পাহাড়ের সমস্যায় সমতলের মানুষকেই আগে প্রতিবাদ করতে হবে

রবিবার, জানুয়ারী ২৮, ২০১৮ ৩:২৩ PM | বিভাগ : প্রতিক্রিয়া


(১) 
রাঙ্গামাটি গেছেন না আপনি? বিলাইছড়ি জায়গাটা রাঙ্গামাটি থেকে একটু দুরে। বিলাইছড়ির ফারুয়া গ্রামটি ভৌগলিকভাবে রাঙ্গামাটি থেকে যতটা দুরে, আধুনিক সুযোগ সুবিধা শিক্ষা এইসব দিক দিয়ে তার চেয়ে অনেক অনেক দুরে। সেইখানে দুইটা মারমা মেয়ের উপর নির্যাতন হয়েছে। কয়দিন আগে রাতের বেলা এই ঘটনাটা ঘটেছে। সেরাতে এই ঘটনা যখন ঘটে, ঠিক সেসময় সেখানে সেনাবাহিনীর একটা অভিযান চলছিলো- গ্রামটিতে বাড়ী বাড়ী ঢুকে সেনাবাহিনীর লোকেরা তল্লাসি চালাচ্ছিলো।

মেয়ে দু’টির রাঙ্গামাটি হাসপাতালে চিকিৎসা চলছে। ডাক্তাররা বলেছেন একটি মেয়েকে ধর্ষণ করা হয়েছে আর ওর ছোট বোনটিকে যৌন নির্যাতন করা হয়েছে। শারীরিক আঘাত আর মানসিক ট্রমা মিলিয়ে দুটি কিশোরীই বিপর্যস্ত।

অভিযোগ উঠেছে সেনাবাহিনীর লোকেরা মেয়ে দু’টির উপর নির্যাতন করেছে। অভিযোগটা আমি জেনেছিলাম কয়েকটা প্রায় অপরিচিত ওয়েব পোর্টাল ও কয়েকজন বন্ধুর ফেসবুক পোষ্ট থেকে। সেটা দেখে আমি একটা পোষ্ট দিয়েছিলাম সকলকে অনুরোধ জানিয়ে ওরা যেন ঘটনার সত্যতা কতোটুকু আছে সেটা একটু খোঁজ খবর নিয়ে জানান। সেই সূত্রেই বন্ধুরা আমাকে জানিয়েছেন যে নির্যাতনের ঘটনা সত্যি। সেনাবাহিনীর সদস্যদের দিকেই সন্দেহ সকলের। আমার বন্ধুরা, ওঁরা দায়িত্বশীল লোক, আমাকে বলেছেন ঘটনার পূর্ণ সত্যতা না জেনে যেন 'উল্টাপাল্টা' কিছু না লিখি।

আমি আমার বন্ধুদের কথা রেখেছি। যতটুকু সম্ভব বিস্তারিত ঘটনাবলী জেনেছি। আমি মেয়ে দুটির নাম জেনেছি, ওদের অসহায় হতভাগা পিতা আর মাতার নাম জেনেছি। এ পর্যন্ত ফেসবুকে কিছু লিখি নি।

এর মধ্যে নানান ঘটনা ঘটেছে। রাসেল মারমা নামের এক ভদ্রলোক, তিনি মারমা সামাজিক সাংস্কৃতিক সংগঠনের নেতা, তিনি মেয়ে দুটির বাবা মাকে নিয়ে একটা প্রেস কনফারেন্স করেছেন রাঙ্গামাটিতে। বিচিত্র একটা প্রেস কনফারেন্স। রাসেল মারমা সেখানে একটা লিখিত বক্তব্য পাঠ করেছেন যার অফিশিয়াল বক্তব্য হচ্ছে ধর্ষককে কেউ দেখতে পায় নি, নির্যাতনকারী কারা সেটা আমরা জানি না। আর অন্তর্নিহিত বয়ান হচ্ছে, ধর্ষণ সেনাবাহিনীর লোকেরা করে নি। উনি সেটাই প্রতিষ্ঠিত করতে চেয়ে প্রেস কনফারেন্স করেছেন। সেই প্রেস কনফারেন্সে আবার মেয়ে দু’টির ছোট ভাইটিও উপস্থিত ছিলো। ওকে যখন প্রশ্ন করা হলো, সে কিছু দেখেছে কিনা, বাচ্চাটি কিন্তু ঠিক ঠিক বলে দিলো যে ধর্ষকদের পরনে আর্মির পোশাক ছিলো।

