকীয়া সন্তানের মানসিক স্বাস্থ্যের উপর এবং সামাজিক সম্পর্ক ও যোগাযোগে বিরূপ প্রভাব ফেলে এবং অধিকাংশ ক্ষেত্রেই তা সন্তানের মানসিক বিষন্নতার ও আগ্রাসী মনোভাবের জন্ম দেয়। এছাড়া সন্তানের পারিবারিক ও দাম্পত্য সম্পর্কের অবনতিতে পিতামাতার পরকীয়া প্রভাব রাখে। দাম্পত্য জীবনে পরকীয়া সবচেয়ে জটিল সম্পর্কের একটি। পরকীয়া নামের অসামাজিক বিবাহ বহির্ভূত অনৈতিক সম্পর্কের অশুভ থাবায় বিপর্যয়ের মুখে পতিত হয় সংসার ও পরিবার প্রথা। অনেকেই সমাজ, লোকচক্ষু ও সন্তানের ভবিষ্যত চিন্তা করে নিরবে সহ্য করে যাচ্ছে স্বামী/ স্ত্রীর এই নিষিদ্ধ প্রণয়লীলা। আবার অনেকেই পরকীয়ার নরক যন্ত্রণা সহ্য করতে না পেরে ঘটাচ্ছেন বিবাহ বিচ্ছেদ আর কেউবা আবার বেছে নিচ্ছে অত্মহননের মতো অভিশপ্ত পথ।

পরকীয়ায় জড়িয়ে গেলে তা কোনো না কোনভাবে প্রকাশ পেয়েই যায় সঙ্গীর কাছে। দুটো মানুষ যখন কাছাকাছি থাকে, এবং যখন কিছু পজিটিভ বা নেগেটিভ পরিবর্তন আসে সম্পর্কে তখন সঙ্গীকে একটু নিরিখ করেই বুঝা যায় পরকীয়ার মতো ঘটনাগুলো ঘটছে। পরকীয়ার লক্ষণ নিয়ে আলাদা করে কিছু বলার নেই আসলে কারণ তথাকথিত প্রতিটা লক্ষণেরই পক্ষে বিপক্ষে যুক্তি আছে। সঙ্গীর মন জেনে যায় তার সঙ্গীটি কখন কোথায় অন্যায় কিংবা অনৈতিক কাজ করে চলেছে।

প্রেম সুন্দর এক বিষয়, অমায়িক। প্রেম নিয়ে স্তুতির শেষ নাই। জীবনে বেঁচে থাকার জন্য প্রেম অপরিহার্য তা মানুষের সাথেই হোক কিংবা প্রকৃতির সাথে কিংবা সৃষ্টির সাথে। পরকীয়ায় দুইজন মানুষের প্রেমই হয় কিন্তু কাউকে ক্ষতিগ্রস্ত করে, কারো সাথে অনৈতিক হয়ে যেই প্রেম তাকে কি সুন্দর বলা যায়? সেই প্রেম কি সুস্থ ও সুন্দর হয় কখনো? যেই প্রেম একটা সংসার ভেঙে দিচ্ছে, যেই প্রেম সন্তানকে ক্ষতিগ্রস্ত করছে, যেই প্রেম পরিবারে অশান্তির ঝড় বইয়ে দিচ্ছে সেই প্রেম কি করে সুস্থ ও সুন্দর হয়? পরকীয়া কোনো সম্পর্কের জন্যই সুস্থতা কিংবা সৌন্দর্যকে প্রস্ফুটিত করে না।

