অপরাধের মূল কারণ অনুসন্ধানে আমরা কি বঞ্চিত নিপীড়িত শ্রেণির প্রতি সমানুভুতিশীল?

মঙ্গলবার, আগস্ট ১৪, ২০১৮ ৬:৩৮ PM | বিভাগ : সমাজ/গবেষণা


আমার অংশী-সঙ্গী (পার্টনার) জানালো তাঁর মন খুব খারাপ, একটি ভয়ংকর স্বপ্নের কারণে। দুঃস্বপ্নটি হচ্ছে, কেউ তাঁকে একটি বাঘের খাঁচায় ফেলে দিয়েছে।

মনোবিজ্ঞান নিয়ে কিছুটা পড়াশোনা আর মেন্টাল হেলথ নিয়ে আধা-পেশাধারী কাজের কারণে, আমি তাঁকে বাংলাদেশের পত্রিকায় প্রকাশিত একটি ছবির কথা বলি। যে ছবিটি ছিলো, তাঁর সন্তানের বয়সী একটি ছেলের জলে ভেজা চোখ, ২২ জন ছাত্রের একজন, যাদের দুই দিনের জন্য "রিমান্ডে" নেয়া হচ্ছে। এই ছবিটি তাঁর দুঃস্বপ্নের মূলে। ইংরেজিতে বলে এমপ্যাথি, সমানুভুতি, যা তাঁর অবচেতন মনে যায়গা করে নিয়েছে। স্বপ্নে সেটা দেখা দিয়েছে, ভিন্ন অবয়বে। সমানুভুতি কিংবা সহানুভূতির মূল্য পরিশোধ, দুঃস্বপ্নে।

সমানুভুতি ব্যাপারটা মানুষকে ঘৃণা করতে বাধা দেয়, পক্ষপাতহীন ভাবে, ন্যায়-অন্যায় বিচারের বাইরে, অন্য মানুষের কষ্ট ও দুর্দশাকে বুঝতে চাওয়ার একটি আবেগ, যা মানবীয়। যা হয়তো ভালোবাসা নয়, কিন্তু ঘৃণা ও বিদ্বেষের বদলে অন্যের কষ্ট, বঞ্চনা, অসহায়ত্ব, রাগ, হতাশা, ইত্যাদি বোঝার চেষ্টা। এই চেষ্টা থাকলে, মানুষ অনেক নতুন কিছু উপলব্দি করে, কিছুটা বেশি মানুষ হয়ে উঠতে পারে।

১৯৮৬ সালে চাপাতির বদলে তলোয়ার (যেটি দিয়ে গরু কোরবানি দেয়া হয়) হাতে একটি কিশোর ছেলে অপরিচিত আমাকে হত্যার জন্য এগিয়ে আসছে, পেছন থেকে আমার পিঠে সুন্দরী কাঠের লাকড়ি দিয়ে মারছে অন্য একজন। আমি স্বপ্নযাত্রার মতো এক হাত দিয়ে মাথা বাঁচানোর চেষ্টা করছি, আর ছেলেটির চোখের ভাষা পড়ার চেষ্টা করছি।

মৃত্যুর মুখে দাঁড়িয়ে আমি এই ছেলেটির মনোজগৎ নিয়ে ভাবছিলাম। কি তাঁর প্রেরণা, কি তাঁর বিশ্বাস, যে এই সদ্য গোঁফদাড়ি ওঠা বয়সে, সে মসজিদ থেকে নেমে এসেছে, একটি শ্রমিক সমাবেশে আক্রমণ করতে, কারণ আজানের সময় এক নারী শ্রমিক নেতা কথা বলছিলো বলে। মাইক বন্ধ না করা, তাঁর ধর্মীয় অনুভূতিতে লেগেছিলো। ইউসুফ নামে একজন শ্রমিক এদের হাতে খুন হয়েছিলো সেদিন।

"ধর্মীয় অনুভূতির নামে অপরিচিত কোনো মানুষ হত্যা করা যায়", -এই বিশ্বাস কারা এই ছেলেটির মাথায় ঢুকিয়েছে? এই প্রশ্নটি নিয়ে ভাবতে ভাবতে আমি এই ছেলেটিকে করুণা করতে শুরু করি। ছেলেটিকে আমার ধর্মজীবী রাজনীতির গুটি হিসেবে মনে হয়। ছেলেটিও ভিকটিম, ম্যনিপুলেশনের। যারা এই ছেলেটির মগজ ধোলাইয়ের কাজটি করেছে, তাঁদের আমি চিনি। এরা ১৯৭১ সালে ১৪ ডিসেম্বর বুদ্ধিজীবী হত্যা করেছে। এরা আবার এখন ছাত্র যুবদের সংগঠিত করছে। আমার পুরো রাগটি ভিন্ন পথে প্রবাহিত হয়; সাম্প্রদায়িক ও মৌলবাদী রাজনীতি ও এই রাজনীতিকে বৈধতা দিচ্ছে যে ব্যাক্তিরা, তাদের প্রতি।