(২) 
প্রথমে তো কেউ মুখ ফুটে এটাও বলছিলো না যে ধর্ষণ ঘটেছে। ঢাক ঢাক গুড় গুড়। ধর্ষণের পরের দিন মেয়ে দু’টিকে রাঙ্গামাটিতে আনা হয়েছে বোটে করে। হাসপাতালে ভর্তি করা হয়েছে। ওদের সাথে দেখা করতে গেল চাকমা সার্কেলের রাজা দেবাশিষ রায় ও রানী য়েন য়েন। ওদের সাথে ছিলেন প্রফেসর বাঞ্ছিতা চাকমা। রাজা ওঁর ফেসবুকে পঁচিশ তারিখে পোষ্ট দিয়ে জানিয়েছেন প্রশাসন কি আচরণ করেছে ওঁদের সাথে। বলে কিনা রাজা রানী ভিক্টিম মেয়েদের সাথে দেখা করতে হলে নাকি ডিসি এসপি সাহেবদের অনুমতি লাগবে! চিন্তা করেন। রাজা একজন ব্যারিস্টার, তাঁকে ওরা শিখাচ্ছে তিনি নাকি তাঁর সার্কেলের দুইটা নির্যাতিতা মেয়ের সাথে কথা বলতে পারবেন না, তার জন্যে ডিসি সাহেবের 'অনুমতি' লাগবে। আর আছে মারমা মেয়েদের ভাষা নিয়ে অবজ্ঞা করা।

এইসবের পরেও রাজা দেবাশিষ রায় আর রানী য়েন য়েন ভিক্টিমদের সাথে দেখা করেছেন। ভিক্টিম মেয়েগুলি ওঁদেরকে স্পষ্ট করে বলেছে "তাঁদের একজন ধর্ষিত হয়েছেন দুইজন সেনা সদস্য দ্বারা (প্রাপ্ত বয়স্ক বড় বোন, যিনি কেবল মারমা ভাষায় কথা বললেন) এবং অপরজন যৌন হয়রানীর শিকার হয়েছেন, একই ব্যক্তিদের দ্বারা (অপ্রাপ্ত-বয়স্ক ছোট বোন, যিনি কিছু বাংলা ও ভাঙ্গা-ভাঙ্গা চাকমা বলতে পাড়েন)।" রাজার ভাষ্য অনুযায়ী, "তাঁরা ভিত-সন্ত্রস্ত। তাঁদের প্রয়োজন নিরাপত্তার। নির্ভয়ের। তাঁদের প্রয়োজন আইনি সহায়তার। দক্ষ দোভাষীর। এবং কোনো ধরণের বাঁধা ও হস্তক্ষেপ ছাড়া যথাযথ তদন্ত, মামলা, দোষীদের শাস্তি ও তাঁদের পুনর্বাসন।"

কে করবে এটা? কে এই অসহায় মারমা মেয়ে দুইটাকে নিরাপত্তা দিবে? কে ওঁদেরকে আশ্বস্ত করবে? রানী য়েন য়েন বলেছেন, "let's bring our girls back to us", পরম মমতায় সাহসিকতার সাথে রানী চেয়েছেন ওঁদের কন্যাদেরকে ওঁরা নিজেদের কাছে নিজেদের আশ্রয়ে নিয়ে আসতে চান। ভিক্টিম মেয়েদু’টিও ওদের রানিমার কাছে যেতে চায়, ওদের রানিমার আশ্রয়ে ওঁরা নিরাপদ বোধ করবে। ইতিমধ্যে রানী ওদেরকে ওদের নিজেদের খাদ্যাভ্যাস অনুযায়ী খাবার দেওয়া থেকে শুরু করে এই দুই বোনের দেখাশোনার ব্যবস্থা করেছেন।

গতকাল যখন রানী গিয়েছেন মেয়ে দুটিকে আনতে, স্থানীয় প্রশাসন রানীর সাথে মেয়ে দু’টিকে আসতে দেয় নি। হাসপাতালে যখন এসব চলছে, রানী দিশেহারার মতো প্রশাসন আর স্থানীয় নেতৃবৃন্দের সাথে কথা বলছেন, সকলকে বুঝাতে চাইছেন, তখন স্বতঃস্ফূর্তভাবে লোকজন জড়ো হওয়া শুরু হয়। মানুষের মধ্যে ভয় দেখা দেয়, মেয়েদুটিকে আবার না অন্য কোথাও সরিয়ে নেওয়া হয়। অসংখ্য মানুষ হাসপাতালের চারপাশে জড়ো হয়ে ঘিরে রাখে।

