কেনো নারীবাদকে মানবতবাদ দিয়ে রিপ্লেস করা যাবে না

রবিবার, মার্চ ৮, ২০২০ ৪:৩৮ PM | বিভাগ : আলোচিত


বিগত বছরগুলোতে 'নারী দিবস'কে কেন্দ্র করে একটা প্রোপাগান্ডা বেশ জোরালোভাবে চালানো হচ্ছে। একটা গোষ্ঠী দাবি করছে, নারীবাদকে কেনো মানবতাবাদ দিয়ে রিপ্লেস করা হবে না যখন আমরা সবাই মানুষ। নারীর অধিকার না বলে কেনো আমরা এটাকে মানুষের অধিকার বলছি না। মানবতাবাদই যখন মানুষের সব রকম অধিকার এবং স্বাধীনতার কথা বলে, তখন আলাদা করে নারীবাদের কি প্রয়োজন?
 
আপাত দৃষ্টিতে মানুষের মনে হতে পারে, আসলেওতো! নারীরাও তো মানুষ। কেনো তাহলে নারী নারী বলে চিল্লাতে হবে! আমরাই হয়তো মেয়েদের মানুষ ভাবতে পারছিনা এখনো! 
 
আপনিও যদি এমনটা ভেবে থাকেন, তাহলে আর্টিকেলটা আপনার জন্য। চলুন খুঁজে দেখি মানবতাবাদ থাকার পরেও নারীবাদের প্রয়োজনীয়তা আছে কিনা! প্রথমে জেনে নেওয়া যাক নারীবাদ এবং মানবতাবাদের সংজ্ঞা। 
 
উইকি তথ্যমতে, "নারীবাদ হল সামাজিক ও রাজনৈতিক আন্দোলন যা প্রত্যেকটি লিঙ্গের রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক, ব্যক্তিগত এবং সামাজিক সাম্যতাকে সংজ্ঞায়িত, প্রতিষ্ঠা এবং অর্জনের লক্ষ্যকে সামনে রেখে কাজ করে।"
 
অপরদিকে, "মানবতাবাদ একটি ধর্মনিরপেক্ষ মতাদর্শ যা যুক্তি, দর্শন ও ন্যায়বিচারকে নৈতিকতা ও সিদ্ধান্ত নেওয়ার প্রক্রিয়ার ভিত্তি হিসেবে গ্রহণ করে এবং সবপ্রকার অলৌকিকতা এবং ধর্মীয় শাস্ত্রকে প্রত্যাখ্যান করে।"
 
সুতরাং, নারীবাদের মূল লক্ষ্য লিঙ্গসমতা যেখানে সেক্যুলার মানবতাবাদের মূল কাজ ধর্মনিরপেক্ষতা ও অলৌকিকতাকে প্রত্যাখ্যান করে সম্য প্রতিষ্ঠা করা।
 
তাহলে মানবতাবাদী এবং নারীবাদীদের মধ্যে পার্থক্য কী? চলুন একটা উদাহরণ থেকে বোঝার চেষ্টা করি।
 
যদি গর্ভপাতের বিরুদ্ধে নিষেধাজ্ঞার সমালোচনা করার টপিকটা বেছে নিই, আমরা দেখবো নারীবাদ এবং মানবতাবাদ দুটোই  এই নিষেধাজ্ঞার বিরুদ্বে। অর্থাৎ এ বিষয়ে উভয় মতাদর্শের মূল্যবোধ একরকম। কিন্তু সমালোচনার ধরণ আলাদা।
 
মানবতাবাদীরা গর্ভপাতের নিষেধাজ্ঞার সমালোচনা করেন কারণ তারা এটিকে ধর্মাবলম্বী মানুষদের এক ধরণের বিশ্বাসের রূপে দেখেন। যার চর্চা ধর্মভেদে আলাদা যেমন হতে পারে, আবার মুক্তচিন্তার মানুষদের জন্য এমনকিি ধার্মিকদের উপর চাপিয়ে দেওয়া হতে পারে। যা ধর্মনিরপেক্ষতার বিরুদ্বে যায়। একইসাথে  নির্দিষ্ট একটি সেক্সের সামাজিক অবস্থানকে বিবেচনা করে গর্ভপাত করে ফেলাকে অমানবিক মনে করে। এবং কোনো রকম লিঙ্গ বৈষম্যকে সমর্থন করে না।
 