আমাদের দেশে পরকীয়ার মতো আপত্তিজনক একটা বিষয়কে মেনে নিয়েই অনেক সংসার চলছে। পুরুষের চেয়ে নারীরাই বেশী মেনে নিতে বাধ্য হচ্ছে পুরুষ সঙ্গীর পরকীয়া সম্পর্ক। তার কারণ হিসেবে বেশীরভাগ ক্ষেত্রেই দেখা যায় পারিবারিক নিরাপত্তা রক্ষা, সামাজিক নিরাপত্তা রক্ষা, অর্থনৈতিক নিরাপত্তা রক্ষা, সর্বোপরি সন্তানের ভবিষ্যৎ চিন্তা। আবার অনেক সঙ্গী মনে করেন যে একদিন তার সঙ্গীটি নিজের ভুল বুঝে ফিরে আসবে পরকীয়া থেকে এবং ঐদিনের অপেক্ষায় কেটে যায় একটা আস্ত জীবন। আবার অনেক সঙ্গী বুঝেও বুঝতে চান না, জেনেও জানতে চান না। তারা এক বায়বীয় ভাবসম্পর্কের ভেতর নিজেদের আত্মপ্রবঞ্চিত করে বেঁচে থেকে কষ্ট ও অপমানকে এড়াতে চান এবং এরাও অবচেতনে সেই দিনের অপেক্ষাতেই থাকে যেদিন তার সঙ্গী পরকীয়া ভেঙে তার কাছে ফিরে আসবে। এটা তাদের তৈরি ফ্যান্টাসিময় এক জীবন। সমস্যার মুখোমুখি হতে ভয় পান এই জাতীয় মানুষ। এই সয়ে যাওয়া মানুষগুলোর ভাগ্য কখনো মুখ তুলে চায় আবার কারো কারো ভাগ্য কখনো আলোর মুখই দেখে না, জীবন শেষ হয়ে যায় অপেক্ষাতেই।

একজন পুরুষ কিংবা নারী যখন বিবাহিত কোনো নারী কিংবা পুরুষের সাথে পরকীয়ায় সম্পৃক্ত হয় তখন তারা বিবাহিত ব্যক্তিটির জীবনসঙ্গীর কথা একবারও ভেবে দেখে না। পরকীয়ায় লিপ্ত দুইজনের মূল্যবোধ, বিবেকবোধ একবারও তাদেরকে বাঁধা দেয় না জন্যই তারা অপরকে ধোঁকা দিয়ে, অপরের সাথে ভণ্ডামি করে নিজেদের প্রেমকে মহান করে তোলার চেষ্টা করে।

আমাদের সমাজের বিবাহিত ব্যক্তি যারা পরকীয়ায় লিপ্ত হয় তারা পারেও বটে। পরকীয়া করবে এবং পরকীয়া যার সাথে করবে তাকে নিজের সঙ্গী সম্পর্কে হাজার মিথ্যা কথা বলবে, সঙ্গী কত খারাপ এবং কত কষ্টে রেখেছে সেইসব গান গাবে। এসব গান শুনে পরকীয়ার অপর সঙ্গী একেবারে মায়া মমতায় বিগলিত হয়ে যাবে। তারপর শুরু হবে প্রেম, এই প্রেমেও যে কত ধোঁকা থাকে! সবাই যে না জেনেই পরকীয়া করে, এমন না বরং জেনে বুঝেও পরকীয়া করে লোকে। পরকীয়ায় তো কোনো দায়িত্ব নিতে হয় না, শুধু মজাই মজা। ঘুরো ফিরো, খাও দাও, প্রেম করো, সেক্স করো, ফুরফুরা মেজাজে বাড়ী যাও - ব্যাস বিন্দাস জীবন। দায়িত্ব নিতে গেলেই যত ক্যাচাল শুরু হয়ে যায়, সঙ্গী বদল হয়ে যায়, গল্পগুলো বদলাতে থাকে। ঘর সংসার তার জায়গায় যেমন সুন্দর চলছে চলুক, সেইখানে হানা দেয়া যাবে না বরং বাহিরেই চলুক মজার দুর্দান্ত প্রেম পরকীয়া। সুমনের একটা গান আছে - এসব কিন্তু ছুটিতেই হতে পারে, বলেছিলে তুমি চিলকা লেকের ধারে...

