সতীর খোঁজে-হিন্দু শাস্ত্রে সতীদাহ-১ম পর্ব

বৃহস্পতিবার, নভেম্বর ২২, ২০১৮ ৮:৫৯ PM | বিভাগ : মুক্তচিন্তা


সতী দিয়েছে তার জীবন সপে! মরণও দিয়েছে সপে!

সতীর বেদিতে, স্বর্গলোকেই সতীর ঠাই হয়।

পৃথিবী সতীর নয়, সতী মানুষ নয়।

প্রাচীনকালে সতীদাহ ‘সতীদাহ’ নামে পরিচিত ছিলো না। একে ‘সহমরণ’, ‘সহগমন’, ‘অনুগমন’, ’অনুমরণ’ ইত্যাদি বলা হতো। স্বামীর মৃত্যুর পর স্বামীর মৃতদেহের সাথে বিধবা পুড়ে মরলে তাকে সহমরণ বলা হতো। স্বামী দূরদেশে মারা গেলে অথবা অন্য কোনো কারণে স্বামীর সাথে স্ত্রীকে একসাথে পোড়ানো না গেলে, স্বামীর পাগড়ী বা পাদুকার সাথে স্ত্রীকে পোড়ানো হলে তাকে অনুমরণ বলা হতো। সহমৃতা নারীকে সতী বলা হতো, কিন্তু এই প্রথাটির নাম প্রাচীনকালে সতী ছিলো না। ইউরোপিয়ানরাই সহমরণ প্রথার ‘সতী’ নামকরণ করেন। এই সহমরণের প্রথাটি অনেক প্রাচীন। অনেক হিন্দু শাস্ত্রে সহমরণের দৃষ্টান্ত ও বিধান রয়েছে। 

হিন্দুশাস্ত্রে সতীদাহ

ঋগ্বেদে সতীদাহ

ঋগ্বেদে সহমরণের প্রসঙ্গ থাকলেও তার অনুমোদন নেই। ঋগ্বেদ ১০/১৮/৭ এ বলা হচ্ছে,

ইমা নারীরবিধবাঃ সুপত্নীরাঞ্জনেন সর্পিষা সং বিশন্তু।

অনশ্রবোহনমীবাঃ সুরত্না আ রোহন্তু জনয়ো যোনিমগ্রে।। (ঋগ্বেদ ১০/১৮/৭)

অর্থাৎ, এ সকল নারী বৈধব্য দুঃখ অনুভব না করে, মনোমতো পতিলাভ করে অঞ্জন ও ঘৃতের সাথে গৃহে প্রবেশ করুন। এ সকল বধূ অশ্রুপাত না করে, রোগে কাতর না হয়ে উত্তম উত্তম রত্নধারণ করে সর্বাগ্রে গৃহে আসুন। (অনুবাদক-রমেশচন্দ্র দত্ত)

এক সময় ঋগ্বেদ ১০/১৮/৭ এ ‘অগ্রে’ শব্দের পরিবর্তে ‘অগ্নেঃ’ শব্দ পাঠ করা হতো। রামমোহন রায় সহমরণের পক্ষপাতীদের যুক্তি খণ্ডন করার জন্য প্রবর্তক ও নিবর্তকের সম্বাদ নামক গ্রন্থ রচনা করেন। তাতে প্রবর্তকের সম্বাদে প্রবর্তক বলেন, ” …সহমরণ বিষয়ে যে এই ঋগ্বেদের শ্রুতি আছে তাহাকে তুমি কিরূপে অপ্রমাণ করিতে পার। যথা। ইমা নারীরবিধবাঃ সুপত্নীরাঞ্জনেন সর্পিষা শম্বিশন্তুনশ্রবা অনমীরাসুরত্না আরোহন্তু যাময়ো যোনিমগ্নেঃ।। ”নিবর্তকের সম্বাদে রামমোহন বলেন, ”এই শ্রুতি এবং ওই পূর্বোক্ত হারীত প্রভৃতির স্মৃতি যাহা তুমি প্রমাণ দিতেছ সে সকল সহমরণের ও অনুমরণের প্রশংসা এবং স্বর্গ ফল প্রদর্শনের দ্বারা কাম্য বোধক হয়। ইহাকে কাম্য না কহিলে তোমারো উপায়ান্তর নাই এবং সহমরণের সংকল্প বাক্যে স্বর্গাদি কামনার প্রয়োগ স্পষ্ট করাইতেছে…” প্রবর্তকের যুক্তি খণ্ডনের সময় রামমোহন কাম্য কর্মের নিন্দা করেন কিন্তু ঋগ্বেদে ১০/১৮/৭ এ ‘অগ্রে’ শব্দের পরিবর্তে অগ্নেঃ শব্দের ব্যবহারকে ভুল বলেন নি। অর্থাৎ, সেই সময়েও ‘অগ্নেঃ’ র ব্যবহার প্রচলিত ছিলো।

‘অগ্রে’ শব্দের জায়গায় ‘অগ্নেঃ’ শব্দ ব্যবহার করলে ঋকটির অর্থ সম্পূর্ণ বদলে যায়। এর অর্থ হয়-

“এইসকল নারী বৈধব্য ক্লেশ ভোগাপেক্ষা ঘৃত ও অঞ্জন অনুলিপ্ত পতিকে প্রাপ্ত হইয়া উত্তম রত্ন ধারণ পূর্বক অগ্নির মধ্যে আশ্রয় গ্রহণ করুক।” [৩৭]

রমেশচন্দ্র দত্ত বলছেন,

“There is not a word in the above relating to the burning of widows. But a word in it Agre was altered into Agne, and the text was then mistranslated in bengal to justify the modern custom of the burning of the widows.” [৩৭]

অর্থাৎ, এখানে বিধবা পোড়ানো সম্বন্ধে একটি শব্দও নেই। কিন্তু অগ্রে শব্দকে অগ্নেঃ তে পরিবর্তন করে, ঋকটির ভুল অনুবাদ করা হয়েছিলো, বঙ্গে বিধবা পোড়ানোর রীতিকে ন্যায্যতা প্রদান করার জন্য।

ঋগ্বেদ ১০/১৮/৮ এ বলা হচ্ছে,

উদীর্ষ্ব নার্ষভি জীবলোকং গতাসুমেতমুপ শেষ এহি।

হস্তগ্রাভস্য দিধিষোস্তবেদং পত্যুর্জনিত্বমভি সং বভূথ।। (ঋগ্বেদ ১০/১৮/৮)

অর্থাৎ, হে নারী সংসারের দিকে ফিরে চলো, গাত্রোত্থান করো, তুমি যার নিকট শয়ন করতে যাচ্ছো সে গতাসু অর্থাৎ মৃত হয়েছে। চলে এসো। যিনি তোমার পাণিগ্রহণ করে গর্ভাধান করেছিলেন, সে পতির পত্নী হয়ে যা কিছু কর্তব্য ছিলো, সকলি তোমার করা হয়েছে।

[অনুবাদক-রমেশচন্দ্র দত্ত, হরফ প্রকাশনী]

নিচে একটি ইংরেজি অনুবাদ দেওয়া হল-

Rise, come unto the world of life, O woman: come, he is lifeless by whose side thou liest.
Wifehood with this thy husband was thy portion, who took thy hand and wooed thee as a lover.

[Ralph T Griffit Translation]

ঋগ্বেদ ১০/১৮/৭ এ সতীদাহের প্রসঙ্গ না থাকলেও, ঋগ্বেদ ১০/১৮/৮ এ নারীকে বলতে দেখা যাচ্ছে, “তুমি যার নিকট শয়ন করতে যাচ্ছো সে গতাসু অর্থাৎ মৃত হয়েছে।” এখানে নারীর সহমরণের প্রবৃত্তি লক্ষ্য করা যায়। তবে ঋগ্বেদে তাকে মৃত স্বামীর পাশ থেকে উঠে আসতে বলা হচ্ছে।

অথর্ব বেদে সতীদাহ

অথর্ববেদ ১৮/৩/১ এ বলা হচ্ছে,

ইয়ং নারী পতিলোকং বৃণানা নি পদ্যত উপ ত্বা মর্ত্য প্রেতম্। ধর্মং পুরাণমনুপালয়ন্তী তস্যৈ প্রজাং দ্রবিণোং চেহ ধেহি।। (অথর্ব বেদ ১৮/৩/১)

অর্থাৎ, এ পুরোবর্তিনী স্ত্রী সহধর্মচারিণী বলে পতির অনুষ্ঠিত যাগাদি কর্মের ফলস্বরূপ স্বর্গাদি লোক বরণ করতে চায়। হে মরণশীল মানুষ, এ স্ত্রী ভূলোক থেকে নির্গত তোমার কাছে অনুমরণের জন্য পুরাতন (স্মৃতি পুরাণাদি প্রসিদ্ধ) ধর্ম অনুপালনের জন্য যাচ্ছে। সে অনুমরণে গমনশীল স্ত্রীর জন্য জন্মান্তরেও এ ভূলোক পুত্রপৌত্রাদি ও ধন দাও।

[অথর্ব বেদ সংহিতা- অনুবাদক- শ্রীবিজনবিহারী গোস্বামী, হরফ প্রকাশনী]

অথর্ববেদ ১৮/৩/১ এর ইংরেজি অনুবাদ-

Choosing her husband’s world, O man, this woman lays herself
down beside thy lifeless body.
Preserving faithfully the ancient custom. Bestow upon here both
wealth and offspring.