যেখানে নারীবাদীরা 'লিঙ্গ সমতার' জন্য গর্ভপাতকে গুরুত্বপূর্ণ মনে করেন এবং একজন নারী একটি সন্তান জন্ম দিতে চান কি চান না, সে ব্যপারে সিদ্ধান্ত নেওয়ার অধিকার একজন নারীর থাকা উচিৎ বলে মনে করেন।
 
সুতরাং দেখা যাচ্ছে নারীবাদ এবং মানবতাবাদকে এক হিসাবে সংজ্ঞায়িত করা না হলেও, তাদের নৈতিক মানগুলি বেশ সমান। এই উভয় দিকই মানুষের স্বাধীনভাবে বেঁচে থাকার পক্ষে কথা বলে।
 
আরেকটি সহজ উদাহরণ দেয়া যেতে পারে, ধরুন আপনি পদার্থবিজ্ঞানের একজন ছাত্র। পদার্থবিজ্ঞান যেহেতু বিজ্ঞানেরই একটা অংশ, সুতরাং আপনি বিজ্ঞানেরও ছাত্র। রসায়ন শুধামাত্র এটা স্পেসিফাই করে যে আপনি বিজ্ঞানের কোন ডিসিপ্লিনের ছাত্র কিংবা কোন বিষয়টি অধ্যয়ন করছেন।
 
একইভাবে আপনি একজন নারীবাদী হতে পারেন আবার মানবতাবাদীও। নারীবাদ মানবতাবাদেরই একটা ডিসিপ্লিন যা স্পেসিফিক্যালি লিঙ্গ সমতা নিয়ে কাজ করে।  
 
বিজ্ঞানের যেমন অনেকগুলো ডিসিপ্লিন থাকে, যেমন পদার্থ, রসায়ন, জীববিজ্ঞান তেমনি মানবতাবাদ রেসিজম, সেক্সিজম, জেন্ডার ডিসক্রিমিনেশন সহ জগতের যাবতীয় সমস্যা নিয়ে আলোচনা করে।
 
এখন যদি আপনাকে জিজ্ঞেস করি আপনি কেনো নিজেকে রসায়নের ছাত্র বলছেন, বিজ্ঞানের ছাত্র বললেই হয়! রসায়ন তো বিজ্ঞানেরই অংশ! তাহলে ব্যাপারটা হাস্যকর হবে। নারীবাদকে মানবতাবাদ দিয়ে রিপ্লেস করার চেষ্টাও ঠিক একই রকম।
 
কেনো রিপ্লেস করা যাবে না তার আরও গুরুত্বপূর্ণ কারণ আছে। ধরুন একটি জঙ্গল যেখানে অনেক রকম জীবজন্তুু বাস করে। সেই জঙ্গলে প্রজাপতির তিনটি প্রজাতি বাস করে। ধরে নিলাম তারা ক, খ এবং গ। একই গোত্রের হওয়ার পরেও 'ক' নামক প্রজাপতি খ এবং গ প্রজাতি গুলোকে দীর্ঘদিন যাবৎ শাসন, শোষণ এবং ডোমিনেট করে, তাদেরকে তাদের নায্য অধিকার থেকে বঞ্চিত করে। কেননা তারা বিশ্বাস করে তারা ঐশ্বরিকভাবে খ এবং গ প্রজাতির চেয়ে সুপেরিয়র।
 
এখন খ ও গ মিলে যদি এ অন্যায়ের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ গড়ে তোলে এবং তার নামকরণ করে 'খগবাদ' এবং ক প্রজাতি এসে বলে, 'খগবাদ' একটা সংকীর্ণ চিন্তা, যেহেতু এটা প্রজাপতিদের সমস্যা তাহলে এটাকে 'প্রজাপতিবাদ' বলা উচিৎ! একইভাবে বাকি জীবজন্তুরা বলতে পারে, তাদেরও অনেক সমস্যা হচ্ছে জঙ্গলে তাহলে এটাকে 'জীবজন্তুবাদ' বলা হোক।
 