একেক জনের পরকীয়া একেক রকম। কারো সঙ্গী জানে তো কারো সঙ্গী কিছুই জানে না। কারো সঙ্গী পরকীয়া নিয়ে নিরন্তর নির্যাতনের শিকার তো কারো সঙ্গী নিত্য উপহারে ভেসে যাচ্ছে। সব সঙ্গী ছুটতে পারে না, আবার কেউ কেউ সাথেও থাকতে পারে না। সন্তানগুলোর কি হয় জানেন? সন্তানরা যখন তাদের মা বাবার এসব অনৈতিক সম্পর্কগুলো সম্পর্কে জানে তখন মন থেকে একেবারে ভেঙে যায়। প্রতিটা সন্তান চায় তাদের বাবা মা একসাথে সুখে থাকবে, বিশ্বস্ত থাকবে, সম্মানের সাথে পরিবার নিয়ে বেঁচে থাকবে। বাবা মা'র এই পরকীয়ার কারণে সন্তান ছোট হয়ে যায় নিজের কাছেই। তার কষ্ট হয়, রাগ জেদ ক্ষোভ হয়। কখনো কখনো সন্তান আত্মহত্যা করতে চায় কিংবা করে লজ্জা ঘৃণা অপমানে।

কথিত আছে, মেয়েরা মূলত পুরুষের বুদ্ধিবৃত্তিক আচরণ, আবেগের প্রকাশ ও অর্থ সম্পদের প্রতি আকৃষ্ট হয়ে এবং শারীরিক চাহিদা থেকে পরকীয়ায় জড়ায় এবং অন্যদিকে পুরুষরা সাধারণত বহুগামী মানসিকতা থেকে পরকীয়ায় জড়িয়ে থাকে। পরকীয়ার পেছনে বহুবিধ কারণকে চিহ্নিত করা হয়- অল্প বয়সে বিয়ে, শারীরিক সমস্যা, বিয়ের ক্ষেত্রে ভুল মানুষকে নির্বাচন করা, ক্যারিয়ার আডভান্সমেন্ট, পারিবারিক ও দাম্পত্য সম্পর্কের অবনতি, বৈবাহিক জীবনে অসুখী, অবজ্ঞা, গৃহস্থলীর কাজে স্বামীর অসহযোগিতা, স্বামী স্ত্রীর ভুল বোঝাবুঝি, বয়সের পার্থক্য, রুচিবোধের ব্যবধান, তিক্ত সম্পর্ক, অশান্তি, বিয়ের অল্পদিনের ভেতরই সন্তানের মা বাবা হয়ে যাওয়া। কিনতু মনে হয় না পরকীয়ার পেছনে সেগুলি প্রকৃত কারণ কেননা এইসব কারণগুলি মেনে নিয়েও অনেক স্বামী স্ত্রী আজীবন সংসার করে যান, পরকীয়ায় জড়িয়ে পড়েন না । আবার এইসব কারণগুলি যেখানে পুরোপুরিই অনুপস্থিত, সেখানেও স্বামী বা স্ত্রী অথবা দুজনেই পরকীয়ায় আসক্ত হয়ে পড়েন । সুতরাং বহুলোচিত কারণগুলি ধোপেই টিকে না।

