অালো তে অায় রে বাপ, অালোতে অায়!

শনিবার, সেপ্টেম্বর ২৩, ২০১৭ ১২:৫৩ PM | বিভাগ : সমাজ/গবেষণা


"বেশ্যা" শব্দটা একটা গালি ক্যামনে হয়, সেইটা অামার বুঝে অাসে না। তারওপর মানুষ তাদেরকে ঘৃণাও করে, দূর দূর করে, পাত্থর মাইরা মারা উচিত বলে গলা ফাটায়। অনেক শিক্ষিত ভাইদের তো এই শব্দটা উচ্চারণ করতেও গা গুলায়, গলা পর্যন্ত অাইসা মাছের কাঁটার মতো অাটকায়া থাকে।

 

 

বেশ্যাদের নিয়া যেই পরিমাণে শর্টফিল্ম বানানো হইসে, অন্য অার কোন বিষয় মানুষেরে এতটা ভাবাইছে তা অামি জানি না।
সেইসব জিনিসের কিছুও যদি অাপনি গিলা থাকেন, তাহইলে অাপনার এইটা অন্তত জানা থাকার কথা যে তাদের নব্বই শতাংশই এই পেশায় অাসে অনিচ্ছায়, বাধ্য হইয়া, নিরুপায় হইয়া, পরিস্থিতির শিকার হইয়া।

অামি একটা রেডিও শোতে শুনছিলাম, একজন বেশ্যার জবানবন্দি। উনি বলছিলেন, "অামাকে অামার সৎ মামা ধর্ষণ করছে। অামি অামার সৎ মা'রে বলায় উনি অামারে চুপ থাকতে বলছেন। বলছেন, ঘরের কথা বাইরে যাইতে দেওয়া ঠিক না। ভয় দেখাইছেন। অামি এক পর্যায়ে অামার বাপেরে বলি, উনি অামারে মারধর করেন, এমন নোংরা কথা বলার জন্য। অাব্বার কথা হইল, নিশ্চই অামি নিজ থেইকা কিছু করছি। এরপর অামি অার বাড়িতে থাকি নাই। পালায়া ঢাকায় অাইসা পড়ছি। গ্রামের এক পরিচিত ভায়েরে ভরসা কইরা অাসছিলাম। উনিও অামারে ধর্ষণ করছেন, এরপর বেশ্যাপল্লীতে সারাজীবনের মতো ঢুকায়ে দিয়ে গেলেন। অামি নিরুপায় ছিলাম। উনি বলছিলেন, অামি যদি ঢাকায় বাঁইচা থাকতে চাই অামারে এই কইরাই খাইতে হইবো। মাইয়া মানুষের কোনো যোগ্যতাই নাই, তয় শরীল অাছে। অার শরীল হল মৌচাক, ব্যাটারা সব মৌমাছি। টাকা এমনেই অাসব। এখন অামি বাড়িতে যাই। ওগো সামনে দিয়াই ঘুইরা বেড়াই। এমনও হয়, অাম্মা-অাব্বা পাশের ঘরে, অার অামি অামার ঘরে ক্লায়েন্টের লগে।  ক্লায়েন্ট তাগো সামনে দিয়াই অামার ঘরে ঢুকে। অামার খারাপ লাগে না। লজ্জাও না। এখন অামার কামই এইটা। তারা যা বলার বলুক। তারাই অামারে ঠেলছে। ভুইলা যায়।"

অামি ওইদিন সত্যি না কাইন্দা পারি নাই। এমন মাইয়ার সংখ্যা সমাজে অগণিত। সমাজই তাগোরে বেশ্যা বানাইতেছে, তারপর সেই বেশ্যার পেটেই লাত্থি বসাইতেছে তারা বেশ্যা বইলা। সমাজ!


সমাজ বেশ্যাদের অালাদা নাম দিছে সমাজ,"বেশ্যা"। তাগোর থাকনের জায়গার অালাদা নাম দিছে, "বেশ্যাপল্লী"। অামি জানতে চাই এই বেশ্যা , কাগোরে সাপ্লাই দিতেছে সমাজ?  কাগো বিচরণ বেশ্যাপল্লীতে? সমকামিগোরে পাইলেই এরেস্ট করা হয়, এই বেশ্যাপল্লীগুলা তাহইলে কাগোর লেইগা বানানো?  অাছে তাগো কোনো নাম? তাগোর থাকনের জায়গার নাম? নাই। নাই।  নাই।

প্রতিনিয়ত সমাজের অসুস্থ পুরুষগোর বিকৃত যৌন চেতনার শিকার হইতেছে মেয়েরা। ঘরে, বাইরে-সবখানে।  এবং সেই শিকাররেই সমাজ শিকার হওয়ার কারণ হিসেবে দর্শাইতেছে। বাহ!কী চমৎকার। (সব মাইয়া তাইলে দলে দলে অাত্মহত্যা করুক, তাগোরে অার কষ্ট কইরা লালা ঝরাইতে হইব না।) এবং এই পর্যন্তই শ্যাষ না। ধর্ষিত হওয়াটা যেহেতু মাইয়াগো লেইগা চরম কলঙ্কের একটা বিষয়, সেহেতু পরিবার-সমাজ সেই মাইয়াগোরে লাত্থাইয়া বিতাড়িত কইরা অশুচি হটাইয়া নিজেরা শুচি থাকে। পবিত্র থাকে, তাগোর ধর্মরক্ষা হয়। বেহেশতে প্রবেশের সবকয়টা দরজা খুইলা যায়।


