পিতামহীর প্রতি পত্র- (পর্ব-৩) মূলঃ আয়ান হারসি আলি

মঙ্গলবার, ডিসেম্বর ২৬, ২০১৭ ২:৪৫ AM | বিভাগ : সীমানা পেরিয়ে


দাদিমা, ইয়েমেন ভ্রমণের কথা কি তোমার মনে আছে? সুল থেকে যাত্রা করে সাগরের ওপারের ইয়েমেনে গিয়েছিলে তুমি। তুমি নিশ্চয় দিনের পর দিন হেঁটেছিলে এর জন্য। তারপর তুমি কোনো পশুতে টানা গাড়ি বা ট্রাক মালিককে টাকা দিয়েছিলে মরুভূমি পার করে তোমাকে বারবারা বন্দরে নিয়ে যাবার জন্য। এরপর তুমি ছোট একটা নৌকায় করে পাড়ি দিয়েছিলে সাগর। সেই ছোট নৌকাটা ছিলো জাদুর নৌকা। তুমি এক জাদুর নৌকায় বসেছিলে। আর সেটা তোমাকে নিয়ে গিয়েছিলো এক সময় থেকে ভিন্ন আরেক সময়ে। তুমি অবশ্য সেটা টের পাওনি। কিন্তু, তুমি তোমার জীবনে একবারের জন্য একশো বছর পরের সময়ে চলে গিয়েছিলে।

এই রোমাঞ্চযাত্রায় তুমি একা নও দাদিমা। তোমার মতো আরো হাজার হাজার মানুষ বের হয়ে এসেছে তাদের পাতায় ছাওয়া কুটির থেকে, তাদের ঝরনা, কুয়ো এবং মরূদ্যান থেকে। বের হয়ে এসেছে তাদের গোত্র থেকে, বের হয়ে এসেছে তাদের দেবতা এবং অপদেবতার বিশ্বাস থেকে। সারা বিশ্বের বিভিন্ন কোণ থেকে হাজার হাজার মানুষেরা ভবিষ্যতের দিকে বিশাল এক লাফ দিয়েছে।

তুমি যদি কিছু নাও করতে, কোথাও ভ্রমণে নাও যেতে, তোমার কুঁড়েঘরেই যদি তুমি আজীবন বসবাস করতে, যদি তুমি অজস্রবার এই কুঁড়েঘরকে গুটিয়ে উটের পিঠে তুলে নিতে, তারপর স্বামী, সন্তান-সন্ততি, তাদের স্বামী বা স্ত্রী এবং নাতি-নাতনিদের নিয়ে আরো অনেকের সাথে অন্য চারণভূমিতে রওনা দিতে, তবুও আধুনিক জীবন তোমার কাছে একদিন না একদিন আসতোই। আধুনিক জীবন এখন বুলেট, ইট, আদেশ-নির্দেশ আর ইউনিফর্ম পরা মানুষের মাধ্যমে ছড়িয়ে পড়েছে সারা বিশ্বে।

দাদিমা, তুমি আমাকে যেসব নৈতিকতা শিক্ষা দিয়েছিলে, সেগুলোকে আমি কাফেরদের নৈতিকতার সাথে তুলনা করে দেখেছি। সেই তুলনার ফলাফল থেকে তোমাকে বলতে বাধ্য হচ্ছি যে, তোমার পূর্বপুরুষের যে নৈতিকতা তার চেয়ে কাফেরদের নৈতিকতা অনেক বেশি কার্যকর।