ভারত কিংবা বাংলাদেশে মানুষেরা পরকীয়াকে ব্যাভিচার বলছে। শুধু ভারত বা বাংলাদেশ নয়, বিশ্বের সকল স্থানেই পরকীয়া একটি নেতিবাচক অনৈতিক সম্পর্ক এবং অপ্রত্যাশিত বিষয়। ব্যাভিচার শব্দটা খুব গুরুত্বপূর্ণ। ব্যাভিচার খুবই নেতিবাচক শব্দ যার দ্বারা যাবতীয় নিষিদ্ধ যৌনাচারকে চিহ্নিত করা হয়। সকল ধর্ম নির্বিশেষে পরকীয়াকে এই বিশ্বের মানুষ ইতিবাচকভাবে দেখছে না বরং নেতিবাচক ও অনৈতিক হিসেবেই দেখছে। প্রেমকে যতই মহীয়ান করা হোক না কেনো পরকীয়াকে এই জগতের বিচারে মহীয়ান করার কোনো সুযোগ নাই। অন্যায় কে আপনি ন্যায় বলতে পারেন না এবং অনৈতিক কর্মকান্ডকে ন্যায্যতার মুখোসও পরানো যায় না। পরকীয়া সম্পর্ক নতুন কোনো বিষয় নয়! বর্তমান বিশ্বের পাশাপাশি আমাদের দেশেও এখন এর প্রবণতা ব্যাপক হারে বৃদ্ধি পেয়েছে। মোবাইল ফোন, ফেসবুক, হোয়াটসঅ্যাপ, ইনস্টাগ্রাম, ভাইবারসহ নানা অ্যাপ্লিকেশন ও প্রযুক্তি মানুষের হাতের মুঠোয়, তাই আজকাল পরকীয়া সম্পর্ক গড়ে তোলা অনেক সহজ। কিন্তু যদি আপনি পরকীয়ায় জড়িত হয়ে থাকেন তাহলে একবার নিজেকে প্রশ্ন করে দেখুন আপনি যা করছেন তাতে করে আপনার সঙ্গী কি ভীষণ ভাবে প্রতারিত হচ্ছে না? পারস্পরিক ভালবাসা, প্রতিশ্রুতি ও সম্মান নিয়ে সারা জীবন একসাথে কাটিয়ে দেয়ার জন্য আপনারা বন্ধনে আবদ্ধ হয়েছেন। এই বন্ধনকে আরও মজবুত করা প্রয়োজন। পরকীয়ায় না যেয়ে বরং আপনার সঙ্গীর সাথে শেয়ার করতে পারেন আপনি কি চান, আবার এটাও খেয়াল করে দেখতে পারেন আপনার সঙ্গী আপনার কাছ থেকে কেমনটা আশা করছে। দুইজনেই যদি দুইজনের ভালো লাগা, মন্দ লাগা গুলোকে শ্রদ্ধা করেন, নিজেদের মানসিক দূরত্ব কমিয়ে ফেলতে পারেন তাহলে দেখবেন জীবন অনেক সহজ হয়ে গেছে। পারস্পরিক দূরত্ব বাড়ার সম্ভাবনাও কমে যাবে অনেকটাই।

পরকীয়া নিয়ে আমাদের দেশে তেমন কোন গবেষণা নাই কিন্তু পত্রপত্রিকার মাধ্যমে আমরা পরকীয়ার প্রকোপ সম্পর্কে জানতে পারি। প্রায়ই পরকীয়ার বলি হতে দেখা যায় সন্তানসহ পরিবারের সদস্যদের। ঢাকা সিটি কর্পোরেশনে যে পরিমাণ বিবাহ বিচ্ছেদের আবেদন জমা পড়েছে তা সামাজিক বন্ধনের বিচ্ছিন্নতাকে চরমভাবে নাড়া দিয়েছে। পরিসংখ্যান মতে,২০১৯ সালের ১৮০ দিনে ৪ হাজার ৫৫৭টি তালাকের আবেদন হলে একদিনে আবেদন হয়েছে ২৬টি তালাকের। অর্থাৎ প্রতি ৫৫ মিনিটে একটি সংসার ভাঙার আবেদন জমা পড়েছে নগর ভবনে। স্বামীর পরকীয়া, মাদকাসক্ত এসব গুরুতর কারণে যেমন তালাক হয়, আবার স্ত্রীর নানা দোষ দেখিয়েও স্বামীরা তালাকের আবেদন করে। ৮০ শতাংশ বিবাহ বিচ্ছেদের আবেদন নারীদের, অভিযোগ পরকীয়ার। মনোবিজ্ঞানী ও সমাজবিজ্ঞানীরা বলছেন, বাংলাদেশের পরিপ্রেক্ষিতে বিবাহ বিচ্ছেদের কারণ হিসেবে পরকীয়ার সুদূরপ্রসারী একটা প্রভাব আছে। আর পরকীয়ার অন্যতম প্রধান কারণ হলো আধুনিকতার প্রভাব। ২০১২ থেকে ২০১৫ পর্যন্ত প্রায় চার বছরে ঢাকা দক্ষিণ সিটি কর্পোরেশনে বিবাহ বিচ্ছেদের আবেদন জমা পড়েছিলো ১৬ হাজার ৩৮৮টি। এর মধ্যে ২০১৫ এ বিচ্ছেদের আবেদন করা হয়েছে ২৮০০টি। ২০১৪ সালে ৪৬০০টি, ২০১৩ সালে ৪৪৭০টি এবং ২০১২ সালে ৪৫১৮টি বিবাহ বিচ্ছেদের আবেদন জমা পড়েছে। এই পরিসংখ্যান বিশ্লেষণে দেখা যায়, প্রায় ৮০ শতাংশ আবেদন করেছেন নারীরা। আর ২০ শতাংশ আবেদন করেন পুরুষরা। সেই সংখ্যাটা এখন দিনের পর দিন বেড়ে যাচ্ছে।

