পিতামহীর প্রতি পত্র – (পর্ব-২) মূলঃ আয়ান হারসি আলি

শনিবার, ডিসেম্বর ২৩, ২০১৭ ৯:২৫ PM | বিভাগ : সীমানা পেরিয়ে


ঘাসের মাদুর বুনতে বুনতে তুমি তীব্র চোখে তাকাতে, তোমার চোয়াল মুষ্টিবদ্ধ হয়ে উঠতো। মাদুর বোনাতে সামান্যতম ভুল হলেও তুমি খেঁকিয়ে উঠতে, অভিশাপ দিতে কঠোর গলায়। তুমি নিজে কঠোর পরিশ্রমী ছিলে। আমাদেরও তোমার মতো পরিশ্রমী হবার জন্য নিত্যদিন উপদেশ দিতে। “মেয়েরা, ঘর ঝাড়ু দাও, মাদুর পরিষ্কার করো, ছাগলের দুধ দোয়াও, আলো জ্বালো, আরো পানি নিয়ে আসো। মাংস কাটো, ধোও এবং রান্না করো। ধান তুলে আনো।”

তোমার অনবরত নির্দেশ এখনো আমার কানে বাজে। বর্ণমালা না শিখিয়ে তুমি আমাদের বাবার বংশতালিকা মুখস্থ করিয়েছিলে। তুমি জানলে খুবই কষ্ট পাবে যে আবেহ মারা গিয়েছে। বংশের উত্তরাধিকার টানার জন্য এখন মাত্র একটাই ছেলে আছে এই বংশে। সে আমার একমাত্র ভাই মাহাদ। যদিও মাহাদের বয়স চল্লিশের উপরে, তারও মাত্র একটা ছেলে। নাম জ্যাকব। জ্যাকবের জন্ম এগারো বছর আগে। হায়েয়া মারা যাবার দুই মাস আগে জন্ম তার।

জ্যাকবকে তার সংস্কৃতি সম্পর্কে বড়রা শিখাতে পারবে না। কারণ যে শিক্ষা তারা তাকে দিতে চেষ্টা করবে সেটা এখনকার সময়ে এবং যে জায়গায় তারা এখন বসবাস করে, সেখানে আর সচল নেই। এগুলো বহু আগেই আমার কাছে অর্থহীন এবং অপ্রয়োজনীয় মনে হতো। জ্যাকবের কাছে আরো বেশি অসম্পূর্ণ এবং অর্থহীন মনে হবে।

তালাল গাছের ছায়া থেকে এখন আমি বহু দূরে। আমাদের অসংখ্য আত্মীয়স্বজন এবং অন্যান্য মুসলমানদের মতো আমিও চিরকালের জন্য কাফেরদের দেশে স্থায়ী নিবাস গড়েছি।

দেশ কী সেটা তোমাকে বোঝাতে আমার সবসময়ই কষ্ট হয়েছে। আমার মনে আছে, কারিওকরে যখন আমরা এসেছিলাম, নাইরোবিতে আমি আমার স্কুলের ম্যাপ তোমার কোলের উপর বিছিয়ে ছিলাম। তুমি আমাকে আর হায়েয়াকে বিদ্রূপ করতে, বকাঝকা করতে আমরা আমাদের কেনিয়ান ক্লাসমেটদের সাথে খুব বেশি মাখামাখি করি বলে। তুমি তাদের ক্রীতদাস বলতে। আমি তোমাকে বলেছিলাম যে আমরা যে দেশে বসবাস করি সেই দেশের মানুষদের সম্মান করা উচিত। তুমি এই দেশ শব্দটা শুনে হতবুদ্ধি হয়ে গিয়েছিলে। সোমালিয়া যে একটা দেশ, সোমালিয়াতে বসবাস করেও সেটা তুমি জানতে না। শুনে হতবুদ্ধি হতে তুমি। তুমি আমাকে জিজ্ঞেস করেছিলে ইসাক এবং দারোদ গোত্রের গর্বিত সন্তানেরা কীভাবে অদৃশ্য এক রেখাকে মেনে নিয়েছে যেটা অতিক্রম করার অনুমতি তাদের নেই। তুমি তোমার কোল থেকে ম্যাপকে ছুড়ে ফেলে দিয়েছিলে। বলেছিলে, ম্যাপের এই ছবির মতো কৌশল এবং মায়াজাল তৈরি করে কাফেররা মানুষকে হাস্যকর সীমান্তরেখা এবং বেড়াকে গ্রহণ করাতে চায়। তোমার কথা হচ্ছে আমাদের প্রথম এবং প্রধান কাজ হবে আল্লাহ এবং বংশের প্রতি অনুগত থাকা।