[griffit translation]

অথর্ববেদ ১৮/৩/২ এ বলা হচ্ছে,

উদীষর্ব নার্যভি জীবলোকং গত্যসুমেতমুপ শেষ এহি। হস্তগ্রাভস্য দধিষোস্তবেদং পত্যুর্জনিত্বমভি সং বভূথ।।

অর্থাৎ, হে ধর্ম পত্নী, জীবলোকের উদ্দেশে পতির কাছ থেকে উঠে এসো। যে মৃত পতির কাছে শয়ন করেছো, সেখানে দৃষ্ট প্রয়োজনের অভাবে তার কাছ থেকে চলে এসো। তোমার পাণিগ্রহণকর্তা পতি অপত্যাদিরূপে জন্মলাভ করেছে।

[ অথর্ব বেদ সংহিতা- অনুবাদ শ্রীবিজনবিহারী গোস্বামী, হরফ প্রকাশনী]

১৮/৩/২ এর ইংরেজি অনুবাদ-

Rise, come unto the world of life, O woman: come, he is lifeless
by whose side thou liest.
Wifehood with this thy husband was thy portion who took thy
hand and wooed thee as a lover.

[griffit translation]

ঋগ্বেদের মতোই অথর্ব বেদে কোনো স্ত্রীকে মৃত স্বামীর সাথে সহমৃতা হওয়ার চেষ্টা করতে দেখা যায়। কিন্তু তাকে এ কাজ করতে বারণও করা হচ্ছে। তবে এও বলা হচ্ছে নারীটি ‘পুরাতন ধর্ম’ পালনের জন্য যাচ্ছে। তাহলে দেখা যায় সহমরণের প্রথাটি অনেক পুরোনো, বেদের থেকেও পুরোনো।

আজকাল হিন্দুরা সতীদাহ বা সহমরণকে কেবলই মুসলমানদের হাত থেকে সম্মান বাঁচানোর জন্য হিন্দু নারীদের পবিত্র আত্মাহুতি বলে দেখাতে চায়। কিন্তু বেদের প্রমাণ হতে দেখা যায়, এ প্রথা বেদের চেয়েও প্রাচীন।

হিন্দুরা বলে, হিন্দুশাস্ত্রে কোথাও সতীদাহ বা সহমরণের নিয়ম নেই। সুতরাং দেখা যাক, তাদের এই দাবী কতটা সত্য!

রামায়ণে সতীদাহ

স্বামী দশরথের মৃত্যুর পর কৌশল্যার সহমৃতা হওয়ার ইচ্ছা দেখা যায় রামায়ণে, যদিও কৌশল্যা সহমৃতা হন না । দশরথের মৃত্যুর পর কৌশল্যাকে বলতে শোনা যায়,

“साहमद्यैव दिष्टान्तम् गमिष्यामि पतिव्रता |
इदम् शरीरमालिङ्ग्य प्रवेक्ष्यामि हुताशनम् || २-६६-१२

অর্থাৎ, আজ আমিও পতিব্রতা হয়ে আমার বিধি নির্দিষ্ট অন্তের সাথে সাক্ষাৎ করবো। স্বামীর এই দেহকে আলিঙ্গন করে, আমি অগ্নিতে প্রবেশ করবো। [৩] [Source ]

রামায়ণের যুদ্ধ কাণ্ডে রাবণ যখন সীতাকে রামের মায়ামুণ্ডু দেখিয়েছিল, সীতা তখন রামের সাথে সহমৃতা হবার বাসনা করেছিলেন[৩৯] –

शिरसा मे शिरसः च अस्य कायम् कायेन योजय |
रावण अनुगमिष्यामि गतिम् भर्तुर् महात्मनः || ६-३२-३२

32. raavaNa = O; Ravana! yojaya = join; me shirasaa = my head; asya = with this Rama’s; shiraH = head; kaayam = body; kaayena = with the body; anugamishhyaami = I shall go along ; gatim = the path; mahaatmanaH = of my high soled; bhartuH = Lord.

“O, Ravana! Join my head with his head and my body with his body. I shall go along the path of my magnanimous Lord.” [source]

অর্থাৎ, হে রাবণ! আমার মস্তক তাঁর (রামের) মস্তকের সাথে স্পর্শ করিয়ে দাও, আমার শরীর তাঁর শরীরের সাথে স্পর্শ করিয়ে দাও। আমি আমার মহৎ প্রভুর অনুগমন করবো।

বাল্মীকি রামায়ণের উত্তরকাণ্ডে বেদবতী রাবণকে বলেন তার পিতা মারা গেলে, তার মাতা সহমৃতা হয়েছিলেন-

“পরে বলদৃপ্ত দৈত্যরাজ শুম্ভ আমার পিতার এই সুদৃঢ় সংকল্পে যারপরনাই কুপিত হয় এবং একদা রজনীযোগে নিদ্রিতাবস্থায় তাঁহাকে আসিয়া বিনাশ করে। পরে আমার জননী একান্ত শোকাকুল হইয়া পিতার মৃতদেহ আলিঙ্গন পূর্বক জ্বলন্ত চিতায় আরোহণ করেন।”

[হেমচন্দ্র ভট্টাচার্য অনূদিত বাল্মীকি রামায়ণের উত্তরকাণ্ডের ১৭ তম সর্গ]

মহাভারতে সতীদাহ

মহাভারতে পান্ডুর মৃত্যুর পর তার পত্নী মাদ্রী সহমৃতা হন। পান্ডুর মৃত্যুর পরে কুন্তি মাদ্রীকে বলেন,

“ভদ্রে যাহা হইবার হইয়াছে। এক্ষণে তোমার নিকট এক প্রার্থনা করি, শ্রবণ কর। আমি রাজর্ষির জ্যেষ্ঠা ধর্মপত্নী; সুতরাং শ্রেষ্ঠ ধর্মফল আমারই প্রাপ্য; অতএব আমি পরলোকগত ভর্তার সহগমণ করিব, তুমি এ বিষয়ে আমাকে নিবারণ করিও না, তুমি গাত্রোত্থান কর। অতি সাবধানে এই সকল সন্তানগুলি প্রতিপালন করিও। আমি মহারাজের মৃতদেহ লইয়া চিতারোহন করি।“

মাদ্রী বলেন,

“আমি স্বামী সহবাসে অদ্যাপি পরিতৃপ্ত হই নাই, অতএব আমিই ইহার সহগমন করিব। অনুগ্রহ করিয়া আমাকে এই বিষয়ে অনুমতি করিতে হইবে। আরও দেখ, মহারাজ আমাতে আসক্ত হইয়া প্রাণত্যাগ করিয়াছেন, তন্নিমিত্ত যমভবনে গমন করিয়া তাহার অভিলাষ পরিপূর্ণ করা আমার প্রধান ধর্ম ও অত্যন্ত অবশ্য কর্তব্য কর্ম। বিশেষত আমি যদি জীবিত থাকিয়া আপনার পুত্রদ্বয়ের ন্যায় তোমার পুত্রগণকে স্নেহ করিতে না পারি, তাহা হইলে অবশ্যই আমাকে ইহকালে লোকনিন্দায় ও পরকালে ঘোরতর নরকে নিপতিত হইতে হইবে। অতএব সহগমন করাই আমার পক্ষে শ্রেয়কল্প। এক্ষণে তোমার নিকট আমার এই ভিক্ষা যে, মহারাজের মৃত দেহের সহিত আমার কলেবর দগ্ধ কর। আমার পুত্রদ্বয়কে আপনার পুত্রগণের ন্যায় স্নেহ ও অপ্রমত্তচিত্তে প্রতিপালন করিও; ইহা ব্যতিত আমার আর কিছুই বক্তব্য নাই।“

এর পর মহাভারতে বলা হচ্ছে, “মদ্ররাজদুহিতা কুন্তিকে এই কথা বলিয়া রাজার মৃতদেহ আলিঙ্গন পূর্বক কলেবর পরিত্যাগ করিলেন।“

[কালিপ্রসন্নের মহাভারত/আদিপর্ব/১২৫ তম অধ্যায়]

