ফারহানা আনন্দময়ী

লেখক

পরিবর্তনের হাওয়া বইয়ে দিন, নারী একাই

পরিবর্তনের হাওয়া বইয়ে দিন, নারী একাই। 
একজন মা’কে বলছি। 
সাহস ক’রে শুরু করতে পারেন আপনার সন্তানদেরকে দিয়েই। প্রত্যেক ঘরে, প্রত্যেক পরিবারে প্রতিটি মা তার কন্যাকে নিজের পায়ে ভর দিয়ে বেঁচে ওঠার এবং বেঁচে থাকার মন্ত্র শেখান। যোগ্যতা দিয়ে নিজের জায়গা ক'রে নিতে উৎসাহ দিন। অন্যায় আচরণের বিরুদ্ধে, অনায্য প্রাপ্তিতে প্রতিবাদী হতে শেখান। সাহসী হওয়ার তাগাদা দিন। আত্মরক্ষার কৌশল শেখান।

প্রতিটি মা তার পুত্রকে শিক্ষা দিন, এই পরিবারে তোমার বোনের ঠিক ততটুকুই অধিকার যতটুকু তোমার। পুত্র হিসেবে তুমি যতটুকু স্বাধীনতা ভোগ করবে, তোমার বোনও একই পরিমান স্বাধীনতা ভোগ করবে। নিজের দায়িত্ব তুমি যে বয়স থেকে নিতে শিখবে, তোমার বোনও সেই বয়স থেকে নিজের ভার বহন করবে। পুত্রকে শেখান, রাতের খাওয়ার টেবিলটা প্রস্তুত করা যদি মা বা বোনের কাজ হয় তো খাওয়া শেষে টেবিল পরিস্কার করার কাজটা তোমার। আত্মরক্ষার কৌশলটা পুত্রকেও শেখান।

এই প্রক্রিয়ার ভেতর দিয়ে বেড়ে উঠতে উঠতে কন্যা-পুত্র দুজনেই জেনে যাবে এবং মেনে নিতে শিখবে, প্রাকৃতিক কারণে শুধু লিঙ্গটা ভিন্ন দু’জনের। কিন্তু অধিকার, মর্যাদা, স্বাধীনতা, যোগ্যতা, দায়িত্ব সবই নারী-পুরুষের সমান। দীর্ঘদিনের পুরুষতান্ত্রিক ভাবনার অচলায়তন ভেঙে পরিবারের অন্য সদস্যরাও এই প্রক্রিয়ায় অভ্যস্ত হয়ে উঠবে ধীরে ধীরে। আপনার স্বামীপুরুষটি হয়তো ছোটবেলা থেকে পরিবার থেকে শিখে এসেছেন, পুত্র মানেই পরিবারে তার Upper-hand আছে। সেই ভদ্রলোকটিও দেখবেন আশপাশ দেখে ক্রমশ ভাবনায়-মানসিকতা বদলে আপনাদের সমতলে নেমে আসবেন কিংবা উঠে আসবেন।

রাষ্ট্রীয় আইন, সামাজিক আইন পরের বিষয়। আপনার পারিবারিক আইনটা যদি প্রথম থেকেই অর্থাৎ সন্তান বেড়ে ওঠার বয়স থেকেই মানব-বান্ধব হয় তাহলে সমাজে নারী-পুরুষকে সমান মর্যাদায় দেখার দৃষ্টিভঙ্গী গড়ে ওঠে সহজেই। পরিবারই হতে পারে একজন কন্যাশিশুর সবচেয়ে কাছের বন্ধু, আবার বিপরীতভাবে সবচেয়ে নিপীড়কও হয়ে ওঠে এই পরিবারই। পরিবারই হতে পারে একজন পুত্রশিশুর মগজে পুরুষতন্ত্রের অহমের বীজ বুনে দেয়ার প্রথম পরিচর্যাকারী, আবার এই পরিবারই তাকে নারীবান্ধব মানসিকতায় গড়ে তুলতে পারে একেবারে শৈশবকাল থেকে। এবং পরিবারে ইতিবাচক সেই দায়িত্ব পালন করার প্রথম এবং প্রধান ভারটি নিতে হয় একজন মা’কেই।