তুমি আমাকে সন্দেহ এবং অবিশ্বাসের মাহাত্ম শিখিয়েছিলে। ইসলাম আমাদের শিখিয়েছে নিজে যা নয়, সেটা হিসাবে ভাণ করা। মাহাদ যখন আমাকে আমার অসতর্কতার সুযোগ নিয়ে ধাক্কা দিয়ে পায়খানার চাঁড়ির মধ্যে ফেলে দিয়েছিলো, তুমি আমার উপর চড়াও হয়েছিলে। কারণ, তোমার চোখে আপন ভাইকে বিশ্বাস করাটাও বোকামিরই নামান্তর। ‘সবসময় সতর্ক থাকো’ এটাই ছিলো তোমার মূল বাণী। কিন্তু, কথা হচ্ছে, সবসময় তুমি সতর্ক থাকলে একসময় ক্লান্তি এসে যেতে বাধ্য। আমাদের সারাক্ষণ সতর্ক থাকতে হচ্ছে, কারণ, সামান্যতম অসতর্কতা দেখালেই অন্য একজন সেটার সুযোগ নিয়ে ফেলবে। এর অর্থ হচ্ছে, তুমি কারো সাথেই আন্তরিকভাবে যৌথ বা দলবদ্ধ কাজ করতে পারবে না এবং লজ্জার ভয়ে তুমি এমন কোনো কাজের ঝুঁকি নেবে না যেটাতে ভুল করলে সবার সামনে তোমাকে বিব্রতকর অবস্থায় পড়তে হবে।

কাফেররা সততা এবং বিশ্বাসের উপর জোর দেয়। এখানে, যেখানেই তুমি যাও না কেনো, কাউকে না কাউকে তোমার বিশ্বাস করতেই হবে। কোথাও যাবার জন্য প্লেনে চড়ছো, বাচ্চাকে স্কুলে দিচ্ছো, তুমি যখন অসুস্থ হয়ে ডাক্তারের কাছে যাচ্ছো, খাবার কিনছো, সব জায়গাতেই তোমাকে কাউকে না কাউকে বিশ্বাস করতেই হচ্ছে। এবং সব জায়গাতেই বিশ্বাস করার মতো লোকও রয়েছে এখানে।

কাফেররা জীবনকে পরীক্ষা হিসাবে বিবেচনা করে না। ইহকাল থেকে পরকালের সেতু হিসাবে ভাবে না। ইহকালকেই তারা জীবনের শেষ ধাপ হিসাবে বিবেচনা করে এবং এর মধ্যেই আনন্দময়তা রয়েছে বলে তারা ভাবে। পৃথিবীর এই জীবনটাকেই আরামদায়ক এবং স্বাস্থ্যকর করার জন্য সে তার সমস্ত সম্পদ, মেধা এবং প্রতিষ্ঠানকে কাজে লাগায়। সে পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতা, স্বাস্থ্যকর খাবার, এবং সঠিক পরিমাণ বিশ্রামের বিষয়ে আবিষ্ট। সে তার স্ত্রী এবং সন্তানদের প্রতি বিশ্বস্ত। সে হয়তো তার পিতা-মাতার যত্ন নিতে পারে, তবে অসীম সংখ্যক পূর্বপুরুষের স্মৃতি দ্বারা ভারাক্রান্ত নয়। তার পরিশ্রমে উপার্জিত সবটুকু অর্থই সে ব্যয় করে শুধু তার সন্তানদের জন্য। এগুলোর কোনো কিছু তাকে ব্যয় করতে হয় না ভাইদের জন্য বা কাকাদের জন্য। যাদের সাথে তার বন্ধুত্ব হয় তাদের প্রতি সে বিশেষ ধরনের ভালোবাসা, দরদ এবং বদান্যতা দেখায়। এই সম্পর্ক রক্তের সম্পর্ক দিয়ে নির্দেশিত নয়, বরং গড়ে ওঠে মনের মিলের কারণে।

কাফেররা যেহেতু নতুন ধারণায় বিশ্বাস করে এর উদ্ভাবনে চেষ্টা চালায়, সে কারণে কাফেরদের দেশে প্রাচুর্যের ছড়াছড়ি রয়েছে। শান্তি, জ্ঞান এবং ভবিষ্যৎ সম্পর্কে নিশ্চিত এমন পরিবেশে মেয়ে সন্তানের জন্ম চমৎকার একটা ঘটনা এখানে। এর জন্য মুখ গোমড়া করে রাখার কিছু নেই, খিটিমিটি আচরণ করারও কোনো কারণ নেই। বরং মেয়ে শিশুর জন্মের জন্য আনন্দ এবং উদযাপন করার সকল কারণই রয়েছে। এখানে একটা মেয়ে শিশু স্কুলে ছেলে শিশুর পাশেই বসে, ছেলে শিশুর সমপরিমাণই সে খেলাধুলার সুযোগ পায়, ছেলে শিশু যে ধরনের এবং পরিমাণ খাবার খায়, মেয়ে শিশুও তাই পায়। অসুস্থ হলে ছেলে শিশু যে যত্ন পায়, মেয়ে শিশুও একই যত্ন পায়। যখন সে প্রাপ্তবয়স্ক হয়, সেও তার সঙ্গিনী নির্বাচনের ক্ষেত্রে একজন ছেলের সমানই সুযোগ পায়।