দাদিমা, পৃথিবীতে অনেক দেশ আছে। ইসাক এবং দারোদের গর্বিত সন্তানদের অনৈক্যের বিষয়ে তোমার ধারণা অবশ্য সঠিক। এখন আর কোনো সোমালিয়া নেই। আমরা এখন অনাচার নৈরাজ্য,এবং হিংস্র কর্মকাণ্ডের জন্য কুখ্যাত। আমরা এখন জলদস্যু হিসাবে পরিচিত, পরিচিত আমাদের ধর্মীয় উগ্রতার জন্য, আর পরিচিত বিনা কারণে অন্যকে হত্যা করা এবং নিজে মরার জন্য।

সব জায়গাতেই এখন মুসলমানরা কঠিন পরিস্থিতির মধ্যে বসবাস করছে। বেশিরভাগ মুসলিম দেশেই এখন সন্ত্রাস এবং হুমকি-ধামকি রাজত্ব করছে। এদের বেশিরভাগই মানুষজনের উন্নত মনন তৈরি করতে ব্যর্থ হয়েছে। এই দেশগুলোর মধ্যে কোনো ঐক্য নেই, ভবিষ্যৎকে উন্নত করার কোনো মানসিকতাও নেই।

কিন্তু, শ্বেতাঙ্গ কাফেরদের দেশে জীবন ভিন্ন ধরনের। এখানে পতাকাই আসল ঐক্যের প্রতীক। তুমি আমাকে শক্তিমত্তাকে শ্রদ্ধা করতে শিখিয়েছো, জীবনে টিকে থাকার কলাকৌশলগুলো দেখার জন্য এবং শেখার জন্য চোখ খোলা রাখা শিখিয়েছো। দাদিমা, কাফেরদের টিকে থাকার কলাকৌশল আমাদের চেয়ে অনেক ভালোভাবে কাজ করে।

তোমার মনে আছে মোগাদিসুর সেই সব দুধ দোয়ানো নারীদের কথা? এরা ঘণ্টার পর ঘণ্টা ধরে অশান্ত গরুর দুই পায়ের মাঝে বসে থাকতো। ওলান ধরে টানাটানি আর চাপাচাপি করতো সর্বোচ্চ দুধ বের করার জন্য। কয়েকদিন আগে আমি হল্যান্ডের একটা ফার্মে গিয়েছিলাম। এলেন আমার প্রথম ডাচ বন্ধু। সে এই ফার্মেই জন্মেছে এবং বড় হয়েছে। ওদের পরিবারের গরুর সংখ্যা আমাদের দুধ দোয়ানো নারীদের চেয়ে কম। কিন্তু, সেগুলো অনেক বেশি হৃষ্টপুষ্ট এবং শান্ত। এগুলোর দুধ দোয়ানোর সময় যখন হলো, তখন এলেনের ভাই পাতলা নল নিয়ে এলো। এই নলগুলো দেখতে অনেকটা আমাদের সেইসব নলের মতো যেগুলো দিয়ে আমরা স্টোরেজ ব্যারেল থেকে আমাদের বালতিতে পানি সরাতাম। এলেনের ভাই সেই নলগুলোকে গাভীদের বাঁটে সেগুলোকে লাগিয়ে দিলো। গাভীগুলো তখন খড় খাওয়ায় ব্যস্ত। তারপর সে একটা ইলেকট্রিক সুইচ অন করলো। এরকম সুইচ আমরা সৌদি আরবে থাকতে বৈদ্যুতিক আলো জ্বালাতে ব্যবহার করতাম। আমাকে বিস্মিত করে দিয়ে এই নলগুলো গাভীর ফুলে থাকা বাঁট থেকে দুধকে চুষে নিয়ে খালি বালতিতে জড়ো করতে লাগলো। মাত্র এক ঘণ্টার মধ্যে এলেনের ভাই যে পরিমাণ দুধ দোয়ালো, সেটা হোডান এবং হলওয়াডাগের বাজারের সব মহিলার দোয়ানো দুধের চেয়েও বেশি।