আদিপর্বের ১২৬ তম অধ্যায়ে বলা হচ্ছে,

“পতিব্রতা মাদ্রীও পতির লোকান্তরপ্রাপ্তি দর্শনে সাতিশয় দুঃখিত হইয়া তাহার মৃতদেহ আলিঙ্গন পূর্বক কলেবর পরিত্যাগ করিয়া পতিলোক প্রাপ্ত হইয়াছেন।“ (কালিপ্রসন্নের মহাভারত)

কুন্তির একটি কথা বিশেষভাবে লক্ষণীয়- পাণ্ডুর মৃত্যুর পর তার সাথে সহমরণে যাওয়াকে ‘শ্রেষ্ঠ ধর্ম ফল’ হিসাবে বর্ণনা করছেন তিনি। সুতরাং জওহরকে যেমন রাজপুতেরা আজকের যুগেও গৌরবান্বিত করে চলেছে, তেমনি সে যুগেও সতীর চিতায় প্রাণত্যাগ করাকে শ্রেষ্ঠ ধর্মফল হিসাবে দেখানো হতো।

মহাভারতের মৌষলপর্বের সপ্তম অধ্যায়ে কৃষ্ণের পিতা বসুদেবের মৃত্যুর পর তার স্ত্রীরা তার সাথে সহমৃতা হন

“পরদিন প্রাতঃকালে প্রবল প্রতাপ মহাত্মা বসুদেব যোগাবলম্বন পূর্বক কলেবর পরিত্যাগ করিয়া উৎকৃষ্ট গতি লাভ করিলেন। তখন তাহার অন্তঃপুর মধ্যে ঘোরতর ক্রন্দন শব্দ সমুত্থিত হইয়া সমুদায় পুরী প্রতিধ্বনিত করিতে লাগিল। কামিনীগণ মাল্য ও আভরণ পরিত্যাগ পূর্বক আলোলয়িতকেশে বক্ষঃস্থলে করাঘাত করিয়া রোদন করিতে লাগিলেন। তখন মহাত্মা অর্জুন সেই মৃতদেহ বহুমুল্য নরযানে আরোপিত করিয়া অন্তঃপুর হইতে বহির্গত হইলেন। দ্বারকাবাসীগণ দুঃখশোকে একান্ত অভিভূত হইয়া তাহার পশ্চাৎ পশ্চাৎ গমন করিতে লাগিল। ভৃত্যগণ শ্বেতচ্ছত্র ও যাজকগণ প্রদীপ্ত পাবক লইয়া শিবিকাযানের অগ্রে অগ্রে গমন করিতে আরম্ভ করিলেন। দেবকী, ভদ্রা, রোহিণী ও মদিরা নামে বসুদেবের পত্নীচতুষ্টয় তাহার সহমৃতা হইবার মানসে দিব্য অলঙ্কারে বিভূষিত ও অসংখ্য কামিনীগণে পরিবেষ্টিত হইয়া তাহার অনুগামিনী হইলেন। মহাত্মা অর্জুন চন্দনাদি বিবিধ সুগন্ধী কাষ্ঠ দ্বারা পত্নী সমবেত বসুদেবের দাহকার্য সম্পাদন করিতে লাগিলেন। ঐ সময় সেই প্রজ্জ্বলিত চিতানলের শব্দ সামবেত্তাদিগের বেদাধ্যয়ন ও অন্যান্য মানবগণের রোদনধ্বনি প্রভাবে পরিবর্ধিত হইয়া সেই স্থান প্রতিধ্বনিত করিতে লাগিল। অনন্তর তিনি বজ্র প্রভৃতি যদুবংশীয় কুমারগণ ও কামিনীগণের সহিত সমবেত হইয়া বসুদেবের উদকক্রিয়া সম্পাদন করিলেন।“

[কালিপ্রসন্নসিংহের মহাভারত/মৌষল পর্ব/৭ম অধ্যায়]

মহাভারতে কৃষ্ণের অনেক পত্নী সহমৃ্তা হন।

রাজশেখর বসুর মহাভারত অনুযায়ী,

“কৃত বর্মার পুত্র এবং ভোজ নারীগণকে মার্তিকাবত নগরে এবং সাত্যকির পুত্রকে সরস্বতী নদীর নিকটস্থ প্রদেশে রেখে অর্জুন অবশিষ্ট বালক বৃদ্ধ ও রমণীগণকে ইন্দ্রপ্রস্থে আনলেন। কৃষ্ণের পৌত্র বজ্রকে তিনি ইন্দ্রপ্রস্থের রাজ্য দিলেন। অক্রূরের পত্নীরা প্রব্রজ্যা নিলেন। কৃষ্ণের পত্নী রুক্মিণী, গান্ধারী, শৈব্যা, হৈমবতী ও জাম্ববতী অগ্নিপ্রবেশ করলেন। সত্যভামা ও কৃষ্ণের অন্য পত্নীগণ হিমালয় অতিক্রম করে কলাপ গ্রামে গিয়ে কৃষ্ণের ধ্যান করতে লাগলেন। দ্বারকাবাসী পুরুষগণকে বজ্রের নিকটে রেখে অর্জুন সজল নয়নে ব্যাসদেবের আশ্রমে এলেন।“

[রাজশেখর বসুর মহাভারত, মৌষল পর্ব]

কালিপ্রসন্ন সিংহের মহাভারতে,

“…ইন্দ্রপ্রস্থের রাজ্যভার কৃষ্ণের পৌত্র বজ্রের প্রতি সমর্পিত হইল। ঐ সময় অক্রূরের পত্নীগণ প্রব্রজ্যা গ্রহণে উদ্যত হইলে, বজ্র বারংবার তাহাদিগকে নিষেধ করিতে লাগিলেন; কিন্তু কিছুতেই তাহারা প্রতিনিবৃত্ত হইলেন না। রুক্মিণী, গান্ধারী, শৈব্যা, হৈমবতী ও দেবী জাম্ববতী ইহারা সকলে হুতাশনে প্রবেশ পূর্বক প্রাণত্যাগ করিলেন। সত্যভামা প্রভৃতি কৃষ্ণের অন্যান্য পত্নীগণ তপস্যা করিবার মানসে অরণ্যে প্রবিষ্ট হইয়া ফলমূল ভোজন পূর্বক হিমালয় অতিক্রম করিয়া কলাপ গ্রামে উপস্থিত হইলেন।…”

[ কালিপ্রসন্নের মহাভারত/মৌষল পর্ব/ ৭ম অধ্যায়]

মহাভারতের শান্তি পর্বে কপোতের মৃত্যুর পর কপোতি আগুনে ঝাপ দিয়ে মারা যায়। কপোতির আত্মহত্যার মাধ্যমে মহাভারতে সহমরণের আদর্শকে ফুটিয়ে তোলা হয়েছে[৩১][৩৭]-

“পতি পরায়ণা কপোতি করুণস্বরে এইরূপে নানাপ্রকার বিলাপ করিয়া পরিশেষে সেই প্রজ্জ্বলিত হুতাশন মধ্যে প্রবেশ করিয়া দেখিল যে, তাহার ভর্তা বিচিত্র মাল্য, পরিধেয় বস্ত্র ও কেয়ূর প্রভৃতি অলঙ্কার সমুদায়ে বিভূষিত হইয়া পুষ্পক রথে অধিরূঢ় হইয়াছে। পুণ্যকর্মপরায়ণ মহাত্মারা তাহার চতুর্দিকে অবস্থান পূর্বক স্তবস্তুতি করিতেছেন। অনন্তর সেই কপোত স্বীয় পত্নীর সহিত সেই বিমানে আরোহণ পূর্বক স্বর্গে গমন করিয়া তত্রত্য দেবগণের নিকট স্বীয় কর্মানুরূপ সম্মানভাজন হইয়া পরমসুখে বিহার করিতে লাগিলেন।”

[কালিপ্রসন্নের মহাভারত/শান্তি পর্ব/ ১৪৮ অধ্যায়]

ধর্মশাস্ত্রে সতীদাহ

পরাশর সংহিতার চতুর্থ অধ্যায়ে বলা হচ্ছে,

“যে পাত্রের সহিত বিবাহের কথাবার্তা স্থির হইয়াছে, তাহার সহিত কন্যার বিবাহ দিতে হইলে, তবে ঐ ভাবী পতি যদি নিরুদ্দেশ হয়, মরিয়া যায়, প্রব্রজ্যা অবলম্বন করে, ক্লীব বলিয়া স্থির হয় বা পতিত হয়, তবে এই পঞ্চ প্রকার আপদে ঐ কন্যার পাত্রান্তরে প্রদান বিহিত। স্বামীর মরনান্তে যে নারী ব্রহ্মচর্য অবলম্বন করেন, তিনি মৃত্যুর পর ব্রহ্মচারীর ন্যায় স্বর্গ লাভ করেন। আর স্বামীর মরণে যিনি সহমৃতা হন, সেই স্ত্রী মানবদেহে যে সার্দ্ধত্রিকোটি সংখ্যক রোম আছে, তাবৎ পরিমিত কাল স্বর্গ ভোগ করিতে থাকেন ব্যালগ্রাহী (সাপুড়ে) যেমন গর্ত মধ্য হইতে, সর্পকে বলপূর্বক টানিয়া আনে, তেমনি সহমৃতা নারী মৃত পতিকে উদ্ধার করিয়া, তৎসহ স্বর্গসুখ ভোগ করেন।