বিবাহ বিচ্ছেদ শুধু বিচ্ছেদ নয়, মনের ভেতর এর প্রভাব ব্যাপক এবং বিস্তৃত। সন্তান থেকে শুরু করে সমাজ সবখানেই প্রতিটা বিচ্ছেদের প্রভাব থাকে। মানুষের সহ্যক্ষমতা কমে যাওয়ার কারণে বিচ্ছেদের ঘটনা বাড়ছে। তবে বিশেষজ্ঞগণ এখনও মনে করেন, পরকীয়ার কারণ আধুনিকতা, যেখানে মোবাইল বা ইন্টারনেটের মাধ্যমে সহজেই অন্য কারো সাথে যোগাযোগ করা যায়। স্বামী-স্ত্রীর সম্পর্ক বিশ্বাসের বাইরে চলে গেলে তারা তালাকের আবেদন করে। পুরুষেরা বাইরে বিভিন্নভাবে বিনোদিত হতে পারে কিন্তু নারীদের ক্ষেত্রে সেই সুযোগ কম।

মোট কথা ভিতরে রোগ থাকলে একসময় তা প্রকাশিত হবেই। সম্পর্কে মানুষ যদি তার সঙ্গীর সাথে একসাথে কোনভাবেই থাকতে না পারে যেকোন কারণে তবে পারস্পরিক সমঝোতার মাধ্যমে তারা পরস্পর থেকে বিচ্ছিন্ন হতে পারে প্রাথমিকভাবে। বিচ্ছিন্ন হওয়ার পরও যদি তারা তাদের সীদ্ধান্তে অটল থাকে তবে তালাক হতে পারে তাদের ভেতর। তারা নিজেদের জন্য নুতন সঙ্গী বেছে নিতে পারে কিন্তু পরকীয়ার মতো অনৈতিক আচরণ না করাই উচিত মানুষের। প্রেম যেকোন কারণে মানুষের হয়ে যেতে পারে কিন্তু সেই ক্ষেত্রে সঙ্গীটিকে সাথে সাথে জানানো প্রয়োজন অন্ধকারে না রেখে। তারপর তারা সিদ্ধান্ত নিতে পারে সেই অবস্থায় তারা কি করবে। অনৈতিক কোনো সম্পর্কই কারো জন্য ভালো কিছু বয়ে আনে না।  মানুষ তার মূল্যবোধের বাহিরে, নৈতিক বোধের বাহিরে আদতে আর মানুষ থাকে না, অমানুষ হয়ে যায়। মানুষে মানুষে সংসার গড়ে, অমানুষে মানুষে সংসার হয় না কখনো। মানুষ যদি প্রেমের নামে এমন সব অনৈতিক আচরণে লিপ্ত হতে থাকে তবে তাদের মাঝে আর কোনো পারিবারিক কিংবা ব্যাক্তিগত কিংবা সামাজিক মূল্যবোধ অবশিষ্ট থাকবে না যা সমাজের জন্য কোনো সুফল বয়ে আনবে না বরং ধ্বংসের মুখে ফেলে দিবে মানুষকে।

