প্রসঙ্গ নারীবাদ : আলোচনা বনাম ঝগড়া

বৃহস্পতিবার, জুলাই ১৮, ২০১৯ ৪:২২ AM | বিভাগ : সাম্প্রতিক


১. পুরুষতন্ত্রের অন্যতম হাতিয়ার নারীদের মধ্যে যুদ্ধ লাগিয়ে দেয়া। এতে পুরুষতান্ত্রিক ব্যবস্থা জোরদার হয়, যা পুরুষতন্ত্রের উদ্দেশ্য। অনেক উচ্চমার্গীয় নারীবাদী আছেন তারা প্রতিনিয়ত নিজেদের মধ্যেই ঝগড়া (যদিও তাদের মতে এগুলো গঠনমূলক আলোচনা!)  করে সময় পাচ্ছেন না, এরপর নারীবাদ নিয়া ভাবনা ও তার প্রচার!
 
 
২. বুক খোলা ছবি নারীকে পণ্য বানায়! এর মানে আপনিও পণ্য। কারণ আপনি যখন স্লিভলেস পড়া শুরু করছেন বা পড়ার ভাবনা মাথায় এনেছিলেন তখন স্লিভলেস তো দূরে থাকুক, স্লিভ এর সাথে লেস শব্দটা যোগ হওয়াকেই পাপ ধরা হতো। আপনি যে প্রজন্ম কে উন্নত করতে চেয়েছেন দাবী করে নিজেকে আজ এ পর্যন্ত এনেছেন, আপনি ঠিক তার আগের প্রজন্মের মতই মস্তিষ্কে উইপোকা পুষে রেখেছেন।
 
৩. বয়সে বড় হলেই সে অনেক জ্ঞানী হতে পারে, ছোটদের থেকে শিখতে গেলে মান যাবে, ছোট ঐ মেয়েটা/ছেলেটা পুঁচকে ইত্যাদি বলা মানে সে নিজেও বেয়াদব কারণ সে তার বয়সে বড় ব্যক্তিদের ভুল প্রমাণে নারীবাদ নিয়া আলোচনা করেন।
 
৪. আমাদের সমাজে নারীকে পণ্য বানিয়েই রুপালি জগতে তাকে উপস্থাপন করা হয়। তার মানে এই নয় যে যে সে পণ্য/ভোগ্যপণ্য। নারী কী পড়বে তা তার স্বাধীনতা। কিন্তু তার চরিত্র বা গল্পের দৃশ্যপট অনুযায়ী কী পোশাক নির্বাচিত হবে তা পরিচালকের স্বাধীনতা এবং গল্পের/চরিত্রের ডিমান্ড (থিয়েটার চর্চা করার সুবাদে শিখেছি)। কিন্তু নারী যেহেতু পুরুষতান্ত্রিক সমাজে কেবল ভোগের বস্তু তাই তাকে ব্যবহার করে অথবা  কেবল যৌনতার বস্তু হিসাবে বিবেচনা করে তাকে পর্দায় উপস্থাপন করাও গ্রহণযোগ্য নয়। কিন্তু যেহেতু আমরা উন্নত হচ্ছি, আমাদের মানসিকতা উন্নত হচ্ছে তাই এখনও এই যুগে যেখানে নারীকে পর্দায় কেবল বক্ষ প্রদর্শনকারী হিসাবে পেশ করা হয় সেখানেও অপরদিকে নারী কী পড়বে বা পড়বে না বলতে পারা সমাজে নারীর এই পোশাককে কেবলই নারীকে পণ্য হিসাবে প্রদর্শন করায় না। 'নারী পণ্য' -কথাটা এবং তার স্বপক্ষে যুক্তিতর্ক সবটাই পুরুষতান্ত্রিক। 
 
৫. কর্পোরেট জগতে এ ক্যাটাগরি মেয়ে বলতে আমি অন্তত বুঝি যে মেয়ে শিক্ষিত, স্মার্ট, গুছিয়ে কথা বলতে পারে, জ্ঞানী, উন্নত মানসিকতার, তার ওপর অর্পিত দায়িত্ব/কাজ ঠিকঠাক করতে পারে (আরো অনেক বিশেষণ ইত্যাদি থাকতে পারে)। কিন্তু মেয়েদের এই সুদিনেও(!) শোনা যায়, যে মেয়েদের স্তনের আকার ৩৬ ও সুগঠিত (পড়ুন, যৌন আকর্ষণীয়), নিতম্ব যার দোল খায়, কোমড়ের ভাঁজ যার সুস্পষ্ট (বিশেষণ আরো আছে হয়ত) তিনিই হলেন এ ক্যাটাগরির। এখানেও নারী নিজের ইচ্ছাতেই পোষাক নির্বাচন করতে পারে বা সে বাধ্যও হতে পারে। যে নারী নিজের ইচ্ছাতে পোষাক নির্বাচন করে, তাকে কি পণ্য বলা যায়? বা যাকে জবরদস্তি পোশাক পড়তে বাধ্য করা হয় তাকেও কি পণ্য ভাবা উচিত? যুদ্ধ টা কিসের বিরুদ্ধে, নারীর পোশাক নাকি নারীর প্রতি নেতিবাচক দৃষ্টিভঙ্গির?
 