সামাজিক সকল সুযোগ সুবিধা থেইকা বঞ্চিত থাকার দরুণ, অর্থনৈতিকভাবে পরিবার এবং সমাজ কর্তৃক পঙ্গু হইয়া থাকার দরুণ-তারা সমাজেরই তৈরি পুরুষতন্ত্রের অারেক ফাঁদে পা দিতে বাধ্য হয়। সমাজ বুঝায় এবং তারা বুঝে-নারীর কিছুই নাই, তয় একটা শরীর অাছে। মেইলা দেও। তারাও বাঁইচা থাকতে মেইলা দিতে বাধ্য হয়। কে চায় না খাইয়া মরতে? অার এমনিতেও ছিঁড়া খাওয়া শেয়ালের ঘিরা ধরব, তারচেয়ে বেশ্যা হওয়াটাই নিরাপদ। তখন সমাজ পায় তার নতুন বেশ্যা। তার কুকুরদের জন্য অারো খাবার। খালি বেহেশতের দরজায় কড়া নাড়লেই হইব? মনের ক্ষুধাও তো অাছে। অার একটু অাকটু বেশ্যাদের রাস্তায় গেলে ধর্ম যায় না। ওইসব যাওয়া-যাওয়ি মাইয়াগো বিষয়।

বেশ্যারা সমাজে গাছের মতো। মানুষ তার ছায়ায় জিরাইবো, অাবার সেই গাছেরই ডাল ভাঙ্গব, পাতা ছিঁড়ব। দরকার পরলে কাইটা ফেলব। পাবলিক প্রপার্টি। তাগোর জীবনে সুখ-শান্তি বইলা কিছু থাকতে হয় না। স্বপ্ন থাকতে হয় না। কারণ তারা শরীর বিলায়া বেড়ায়। তারা চরিত্রহীন। অখন কাদের কাছে বিলায়, সেইটা ম্যাটার না। লাত্থি মারি,এই সমাজের কপালে। থুহ্!

তো বাকি যেই দশ শতাংশ নারীরা স্বেচ্ছায় এই পেশায় অাসে, অামি তাগোরেও সম্মান করি। এবং তারা চরিত্রহীন-এইটা অামার কাছে একটা অসুস্থ চিন্তা ব্যতীত অার কিছু না। মানুষের চরিত্র হইল তার সমাজিক জীবন কেন্দ্রিক। সে মানুষের সাথে কেমন অাচরণ করে, কয়জন তার দ্বারা উপকৃত হইল, কয়জন তার দ্বারা অপকৃত হইল-সেইটা। সে তার ব্যক্তিগত জীবনে কী করতেছে, সেইটার উপর ভিত্তি কইরা তারে সৎ-অসৎ বলার অামি-অাপনি কে? যদি সে কারো ক্ষতি না কইরা থাকে?


অারেক শ্রেণীর ফালতু লোক অামি দেখি, যারা বলে,"বেশ্যারাও তো মানুষ। তাদেরকেও সম্মান করা উচিত"। ওরে অামার অাবেগী খচ্চরের দল, তারাও তো মানুষ বলতে কী বুঝাইতে চাও? তারা তো মানুষই। এরা অাসলে, সম্মান করে না। নিজের একটা অালাদা ইমেইজ তৈরি করতে চায়। মানে, ওই অারকি, বেশ্যারা অাসলে খারাপ, কিন্তু অামি তো মহৎ,তাই। ফালতু!

তো, কয়দিন অার কুয়ার অন্ধকারে থাকবেন, কুয়া থেইকা বাইর হইয়া অালোতে অাসেন। নোংরামি অাপনাদের মানসিকতা করে, বেশ্যারা না। অালো তে অায় রে বাপ, অালোতে অায়!


  • ২৮৮১ বার পড়া হয়েছে

পূর্ববর্তী লেখা পরবর্তী লেখা

বিঃদ্রঃ নারী'তে প্রকাশিত প্রতিটি লেখার বিষয়বস্তু, ক্রিয়া-প্রতিক্রিয়া ও মন্তব্যসমুহ সম্পূর্ণ লেখকের নিজস্ব। প্রকাশিত সকল লেখার বিষয়বস্তু ও মতামত নারী'র সম্পাদকীয় নীতির সাথে সম্পুর্নভাবে মিলে যাবে এমন নয়। লেখকের কোনো লেখার বিষয়বস্তু বা বক্তব্যের যথার্থতার আইনগত বা অন্যকোনো দায় নারী কর্তৃপক্ষ বহন করতে বাধ্য নয়। নারীতে প্রকাশিত কোনো লেখা বিনা অনুমতিতে অন্য কোথাও প্রকাশ কপিরাইট আইনের লংঘন বলে গণ্য হবে।


মন্তব্য টি

ফেসবুকে আমরা