রুমা মোদক

কথাশিল্পী ও শিক্ষক।

পরি মণির নিশ্চয় দোষ আছে


পরি মণির সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ অপরাধটি আমি খুঁজে পেয়েছি। এবং সম্ভবত এর জন্য তাঁর শাস্তি অবশ্যম্ভাবী।পরি মণি নির্দোষ নয়। তার কয়েকটি অপরাধ ইতোমধ্যে  চিহ্নিত হয়েছে। যদিও তার সবকটিই সবার জানা এবং বহুল আলোচিত। তবু আবার বলি, সে যে হাজার কোটি টাকা লোপাট করেনি। খুন, হত্যা, গুমের মতো অপরাধ করেনি, মিডিয়া এবং সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমের কারণে তা ইতোমধ্যেই সবাই জেনে গেছেন।

তাঁর অপরাধ তাঁর বনানীর বাসায় ১৮ লিটার মদ, এল এস ডি সহ আরো কয়েক ধরনের মাদক দ্রব্যের সন্ধান মিলেছে। দেশের প্রচলিত আইনে এটি যে অপরাধের পর্যায়ে পড়ে এ নিয়ে কারো দ্বিমত নেই। যদিও তার বাসায় বিপুল পরিমাণ মাদক দ্রব্য, যার মধ্যে কিছু আবার নিষিদ্ধ মাদক এর উৎস এবং কনজিউম নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে। তার একটি মেয়াদ উত্তীর্ণ লাইসেন্স রয়েছে বটে কিন্তু মেয়াদ উত্তীর্ণ লাইসেন্সের জোরে এতো বিপুল পরিমাণ মাদক তিনি সংরক্ষণ করতে পারেন না। এটি ফৌজদারি অপরাধ। এজন্য প্রচলিত আইন অনুযায়ী তার দণ্ড এবং শাস্তি প্রাপ্য।

তবে আমাদের মনে আছে নিকট অতীতে ব্যারিস্টার মওদুদ আহমেদ কে গ্রেফতার করা হয়েছিলো দু বোতল মদ রাখার অপরাধে। আর পরি মণির বাসায় তো উদ্ধার হলো পুরো  খনি। গ্রেফতারের জন্য, কারো বিরুদ্ধে তাৎক্ষণিক মামলা দেয়ার জন্য এর চেয়ে কার্যকরী হাতিয়ার এই ব্যবস্থায় আর নেই। কিন্তু পরিমণির ক্ষেত্রে যে প্রশ্নটি সমাধানহীন এবং রহস্যজনক কারণে অনুচ্চারিত, তা হলো এই বিপুল পরিমাণ মাদকের খদ্দের কারা ছিলো? কাদের এই মাদক কিনে খাওয়ার মতো সামর্থ্য রয়েছে? তারা সমাজের কোন শ্রেণি থেকে এসেছেন, যারা এসব গ্রহণের জন্য পরিমণির বাসায় ভীড় করতেন? এই প্রশ্নের উত্তরও এখনো মিলেনি। আদৌ কোনদিন মিলবে কিনা সন্দেহ।

পরিমণির অপরাধ, একজন বিশিষ্ট ব্যবসায়ী নাসিরের বিরুদ্ধে তিনি ধর্ষণ চেষ্টার অভিযোগ এনেছেন। যদি অভিযোগ সত্যি হয়, তবে অপরাধ নাসিরের, পরিমণির নয়। এই অভিযোগে নাসির গ্রেফতার হয়েছেন। কিন্তু পরবর্তীতে কিছু আপাত সাক্ষী প্রমাণ বলছে, অভিযোগ মিথ্যা। অভিযোগ মিথ্যা হলে পরিমণির অপরাধ ক্ষমার অযোগ্য। কিন্তু আমাদের অধিকাংশই অভিযোগের এই সত্য/অসত্য উভয় পিঠের বিবেচনা উহ্য রেখে বরং পশ্চাৎপদ দৃষ্টিতেই আবদ্ধ থেকেছি এবং ভেবেছি, একটা "বেশ্যা"(?) মেয়ের আবার অভিযোগ কিসের।

আমরা অনেকেই ধর্ষণ ইস্যুতে পরিমণির পক্ষ নিয়েছিলাম। সাদা চোখে তাৎক্ষণিক ভাবে আমরা পরিমণিকে বিশ্বাস করেছিলাম। এবং এই বিশ্বাস এবং পক্ষাবলম্বনের জন্য আমি  অনুতপ্ত নই। একজন ভিক্টিমের পক্ষাবলম্বন আমার বিবেক নির্দেশিত দায়িত্ব। এবং সে যদি দেহ ব্যবসায়ীও হয়, তাঁর 'না' মানে 'না'।