৬. ছোট নারীবাদী/বড় নারীবাদী বলে নারীবাদকে কয়েকটা অংশে ভাগ করে প্রত্যেককে বিভ্রান্ত করে নারীবাদকে ছোট করার পাশাপাশি, নিজেদের ও ছোট করা হয় এবং পাঠক বিভ্রান্তি বাড়ানো হয়। বাঙালি বড়ই সমালোচনা প্রিয়। তারা সামনে যতো তেল মারে, পেছনে খুব সুন্দর করে গালিও দিতে জানে। আলোচনায় শেখার অনেক উপাদান থাকা সত্ত্বেও বাঙালি(?) পাঠক কেবল তর্কাতর্কি বিষয়েই সীমাবদ্ধ থাকে এবং মূল উদ্দেশ্য বিফল রয়। আমি যদি ভেবে নিই, কে কী ভাবল/বলল তাতে কিছু আসে যায় না। তাহলে সে যুক্তি অনুযায়ী, আমার এত কষ্টে করে লেখা, লেখার জন্য চিন্তা করা, চিন্তার জন্য জ্ঞান চর্চা করা এই ব্যাপারগুলো সবই অযৌক্তিক। আমার কেবল আমাকে নিয়েই থাকা উচিৎ, নারীবাদ চুলোয় যাক তাতে আমার কী!
 
৭. আমাদের সমাজে যেখানে নারী ১৮ এর আগে বিয়ে ঠেকাতেই ব্যর্থ সেখানে তাকে কী পড়বে, কি করবে এই চিন্তা করতে শেখানো একটা বিশাল চ্যালেঞ্জ। কিন্তু যখন নির্দিষ্ট লেভেল টার্গেট করা হয় যেমন 'নারী সম্পূর্ণ স্বাধীন', তখন কোনো না কোনোভাবে ঐ বিয়ে না ঠেকাতে পারা নারী পর্যন্ত বার্তা পৌছায়। সে পরিস্থিতিতে ভাবতে শেখে, ধীরে ধীরে চিন্তা করার সামর্থ্য অর্জন করতে পারে। কিন্তু তাই বলে তার কাছ থেকে চূড়ান্ত আশা করা বোকামি। ব্যাপারটা এতো সহজ/স্বাভাবিক হলে সাম্যবাদ ঘন্টাখানেকের মধ্যেই কড়া নাড়ত নিজেই।
 
৮. নারীবাদের উদ্দেশ্য নারী কি করবে বা করবে না সেই স্বাধীনতা অর্জন ও ব্যবহার। তা কোনোভাবেই পুরুষতন্ত্রের পরোক্ষ হাতিয়ার হতে পারে না। গঠনমুলক আলোচনা এবং ঝগড়ার মধ্যে আকাশ পাতাল পার্থক্য।
 
৯. গালি যদি পরিত্যাজ্য হয়, তবে তা পুরোপুরিই পরিত্যাজ্য। কেউ যদি 'ধুর বাল' ও বলে তাও পরিত্যাজ্য। ইংরেজিতে বললেই তা স্মার্টনেস আর বাংলায় বললেই জাত গেলো বলে চিৎকার করা গালির আগে পরিত্যাজ্য। এটা এক ধরণের সুবিধাবাদ। তেমনি কিছু বলতে গেলেই গালিবাচক শব্দ বেছে নিতেই হবে এই ধারণাও এক প্রকার উগ্রতা। বাংলা ভাষায় শব্দের অভাব নেই কিন্তু বেছে নেয়াটা মানসিকতার ওপর নির্ভর করে। নারীবাদ নারীকে তার অধিকার সম্পর্কে সচেতন করে, সে কী পড়বে, কী খাবে, কার সাথে থাকবে, কার সাথে কোথায় শোবে এগুলো নির্ধারণ করার অধিকার কেবল নারীকেই দেয়। কিন্তু নারীবাদ কোনোভাবেই ছেলেরা রাস্তার পাশে প্রস্রাব করতে পারলে আমিও পারব, ছেলেরা শার্ট খুলতে পারলে আমিও পারব এগুলা শেখায় না। 
 

  • ২১১ বার পড়া হয়েছে

পূর্ববর্তী লেখা পরবর্তী লেখা

বিঃদ্রঃ নারী'তে প্রকাশিত প্রতিটি লেখার বিষয়বস্তু, ক্রিয়া-প্রতিক্রিয়া ও মন্তব্যসমুহ সম্পূর্ণ লেখকের নিজস্ব। প্রকাশিত সকল লেখার বিষয়বস্তু ও মতামত নারী'র সম্পাদকীয় নীতির সাথে সম্পুর্নভাবে মিলে যাবে এমন নয়। লেখকের কোনো লেখার বিষয়বস্তু বা বক্তব্যের যথার্থতার আইনগত বা অন্যকোনো দায় নারী কর্তৃপক্ষ বহন করতে বাধ্য নয়। নারীতে প্রকাশিত কোনো লেখা বিনা অনুমতিতে অন্য কোথাও প্রকাশ কপিরাইট আইনের লংঘন বলে গণ্য হবে।


মন্তব্য টি

লেখক পরিচিতি

নুসরাত জাহান মিম

অনার্স শেষ বর্ষ, রসায়ন, জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয় (বরিশাল সরকারি মহিলা কলেজ)

ফেসবুকে আমরা