তবে এখানেও কথা আছে। সেই মা কি প্রকৃতপক্ষেই চাইছেন যে, তার উভয় সন্তানই (কন্যা এবং পুত্র) সমান অধিকারপ্রাপ্ত এবং সমান দায়িত্বপ্রাপ্ত হয়ে বেড়ে উঠুক? আমাদের সমাজে ২০১৭ সালে দাঁড়িয়েও অধিকাংশ পরিবারে মায়েরা পুরুষতন্ত্রের ধারক ও বাহক হয়ে পরিবার পরিচালনা করেন। সেই মায়েদের চিন্তা-চেতনায় পুত্রসন্তান অধিক কাম্য এবং আদরণীয়, কন্যাসন্তানের চেয়ে। এবং তাদের সেই পক্ষপাতিত্ব ভীষণ নির্লজ্জরূপে প্রকাশিত হয় প্রতিটি আচরণে। মায়েরা কন্যাসন্তানকে প্রতিটি কাজে এবং কথায় বুঝিয়ে দেন, তোমাদেরকে পেলে-পুষে, লেখাপড়ার একটি সার্টিফিকেট জোগাড় করে, ঘরকন্নার কাজ শিখিয়ে-পড়িয়ে বড় করা হচ্ছে বিয়ে দিয়ে পরের বাড়িতে সংসার করার জন্যই কেবল। আর পুত্রসন্তানকে অধিক মনোযোগে দেখভাল ক’রে, মাছের বড় মাথাটা-মুরগীর রানের মাংসটা খাইয়ে, অধিক বিনিয়োগে লেখাপড়া করানো হচ্ছে, এই বিনিয়োগ ফেরত দেয়ার জন্য, যখন বাবা-মা আয়ক্ষম থাকবেন না, সেই দিনের আশংকায়।

আজ সকালেই পত্রিকায় একটি নিবন্ধ পড়েছি, ‘কন্যাসন্তানের জন্মপূর্ব ছোট্ট আখ্যান’। লেখক বর্ণনা করেছেন, তাঁর কন্যাসন্তান যখন স্ত্রীর গর্ভে ছিলো সেই সময়কালের প্যাথলজিস্ট, ডাক্তার এবং আত্মীয়স্বজনের পুত্রসন্তানপ্রীতির এক নির্মম দৃষ্টিভঙ্গীর নির্লজ্জ প্রকাশের। গর্ভে যদি পুত্রশিশুর ভ্রূণ দেখা যায় আলট্রাসনোগ্রাফিতে, ডাক্তারেরা সোৎসাহে তা মা-বাবাকে জানান দেন, মা-বাবা জানতে না চাইলেও। আর ভ্রূণ কন্যাশিশুর হলে তাদের দেহভাষাতেই তা মুহূর্তে প্রকাশিত হয় মা-বাবার কাছে। বোঝাই যায়, উচ্চশিক্ষার সার্টিফিকেট আসলে মানুষের মগজের অন্ধকারে আলো ফেলতে পারে না।

মায়েদেরকে বলি, একপাশে সরিয়ে রাখুন পুত্রশিশুবান্ধব এই সমাজ-সামাজিকতা, মাথা থেকে নামিয়ে ফেলুন পুরুষতন্ত্রের শিখিয়ে দেয়া মন্ত্র। নিজের সন্তানকে আলোকিত করার মহান ব্রতটি আপনিই পালন করুন, কারো অপেক্ষা না ক’রেই। নারীর কিছু লড়াই দৃশ্যমান, সরব। এর বাইরেও কিছু লড়াই আছে নারীর, যা হয়তো চাক্ষুষ করা যায় না। কিন্তু লক্ষ্যে অবিচল থাকলে সেই লড়াই নিঃশব্দেই যুদ্ধের মাঠে তার নিজের পথ কেটে নেয়, গন্তব্যে পৌঁছিয়েও যায়। মা হিসেবে শুধু আপনার চাওয়াটাকে ঋজু রাখুন, যে চাওয়ায় আপনার কন্যা এবং পুত্র আপনার পরিবারে সমান অধিকারে, সমান প্রাপ্তিতে, সমান দায়িত্ববোধ নিয়ে বেড়ে উঠতে পারে।   