আমি ছেলেটিকে নিশ্চিত ভাবেই আঘাত করতে পারতাম, প্রতিশোধের। কিন্তু আমি কেবল তাঁর হাত থেকে তলোয়ারটি ফেলে দেয়ার জন্য কব্জিতে আঘাত করি।

আমি মহানুভবতার কথা বলছি না, যে মহানুভবতা অপরাধীকে বিচারের আওতায় আনবে না। আমি বলছি, আসল অপরাধী কারা, এই বিবেচনা বোধের। এই বিবেচনা বোধের জন্য সম্ভবত কিছুটা সমানুভুতিরও দরকার আছে।

সমস্যার মুল খোঁজার জন্য হয়তো কেবল বুদ্ধিবৃত্তি বা পাণ্ডিত্য যথেষ্ট নয়। ভালোবাসা, যত্নশীলতা, সহানুভূতির দরকার আছে। কেনো অনেক মানুষ শোষণ ও বঞ্চনার মধ্যে আছে? এই প্রশ্ন শ্রেণিপ্রশ্ন। এই প্রশ্ন বাদ দিয়ে আমরা সুশাসন, মানবাধিকার, জবাবদিহিতা নিয়ে সেমিনার করতে পারি। পারি কারণ, বঞ্চিত মানুষেরা আমাদের শ্রেণির মানুষ নয়। এই মানুষদের জন্য আমাদের সমানুভুতি নেই।

তেমনই, নারীর প্রতি সহিংসতার প্রশ্নে, আমরা "নিপীড়ন বিরোধী" কোনো জোট করি না। কারণ আমাদের অন্য প্রায়োরিটি আছে। আমাদের নারীদের প্রতি সমানুভুতি নেই, পুরুষ হিসেবে। থাকলে, আমরা নারীর প্রতি সহিংসতার ব্যাপারে সোচ্চার অনেক মানুষ দেখতাম। একই কথা সত্য ধর্মীয় ও সংখ্যালঘু জাতিসত্তার ব্যাপারে। তাঁদের ব্যাপারেও আমাদের সমানুভুতি নেই। অন্তত আমাদের কাজ তাই বলে।

সমানুভুতি থাকলে আমরা সমস্যার আরও গভীরে যেতাম। আমরা সমস্যার মূলে যে কাঠামোগত বৈষম্য ও সহিংসতা রয়েছে তার মূল কারণ নিয়ে আলোচনা করতাম। আমরা এই বৈষম্য ও সহিংসতার পুরো ব্যাবস্থা বদলে দেয়ার জন্য রাজনীতি করতাম।

মূল প্রশ্নটা পাণ্ডিত্যের নয়, কিংবা ক্ষমতার। মূল প্রশ্নটা মূল্যবোধের যার ভিত্তি সমানুভুতি ও বঞ্চিতের প্রতি ভালোবাসা। আপনি সরকার বিরোধী জ্বালাময়ী স্ট্যাটাস দিতে পারেন, নৈতিক ক্ষ্যাপামি জানাতে পারেন, কিংবা কেবলই শব্দ-বমনও করতে পারেন। এগুলো কোনো প্রগতিশীল কিছু নয়। এর মধ্যে দিয়ে আপনি আগামী দিনের সহিংসতার ভিত্তি রচনা করতে ও বৈধতা দিতেও পারেন।

আমরা কি সকলের প্রতি সমানুভুতিশীল, অন্তত অপরাধীর অপরাধের মূল কারণ বোঝার ক্ষেত্রে? সে ছাত্রলীগ, ছাত্রদল বা শিবির হলেও। আমরা কি সমস্যার মূল কারণ বোঝার প্রতি সংবেদনশীল? আমরা কি বঞ্চিত নিপীড়িত শ্রেণির প্রতি সমানুভুতিশীল?

যদি তা হতাম, হয়ত বদল দিতে চাইতাম গোটা ব্যাবস্থাটাকেই।


  • ১৫১ বার পড়া হয়েছে

পূর্ববর্তী লেখা পরবর্তী লেখা

বিঃদ্রঃ নারী'তে প্রকাশিত প্রতিটি লেখার বিষয়বস্তু, ক্রিয়া-প্রতিক্রিয়া ও মন্তব্যসমুহ সম্পূর্ণ লেখকের নিজস্ব। প্রকাশিত সকল লেখার বিষয়বস্তু ও মতামত নারী'র সম্পাদকীয় নীতির সাথে সম্পুর্নভাবে মিলে যাবে এমন নয়। লেখকের কোনো লেখার বিষয়বস্তু বা বক্তব্যের যথার্থতার আইনগত বা অন্যকোনো দায় নারী কর্তৃপক্ষ বহন করতে বাধ্য নয়। নারীতে প্রকাশিত কোনো লেখা বিনা অনুমতিতে অন্য কোথাও প্রকাশ কপিরাইট আইনের লংঘন বলে গণ্য হবে।


মন্তব্য টি

লেখক পরিচিতি

খান আসাদ

সমাজকর্মী

ফেসবুকে আমরা