পিতামহীর প্রতি পত্র- (শেষ পর্ব) মূলঃ আয়ান হারসি আলি

রবিবার, ডিসেম্বর ৩১, ২০১৭ ৫:৩৯ AM | বিভাগ : সীমানা পেরিয়ে


দাদিমা, তোমার কি গোত্রপ্রধান ফারাহ গোরের কথা মনে আছে? এই গোত্রপ্রধান নাইরোবিতে আমাদের দেখাশোনা করেছিলেন। তিনি প্রচুর পরিশ্রম করে টাকা উপার্জন করেছিলেন। সেই টাকাকে তিনি সঠিকভাবে বি্নিয়োগ করেছিলেন। ধীরে ধীরে তাঁর ধনসম্পদ ফুলে ফেঁপে উঠেছিলো। তোমাদের সমাজের নৈতিক দায়িত্ব হিসাবে তাঁকে তাঁর সম্পদ ভাগাভাগি করতে হয়েছিলো আত্মীয়স্বজনদের সাথে। তাঁর সম্পদের ভাগ দিতে হয়েছিলো এমন সব ব্যক্তিদের, যারা জীবনে কোনোদিন নিজেরা কাজ করেনি, যাদের অনেকেই স্ত্রী-সন্তানদের ত্যাগ করে গিয়েছিলো। এরা সবাই ফারাহ গোরের উপর বসে বসে খেয়েছে, আরাম-আয়েসে জীবন কাটিয়েছে। এদের ভরণ-পোষণ চালাতে চালাতে ফারাহ নিজেই একদিন নিঃস্ব হয়ে গিয়েছিলেন। একই ঘটনা এখন ঘটছে আমেরিকায় বসবাস করা তোমার প্রিয়তম নাতি হাসানের ক্ষেত্রেও।

তুমি পুরনো কবিতা আবৃত্তি করতে এবং আমাকে দিয়ে মুখস্থ করানোর চেষ্টা করতে। আমি পারি নাই সেগুলোকে মুখস্থ করতে। আমি তোমাকে এবং তোমাদের পরের প্রজন্মকে ব্যর্থ করে দিয়েছি। আমি সেইসব কবিতাগুলোকে মনের মাঝে গেঁথে রাখতে পারি নাই, পারি নাই সেগুলোকে লিখেও রাখতে। তুমি এখন চলে গেছো এই পৃথিবী ছেড়ে। তোমার সাথে সাথে বিদ্বেষ এবং বিজয়ের, বাসনা এবং ভালবাসার, শঙ্কা এবং শৌর্যের, অহংকার এবং অপমানের, মহত্ব এবং ক্ষুদ্রতার সেইসব কবিতাগুলোও বিদায় নিয়েছে। তোমাকে যখন বালুমাটিতে কবর খুঁড়ে শুইয়ে দেওয়া হয়েছে, তখন তোমার সাথে সাথে পুরনো এই জ্ঞান এবং নীতিবাক্যসমূহও চলে গিয়েছে মাটির তলে।

আমি তোমার জন্য কাঁদছি না, কিন্তু স্মৃতি হারানোর জন্য বিলাপ করছি। আজকের এই নতুন পৃথিবীতে ওইসব পুরনো কবিতার কোনো সক্ষমতা নেই আমাদের টিকিয়ে রাখার ক্ষেত্রে। সোমালি গোত্রগুলো এখন ঝঞ্ঝাবিক্ষুব্ধ সাগরে অনিশ্চিতভাবে ভাসছে। বিশাল এবং বিরামহীন ঢেউ, তীব্রতর বিপুল স্রোতের বিরুদ্ধে লড়ার জন্য আমাদের কোনো বৈঠা নেই, নেই কোনো নৌকা কিংবা অন্য কোনো অবলম্বন। রক্তের উত্তরাধিকার এখন ক্লান্ত এবং অবসন্ন। এর উপর নির্ভর করতে গিয়ে এখন শুধু সন্ত্রাস আর হানাহানিই তৈরি হচ্ছে। ঐক্য এবং উন্নতির জন্য এটা এখন আর নির্ভর করার মতো কিছু না।