[ ঊনবিংশতি সংহিতা/ পরাশর সংহিতা/অধ্যায় ৪/২৬-২৯ |অনুবাদক- শ্রীপঞ্চানন তর্করত্ন]

পরাশর সংহিতার শ্লোকগুলির যে অনুবাদ উপরে দেওয়া হলো, এটা ছাড়াও অন্য রকম একটি অনুবাদ রয়েছে। অনুবাদ করেছেন ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগর। সেই অনুবাদে বিদ্যাসাগর দেখিয়েছিলেন, বিধবা বিবাহ হিন্দুশাস্ত্র সম্মত। সেই অনুবাদটি হলো-

“নষ্টে মৃতে প্রব্রজিতে ক্লীবে চ পতিতে পতৌ।

পঞ্চস্বাপৎসু নারীণাং পতিরান্যো বিধীয়তে।। ৪/২৬

মৃতে ভর্ত্তরি যা নারী ব্রহ্মচর্য্যে ব্যবস্থিতা।

সা মৃতা লভতে স্বর্গং যথা তে ব্রহ্মচারিণঃ।।৪/২৭

তিস্রঃ কোট্যোহর্দ্ধকোটি ছ যানি লোমানি মানবে।

তাবৎ কালং বসেৎ স্বর্গং ভর্ত্তারং যানুগচ্ছতি।।৪/২৮

অর্থাৎ, স্বামী অনুদ্দেশ হইলে, মরিলে, ক্লীব হইলে, সংসারধর্ম পরিত্যাগ করিলে, অথবা পতিত হইলে, স্ত্রীদিগের পুনর্বার বিবাহ করা শাস্ত্রবিহিত। যে নারী, স্বামীর মৃত্যু হইলে, ব্রহ্মচর্য অবলম্বন করিয়া থাকে, সে দেহান্তে ব্রহ্মচারীদিগের ন্যায়, স্বর্গলাভ করে। মনুষ্য শরীরে যে সার্ধ ত্রিকোটি লোম আছে, যে নারী স্বামীর সহগমন করে, তৎসম কাল স্বর্গে বাস করে।” [৩২]

এর পরে বিদ্যাসাগর মহাশয় বলছেন, “পরাশর কলিযুগের বিধবাদিগের পক্ষে তিন বিধি দিয়াছেন, বিবাহ, ব্রহ্মচর্য ও সহগমন। তন্মধ্যে রাজকীয় আদেশক্রমে, সহগমনের প্রথা রহিত হইয়া গিয়াছে। এক্ষণে বিধবাদিগের পক্ষে দুই মাত্র পথ আছে, বিবাহ ও ব্রহ্মচর্য; ইচ্ছা হয় বিবাহ করিবেক, ইচ্ছা হয় ব্রহ্মচর্য করিবেক। কলিযুগে, ব্রহ্মচর্য অবলম্বন করিয়া, দেহযাত্রা নির্বাহ করা বিধবাদিগের পক্ষে অত্যন্ত কঠিন হইয়া উঠিয়াছে। এই নিমিত্তই ভগবান পরাশর সর্ব প্রথম বিবাহেরই বিধি দিয়াছেন। সে যাহা হউক, স্বামীর অনুদ্দেশ প্রভৃতি পাঁচ প্রকার বৈগুণ্য ঘটিলে, স্ত্রীলোকের পক্ষে বিবাহের স্পষ্ট বিধি প্রদর্শিত হওয়াতে, কলিযুগে সেই সেই অবস্থায়, বিধবার পুনর্বার বিবাহ করা শাস্ত্রসম্মত কর্তব্য কর্ম বলিয়া অবধারিত হইতেছে।” [৩২]

বিশেষত পরাশর স্মৃতির উপরোক্ত শ্লোকগুলির ভিত্তিতেই বিধবা বিবাহ শাস্ত্রসম্মত প্রমাণে সচেষ্ট হয়েছিলেন ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগর। কিন্তু তার অনূদিত শ্লোকগুলির মধ্যেও সতীদাহের উল্লেখ পাওয়া যায়। বিদ্যাসাগরের সময়কালে সহমরণ সম্ভব না হওয়ার পিছনে বিদ্যাসাগর যুক্তি দিয়েছেন, “…রাজকীয় আদেশক্রমে, সহগমনের প্রথা রহিত হইয়া গিয়াছে। এক্ষণে বিধবাদিগের পক্ষে দুই মাত্র পথ আছে, বিবাহ ও ব্রহ্মচর্য; ইচ্ছা হয় বিবাহ করিবেক, ইচ্ছা হয় ব্রহ্মচর্য করিবেক।” [৩২]

ব্যাসসংহিতার ২য় অধ্যায়ে বলা হচ্ছে,

“পতিব্রতা স্ত্রী স্বামী প্রবাসে থাকিলে দীনভাবে থাকিবে। মৃত ভর্তার সহিত অগ্নিপ্রবেশ করিবে অথবা আজীবন ব্রহ্মচর্য করিবে।“

[ ঊনবিংশতি সংহিতা\ব্যাসসংহিতা | অনুবাদক- পঞ্চানন তর্করত্ন ]

দক্ষ সংহিতায় বলা হচ্ছে,

“ভর্তার মৃত্যু হইলে, যে স্ত্রী স্বামীর চিতা আরোহণ করে সেই স্ত্রী সদাচারসম্পন্না হইবে এবং স্বর্গে দেবগণের পূজ্য হইবে। ব্যালগ্রাহী (সাপুড়ে) যেমত গর্ত হইতে বল দ্বারা সর্পগণকে উদ্ধার করে, সেইরূপ পতিসহগামিনী স্ত্রীর পতি যদ্যপি নরকস্থ থাকে, তাহাকেও নিজ পূণ্যবলে উদ্ধার করিয়া পতির সহিত (স্বর্গলোকে) সহর্ষে কালযাপন করে।“

[ দক্ষসংহিতা/ অধ্যায় ৪ | ঊনবিংশতি সংহিতা/দক্ষ সংহিতা- অনুবাদক পঞ্চানন তর্করত্ন ]

বিষ্ণু সংহিতায় সতীদাহ

বিষ্ণু সংহিতার ২৫ তম অধ্যায়ে বলা হচ্ছে,

“স্ত্রীলোকের ধর্ম নিরুপিত হইতেছে। ভর্তার সমান ব্রতাচরণ, শ্বশ্রু, শ্বশুর, গুরু, দেবতা ও অতিথির পূজা , গৃহোপকরণ, দ্রব্য সামগ্রীকে বেশ মাজিয়া ঘষিয়া গুছাইয়া রাখা, অমুক্তহস্ততা (অর্থাৎ, অল্পব্যয় করা), ধন-পাত্র সুগোপন করিয়া রাখা, বশিকরণাদি মূলকর্মে অপ্রবৃত্তি। মঙ্গলাচার তৎপরতা, ভর্তা প্রবাসে থাকিলে কেশবিন্যাস না করা, পরগৃহে গমন না করা, দ্বারদেশে বা গবাক্ষে অবস্থান না করা এবং সকল কর্মেই অস্বতন্ত্রতা- (যথাক্রমে) বাল্য, যৌবন ও বার্ধক্যে- পিতা, ভর্তা ও পুত্রের বশে থাকা, ভর্তার (স্বামী) মৃত্যু হইলে ব্রহ্মচর্য কিংবা ভর্তার সহগমন বা অনুগমন (স্ত্রীলোকের ধর্ম)।

[ঊনবিংশতি সংহিতা/বিষ্ণু সংহিতা/২৫ অধ্যায় ।| অনুবাদক পঞ্চানন তর্করত্ন]

JULIUS JOLLY অনূদিত Institutes of Vishnu হতে একই কথা উদ্ধৃত করা হল-

“13.To remain subject, in her infancy, to her father; in her youth, to her husband; and in her old age, to her sons.