একটু খেয়াল করে দেখুন, শেষ মতবাদটি দিয়ে প্রথমটিকে রিপ্লেস করলে খগ প্রজাতির সমস্যাটা নরমালাইজ হয়ে যায় এবং এটি গুরুত্ব হারায়। 
 
নারী, পুরুষ এবং অন্যান্য লিঙ্গের মধ্যে যে বৈষম্য বিদ্যমান তা তৈরি হয় লিঙ্গ পরিচয়ের উপর ভিত্তি করে। একে জাগতের অন্য সমস্যাগুলোর (যেমন রেসিজম) মতো করে মানুষের সমস্যা বলা চলে না। আমার জানামতে অন্য কোনো সমস্যা লিঙ্গভেদে তৈরি হওয়া না। তাই মানবতাবাদের মূল্যবোধ নারীবাদ একই হলেও দুটো পুরোপুরি এক বিষয় না। 
 
জন্মগতভাবে মানুষের গর্ভে জন্ম নেওয়া প্রতিটি শিশুই মানুষ। হোক সে নারী, পুরুষ কিংবা ইন্টারসেক্স! তারপরও কি আমাদের জৈবিক পরিচয় অস্বীকারের উপায় আছে? নেই। প্রয়োজনও দেখি না। নারী পুরুষ ইন্টারসেক্স শরীরিক এবং মানসিকভাবে আলাদা। তাই সেক্স ভিত্তিক শ্রম বিভাজনকে অস্বীকার করারো সুযোগ  নেই। কোনো সেক্স সুপেরিয়র কিংবা ইনফিরিয়র না।
 
নারী-পুরুষ-ইন্টারসেক্সের কমন যে বৈশিষ্ট্য তা হলো মানবিকতা। যার যার লৈঙ্গিক পরিচয় নিয়েই তারা মানবিক হতে পারে। সুতরাং নারীবাদকে মানবতাবাদ দিয়ে রিপ্লেস করার কোনো কারণ দেখছি না। 
 
তবে সচেতনভাবে দেখলে দুটি বিষয় চোখে পড়ে। হয় এই ধরণের দাবি পুরুষতান্ত্রিক ষড়যন্ত্র (লিঙ্গবৈষ্যমকে নরমালাইজের মাধ্যমে), নয়তো নারীবাদী ট্যাগ খেয়ে (এ অঞ্চলে যেহেতু মিসকন্সেপশনের জন্য নারীবাদী একটা গালিতে পরিণত হয়ছে) সমাজের চক্ষুসূল হওয়া থেকে বাঁচতে কিংবা নেহায়েত অজ্ঞতাবশত! 
 
সবাইকে নারী দিবসের শুভেচ্ছা।
 

  • ৩৫১ বার পড়া হয়েছে

পূর্ববর্তী লেখা পরবর্তী লেখা

বিঃদ্রঃ নারী'তে প্রকাশিত প্রতিটি লেখার বিষয়বস্তু, ক্রিয়া-প্রতিক্রিয়া ও মন্তব্যসমুহ সম্পূর্ণ লেখকের নিজস্ব। প্রকাশিত সকল লেখার বিষয়বস্তু ও মতামত নারী'র সম্পাদকীয় নীতির সাথে সম্পুর্নভাবে মিলে যাবে এমন নয়। লেখকের কোনো লেখার বিষয়বস্তু বা বক্তব্যের যথার্থতার আইনগত বা অন্যকোনো দায় নারী কর্তৃপক্ষ বহন করতে বাধ্য নয়। নারীতে প্রকাশিত কোনো লেখা বিনা অনুমতিতে অন্য কোথাও প্রকাশ কপিরাইট আইনের লংঘন বলে গণ্য হবে।


মন্তব্য টি

লেখক পরিচিতি

নওরীন পল্লবী

নারীবাদী লেখক।

ফেসবুকে আমরা