ফরিদ আহমেদ

লেখক, অনুবাদক, দেশে থাকা অবস্থায় বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষকতা করতেন। দীর্ঘ সময় মুক্তমনা ব্লগের মডারেশনের সাথে জড়িত ছিলেন। যুদ্ধাপরাধীদের বিচারের রায়ের অনুবাদ করেছেন। বর্তমানে ক্যানাডা রেভেন্যু এজেন্সিতে কর্মরত অবস্থায় আছেন। টরন্টোতে বসবাস করেন।

পহেলা জানুয়ারির বর্ষবরণ উৎসব তুলনামূলকভাবে সাম্প্রতিক ইতিহাস

মানুষের বর্ষবরণের উৎসব অনেক পুরনো। বর্ষবরণের প্রথম যে উৎসবের খোঁজ পাওয়া যায়, সেটি চার হাজার বছর আগের, প্রাচীন মেসোপটেমিয়াতে। তবে, সেই বর্ষবরণ জানুয়ারির এক তারিখে হতো না, হতো মধ্য মার্চের কোনো এক সময়ে। জানুয়ারিতে বর্ষবরণ হওয়ার কোনো সুযোগই তখন আসলে ছিলো না, কারণ এই মাসের কোনো অস্তিত্বই তখন ক্যালেন্ডারে ছিলো না। মেসোপটেমিয়ানদের মতো মিশরীয় এবং পারস্যের লোকজনও বর্ষবরণ করতো, তবে সেগুলোও ছিলো ভিন্ন ভিন্ন দিনে।

পহেলা জানুয়ারির এই বর্ষবরণ উৎসব তুলনামূলকভাবে সাম্প্রতিক ইতিহাস।

রোমানরা শুরুতে তাদের বর্ষবরণ করতো পহেলা মার্চে। তাদের ক্যালেন্ডারে মাত্র দশটা মাস ছিলো, যার শুরু হতো মার্চ থেকে। এই ক্যালেন্ডারে মার্চ থেকে ডিসেম্বর পর্যন্ত ছিলো, ছিলো না শুধু জানুয়ারি এবং ফেব্রুয়ারির অস্তিত্ব। এটা যে দশ মাসের ক্যালেন্ডার ছিলো, তার চিহ্ন কয়েকটা মাসের নামের মধ্যেও রয়েছে গিয়েছে। যেমন ধরুন, সেপ্টেম্বর, অক্টোবর, নভেম্বর এবং ডিসেম্বর এখনকার হিসাবে মাস নম্বর ৯, ১০, ১১ এবং ১২। কিন্তু সে সময়ে এগুলো ছিলো যথাক্রমে ৭, ৮, ৯ এবং ১০ নম্বর মাস। ল্যাটিন ভাষায় সেপ্টেম মানে সাত, অক্টো মানে আট, নভেম মানে নয় আর ডিসেম মানে দশ। এগুলোর অর্থ দেখলেই এদের ক্রম বোঝা যায়।

জানুয়ারি এবং ফেব্রুয়ারি ক্যালেন্ডারে যোগ দিলো খৃস্টপূর্ব ৭০০ সালের দিকে। রোমের রাজা নুমা পমপিলিয়াস দশ মাসকে ভেঙে বারো মাসে নিয়ে আসেন। রোমানরা জোড় সংখ্যাকে অশুভ হিসাবে বিবেচনা করতো। ফলে, যে সব মাস জোড় সংখ্যা দিয়ে শেষ হয়েছে, সেগুলো থেকে ১ দিন করে নিয়ে নেন নুমা। এতে করে ৬ দিন আসে। শীতকালের ৫১টা দিন তখনকার ক্যালেন্ডারে অব্যবহৃত ছিলো। এই একান্ন আর বিভিন্ন মাস থেকে তুলে নেওয়া ৬ দিন মিলে হলো সাতান্ন দিন। এ দিয়েই তিনি জানুয়ারি আর ফেব্রুয়ারি মাস তৈরি করলেন। জানুয়ারি পেলো ঊনত্রিশ দিন আর ফেব্রুয়ারির ভাগ্যে জুটলো আটাশ দিন। ফেব্রুয়ারি মাস অশুভই রয়ে গেলো রোমানদের কাছে।

নুমা জানুয়ারিকে বছরের প্রথম মাস করলেও, পহেলা জানুয়ারি বর্ষবরণের দিন হিসাবে পালিত হতো না। রোমানরা মার্চের এক তারিখকেই তখন পর্যন্ত বিবেচনা করতো বছরের শুরু হিসাবে।