পরি মণি যদি মিথ্যা অভিযোগ  করে থাকেন তবে সেই দায় একান্তই তার। কিন্তু যে ভিডিও ক্লিপস দিয়ে প্রমাণ করার চেষ্টা হচ্ছে পরিমণিই সেদিন নুইসেন্স করেছেন। এই নুইসেন্স করাটাও নিঃসন্দেহে তার অপরাধ হিসাবেই বিবেচিত হয়।

কিন্তু সন্দেহর অবকাশ তৈরি হয় সেখানে, যেখানে সেই ভিডিওটি খণ্ডিত। এখন মোটামুটি সর্বজন বলছেন যে পরিমণি উঁচু দরের দেহোপজীবি। তার এই বিত্ত বৈভব সবই এভাবেই অর্জিত। প্রশ্নটা এখানেই। দেহ বিক্রি যার পেশা(?)। হরহামেশা যিনি ডিলিংসে যান, সেদিন ব্যবসায়ী নাসিরের সাথে এমন কী ঘটলো যে তা মামলা, সংবাদ সম্মেলন, গ্রেফতার পর্যন্ত গড়ালো? প্রশ্নটা কিন্তু সমাধানহীন রয়ে গেছে এখনো।

তার বিরুদ্ধে আর একটি গুরুতর অভিযোগ, সে পর্ণগ্রাফি করতো। কিন্তু তা প্রমাণে দুয়েকটা অর্ধউলঙ্গ, আন অফিসিয়াল নাচ ছাড়া এখনো আর কোনো প্রমাণ আইন শৃঙ্খলা বাহিনী হাজির করতে পারেনি। হতে পারে সেটি সিক্রেট। সাধারণের কাছে সঙ্গত কারণেই প্রকাশযোগ্য নয়। এমনটি ঘটে থাকলে প্রচলিত আইনে শ্রদ্ধা রেখে আমরা একেও অপরাধ হিসাবেই চিহ্নিত করবো। 

এইসব অপরাধ চিহ্নিত পূর্বক বিচার এবং শাস্তি দাবি করার আগে আমরা একটু অতীতের দিকে তাকাই। ইন্টারনেটের সেই প্রাথমিক যুগ। প্রায় ২০-২৫ বছর আগের কথা। তখন ইন্টারনেট মানেই পর্ণ। হাতে হাতে ঘুরতো এসব পর্ণ। কাদের? সব চেনাজানা মডেল অভিনেত্রী, গায়িকা। এর ওর তার অনেকের নগ্ন ভিডিও, একান্ত মূহুর্তের ভিডিও ছিলো এই ভার্চুয়াল জগতের মূল আকর্ষণ। যার অধিকাংশ তাদের অজান্তে করা হয়েছে এবং সুপরিকল্পিত ভাবে অন্তর্জালে ছড়িয়ে দেয়া হয়েছে। সেই মডেল, শিল্পী, অভিনেত্রীদের এবিউজড করে নিয়মিত এসব ভিডিও ইন্টারনেটে আপলোড করতো তারা সমাজের সুপ্রতিষ্ঠিত ব্যবসায়ী, ইন্ড্রাস্ট্রিয়ালিস্ট। লোভ কিংবা মোহে উঠতি মডেল নায়িকারা ইন্ড্রাস্ট্রিয়ালিস্টদের ফাঁদে পড়তো এবং প্রতারিত হয়ে মুখ লুকিয়ে প্রান রক্ষা করতো। তাদের কাউকেই এখন আর আমরা মিডিয়ায় দেখি না। তারা প্রায় সবাই হারিয়ে গেছেন।

যেসব অভিযোগে রাষ্ট্রের বিশাল বহর নিয়ে পরিমণি কে গ্রেফতার করা হলো, পুনঃপুন রিমাণ্ডে নেয়া হচ্ছে অবশেষে কারাগারে প্রেরণ করা হয়েছে, সেসব অভিযোগের প্রেক্ষিতে  আমরা আম জনতা প্রথমদিকে শুনলাম পরিমণি গুরুত্বপূর্ণ তথ্য এবং নাম ধাম দিচ্ছে। সে অনুযায়ী তালিকা করা হচ্ছে এবং তাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেয়া হবে। কাল দেখলাম ৩৬০ ডিগ্রি ঘুরে তারা বলছেন, তালিকা করা সম্ভব নয়।