আপনার যে শিশুপুত্রটি আজ তার বোনের মানুষ হিসেবে শতভাগ অধিকারপ্রাপ্তির এই চলমান পথে সাক্ষী হয়ে রইলো, এই শিশুপুত্রটিও পরিণত বয়সে তার নিজের সংসারে কোনোরকম লড়াই করা ছাড়াই তার কন্যাকে এই অধিকার দিতে আগুয়ান হবে, তার স্ত্রীকে পেছনে ফেলে। বিশ্বাস করুন, তাই-ই হয়, তাই-ই হবে। আজকের মাকে যে লড়াইটা করতে হচ্ছে তার সংসারের প্রথার বিপরীতে দাঁড়িয়ে, তার স্বামীর বহুবছরের চর্চিত অভ্যাসের বিপরীতে দাঁড়িয়ে, আগামী প্রজন্মের একজন মাকে অতোটা পরিশ্রম করতে হবে না, যদি আজ আপনি কাজটা এগিয়ে রাখেন।       

নারী, সবকিছুর আগে আপনাকেই সিদ্ধান্ত নিতে হবে, মা হিসেবে আদরে-আহলাদে পুত্রকে রোজগেরে ক'রে বড় করবেন নিজের ভবিষ্যত নিরাপদ রাখতে? আর কন্যাকে ঘরকন্না শিখিয়ে প্রস্তুত করবেন বিয়ের বাজারের বিক্রীযোগ্য পণ্য করে তুলতে? নাকি শিশুকাল থেকেই দু’জনের মগজে ঢুকিয়ে দেবেন তোমরা দুজনেই সমান অধিকারপ্রাপ্ত, সমান দায়িত্বপ্রাপ্ত, মানুষ হিসেবে।

নারী, সাহসী হোন, ঘুরে দাঁড়ান, এগিয়ে যান। সাহসী সিদ্ধান্ত নিন পরিবর্তনের জন্যে, আজই। পরিবর্তনের সুফল হয়তো ঠিক আপনার পরের প্রজন্মেই দেখতে পাবেন। আমাদের মধ্যবিত্ত মানসিকতায় পরিবর্তন যত দ্রুত আসবে, সমাজ বদল ততই অনিবার্য হবে। পুরো সমাজ না হোক, অন্ততঃ আপনার প্রতিবেশতো বদলাবে। চেষ্টা ক’রেই দেখুন না একবার। মুক্তি আসবেই। কবি বলেছেন-

“স্বাধীনতা চাইছি সবাইকে দিতে, কেবল আমাকে নয়,

নিজে না ভাঙলে নিজের শেকল কেউ ভাঙে না এসে...”

শেকল ভাঙার কাজটি মা হয়ে আপনিই না হয় শুরু করুন। আপনি না হয় মুক্তির স্বাদ পুরোটা পেলেন না। তাতে কী! আপনার কন্যা, আপনার পুত্র, আপনার পুত্রবধূই সম্পূর্ণ মুক্ত একজন মানুষ হয়ে বেঁচে থাকুক পৃথিবীর বুকে।   

বিঃদ্রঃ নারী'তে প্রকাশিত প্রতিটি লেখার বিষয়বস্তু, ক্রিয়া-প্রতিক্রিয়া ও মন্তব্যসমুহ সম্পূর্ণ লেখকের নিজস্ব। প্রকাশিত সকল লেখার বিষয়বস্তু ও মতামত নারী'র সম্পাদকীয় নীতির সাথে সম্পুর্নভাবে মিলে যাবে এমন নয়। লেখকের কোনো লেখার বিষয়বস্তু বা বক্তব্যের যথার্থতার আইনগত বা অন্যকোনো দায় নারী কর্তৃপক্ষ বহন করতে বাধ্য নয়। নারীতে প্রকাশিত কোনো লেখা বিনা অনুমতিতে অন্য কোথাও প্রকাশ কপিরাইট আইনের লংঘন বলে গণ্য হবে।