কাফেরদের এই বিস্ময়কর প্রতিভা শুধু দুধ দোয়ানোর ক্ষেত্রেই সীমাবদ্ধ না। আমি তাদের জীবন প্রণালী খুব কাছে থেকে দেখেছি। দেখে ভেবেছি, আমার মতো তোমারও যদি সুযোগ থাকতো দেখার, তুমিও এদের কিছু কলাকৌশল শিখে নিতে পারতে। তুমি হয়তো সেক্ষেত্রে এতো সহজে মরতে না।

ডাচদের সফলতার গোপন রহস্য হচ্ছে নতুন কিছুকে গ্রহণ করার সক্ষমতা এবং নিত্য নতুন আবিষ্কার। সমস্যা সমাধানের তাদের যে মনোভাব, সেটা তাদেরকে প্রকৃতিকে নিজের দিকে ঝুঁকে আসতে বাধ্য করে, এর উল্টোটা না। আমাদের মূল্যবোধে দাদিমা, কাঁটাগাছ থেকে শুরু করে বাউবাব গাছ, সকাল থেকে শুরু করে সন্ধ্যা, সব কিছুই আমাদের অনড়। আমরা এমন এক ঈশ্বরের আনুগত্য মেনে চলি, যিনি কোনো কিছুর পরিবর্তনকেই সমর্থন করেন না। তিনিই সবকিছু ঠিক করে দিয়েছেন। সেখানে কোনো পরিবর্তনই কাম্য নয়।

আমাদের লোকেরা যখন মরুভূমির মধ্যে দিয়ে যায়, এক মরূদ্যান থেকে আরেক মরূদ্যানে আশ্রয় নেয় তারা। কিন্তু, আমরা নিজেরা কোনো স্থান তৈরি করি না যেখানে পানি পাওয়া যাবে। আমরা নদী কিংবা হ্রদ-কে শাসন করি না, এদের গতিপথকে পাল্টাই না নিজেদের ইচ্ছা অনুযায়ী। কিংবা মাটিতে গর্ত খুঁড়ে কোনো কুয়াও তৈরি করি না জলের জন্য।

চলমান…..


  • ২২৬১ বার পড়া হয়েছে

পূর্ববর্তী লেখা পরবর্তী লেখা

বিঃদ্রঃ নারী'তে প্রকাশিত প্রতিটি লেখার বিষয়বস্তু, ক্রিয়া-প্রতিক্রিয়া ও মন্তব্যসমুহ সম্পূর্ণ লেখকের নিজস্ব। প্রকাশিত সকল লেখার বিষয়বস্তু ও মতামত নারী'র সম্পাদকীয় নীতির সাথে সম্পুর্নভাবে মিলে যাবে এমন নয়। লেখকের কোনো লেখার বিষয়বস্তু বা বক্তব্যের যথার্থতার আইনগত বা অন্যকোনো দায় নারী কর্তৃপক্ষ বহন করতে বাধ্য নয়। নারীতে প্রকাশিত কোনো লেখা বিনা অনুমতিতে অন্য কোথাও প্রকাশ কপিরাইট আইনের লংঘন বলে গণ্য হবে।


মন্তব্য টি

লেখক পরিচিতি

ফরিদ আহমেদ

লেখক, অনুবাদক, দেশে থাকা অবস্থায় বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষকতা করতেন। দীর্ঘ সময় মুক্তমনা ব্লগের মডারেশনের সাথে জড়িত ছিলেন। যুদ্ধাপরাধীদের বিচারের রায়ের অনুবাদ করেছেন। বর্তমানে ক্যানাডা রেভেন্যু এজেন্সিতে কর্মরত অবস্থায় আছেন। টরন্টোতে বসবাস করেন।

ফেসবুকে আমরা