উপরোক্ত দোষগুলি কিংবা অপরাধগুলি যদি সত্যি পরিমণির বিরুদ্ধে প্রমাণিত হয়, পরিমণির শাস্তি প্রাপ্য। পরিমণি নারী বলে, পরিমণি চলচ্চিত্র শিল্পী বলে, সাব অল্টার্ণ সমাজ থেকে উঠে আসা হোমডা চোমড়া ফাদার কিংবা গড ফাদার হীন বলে, সুন্দরী বলে কোনভাবেই সে ক্ষমা পেতে পারে না। অপরাধীকে ক্ষমার জন্য কোনো অজুহাত গ্রহনযোগ্য নয়, দাবিও করা অনুচিত।

কিন্তু এখনো পর্যন্ত যে অপরাধগুলি তার বিরুদ্ধে আনীত হয়েছে সব কয়টি প্রমাণ সাপেক্ষ। প্রমাণের আগে কাউকে দোষী সাব্যস্ত করে এই যে মিডিয়া ট্রায়াল, জনতার আদালতে তাকে পদে পদে হেনস্থা করা প্রচলিত আইনের শাস্তির চেয়েও ভয়ংকর। পরিমণি এই ভয়ংকর শাস্তির মধ্য দিয়ে যাচ্ছেন।

পরিমণি কোনো পারিবারিক ট্রমা কাটিয়ে এসেছেন, তাতে তার অপরাধ লঘু হয়ে যাওয়ার মতো মানবিক রাষ্ট্র এবং সমাজ আমাদের নয়। এই দাবিও আমি করবো না।

কিন্তু আমার কিছু প্রশ্ন রয়েছে। পরিমণি যে আবেদন নিয়ে চলচ্চিত্রে অভিনয় করতে এসেছিলেন, একজন উঁচু দরের অভিনয় শিল্পী হয়ে নিজের ক্যারিয়ার তৈরি করার সব গুনাবলী ছিলো তার। আমাদের চলচ্চিত্র ইন্ড্রাস্ট্রি তার কতোটুকু ব্যবহার করেছে? বা ব্যবহার করার মতো অবস্থায় আমাদের ইন্ড্রাস্ট্রি আদৌ আছে কী?

আজ যে পরিমণির সাথে তুলনায় বারবার শাবানা ববিতার প্রসঙ্গ তুলে আনেন, তাঁরা যৌবনে চলচ্চিত্রে পেশাদারিত্বের সাথে চুটিয়ে অভিনয় করেছেন, আয় করেছেন এবং বার্ধক্যের পর্যায়ে অনেকেই সময়মত নিজেদের গুটিয়ে নিয়েছেন। সেদিন শিল্পাঙ্গনের একজন কর্তা স্থানীয় ব্যক্তিত্ব আক্ষেপ করে বলছিলেন, চলচ্চিত্রের এই মুরুব্বি স্থানীয় অভিনেত্রীদের তিনি ডেকেও কোনো অনুষ্ঠানে আনতে পারেন না। তাঁরা তাঁদের পূর্বের গৌরবময় অতীত ধুয়ে মুছে সাফ করে দিতে চান, পারলে অস্বীকার করেন। নামী এবং প্রভাবশালী পরিচালক দেলোয়ার জাহান ঝন্টু বারবার ধর্মীয় অনুষঙ্গ এনে তুলনা করছিলেন আর বলছিলেন, আমি আর কিছু পারি না বলে চলচ্চিত্র বানাই। তাদের এটিচুয়েডে স্পষ্ট যে তারা তাদের কৃতকর্মের জন্য গর্বিত দূরে থাক, তারা এই পরিচয় দিতে কুণ্ঠিত। তারা যা করেছেন, তার প্রতি বিন্দুমাত্র শ্রদ্ধা তাদের মধ্যে কাজ করে না। এই ভঙ্গুর উত্তুঙ্গু প্রৌঢ় প্রজন্মের জন্যই আমাদের চলচ্চিত্র শিল্পের আজ এই দুরাবস্থা।