(৩) 
এখনো পর্যন্ত মেয়ে দু’টি হাসপাতালেই আছে। ভিত সন্ত্রস্ত আতঙ্কিত।

সেদিন হাসপাতালের ঘটনা বলতে গিয়ে রানী সাহেবা ওঁর ফেসবুক পোস্টে লিখেছেন, "যারা যারা সংহতি জানাতে সব ভয় তুচ্ছ করে হাসপাতাল প্রাঙ্গণে ছুটে এসেছিলেন, সকলের প্রতি কৃতজ্ঞতা জানাই। আমার একটিই আক্ষেপ মেয়ে দুইজন স্বচক্ষে এটি দেখতে পারে নি, আমার কাছ থেকে বর্ণনা শুনতে হয়েছে। একইভাবে আমি আপনাদের জানিয়ে দিই, আপনাদের এত জনের উপস্থিতির কথা শুনে বড় বোনটির দুই চোখ থেকে কেবল পানি ঝরেছে। কিছু বলার মতো অবস্থা তার ছিলো না। এই মুহূর্তটির কথা আমার আজীবন মনে থাকবে।"

আপনারা কি নিজেদেরকে একবার ঐ মেয়েদুটির জায়গায় ভাবতে পারেন? ভয়ংকর সেই নির্যাতনের অভিজ্ঞতা ওদের স্মৃতিতে এখনো জ্বলছে। ট্রমা থেকে ওরা এখনো বের হতে পারে নি। চরম নিরাপত্তাহীনতার মধ্যে ওরা যখন জেনেছে, হাসপাতালের আশপাশে ওদের ভাইয়েরা উপস্থিত হয়েছে সকল ভয় ভীতিকে উপেক্ষা করে, ওদের আবেগটা কিরকম হবে? ওরা তো কাঁদবেই। কারণ মানুষ যখন নিজের জীবনে দেখতে পায় যে মানুষ সবসময়ই মানুষের পাশে দাঁড়ায়, যখন উপলব্ধি করতে পারে যে শেষ বিচারে বেশীরভাগ মানুষই মানুষের পাশে দাঁড়ায়, যখন উপলব্ধি করতে পারে যে নির্যাতকের সংখ্যা সবসময়ই কম, মানুষের সংখ্যাই বেশী- তখন কাঁদবে না তো আর কি করবে!

যারা সেদিন হাসপাতালে ছুটে গিয়েছিলেন ওদের কথা ভেবে আমি নিজেও আবেগপ্রবণ হয়েছি। কারণ আমি জানি রাঙ্গামাটি আর ঢাকা শহর বা কুমিল্লা শহর বা পাবনা শহর এক না। সমতলে আপনারা চট করে যেভাবে যে কোনো অন্যায়ের প্রতিবাদে ছুটে যেতে পারেন যে কোনো জায়গায়, রাঙ্গামাটিতে ওরা সেটা পারে না। সেখানকার পরিস্থিতিতে যারা সেদিন এগিয়ে গেছেন ওদের কথা ভেবে অহংকার হয়। কিন্তু সেই সাথে একটু গ্লানিমতও হয় যে সমতলের তরুণরা ব্যাপারটা নিয়ে কিছু বলছেন না।

পাহাড়ে যে কোনো অন্যায়ের বিরদ্ধে সমতলের বন্ধুদের প্রতিবাদ করাটা বেশী জরুরি। কেনো? এই বিশেষ ঘটনাটিতে একবার ভাবুন তো, আমরা যদি প্রতিবাদ না করি তাইলে সেই নির্যাতিতা মেয়ে দু’টির চোখে তো পুরা সমতলের বাঙালি সমাজ সেই ধর্ষকদের কাতারেই দাঁড়িয়ে গেলাম। যে কোনো পাহাড়ি মেয়ে তখন যে কোনো বাঙালিকে যদি ধর্ষকদেরই একজন মনে করেন তাকে আপনি দোষ দিতে পারবেন? পারবেন না।

এইজন্যেই প্রতিবাদটা জরুরি। জরুরি কারণ আমার পাহাড়ি কন্যা দু’টিকে আপনাদের জানিয়ে দিতে হবে যে আপনারা ঐ ধর্ষকদের পক্ষে না, ঐ ধর্ষকটি দেখতে হয়তো আপনার মতো, হয়তো আপনার মতো বাংলায়ই কথা বলে, কিন্তু সে আপনার ভাই না সন্তান না পিতা না।

(৪) 
সমতলের বাঙালি বন্ধুদেরকে বলি, আপনারা কিছু বলেন, আপনারা মুখ খোলেন। একটা কারণ তো বলেইছি কেনো আপনার প্রতিবাদটা জরুরি। আরও কারণ আছে।