তোমার সন্তান এবং নাতি-নাতনিরা কোনো ধরনের ভিত্তি ব্যবস্থা বা পথনির্দেশনা ছাড়াই চলছে। লাদানের কথাই ধরো। তার বেয়াড়াপনা, কাফেরদের সঙ্গীত এবং বিনোদনের প্রতি তার আকর্ষণের কারণে তুমি সবসময়ই তাকে ঘৃণা করতে। সে এখন ব্রিটেনে আছে। এক সময় যারা তার প্রতি দয়া দেখিয়ে তাকে খাদ্য, আশ্রয় আর আর্থিক সাহায্য-সহযোগিতা দিয়েছে, আজ তারাই তাকে নিরতিশয় অপছন্দ করে। সে তোমার প্রত্যাশার মানে পৌঁছাতে পারেনি, আবার ওইসব কাফেরদের প্রত্যাশাও সে পূরণ করতে পারেনি। সে নিজেকে গোত্রের একটা অংশ এখনো মনে করে, কিন্তু এটা তার জন্য কোনো অর্থই বহন করে না। সে হারিয়ে গিয়েছে বিপরীতমুখী এই দুই প্রত্যাশার মাঝে।

কাফেরদের দিকনির্দেশিত পথেই উদ্ধারের উপায় রয়েছে দাদিমা। কাফেররা অসংখ্য স্মৃতিবিজড়িত বই ছেপেছে, নিবন্ধিত করে রেখেছে। তারা লেন্সের মধ্য দিয়ে তাকিয়ে অদৃশ্য এক প্রাণী জগত দেখতে পায়। এই অদৃশ্য প্রাণীরা আমাদের চারপাশে থাকে, কেউবা বসত করে আমাদের শরীরের ভিতরেই। আমাদের শরীরকে রক্ষা করার জন্য কাফেররা ওষুধ আবিষ্কার করেছে। এই ওষুধ ওইসব প্রাণীদের আক্রমণ করে। দাদিমা, জ্বর এবং অন্যান্য অসুস্থতা জিন-প্রেতের কারণে ঘটে না। ঘটে না পূর্বপুরুষের কবর থেকে উঠে এসে আমাদের পীড়ন করার কারণে। কিংবা ঘটে না ঈশ্বরের আমাদের উপর রেগে যাবার কারণে। এর পিছনে রয়েছে অদৃশ্য জীবাণু, যাদেরকে পরজীবী, ব্যাক্টেরিয়া এবং ভাইরাস বলা যেতে পারে। কাফেরদের ওষুধ আমাদের ওষুদের চেয়ে অনেক ভালো ভাবে কাজ করে। কারণ, তাদের ওষুধ তৈরি হয়েছে তথ্য, অনুসন্ধান এবং প্রকৃত জ্ঞানের ভিত্তিতে।

কাজ, অর্থ, সন্তান উৎপাদন এবং অবসর সময়ের প্রতি কাফেরদের যে মনোভাব, সেটাকে যতো দ্রুত আমরা গ্রহণ করতে পারবো, ততোই আমাদের জীবন সহজ এবং উন্নততর হবে। সরল জীবনের ব্যাপারে তোমার চিন্তা-ভাবনা আমি জানি। খুব বেশি সরল জীবন শৃঙ্খলা এবং নৈতিকতাকে শিথিল করে দেয়। তুমি এমনকি ওয়াশিং মেশিনকেও গালমন্দ করো। মেশিন যদি আমাদের কাপড়-চোপড় এবং থালা-বাসনকে ধুয়ে দিতো, তুমি রাগে গজগজ করে বলতে অল্পবয়েসী মেয়েরা এবং নারীরা অনেক বেশি অবসর সময় পেয়ে যাবে। ফলে, তারা সব খারাপ কাজের প্রতি আকৃষ্ট হবে এবং এতে করে তাদের ছিনাল হয়ে যাবার সম্ভাবনা রয়েছে।