সামাজিকভাবে আমাদের উচিত পরকীয়ার মতো অনৈতিক আচরণকে ‘না’ বলা এবং প্রতিহত করা। নিজে অন্যায় না করলেই কিন্তু আমাদের কর্তব্য ফুরিয়ে যায় না বরং অপরকেও অন্যায় করতে না দেয়া, অপরের অন্যায়কে প্রতিহত করা, প্রতিবাদ করাও অবশ্য কর্তব্য। বিবেকবান মানুষ হিসেবে অন্যায়ের প্রতিবাদ করার চেতনা ধারণ করার পরও সমাজের মানুষ অপরের অন্যায়কে প্রশ্রয় দেয়, তাহলে কি সে অন্যায় অপরাধের ইন্ধনদাতা হলো না? অস্বীকার করা যাবে কি এই ইন্ধনের বিষয়টাকে? সুখকাতর এককেন্দ্রিক মানুষ অন্যায়ের প্রতিবাদ করার চেয়ে, অন্যায়কে প্রতিহত করার চেয়ে বরং সরবে কিংবা নীরবে অন্যায়কে পৃষ্ঠপোষকতা দেয় যা আমাদেরকে ব্যাক্তিগত, পারিবারিক ও সামাজিকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত করে।

বিভিন্ন সামাজিক গবেষণা থেকে দেখা যায় সন্তানের ভবিষ্যৎ অনেক মানুষকে পরকীয়া সম্পর্ক তৈরি করা থেকে বিরত রাখে এবং অনেকে পরকীয়া সম্পর্কে জড়ালেও সন্তানের ভবিষ্যতকে গুরুত্ব দিয়ে পরকীয়া সম্পর্ক থেকে বের হয়ে আসে। আমাদের মনে রাখতে হবে মানুষের মনের মধ্যে সবসময় ভালো ও মন্দের দ্বন্দ্ব চলতে থাকে। নিষিদ্ধ বিষয়ের প্রতি মানুষের মনের আকর্ষণ বেশী থাকে, সেই আকর্ষণকে মোকাবেলা করাটাই হলো একজন প্রকৃত মানুষের কাজ। মানুষের মনের মন্দ চিন্তাভাবনার বিরুদ্ধে লড়াইয়ে জয়ী হতে মানুষকে সাহায্য করে তার শিক্ষা, তার ধর্ম, তার পারিবারিক মূল্যবোধ এবং সর্বোপরি তার স্বদিচ্ছা। পরিশেষে এটাই সত্য যে কোনো অনৈতিক অবস্থান কোনো সম্পর্ককেই সুস্থতা ও সৌন্দর্য দিতে পারে না এবং মানুষ হিসেবে কোনো অনৈতিক মূল্যবোধহীন অবস্থান আমাদেরকে অবক্ষয়ের পথেই ধাবিত করে। পরকীয়া ফৌজদারি অপরাধ না হলেও যেহেতু তা একটি অনৈতিক সম্পর্ক এবং অন্যায়কে প্রমোট করে তাই এর বিরুদ্ধে আমাদের সমাজের প্রতিটা মানুষের সোচ্চার ও সচেতন হওয়া প্রয়োজন এবং আইনেও এর জন্য শাস্তির বিধান থাকা জরুরি। 

(লেখাটি লিখতে পরকীয়া নিয়ে বিভিন্ন পত্রিকায় প্রকাশিত তথ্যের সাহায্য নেয়া হয়েছে)

2503 times read

নারী'তে প্রকাশিত প্রতিটি লেখার বিষয়বস্তু, ক্রিয়া-প্রতিক্রিয়া ও মন্তব্যসমুহ সম্পূর্ণ লেখকের নিজস্ব। প্রকাশিত সকল লেখার বিষয়বস্তু ও মতামত নারী'র সম্পাদকীয় নীতির সাথে সম্পুর্নভাবে মিলে যাবে এমন নয়। লেখকের কোনো লেখার বিষয়বস্তু বা বক্তব্যের যথার্থতার আইনগত বা অন্যকোনো দায় নারী কর্তৃপক্ষ বহন করতে বাধ্য নয়। নারীতে প্রকাশিত কোনো লেখা বিনা অনুমতিতে অন্য কোথাও প্রকাশ কপিরাইট আইনের লংঘন বলে গণ্য হবে।