14.After the death of her husband, to preserve her chastity, or to ascend the pile after him.” (25/13-14)

অত্রি সংহিতায় সতীদাহ

চিতিভ্রষ্টা তু যা নারী ঋতুভ্রষ্টা চ ব্যাধিতঃ।

প্রাজাপত্যেন শুধ্যেত ব্রাহ্মণান্ তোজয়দ্দেশ।। ২০৯

অর্থাৎ, স্ত্রীলোক সহমরণ বা অনুমরণ করিতে গিয়া চিতা হইতে পতিত হইলে বা রোগ দ্বারা রজোহীন হইলে প্রাজাপত্য ব্রত করিয়া এবং দশজন ব্রাহ্মণ ভোজন করাইয়া শুদ্ধ হইবে।

[ঊনবিংশতি সংহিতা/অত্রি সংহিতা/২০৯ শ্লোক | অনুবাদক- পঞ্চানন তর্করত্ন]

পুরাণে সতীদাহ

অগ্নি পুরাণে সতীদাহ

“…একজন নারী দেহ ও আত্নায় শুদ্ধ হবেন, খরচের ক্ষেত্রে মিতব্যয়ী হবে এবং পিতা যে ব্যক্তির সাথে তার বিবাহ দিয়েছেন, বিশ্বাসের সাথে তার সেবা করবেন। স্বামীর মৃত্যুর পর যে বিধবা আত্মনিয়ন্ত্রণ করেন এবং ব্রহ্মচর্য পালন করেন, তিনি স্বর্গে গমন করেন। একজন বিধবার কোনো অপিরিচিত ব্যক্তির গৃহে বাস করার ইচ্ছা করা অনুচিত, তার ঝগড়াটে স্বভাবের হওয়াও উচিত নয়। একজন বিধবা এবং বিবাহিতা নারীর স্বামী দূরদেশে থাকলে, তাদের কখনো সাজসজ্জা করা উচিত নয়। তারা মন্দিরে বাস করবেন এবং ঈশ্বরের কাছে তাদের স্বামীর ভালোর জন্য প্রার্থনা করবেন। অন্য সময়ে বিবাহিতা নারী স্বামীর মঙ্গলের জন্য কিছু অলঙ্কার পরিধান করবেন। যে বিধবা মৃত স্বামীর চিতায় নিজেকে পোড়ায় তিনি স্বর্গে গমন করেন।” [১]

[ Agni Puranam/CCXXII (222) chapter/ 19-23 | translation by: MN DUTT, Cosmo Publication | first published 1904]

কূর্ম পুরাণে সতীদাহ

“কোনো ব্যক্তি পবিত্র কোনো স্থানে মৃত্যু বরণ করলে সকল পাপ থেকে মুক্ত হন। স্বামী যদি ব্রহ্মঘাতক (ব্রাহ্মণকে হত্যাকারী), অকৃতজ্ঞ, পাপীও হয়, তার স্ত্রী তার মৃত্যুর পর অগ্নিতে প্রবেশ করলে, তাকে উদ্ধার করেন। বিজ্ঞজনেদের মতে, এটা নারীদের জন্য পরম অনুতাপ।” [২]

[ kurma purana/ uttarabhaga/34/108-109]

বিষ্ণু পুরাণে সতীদাহ

বিষ্ণুপুরাণ মতে, দুর্বাসার অভিশাপকে সম্মান জানিয়ে মায়াবী কৃষ্ণ হাঁটুর উপরে পায়ের পাতা স্থাপন করে যোগ অবলম্বন করেন। জরা নামে এক ব্যাধ কৃষ্ণকে হরিণ ভেবে তার দিকে তীর নিক্ষেপ করে। এভাবে কৃষ্ণ মৃত্যুবরণ করেন। [৪] কৃষ্ণের মৃত্যুর পর তার স্ত্রীরা সহমৃতা হন। বিষ্ণু পুরাণ বলছে-

”পরাশর বললেনঃ কৃষ্ণ এবং রামের মৃতদেহ পাওয়া গেলে অর্জুন তাদের এবং অন্যান্য মৃতদের সৎকার করেন। কৃষ্ণের আট পত্নী, পূর্বে রুক্মিণীর সাথে যাদের নাম নেওয়া হয়েছে, তারা হরিকে আলিঙ্গন করে তার চিতার অগ্নিতে প্রবেশ করেন। হে ধার্মিকগণের মধ্যে শ্রেষ্ঠ, রামের মৃতদেহকে আলিঙ্গন করে রেবতিও আগুনে প্রবেশ করেন, স্বামীর সাথে সংস্পর্শের ফলে অগ্নি রেবতীর সুখী হৃদয়ের কাছে শীতল হয়েছিল। সেখানে সব শোনার পর, উগ্রসেন আর বসুদেবের সাথে দেবকী এবং রোহিনী আগুনে প্রবেশ করেন।…” [৫]

[ Vishnu Puranam/part 5/ section XXXVIII(38) | translation by MN DUTT, printed by H.C Das, Elysium Press, 65/2 Beadon Street, 1896]

গরুড় পুরাণে সহমরণ

“স্বামী নিরুদ্দেশ হলে, মৃত হলে অথবা ছেড়ে চলে গেলে অথবা নপুংসক অথবা নীচস্বভাবের হলে, এমন জরুরী অবস্থায় একজন নারী পুনরায় বিবাহ করতে পারেন।” [৬]

[garuda puranam 1/107/28 | Motilal Banarsidass Publishers Limited]

“যে নারী তার স্বামীর সাথে সহমৃতা হন, তার স্বামীর শরীরে যত লোম আছে, তত বছর স্বামীর সাথে তিনি স্বর্গে বাস করবেন।” [৭]

[garuda puranam 1/107/29 | Motilal Banarsidass Publishers Limited]

গরুড় পুরাণের অন্য স্থানে আবার বলা হচ্ছে-

“যে নারী স্বামীর কাছে পবিত্র এবং বিশুদ্ধ, তার উচিত মৃত স্বামীকে নমস্কার করে অন্ত্যেষ্টিক্রিয়া শুরু হবার আগে স্বামীর চিতায় আরোহণ করা। যে নারী চিত্তের দৌর্বল্যের কারণে চিতা হতে দূরে সরে যান তার প্রজাপাত্য প্রায়শ্চিত্ত করা উচিত। স্বামীকে অনুসরণ করে যে নারী চিতায় আরোহণ করেন, মানুষের শরীরে যে সাড়ে তিন কোটি লোম আছে, তত বছরই তিনি স্বর্গে বাস করেন। সাপুড়ে যেমন গর্ত থেকে সাপকে বের করে আনে তেমনি সেই নারী তার স্বামীকে নরক থেকে উদ্ধার করেন এবং তার স্বামীর সাথে স্বর্গসুখ ভোগ করেন। যে নারী চিতায় আরোহণ করেন তিনি স্বর্গে যান। স্বর্গের অপ্সরাদের দ্বারা তিনি প্রশংসিত হন এবং স্বামীর সাথে, যতসময় ১৪ জন ইন্দ্র স্বর্গে রাজত্ব করেন, ততসময় স্বর্গে সুখ ভোগ করেন। এমনকি যদি পুরুষটি ব্রহ্মঘাতিও (ব্রাহ্মণকে হত্যাকারী) হয়, যদি বন্ধু বা মহৎ কোনো ব্যক্তির খুনিও হয়, তার স্ত্রী চিতায় আরোহণ করলে সে পাপমুক্ত হয়। যে নারী স্বামীর মৃত্যুর পর অগ্নিতে প্রবেশ করেন, তিনি স্বর্গে অরুন্ধতীর মতো সুখ্যাতি লাভ করেন। যতক্ষণ কোনো নারী তার স্বামীর মৃত্যুর পর নিজেকে দহন না করেন, ততক্ষণ তিনি তার নারীজন্ম থেকে মুক্তি পান না। যে নারী তার স্বামীর অনুগমন করেন, তিনি তার মাতৃকুল, পিতৃকুল ও পতিকুলের তিন পুরুষকে পরিশুদ্ধ করেন।” [৮]

[Garuda Purana II.4.88-97 | Motilal BanarsiDas Publishers Privet Limited]

ব্রহ্মাণ্ড পুরাণে সতীদাহ

পরশুরামের পিতা জমদগ্নিকে মৃত ভেবে তার মাতা রেণুকা সহমরণের সিদ্ধান্ত নিয়েছিলেন-

“পবিত্র রীতিনীতির অনুষ্ঠানকারী রেণুকা যে স্বামীর শোকে বিভোর হয়েছিলেন, তিনি তার পুত্রদের ডেকে এই কথাগুলো বললেনঃ ২/৩/৩০/৩৫ [৯]

রেণুকা বললেনঃ

হে আমার পুত্রেরা আমি তোমাদের স্বর্গীয় মেধাবী পিতার অনুগমণের ইচ্ছা করি। এর অনুমতি প্রদান করা তোমাদের কর্তব্য। ২/৩/২০/৩৬ [১০]

বৈধব্যের দুর্গতি অসহনীয়। আমি কিভাবে তা সহ্য করবো? স্বামীর দুঃখে শোকার্ত হয়ে আমি পাগল হয়ে যাব। আমি কিভাবে আমার দিনযাপন করবো? ২/৩/৩০/৩৭ [১১]

তাই আমি আমার প্রিয়তম স্বামীকে অনুসরণ করবো যাতে আমি তার সাথে অন্য জগতে কোনো বাধা ছাড়াই চিরকাল বাস করতে পারি। ২/৩/৩০/৩৮ [১২]