ওয়াশিং মেশিনের ব্যাপারে এক অর্থে তুমি সঠিক, আবার আরেক অর্থে ভুল। অবক্ষয়ের বিরুদ্ধে লড়াই করার সেরা ওষুধ হচ্ছে লক্ষ্যের দিকে দৃষ্টি নিবদ্ধ করা। এর বদলে তুমি প্রার্থনাও করতে পারো, তবে সেটা আদৌ কোনো কাজে আসে কিনা সেটা জানা নেই আমার। আমি কাফেরদের দেশে এসেছি। এখানে মেশিন আমাদের কাপড় এবং বাসনপত্র ধুয়ে দেয়। এখানে আমরা দোকান থেকে অনলাইনে খাবার অর্ডার দেই। এগুলো করে দিনের অসংখ্য কর্ম ঘণ্টাকে বাঁচাই আমরা। এর জন্য আমি অলস হয়ে যাইনি। বরং আমি অনেক বেশি কার্যকর হয়েছি। সেই সাথে আমার আনন্দ করার অবসর সময়ও বেড়েছে। আনন্দ করাটা সবসময়ই জীবনের জন্য উপকারী।

দাদিমা, আমি আর পুরনো দিনে বিশ্বাস করি না। তোমার জীবদ্দশাতেই পৃথিবীটা পাল্টানো শুরু হয়েছে। আর আজকের সময়ে এসে পুরনো পন্থা আর আমার জন্য উপযোগী নেইও। আমি তোমাকে ভালবাসি। সোমালিয়ার সব স্মৃতিকে নয়, কিছু কিছু স্মৃতিকেও আমি এখনো ভালবাসি। কিন্তু আমি আর কখনোই রক্তের উত্তরাধিকারের প্রতি আনুগত্য দেখাবো না। আল্লাহ-র প্রতি আনুগত্যও আমি আর দেখাচ্ছি না। ওই বিশ্বাস থেকে সরে এসেছি আমি। পুরনো পন্থা যেহেতু আমাদের বহু লোকেরই জীবনকে ক্ষতিগ্রস্থ করছে, আমি আমার গোত্রের যাযাবর মানুষেরা সেই পন্থাকে যাতে পরিত্যাগ করে সেজন্য আপ্রাণ চেষ্টা চালাবো আমি।

********************************************************************************
আয়ান হারসি আলির জন্ম সোমালিয়াতে। জন্মেছিলেন একটা মুসলিম পরিবারে। তাঁর শৈশব, কৈশোর এবং তারুণ্য কেটেছে আফ্রিকাতে এবং সৌদি আরবে। ১৯৯২ সালে তিনি শরণার্থী হিসাবে নেদারল্যান্ডে যান। দূর সম্পর্কের এক কাজিনের সাথে বিয়ে হয়েছিলো তাঁর। এই বিয়ে হয়েছিলো তাঁর অসম্মতিতে, পরিবারের চাপে। যাঁর সাথে তাঁর বিয়ে হয়েছিলো, তিনি তাঁকে কখনোই দেখেননি। বর থাকতো ক্যানাডায়। এই বিয়ে থেকে পালাতে গিয়েই নেদারল্যান্ডে আশ্রয় নেন তিনি। সেখানে ডাচ ভাষা শেখেন তিনি। অনুবাদক হিসাবে কাজ করেন গর্ভপাত ক্লিনিকে এবং পারিবারিক সহিংসতার শিকার নারীদের আশ্রয়কেন্দ্রে। রাষ্ট্রবিজ্ঞানে কলেজ ডিগ্রি শেষ করার পরে তিনি লেবার পার্টির সাথে কাজ করা শুরু করেন। নাইন-ইলেভেনের সন্ত্রাসী হামলার পরে তিনি ইসলাম ত্যাগ করেন এবং ডাচ পার্লামেন্টের সদস্য হন। ইউরোপের মুসলিম নারীদের অধিকার এবং ইসলাম ধর্মকে আধুনিক এবং আলোকিত করার কাজে নিজেকে নিয়োজিত করেন। তিনি ওয়াশিংটন ডিসির আমেরিকান এন্টারপ্রাইজে কাজ করতে যান। তাঁর তত্ত্বাবধানে আয়ান হারসি আলি ফাউন্ডেশন গরে ওঠে। এই ফাউন্ডেশনের মূল কাজ হচ্ছে নারীদের প্রতি ঘটা বিভিন্ন ধরনের অপরাধের বিরুদ্ধে লড়াই করা। এর মধ্যে অন্যতম হচ্ছে নারীদের খৎনা করা, জোর করে বিয়ে দেওয়া, অনার কিলিং ইত্যাদি। এই লড়াইটা তিনি এবং তাঁর ফাউন্ডেশন চালাচ্ছে নারীদের শিক্ষিত করে তোলা এবং জ্ঞানের প্রসারের মাধ্যমে।

