নওরীন পল্লবী

নারীবাদী লেখক।

সুরক্ষিত শৈশবের সন্ধানে ‘ষষ্ঠ ইন্দ্রিয়’

সময়টা আঠারো সালের শেষের দিকে। নিউজপেপারের পাতায় পাতায় শিশু ধর্ষণের খবর। বয়সের গড় উর্ধ্বসীমা তাও ছিল, নিম্নসীমা চোখে পড়ে না। প্রতিদিন গড়ে ৩জন শিশু ধর্ষণ কিংবা ধর্ষণ চেষ্টার শিকার। পত্রিকা খুললেই তিন-চার-পাঁচ-সাত-এগারো যেকোনো বয়সের শিশুর ধর্ষিত হওয়ার খবর। কখনো কখনো প্রমাণ লোপাট করতে ফুলের মতো শিশু খুন করতেও পাষণ্ডরা দ্বিধা করছে না এতটুকু! এ যেনো এক ধর্ষণপুরী! 

দিনের পর দিন দুশ্চিন্তা ঘিরে রাখে আমাকে। ঘুমোতে পারি না আগের মতো। ছোট ছোট নিষ্পাপ মুখগুলো চোখের সামনে ভেসে ওঠে। মানসিক স্বস্তির জন্যর পত্রিকা পড়া ছেড়ে দিলাম। না, লাভ হলো না। কিছুতেই শান্তি পাই না। আমাকেই কিছু করতে হবে। ঠিক করলাম আমি কিছু করবো। কাছের বন্ধুদের সাথে শেয়ার করলাম। ওরা রাজি হলো। 

দেখতে দেখতে নতুন বছর-২০১৯ শুরু হল। আমরা থার্ডইয়ার উঠলাম। বন্ধুরা সিভি ভারী করবে বলে, যে যার মত বিভিন্ন সংগঠনে যোগ দিচ্ছে। রায়হান, রুহুল, আমি আর মোমেন ঠিক করলাম, আমরা নিজেরাই একটা সংগঠন তৈরি করবো, যে সংগঠন শিশুদের নিরাপদ শৈশবের উদ্দেশ্যে কাজ করবে। নাম ঠিক হল- ‘ষষ্ঠ ইন্দ্রিয়’, যে ইন্দ্রিয় মানুষকে যেকোনো অবস্থা মোকাবেলা করার জন্য তৈরি করে বলে ধারণা করা হয়। আমরা তো শিশুদের সচেতন করে গড়ে তুলতে চাই, তাই এমন নাম। 

বিশ্ববিদ্যালয়ের বেশকিছু শিক্ষকের সাথে কথা বললাম, ওনারা উৎসাহ দিলেন। ছোটখাটো একটা কমিটি তৈরি করে ৬টি উদ্দেশ্য সামনে রেখে চলতি বছরের ১৪ ফেব্রুয়ারি যাত্রা শুরু করলো স্বপ্নের ষষ্ঠ ইন্দ্রিয়। যার প্রথম উদ্দেশ্য নির্ধারিত হল ‘শিশু যৌন নিপীড়ন বিষয়ক সচেতনতা তৈরি ও নিপীড়ন বিষয়ক জরিপ পরিচালনা’। প্রাথমিকভাবে আমরা রাজশাহী শহরে কাজ শুরু করলাম। শহরের প্রাথমিক বিদ্যালয়গুলোর শিশুদের সাথে কর্মশালা পরিচালনা করা শুরু করলাম। কর্মশালাকে ৬ ধাপে ভাগ করা হল:

ধাপ-১: পরিচিতি  পর্ব।

ধাপ-২: শরীরের ব্যক্তিগত অঙ্গগুলোর সাথে পরিচিতি এবং ভালো স্পর্শ ও খারাপ স্পর্শের পার্থক্য বুঝানো।

ধাপ-৩: কে বা কারা  ব্যক্তিগত অঙ্গগুলো দেখতে/  স্পর্শ (প্রয়োজনে) পারবে তা বুঝিয়ে দেয়া।

ধাপ-৪: কেউ খারাপভাবে আদর করলে কি কি উপায়ে তারা নিজেকে রক্ষা করবে তার স্পষ্ট ধারণা দেয়া।