এই জ্বলন্ত চিতায় প্রবেশ করে, কিছু দীর্ঘ সময়ের পরে, পিতৃদের জগতে আমি আমার স্বামীর অতিথি হব। ২/৩/৩০/৩৯ [১৩]

হে পুত্রেরা যদি তোমরা আমার প্রিয় কিছু করতে চাও, তবে আমার বিরুদ্ধে ঐক্যবদ্ধ অবস্থান গ্রহণ করে অন্য কোন কিছুই প্রকাশ করতে পার না, আগুনে আমার আত্মাহুতিতে তোমাদের সম্মতি ও সমর্থন জানানো ছাড়া। ২/৩/৩০/৪০ [১৪]

এই কথাগুলো বলার পরে দৃঢ় সিদ্ধান্তের সাথে রেণুকা তার স্বামীর অনুগমণের সিদ্ধান্ত নিলেন এবং অগ্নিতে প্রবেশ করলেন। ২/৩/৩০/৪১” [১৫]

[brahmanda puranam- Publisher- Motilal Banarsi das private limited]

পদ্মপুরাণে সতীদাহ

পদ্মপুরাণে এক ব্রাহ্মণ মারা গেলে তার স্ত্রী দুঃখে ভেঙ্গে পড়ে। তখন সেখানে নারদ এসে উপস্থিত হলে স্ত্রীটি নারদের পায়ে লুটিয়ে পড়ে।

“তাকে উঠিয়ে নারদ বিশুদ্ধ নারীটিকে তার মৃত স্বামীর সম্বন্ধে বললেনঃ হে নিষ্পাপ বিশালাক্ষী, দয়া করে তুমি তোমার স্বামীর কাছে যাও। হে বিশালাক্ষী, তোমার স্বামী তার আত্মীয় দ্বারা পরিত্যক্ত এবং মৃত। হে শুভে, তোমার কাঁদা উচিত নয়। অগ্নিতে প্রবেশ কর (তোমার স্বামীর চিতায়)।

ব্রাহ্মণ নারীটি বললেনঃ

হে ঋষি, আমাকে যেতে হবে নাকি যেতে হবে না বলুন, যাতে অগ্নিতে প্রবেশের সময় পার না হয়ে যায়।

নারদ বললেনঃ ৫/১০৬/৫৮-৬২ [১৬]

ঐ শহরটি এখান থেকে একশ যোজন দূরে। ব্রাহ্মণকে (তোমার স্বামীর মৃতদেহকে) কাল পোড়ানো হবে।

Avyaya (নারীটি) বললেনঃ

হে মুনি! আমি আমার স্বামীর কাছে যেতে চাই, যিনি দূরে আছেন।

তার কথা শুনে নারদ বললেনঃ “তুমি আমার বীণার হাতলে বস। আমি সেখানে এক মুহূর্তে পৌঁছে যাব।” এটা বলতে বলতে তিনি সেখানে উপস্থিত হলেন- সেই দেশে যেখানে মৃত ব্রাহ্মণটি ছিলেন। মুনি Avyaya কে বললেনঃ ”যদি তুমি অগ্নিতে প্রবেশ করতে চাও, তবে কেঁদো না। হে কন্যা! যদি তুমি পরপুরুষ সম্ভোগের মত পাপ করে থাকো, তবে শুদ্ধ হবার জন্য এর প্রায়শ্চিত্ত করো। আগুনে প্রবেশের ফলে তোমার ছোটখাটো পাপ বিনষ্ট হয়ে যাবে। আগুনে প্রবেশ ছাড়া মহিলাদের সকল পাপ নিবারণের অন্যকোনো প্রায়শ্চিত্ত আমি দেখি না। 5/106/64-69A [১৭]

নারীটি নারদকে জিজ্ঞেস করে, অগ্নিতে প্রবেশের সময় নারীদের কি কি করা উচিত?

উত্তরে নারদ বলেন,

তাদের স্নান করতে হবে, নিজেদের পবিত্র করতে হবে, অলঙ্কার পরতে হবে, চন্দনের প্রলেপ দিতে হবে, পুষ্প পরতে হবে, ধূপ, শস্য এবং পবিত্র চাল রাখতে হবে। তাদের একটি সুষম সূত্র পরিধান করতে হবে, পায়ে লাল লাক্ষা লাগাতে হবে।সাধ্য অনুসারে তারা উপহার দান করবে, তারা সম্মতি সূচক বাক্য উচ্চারণ করবে এবং তারা খুশি মুখে থাকবে। তাদের অনেক শুভ গান ও বাদ্যযন্ত্রধ্বনি শুনতে হবে। অবিশ্বস্ততার মত পাপ করে থাকলে , প্রায়শ্চিত্তের জন্য সেই পুরোনো পাপের কথা স্বীকার করতে হবে। তারপর তাদের গয়না পরিধান করতে হবে, এবং ব্রাহ্মণকে তা নিবেদন করতে হবে। অলঙ্কার না থাকলে তারা ব্রাহ্মণকে প্রায়শ্চিত্তের অনুষ্ঠান করতে বলতে পারবে না। অন্য কোনো ভাবে, অন্য কোথাও সেই পাপের স্খালন হতে পারে না। [৩৪]

যাইহোক, কিছু কথোপকথন ও ঘটনার পরে,

“ব্রাহ্মণটির দেহ পুড়িয়ে নারদ ব্রাহ্মণটির স্ত্রীকে বলেনঃ হে অভয়া, যাও অগ্নিতে প্রবেশ কর, যদি তোমার ইচ্ছা হয়। তারপর সতী নারীটি সাজগোজ করে, নারদকে ডানদিক থেকে তিনবার প্রদক্ষিণ করে, নমস্কার করে, নিজের মন গৌরিকে সমর্পণ করলেন। পার্বতীকে পৃথক ভাবে সন্তুষ্ট করার জন্য, তিনি নিজের সুষম সূত্র, হলুদ, পবিত্র শস্য, ফুল, বস্ত্র, চন্দন, চিরুনি, রকমারী ফল ইত্যাদি স্পর্শ করলেন। সতী নারীটি তিনবার দাউ দাউ করে আকাশ স্পর্শ করা অগ্নিকে তার ডানদিক থেকে প্রদক্ষিণ করলেন এবং তার সামনে গিয়ে দাঁড়ালেন। এবং এই কথাগুলো বললেনঃ [৩৫]

হে ইন্দ্র, হে পৃথিবী মাতা, হে সূর্য, ধর্মের মত সকল দেবতা আমার কথা শুনুন, “যদি বিবাহের দিন থেকে আজ অবধি দিনরাত্রি আমি বাক্য, মন ও কর্মের দ্বারা স্বামীর স্বামীর সেবা করে থাকি এবং যদি বাল্য, যৌবন ও বার্ধক্যে আমি আমার কর্তব্য সঠিকভাবে পালন করে থাকি, তবে আমাকে আমার স্বামীর কাছে প্রেরণ করুন। এই কথা বলে তিনি তার হাতের ফুলটি ফেলে দিলেন এবং জ্বলন্ত আগুনে প্রবেশ করলেন। তারপর তিনি সূর্যের মত চমৎকার একটি যান দেখলে যা স্বর্গীয় অপ্সরাদের সঙ্গীতে পূর্ণ ছিল। তিনি বিমানে আরোহন করলেন এবং স্বর্গে স্বামীর কাছে চলে গেলেন। তারপর যম সেই সতী নারীকে সম্মান জানিয়ে বললেন, তুমি স্বর্গে চিরকাল থাকবে। তোমার কোনো পাপ অবশিষ্ট নেই…” [৩৬] [Tr. N.A. Deshpande| Motilal Banarsi Dass Publication]

“রুক্মপুত্রি প্রদ্যুম্নের সাথে, ঊষা অনিরুদ্ধের সাথে আগুনে প্রবেশ করলেন। সকল যাদব নারীরা তাদের স্বামীর শরীরকে সম্মান জানালেন এবং আগুনে প্রবেশ করলেন।” Padma Purana VI.252.89-90 [১৮] [Tr. N.A. Deshpande | Motilal Banarsi Dass Publication]

দেবীভাগবত পুরাণে সতীদাহ-

“একসময় যৌবন ও সৌন্দর্যে পরিপূর্ণ মাদ্রী একাকী এক নির্জন স্থানে ছিলেন। তাকে দেখে পাণ্ডু জড়িয়ে ধরেন এবং অভিশাপের কারণে মারা যান।যখন অন্ত্যেষ্টিক্রিয়ার চিতা জ্বলছিল, তখন সতী মাদ্রী অগ্নিপ্রবেশ করেন এবং সতী হয়ে মারা যান। কুন্তিকে এমনটি করতে বারণ করা হয়েছিল, যেহেতু তার ছোট শিশুদের দেখাশোনা করার ছিল।” [১৯]