পাহাড়ে যখন আদিবাসী মানুষের প্রতি একটা অন্যায় হয়, পাহাড়িরা যখন তার প্রতিবাদ করে, স্থানীয় সামরিক এবং বেসামরিক প্রশাসন সেটাকে কেবল আদিবাসীদের সমস্যা বলে বিবেচনা করে। অর্থাৎ প্রতিবাদটা তখন হয়ে যায় বাঙালির বিরুদ্ধে পাহাড়িদের আন্দোলন। আর ঢাকায় সরকারের উচ্চ পর্যায়ের লোকজন, মন্ত্রীরা, নেতারা, আমলারা সমস্যাটাকে পাহাড়ি এলাকার বিশেষ সমস্যা হিসাবে বিবেচনা করে আর সেইভাবে গুরুত্বহীন একটু সমস্যা হিসাবে সেটি চাপা পড়ে যায়। টেলিভিশন খবরের কাগজের লোক ওরাও দেখবেন যে পাহাড়ের খবর ছাপানোর ব্যাপারটাকে একটা আঞ্চলিক বিশেষ বিবেচনা থেকেই বিবেচনা করে খবরটাকে কতোটুকু গুরুত্ব দেওয়া হবে। বেশীরভাগ সময়ই দেখা যায় পাহাড়ের কোনো অন্যায় অত্যাচারের খবর প্রকাশের ব্যাপারে টেলিভিশন ও কাগজগুলি 'ব্যাপারটা আবার ন্যাশনাল সিকিউরিটি ইস্যু কিনা' এইরকম একটা সংশয়ের মধ্যে থাকে।

কিন্তু একটা ধর্ষণ তো কেবল পাহাড়ের অন্যায় বা সমতলের অন্যায় না। তার সাথে যদি আমাদের বাহিনী বা অন্য কোনো সরকারী সংস্থার নাম চলে আসে, তখন তো একটা গুরুত্ব নিয়ে দেখতে হয়। সমতলের মানুষ যদি প্রতিবাদ করে, তাইলে যেটা হবে তখন টেলিভিশন খবরের কাগজ ওরাও গুরুত্ব দিবে। স্থানীয় প্রশাসন তখন এটা আর 'আরেকটা পাহাড়ি বাঙালি সমস্যা' বলে এড়াতে পারবে না। মন্ত্রী আমলা নেতা ওরাও তখন এইটা 'হিল ট্র্যাক্টের ব্যাপারটা আলাদা' বলে চাপা দিবে না।

এইজন্যে শুধু একজন দুইজন পাহাড়ের সমস্যা নিয়ে লিখবে আর বাকিরা সেটাতে লাইক কমেন্ট করবে তাতে হবে না। প্রতিবাদটা আপনাকে করতে হবে- সমতলের ছেলেরা মেয়েরা বুড়োরা সবাই- আপনাদেরকেই প্রতিবাদটা আগে করতে হবে। মিছিল মিটিং মানব বন্ধন সেগুলি করে প্রতিবাদ করেন তো ভালো, নিতান্ত একটা ফেসবুক পোস্ট হলেও আপনাকে লিখতে হবে।

(৫) 
লিখতে পারেন, কথা বলে পারেন যেভাবে পারেন প্রতিবাদটা করতে হবে। সেই মারমা মেয়ে দু’টিকে জানাতে হবে যে, না, সমতলের বাঙালিরা ধর্ষকের পক্ষে না। জানাতে হবে যে ওদের নিরাপত্তার জন্যে সেদিন রাঙ্গামাটি হাসপাতালে স্বতঃস্ফূর্তভাবে যে কয়েক’শ মানুষ হাজির হয়েছিলো, ওদের সাথে শারীরিকভাবে হয়তো না কিন্তু নৈতিকভাবে আমিও ছিলাম- সমতলের সকল তরুণ ছিলো।

ঐ বড় বোনটির চোখের জল- আস্থার ও ভালোবাসার অশ্রু- সেটার ভাগ আপনি কেনো নিবেন না!



  • ২৮৬৪ বার পড়া হয়েছে

পূর্ববর্তী লেখা পরবর্তী লেখা

বিঃদ্রঃ নারী'তে প্রকাশিত প্রতিটি লেখার বিষয়বস্তু, ক্রিয়া-প্রতিক্রিয়া ও মন্তব্যসমুহ সম্পূর্ণ লেখকের নিজস্ব। প্রকাশিত সকল লেখার বিষয়বস্তু ও মতামত নারী'র সম্পাদকীয় নীতির সাথে সম্পুর্নভাবে মিলে যাবে এমন নয়। লেখকের কোনো লেখার বিষয়বস্তু বা বক্তব্যের যথার্থতার আইনগত বা অন্যকোনো দায় নারী কর্তৃপক্ষ বহন করতে বাধ্য নয়। নারীতে প্রকাশিত কোনো লেখা বিনা অনুমতিতে অন্য কোথাও প্রকাশ কপিরাইট আইনের লংঘন বলে গণ্য হবে।


মন্তব্য টি

লেখক পরিচিতি

ইমতিয়াজ মাহমুদ

এডভোকেট, মানবাধিকারকর্মী

ফেসবুকে আমরা