ধাপ-৫: ৩য়, ৪র্থ ও ৫ম শ্রেণীতে জরিপ নিপীড়ন বিষয়ক পরিচালনা।

ধাপ-৬: মতবিনিময় ও অভিভাবকদের উদ্দেশ্যে সচেতনতামূলক লিফলেট বিতরণ। 

কিছুদিনের মধ্যেই ভালো সাড়া পেতে শুরু করলাম। নোয়াখালি বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয় এবং মওলানা ভাসানী বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ে চালু হল আরও নতুন দু'টো শাখা। বর্তমানে ষষ্ঠ ইন্দ্রিয়ের শাখা তিনটি যার মাধ্যমে আমরা রাজশাহী, নোয়াখালি এবং টাঙ্গাইলে আমাদের সচেতনতামূলক কর্মশালা পরিচালনা করে চলেছি। এ পর্যন্ত ২২টি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের প্রায় ৫০০০ শিশুকে আমরা প্রশিক্ষণ দিয়েছি। জরিপ করেছি প্রায় ১০০০ শিশুর উপর যেখানে ৩০-৪০ শতাংশ শিশু কোনো না কোনোভাবে যৌন নিপীড়নের শিকার হয়েছে বলে জানিয়েছে। দু/একটি ব্যতিক্রম ছাড়া কোনো শিশুই অভিভাবকে জানায়নি নিপীড়নের ঘটনাগুলো, যদিও ৯৫ শতাংশ নিপীড়ক শিশুদের পূর্বপরিচিত। আরও আশ্চর্যের ব্যাপার হলো, নিপীড়নের শিকার শিশুদের মধ্যে ছেলে এবং মেয়ে ভিক্টিমের সংখ্যা প্রায় সমান। 

অভিভাবকদের অনুরোধ করবো, ৩ বছর বয়স হলেই বাচ্চাদের সাথে একটু একটু করে কথা বলা শুরু করুন। শিশুদের (নামসহ) শরীরের ব্যক্তিগত অংশের সাথে পরিচয় করিয়ে দিন, যাতে তারা নিজেদের ব্যাপারে সতর্ক থাকতে পারে, তারচেয়েও বড়ো ব্যাপার -তারা যেনো তাদের সমস্যার কথা আপনাকে জানাতে পারে। আর সে সেতুটা আপনাকেই তৈরি করতে হবে। শিশুদের বলুন, আপনি তাদের পরম বন্ধু, তাদের সবকথা আপনি বিশ্বাস করবেন এবং সে কোনো বিপদে পড়লে আপনি অবশ্যই তাকে সাহায্য করবেন। বেশিরভাগ নিপীড়কই শিশুদের পূর্ব পরিচিত এবং পরিবারে বিশ্বস্ত হয়। তাই অনেকসময় শিশুরা বলতে ভয় পায়, যদি আপনি তার কথা বিশ্বাস না করেন! শিশুদের মন থেকে এই ভয়টা দূর করতে হবে। নিপীড়ক যে কেউ হতে পারে, দুর্ভাগ্যবশত কিছু কুলাঙ্গার বাবাও সে তালিকায় আছে, যদিও তারা সংখ্যায় কম।

আমাদের মধ্যে একটা ভুল ধারণা আছে যে পেডোফাইল (শিশুকামী), যারা মেন্টাল ডিসঅর্ডারের কারণে শিশুদের প্রতি যৌন আকর্ষণ বোধ করে, তারাই শুধু শিশু নিপীড়ন করে। পেডোফাইলরা শিশু নিপীড়নের সাথে জড়িত এবং তাদের চিকিৎসার প্রয়োজন, আবার পেডোফাইল হলেই নিপীড়ক হবে এমন নয়। 

পেডোফাইল ছাড়াও আরো দুটো শ্রেণীর মানুষ শিশুদের যৌন নিপীড়ন করে থাকে। একটা শ্রেণী, যারা বিয়ের যথেষ্ট বয়স হওয়ার পরেও যৌনতার ব্যাপারে আত্মবিশ্বাসের অভাবে বিয়ে করতে পারছে না, আর আরেকটা শ্রেণী যাদের বয়স মোটামোটি চল্লিশের উপরে এবং যৌনজীবনে অসুখী। এরা শিকার হিসেবে শিশুদের প্রিফার করে, কারণ এতে রিস্ক কম। অধিকাংশ শিশুরই ভালো স্পর্শ- খারাপ স্পর্শ সম্পর্কে স্পষ্ট ধারণা নেই। তাই পরিবারের বিশ্বস্ততার সুযোগ নিয়ে শিশুদের খুব সহজেই নিপীড়ন করা যায়। 

শিশুদের নিরাপদ শৈশব নিশ্চিত করা আমাদের পরম দায়িত্ব। আসুন, নিরবতা ভেঙে আওয়াজ তুলি, সুরক্ষিত শৈশব নিশ্চিত করি। আজকের শিশুই আগামীর ভবিষ্যৎ।

892 times read

নারী'তে প্রকাশিত প্রতিটি লেখার বিষয়বস্তু, ক্রিয়া-প্রতিক্রিয়া ও মন্তব্যসমুহ সম্পূর্ণ লেখকের নিজস্ব। প্রকাশিত সকল লেখার বিষয়বস্তু ও মতামত নারী'র সম্পাদকীয় নীতির সাথে সম্পুর্নভাবে মিলে যাবে এমন নয়। লেখকের কোনো লেখার বিষয়বস্তু বা বক্তব্যের যথার্থতার আইনগত বা অন্যকোনো দায় নারী কর্তৃপক্ষ বহন করতে বাধ্য নয়। নারীতে প্রকাশিত কোনো লেখা বিনা অনুমতিতে অন্য কোথাও প্রকাশ কপিরাইট আইনের লংঘন বলে গণ্য হবে।