[Devi Bhagabatam 6.25.35-50 | Translation: swami Vijanananda |Republished in 2008 by Forgotten Books]

“…তারপর সেই মুনিরা পাণ্ডুকে মৃত জানতে পেরে তাদের মৃতের সৎকারের অবশ্যকর্তব্য পালন করলেন। সেই সময়ে মাদ্রী কুন্তিকে তার দুই পুত্রের ভার অর্পণ করেন এবং তার স্বামীর সাথে সতী প্রথা পালন করে সত্যলোকে গমন করেন।” [২০]

[ Devi Bhagavatam 2.6.53-71|Translation: swami Vijanananda |Republished in 2008 by Forgotten Books]

শিবপুরাণে সতীদাহ

“২০. যুবতী নারীটি তার স্বামীকে রাক্ষস দ্বারা বন্দি দেখে ভীত হয়ে পড়েন এবং তীব্র ক্রন্দনের সাথে তাকে অনুনয় করেন। ২১. বারবার আকুতি করা সত্ত্বেও নরখেকো নিষ্ঠুর রাক্ষসটি ব্রাহ্মণটির মাথা কেটে তাকে খেয়ে ফেলে। ২২. এতে দুর্দশাগ্রস্ত, শোকার্ত পবিত্র নারীটি তীব্র বিলাপ করেন। তিনি তার স্বামীর হাড়গুলোকে জড়ো করেন এবং একটা চিতা প্রস্তুত করেন। ২৩. ব্রাহ্মণ নারীটি তার স্বামীর অনুগমনের জন্য চিতায় প্রবেশের বাসনা করলেন এবং রাক্ষস রাজাকে অভিশাপ দিলেন। ২৪. সতী নারীটি এটা বলার পরে অগ্নিপ্রবেশ করলেন- আজকের পর থেকে তুমি কোনো নারীর সাথে মিলিত হলে, মারা যাবে।” [২১]

[Siva puranam/Kotirudra samhita/10/20-24| Motilal BanarsiDas Publishers private limited]

শ্রীমদভাগবতে সতীদাহ

“তারপর তিনি কাঠে আগুন জ্বালিয়ে একটি চিতা প্রস্তুত করলেন এবং তার উপর তার স্বামীর মৃতদেহ স্থাপন করলেন। এই কাজ শেষ হয়ে গেলে তিনি তীব্রভাবে বিলাপ করলেন এবং স্বামীর সাথে আগুনে পুড়িয়ে নিজেকে মারার জন্য প্রস্তুত করলেন।” [২২] [srimadbhagbatam/4/28/50 Translation: Vaktivedanta swami Prabhupada |The Vaktivedanta Book Trust]

এই শ্লোকের ভাষ্যে প্রভুপাদ বলছেন,

“বিশ্বস্ত স্ত্রীর তার স্বামীর সাথে মারা যাওয়া বৈদিক ব্যবস্থার এক দীর্ঘ ঐতিহ্য। একে সহমরণ বলা হয়। ভারতে এই প্রথা ব্রিটিশ শাসনকাল পর্যন্ত প্রচলিত ছিল। সেই সময়, যাইহোক, মাঝে মাঝে যে স্ত্রী তার স্বামীর সাথে মরতে প্রস্তুত নয় তাকেও তার আত্মীয়েরা জোর করে তা করতে বাধ্য করতো। পূর্বে ব্যাপারটি এমন ছিল না। স্ত্রী স্বেচ্ছায় অগ্নিতে প্রবেশ করতেন। ব্রিটিশ সরকারকে এই প্রথাকে অমানবিক ভেবে রদ করেছিলেন। যাইহোক, ভারতের ইতিহাসের আদিকাল থেকে আমরা সন্ধান পাই, যখন মহারাজা পাণ্ডুর মৃত্যু হয় তখন তার দুই স্ত্রী বেঁচে ছিলেন, মাদ্রী এবং কুন্তি। প্রশ্ন ছিল, তারা উভয়ে মরবেন, না তাদের একজন মরবেন। মহারাজা পাণ্ডুর মৃত্যুর পর তার স্ত্রীরা স্থির করেন একজন বেঁচে থাকবেন এবং অপরজন সহমরণে যাবেন। মাদ্রী সহমরণে গেলেন এবং পাঁচ পাণ্ডব সন্তানদের দেখাশোনার জন্য কুন্তি বেঁচে থাকলেন। এমনকি ১৯৩৬ সালে আমরা অনুগত স্ত্রীকে স্বেচ্ছায় তার স্বামীর সাথে আগুনে প্রবেশ করতে দেখেছি। এটি নির্দেশ করে যে একজন ভক্তের স্ত্রীকে এমন আচরণ করার জন্য প্রস্তুত করে রাখতে হবে।একইভাবে আধ্যাত্মিক গুরুর কোনো নিবেদিত শিষ্যের গুরুর লক্ষ্য সম্পাদনে ব্যর্থ হওয়ার চেয়ে আধ্যাত্মিক গুরুর সাথে মরা ভালো। দেবত্বের সর্বোচ্চ ব্যক্তিত্ব যেমন ধর্ম সংস্থাপনের জন্যই পৃথিবীতে নেমে আসেন, তেমনি তার প্রতিনিধি, আধ্যাত্মিক গুরুও ধর্মসংস্থাপনের জন্য আসেন। আধ্যাত্মিক গুরুর লক্ষ্যের দায়িত্ব নেওয়া এবং তা সঠিকভাবে পালন করা শিষ্যের দায়িত্ব। অন্যথায়, শিষ্যের তার গুরুর সাথে মরা উচিত। অন্য কথায়, আধ্যাত্মিক গুরুর ইচ্ছা পূরণের জন্য ব্যক্তিগত চিন্তা পরিত্যাগ করে শিষ্যের জীবন দান করতেও প্রস্তুত থাকা উচিত।” [২৩]

শ্রীমদভাগবতের ৯/৯/৩২ শ্লোক এর ভাষ্যে প্রভুপাদ বলছেন,

“বৈদিক সংস্কৃতিতে সতী বা সহমরণ বলে একটি ব্যবস্থা রয়েছে, যাতে কোনো নারী তার স্বামীর সাথে মারা যায়। এই ব্যবস্থা অনুসারে, স্বামী মারা গেলে স্ত্রী স্বেচ্ছায় তার স্বামীর জ্বলন্ত চিতায় ঝাপ দিয়ে মৃত্যুবরণ করে।এখানে, এই শ্লোকে এই সংস্কৃতির অন্তর্নিহিত কথাগুলি ব্রাহ্মণের স্ত্রীর দ্বারা প্রকাশিত হল। স্বামী ছাড়া কোনো মহিলা মৃতদেহের মত। তাই বৈদিক সংস্কৃতি অনুসারে কোনো নারীর অবশ্যই বিয়ে দিতে হত। এটা তার পিতার দায়িত্ব। কোনো মেয়েকে দান করে দেওয়া যেত এবং স্বামীর একের অধিক স্ত্রী থাকতে পারতো , কিন্তু কোনো নারীর অবশ্যই বিয়ে দিতে হত। এটা বৈদিক সংস্কৃতি। একজন মহিলা সবসময় নির্ভরশীল (অধীন?) থাকবেন, বাল্যকালে পিতার উপর নির্ভরশীল থাকবেন, যৌবনে স্বামীর উপর নির্ভরশীল থাকবেন এবং বার্ধক্যে জ্যেষ্ঠ সন্তানের উপর নির্ভরশীল থাকবেন। মনুসংহিতা অনুযায়ী, নারী কখনোই স্বাধীন থাকবেন না। মহিলাদের জন্য স্বাধীনতা মানে দুঃখজনক জীবন। আজকের যুগে, কত মেয়েরা অবিবাহিতা থাকে এবং নিজেদের স্বাধীন ভাবার ভ্রম করে, কিন্তু তাদের জীবন হয় দুঃখজনক। এখানে একটি ঘটনা দেখা যায়, যেখানে একজন মহিলা অনুভব করে, স্বামী ছাড়া তার জীবন মৃতদেহের সমান।” [২৪]

শ্রীমদভাগবত ১/১৩/৫৮ তে, ধৃতরাষ্ট্রের মৃত্যুর পর তার স্ত্রী গান্ধারী সহমৃতা হন-

“বাইরে যখন তার স্বামীকে রহস্যময় শক্তির আগুনে কুটিরসহ জ্বলতে দেখবেন, তখন সতী স্ত্রী আত্মহারা হয়ে আগুনে প্রবেশ করবেন।” [২৫]