তাদের তৈরি করা পরম্পরায় পরিমণির চলচ্চিত্রাভিনেত্রী হওয়ার সব গুনাবলী থাকা সত্ত্বেও সে চাইলেই কাঙ্ক্ষিত  সিনেমা করতে পারতো? আমাদের চলচ্চিত্র ইন্ড্রাস্ট্রি কী সেইভাবে আদৌ দাঁড়িয়েছে, বরং অন্যভাবে বলি যে অমিত সম্ভাবনা ছিলো ৭০/৮০/৯০ এর দশকে আজ সেই অবস্থান আদৌ ধরে রাখতে পেরেছে? ঈদ মৌসুমে যে আমরা আমাদের অগ্রবর্তী কয়েকটি প্রজন্ম অধীর আগ্রহ নিয়ে অপেক্ষা করতাম কয়টি ছবি মুক্তি পাবে, কোন কোন হলে মুক্তি পাবে? সেই হলগুলো এখন কই? চলচ্চিত্রে শাবানার মতো, ববিতার মতো, শাবনূর পপির মতো ক্রেজ এখন কই? হলের সামনে টিকেটের লম্বা লাইন কিংবা টিকেটের কালোবাজার এখন এই প্রজন্মের কাছে রূপকথার গল্প।

যাত্রা, চলচ্চিত্র সব ধ্বংস করে দিয়ে আমরা পরিমণির কাছে চাইছি ছ্যাঁচোরের মতো দু চার পয়সা রোজগার করে কোনরকমে চেয়ে চিন্তে জীবন কাটিয়ে সতীত্বের পরকাষ্ঠা দেখাবে। সব দায় পরিমণির। যখন তার সামান্য চোখের ইশারায় সে বুভুক্ষু পুরুষকে বাগে নিতে পারে, তুড়ি মেরে আয় করে নিতে পারে অঢেল অর্থ, বিলাসী জীবন। শরীরের বিনিময়ে যে অর্থ বিত্ত সহজলভ্য, তা গ্রহণ না করে নিজেকে সতী সাধ্বী রাখার দায় কেবল পরি মণির। এর সব দোষও হয়তো পরিমণির।

কিন্তু পরিমণির আসল দোষ অন্যকিছু, আমি যা খুঁজে পেয়েছি, আর তা হলো তার 'চির উন্নত শির'। একটা প্রাপ্ত বয়স্ক মেয়ে, যা করে কিংবা করেছে তার দায় তার একার নয় কোনভাবেই। আর পুরো রাষ্ট্র যন্ত্র, মিডিয়া, প্রচলিত জনমানস এবং তার সঙ্গলাভ কারীরা পর্যন্ত যেভাবে তাকে তিলে তিলে পিষে মারার চেষ্টা করছে, পরিমণি সেই ভণ্ডদের মুখে একটা তীব্র চপেটাঘাত।

ধরা পড়ার পর পরি মণি যদি লজ্জায় কপট আঁচলে মুখ ঢাকতো, তাঁর তর্জনী আমাদের সোকল্ড ভদ্র সমাজের দিকে না তুলতো বোধহয় আমরা তার অপরাধ কিছু লঘু করে দেখতাম। তাঁর এই ঔদ্ধত্য আমাদের অভ্যস্ত চোখে বড়ই বেমানান লাগছে। আমরা তাঁর ঝাঝ সহ্য করতে পারছি না, আবার সহ্য যে করতে পারছি না তা স্বীকারেরও সৎ সাহস আমাদের নাই।

এতএব আমাদের এই অসততা আর ভণ্ডামির মাশুল পরিমণি কতোটা দেয় তাই এখন দেখার বিষয়। সময়ের চেয়ে অগ্রসর নারীকে কবে কোন সমাজ ধিক্কার না দিয়ে, শাস্তি না দিয়ে গ্রহণ করার দুঃসাহস দেখাতে পেরেছে?

473 times read

নারী'তে প্রকাশিত প্রতিটি লেখার বিষয়বস্তু, ক্রিয়া-প্রতিক্রিয়া ও মন্তব্যসমুহ সম্পূর্ণ লেখকের নিজস্ব। প্রকাশিত সকল লেখার বিষয়বস্তু ও মতামত নারী'র সম্পাদকীয় নীতির সাথে সম্পুর্নভাবে মিলে যাবে এমন নয়। লেখকের কোনো লেখার বিষয়বস্তু বা বক্তব্যের যথার্থতার আইনগত বা অন্যকোনো দায় নারী কর্তৃপক্ষ বহন করতে বাধ্য নয়। নারীতে প্রকাশিত কোনো লেখা বিনা অনুমতিতে অন্য কোথাও প্রকাশ কপিরাইট আইনের লংঘন বলে গণ্য হবে।