তাঁর লেখা বই ইনফিডেল এবং হেরেটিক ইউরোপে বেস্ট সেলারের মর্যাদা পেয়েছে। সারা বিশ্ব থেকে তিনি নানা ধরনের সম্মান অর্জন করেছেন। টাইম ম্যাগাজিন ২০০৫ সালের সবচেয়ে ক্ষমতাবান একশো জন নারীর তালিকায় তাঁকে অন্তর্ভুক্ত করেছে, গ্লামার হিরো হিসাবে ঘোষণা দিয়েছে। রিডার্স ডাইজেস্ট তাঁকে ২০০৫ সালের সেরা ইউরোপিয়ান হিসাবে স্বীকৃতি দিয়েছে। তিনি নরওয়ের হিউম্যান রাইটস সার্ভিস বেল-ওয়েদারের বর্ষ সেরা পুরস্কারও জিতেছেন। জিতেছেন ড্যানিশ ফ্রিডম প্রাইজ, সুইডিশ ডেমোক্রেসি প্রাইজ এবং মার্টিন লুথার কিং জুনিয়র আনসাং হিরোজ এওয়ার্ড।

তাঁর আত্মজীবনীমূলক গ্রন্থ "নোমাডের" একটা অধ্যায়ের শিরোনাম হচ্ছে “লেটার টু মাই গ্র্যান্ডমাদার”। সেই অধ্যায়েরই অনুবাদ আমি করেছি “পিতামহীর প্রতি পত্র” নামে।

এক ভাষা থেকে আরেক ভাষায় অনুবাদ খুবই দুঃসাধ্য একটা কাজ। অনুবাদ আসলের মতো প্রাঞ্জল হয় না, আড়ষ্টতা থেকে যায়। আমার অনুবাদেও তাই হবে। তারপরেও এই কাজটা করেছি এই ভেবে যে বাংলাদেশে অনেক মানুষই ইংরেজিতে খুব একটা দক্ষ নয়। ইংরেজি ভাষায় কোনো কিছু পড়ে স্বাচ্ছন্দ্যবোধ করে না তারা। নিজের ভাষাতে পড়তে চায় সবকিছু।

অনুবাদের ফলে যে জড়তাযুক্ত ফলাফল আসে, সেটাকে খানিকটা উপশম করার জন্য খানিকটা মুক্ত অনুবাদ করেছি আমি। ইংরেজির সাথে মিলালে আমার এই অনুবাদ হুবহু মিলবে না। মূল অনুবাদের সাথে না মিললেও, মূল ভাবটা ঠিকই পাঠক পাবেন, সে ব্যাপারে নিশ্চিত আমি।


  • ২২২০ বার পড়া হয়েছে

পূর্ববর্তী লেখা পরবর্তী লেখা

বিঃদ্রঃ নারী'তে প্রকাশিত প্রতিটি লেখার বিষয়বস্তু, ক্রিয়া-প্রতিক্রিয়া ও মন্তব্যসমুহ সম্পূর্ণ লেখকের নিজস্ব। প্রকাশিত সকল লেখার বিষয়বস্তু ও মতামত নারী'র সম্পাদকীয় নীতির সাথে সম্পুর্নভাবে মিলে যাবে এমন নয়। লেখকের কোনো লেখার বিষয়বস্তু বা বক্তব্যের যথার্থতার আইনগত বা অন্যকোনো দায় নারী কর্তৃপক্ষ বহন করতে বাধ্য নয়। নারীতে প্রকাশিত কোনো লেখা বিনা অনুমতিতে অন্য কোথাও প্রকাশ কপিরাইট আইনের লংঘন বলে গণ্য হবে।


মন্তব্য টি

লেখক পরিচিতি

ফরিদ আহমেদ

লেখক, অনুবাদক, দেশে থাকা অবস্থায় বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষকতা করতেন। দীর্ঘ সময় মুক্তমনা ব্লগের মডারেশনের সাথে জড়িত ছিলেন। যুদ্ধাপরাধীদের বিচারের রায়ের অনুবাদ করেছেন। বর্তমানে ক্যানাডা রেভেন্যু এজেন্সিতে কর্মরত অবস্থায় আছেন। টরন্টোতে বসবাস করেন।

ফেসবুকে আমরা