প্রভুপাদ তার ভাষ্যে বলছেন,

“গান্ধারী ছিলেন একজন আদর্শ পবিত্র নারী, তার স্বামীর জীবনসঙ্গিনী, এবং এরপরে যখন তিনি দেখলেন তার স্বামী নিজের রহস্যময় যোগের আগুনে কুটির সহ জ্বলছেন, তিনি মরে গেলেন। একশ পুত্রকে হারানোর পরে তিনি ঘর ছেড়েছিলেন এবং জঙ্গলে তার সবচাইতে প্রিয় স্বামীকে পুড়তে দেখলেন। তিনি প্রকৃতপক্ষে একাকী বোধ করলেন, তাই তিনি অগ্নিতে প্রবেশ করলেন এবং মৃত্যুতেও স্বামীকে অনুসরণ করলেন। পবিত্র নারীর মৃত স্বামীর অগ্নিতে প্রবেশের নাম হল সতী প্রথা, এবং এই কাজটি কোনো নারীর জন্য সবচেয়ে যথাযথ বলে বিবেচনা করা হয়। পরবর্তীকালে এই প্রথা এক জঘন্য অপরাধ হয়ে পড়ে কারণ অনিচ্ছুক মহিলাদের উপরও এটা জোর করে চাপানো হচ্ছিল। বর্তমানের অধঃপতিত যুগে কোনো নারীর সতীপ্রথা পালন করা সম্ভব নয়, অতীতে যতটা পবিত্র ভাবে গান্ধারী এবং অন্যান্যরা করেছিলেন। গান্ধারীর মত সতী নারীর কাছে পতির থেকে আলাদা থাকা প্রকৃত অগ্নির চাইতেও জ্বালাময়। এরকম মহিলা স্বেচ্ছায় সতীপ্রথা পালন করতে পারেন এবং এখানে কারোর কোনো অপরাধমূলক জোরাজুরি নেই। যখন এই প্রথা কেবল একটা ফর্মালিটি হয়ে উঠেছিল, তখন মহিলাদের এই নিয়ম পালন করতে বাধ্য করা হত, প্রকৃতপক্ষে এটা অপরাধমূলক হয়ে উঠেছিল এবং তাই আইনের দ্বারা এই অনুষ্ঠান বন্ধ করা হয়। নারদ মুনি তার ভবিষ্যদ্বাণীতে যুধিষ্ঠিরকে তার বিধবা মাসির কাছে (মূল ইংরেজি অনুবাদে aunt আছে) যেতে বারণ করেছিলেন।” [২৬]

“এভাবে ব্রাহ্মণপত্নী রাজা সুদাস যিনি মিত্রসাহা নামে পরিচিত তাকে অভিশাপ দিলেন। তারপর, স্বামীকে অনুসরণ করার জন্য , স্বামীর হাড়গুলো একত্রিত করে তিনি তাতে আগুন ধরালেন এবং সেই আগুনে ঝাপ দিয়ে স্বামীর মতোই একই গতি প্রাপ্ত হলেন।“ [৩৩] [shrimadbhagabatam/9/9/36- translated by prabhupada]

[প্রভুপাদ অনুবাদিত শ্রীমদভাগবত ডাউনলোডের লিংক]

স্কন্দ পুরাণে সতীদাহ

“এর পরেই রাজা Manojava ওই তীর্থের বলে তার দেহ ত্যাগ করে শিবলোকে গেলেন। হে ব্রাহ্মণেরা, তারপর তার স্ত্রী সুমিত্রা তার দেহকে আলিঙ্গন করে তার চিতায় আরোহণ করলেন। তিনিও (সুমিত্রা) একইলোক প্রাপ্ত হলেন।” [২৮] [Skanda Purana III.i.12.115-116 |Tr. G.V. Tagare|Motilal BanarsiDass Publication]

“৫৩.যে সতী নারী গৃহ থেকে শ্মশানে আত্মাহুতি দেওয়ার জন্য অবধি তার স্বামীর অনুসরণ করে, প্রতি ধাপে সে নিশ্চয় একটি অশ্বমেধ যজ্ঞের সমান পূণ্য লাভ করে। ৫৪.সাপুড়ে যেমন জোর করে সাপকে গর্ত হতে বের করে আনে, তেমনি সতী নারীও তার স্বামীকে যমদূতের হাত থেকে রক্ষা করে আনে এবং স্বর্গভোগ করে। ৫৫-৫৮. সতী নারীকে দেখে যমদূত পালিয়ে যায়।সতী নারীর দ্যুতি দেখে সূর্যও জ্বালা বোধ করে, এমনকি আগুনও দগ্ধ হয়ে যায়, অন্যান্য আলোর উৎসও ভীত হয়ে ওঠে। একজন সতী নারী তার স্বামীর সাথে তত কোটি দশ হাজার বছর স্বর্গ ভোগ করে, যে সংখ্যক লোম তার শরীরে আছে।” [২৯] [Skanda Purana III.ii.7.53-56| Motilal BanarsiDass Publication]

৩৮-৪১. তার স্ত্রী অনন্য বৈশিষ্ট্যের সাথে সুন্দরী ছিলেন। তিনি সতী ছিলেন এবং মহান গুণের অধিকারী ছিলেন। তিনি আনন্দের সাথে হাসতেন। তিনি দৃঢ় চিত্তের অধিকারী ছিলেন। যখন তার স্বামীকে হত্যা করা হল, তার অবস্থা করুণ হয়ে পড়ল। পতিবিচ্ছেদে তিনি অত্যন্ত কাতর হয়ে পড়লেন। তিনি ভয়ানক জংগলের মধ্যে লুকিয়ে ছিলেন। সুন্দরী মহিলাটি জ্বালানি ও পাতা সংগ্রহ করে চিতা প্রস্তুত করে স্বামীর সাথে সেই চিতায় আরোহণ করলেন। এই কাজ করে তিনি মানসিক ভাবে তৃপ্তি পেয়েছিলেন। [৩০] [Skanda Purana V.i.53.38-41 |Motilal BanarsiDass Publication]

ব্রহ্মবৈবর্ত পুরাণে সতীদাহ

ব্রহ্মবৈবর্ত পুরাণে কপোত কপোতির উপাখ্যানে কপোত অগ্নিতে ঝাপ দিয়ে মারা গেলে, কপোতিকেও একই কাজ করতে দেখা যায় এবং কপোতির কথায় সহমরণের আদর্শ ফুটে ওঠে। খাঁচায় বদ্ধ কপোতি ব্যাধ লুব্ধককে বলে, “মহাশয়, দয়া করে আমাকে মুক্ত করে দিন। পতিবিহীন এই জীবনে আর কি প্রয়োজন? আমি এখনই এই অগ্নিতে দেহত্যাগ করবো। ”ব্যাধ কপোতিকে মুক্ত করে দিলে কপোতি বলে, “সমস্ত অবস্থায় স্বামীর অনুগমন করাই স্ত্রী জাতির ধর্ম। বেদে এবং লোকসমাজে এই পথই প্রশস্ত বলে অভিহিত। পতিব্রতা নারী স্বামীর সাহায্যেই স্বর্গে গমন করে থাকে। যে নারী স্বামীর অনুগমন করে, সে বহুকাল পর্যন্ত স্বর্গে বাস করে।” তারপর সে যখন আগুনে প্রবেশ করল তখন আকাশে জয়ধ্বনি শোনা গেল। সেই পক্ষি দম্পতি সূর্যের মত উজ্জ্বল বিমানে স্বর্গে যেতে যেতে ব্যাধকে বলল- “মহাশয় আমরা দেবলোকে যাচ্ছি। এখন তোমার অনুমতি নিচ্ছি; কারণ তুমি আমাদের অতিথি। তোমার জন্যই আমাদের স্বর্গে যাওয়ার পথ প্রশস্ত হল। তোমাকে আমরা নমস্কার করি।”

[ব্রহ্মবৈবর্ত পুরাণ,৮০ তম অধ্যায় ,অনুবাদক-অন্নদাশঙ্কর পাহাড়ী]


  • ৪৬৮ বার পড়া হয়েছে

পূর্ববর্তী লেখা পরবর্তী লেখা

বিঃদ্রঃ নারী'তে প্রকাশিত প্রতিটি লেখার বিষয়বস্তু, ক্রিয়া-প্রতিক্রিয়া ও মন্তব্যসমুহ সম্পূর্ণ লেখকের নিজস্ব। প্রকাশিত সকল লেখার বিষয়বস্তু ও মতামত নারী'র সম্পাদকীয় নীতির সাথে সম্পুর্নভাবে মিলে যাবে এমন নয়। লেখকের কোনো লেখার বিষয়বস্তু বা বক্তব্যের যথার্থতার আইনগত বা অন্যকোনো দায় নারী কর্তৃপক্ষ বহন করতে বাধ্য নয়। নারীতে প্রকাশিত কোনো লেখা বিনা অনুমতিতে অন্য কোথাও প্রকাশ কপিরাইট আইনের লংঘন বলে গণ্য হবে।


মন্তব্য টি

লেখক পরিচিতি

অজিত কেশকম্বলী

লেখক ও ব্লগার

ফেসবুকে আমরা