এই অবস্থাটা পাল্টে যায় জুলিয়াস সিজারের সময়ে এসে। খ্রীস্টপূর্ব ৪৬ সালে রোমান ক্যালেন্ডারের যুগান্তকারী এক সংস্কার করা হয় এই সময়ে। এর আগ পর্যন্ত রোমান ক্যালেন্ডার ছিলো চান্দ্র মাসের হিসাবে, জুলিয়াস সিজার এসে সেটাকে সংশোধন করে সৌর মাসে রূপান্তর করেন। সেই সাথে ঘোষণা করেন জানুয়ারি মাসের প্রথম তারিখ নতুন বছর হিসাবে গণ্য হবে। পুরো রোমান সাম্রাজ্য জুড়েই তখন থেকে পহেলা জানুয়ারি বর্ষবরণের দিন হিসাবে পালিত হতে থাকে।

মধ্যযুগের ধর্মান্ধ ইউরোপ জানুয়ারি এক এর এই মর্যাদাকে কেড়ে নেয় প্যাগানদের সংস্কৃতি এবং পহেলা জানুয়ারির সাথে খৃস্টান ধর্মের কোনো যোগসূত্র নেই এই অভিযোগে। তাদের কেউ বড় দিনে, কেউ বা ইস্টারের দিনে বর্ষবরণ শুরু করে।

পরিস্থিতি আবার বদলে যায় পোপ ত্রয়োদশ গ্রেগরির সময়। তিনি এসে জুলিয়াস সিজারের করা ক্যালেন্ডারকে সামান্য কিছু সংশোধন করে চালু করে দেন। এই ঘটনা ঘটে ১৫৮২ সালে। পোপ করেছেন বলে ক্যাথলিক দেশগুলো সাথে সাথেই মেনে নেয় এই ক্যালেন্ডারকে। কিন্তু বাধ সাধে প্রটেস্টান্ট ধর্মবিশ্বাসী দেশগুলো। তাদেরকে ধর্মচ্যুত করে ক্যাথলিক বানানোর ষড়যন্ত্র হিসাবে এটাকে দেখেছিলো তারা, ফলে এই সংশোধনকে প্রত্যাখ্যান করে তারা।

ব্রিটিশরা প্রথম এই গ্রেগরিয়ান ক্যালেন্ডার গ্রহণ করে ১৭৫২ সালে। সেই থেকে ব্রিটিশ সাম্রাজ্যে এই ক্যালেন্ডার চালু হয়ে যায়। ব্রিটিশদের কাছ থেকে আমরা ভারতবর্ষীয়রা এই ক্যালেন্ডার পেয়েছি বলে এখনও আমরা একে গ্রেগরিয়ান ক্যালেন্ডার না বলে ইংরেজি ক্যালেন্ডারই বলি। নববর্ষকে ইংরেজি নববর্ষ বলে স্বাগত জানাই।

সবাইকে নতুন বছরের শুভেচ্ছা।

------------

সামান্য একটা অফটপিক। বাংলাদেশে শিশুদের পহেলা জানুয়ারি জন্ম হবার প্রবণতা বিশ্বের অন্য যে কোনো দেশের তুলনায় বহু বহু গুণে বেশি। দশ জন বাংলাদেশির অফিসিয়াল জন্ম তারিখ জিজ্ঞেস করুন, দেখবেন এদের মধ্যে কমপক্ষে পাঁচ জনেরই জন্মদিন এই পহেলা জানুয়ারিতে। বাচ্চা-কাচ্চা সব যাতে এই একদিনেই না জন্মায়, সেজন্য অভিবাবক এবং শিক্ষকদের সচেতনতা বিশেষভাবে কাম্য।

 

বিঃদ্রঃ নারী'তে প্রকাশিত প্রতিটি লেখার বিষয়বস্তু, ক্রিয়া-প্রতিক্রিয়া ও মন্তব্যসমুহ সম্পূর্ণ লেখকের নিজস্ব। প্রকাশিত সকল লেখার বিষয়বস্তু ও মতামত নারী'র সম্পাদকীয় নীতির সাথে সম্পুর্নভাবে মিলে যাবে এমন নয়। লেখকের কোনো লেখার বিষয়বস্তু বা বক্তব্যের যথার্থতার আইনগত বা অন্যকোনো দায় নারী কর্তৃপক্ষ বহন করতে বাধ্য নয়। নারীতে প্রকাশিত কোনো লেখা বিনা অনুমতিতে অন্য কোথাও প্রকাশ কপিরাইট আইনের লংঘন বলে গণ্য হবে।