দাদিমা, আমি জানি, যে কথাগুলো তোমাকে আমি বললাম, সেগুলো শুরুতেই তোমাকে প্রচণ্ড ধাক্কা দেবে এবং কুপিত করবে। কিন্তু, তুমি যখন শান্ত হবে এবং ঠাণ্ডা মাথায় ভাববে, তখন তুমি বুঝতে পারবে যে, এক বাচ্চাকে বড় করে অন্য বাচ্চাদের অনুগত এবং দাস বানানোর কোনো প্রয়োজন নেই। যেমন প্রয়োজন নেই মেয়ে বাচ্চার যৌনাঙ্গে খৎনা করে তাকে অন্য পুরুষের জন্য সংরক্ষণ করা, যে কিনা তার শরীরের অধিকার কিনে নেবে বিয়ের নামে।

কাফেররা তোমার মতোই মিতব্যয়িতার স্তব করে। কিন্তু, তারপরেও এখানে সম্পদের প্রদর্শনকে গুরুত্ব দেওয়া হয়। এখানে সম্পদের প্রাচুর্যতা এবং অপ্রাচুর্যতা দিয়ে মানুষ শ্রেণি বিভাজিত। তারা মতাদর্শ এবং ভাবাদর্শ দিয়েও বিভক্ত। এই পার্থক্যের কারণে মানুষের মধ্যে সবসময়ই বিতর্ক হচ্ছে। কিন্তু, বহু আগের একক পূর্বপুরুষ থাকার মিথ্যা ভ্রাতৃত্বের আশ্বাস থেকে, এটা অনেক বেশি বাস্তবসম্মত। একজন সাধারণ পূর্বপুরুষের রক্তের উত্তরাধিকারের কারণে গড়ে উঠা ভণ্ডামিময় ঐক্যের চেয়ে, বাস্তব এবং কার্যকর সাধারণ সমস্যার ভিত্তিতে গড়ে ওঠা এই সংগঠনগুলো অনেক বেশি অকৃত্রিম এবং অবিচল।


  • ১৬৬০ বার পড়া হয়েছে

পূর্ববর্তী লেখা পরবর্তী লেখা

বিঃদ্রঃ নারী'তে প্রকাশিত প্রতিটি লেখার বিষয়বস্তু, ক্রিয়া-প্রতিক্রিয়া ও মন্তব্যসমুহ সম্পূর্ণ লেখকের নিজস্ব। প্রকাশিত সকল লেখার বিষয়বস্তু ও মতামত নারী'র সম্পাদকীয় নীতির সাথে সম্পুর্নভাবে মিলে যাবে এমন নয়। লেখকের কোনো লেখার বিষয়বস্তু বা বক্তব্যের যথার্থতার আইনগত বা অন্যকোনো দায় নারী কর্তৃপক্ষ বহন করতে বাধ্য নয়। নারীতে প্রকাশিত কোনো লেখা বিনা অনুমতিতে অন্য কোথাও প্রকাশ কপিরাইট আইনের লংঘন বলে গণ্য হবে।


মন্তব্য টি

লেখক পরিচিতি

ফরিদ আহমেদ

লেখক, অনুবাদক, দেশে থাকা অবস্থায় বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষকতা করতেন। দীর্ঘ সময় মুক্তমনা ব্লগের মডারেশনের সাথে জড়িত ছিলেন। যুদ্ধাপরাধীদের বিচারের রায়ের অনুবাদ করেছেন। বর্তমানে ক্যানাডা রেভেন্যু এজেন্সিতে কর্মরত অবস্থায় আছেন। টরন্টোতে বসবাস করেন।

ফেসবুকে আমরা