নিরবচ্ছিন্ন সুখ, আনন্দ বলে কিছু নেই!

শনিবার, জুন ২, ২০১৮ ১০:৪৮ PM | বিভাগ : ওলো সই


কোনো কাজে মন বসাতে পারছি না! আমার চারপাশে এতো ভালো ভালো সব ঘটনা ঘটে যাচ্ছে কিছুই আমাকে স্পর্শ করছে না! বড় মেয়েটার স্কুলে ফাইনাল টেস্টের খাতা দেখতে ডেকেছিলো। গেলাম, টিচার আর আমার মেয়ে টেবিলের উল্টো পাশে বসে আছে গা ঘেষাঘেষি করে।
 
টিচার একটা করে পেপার্স খুলে দেখাচ্ছে আর মেয়ে মিটি মিটি হেসে দুই ভ্রু নাচিয়ে ইশারায় আমার রিয়েকশান জানতে চাইছে, টিচার গম্ভীর হয়ে একটা করে পেপার্স খুলে বলছে -এই এই বিষয়গুলো মেধার জন্য অন্নেক কঠিন ছিলো, অন্য বাচ্চাদের তুলনায়, কারণ তারা একদম ছোটো থেকে শিখেছে সরাসরি তাদের মাতৃভাষায়। শুনে আমার মনটা যখন খারাপ হয়ে যাচ্ছিলো টিচার তখনই নাটকীয়ভাবে বললো
 
-কিন্তু মেধা সিক্সটিনে সিক্সটিন পেয়েছে! বলেই ছাত্র শিক্ষক পরস্পরের সাথে হাই ফাইভ করলো। এই ভাবে সব সাবজেক্টের নং আমাকে দেখালো আর প্রতিবার তারা হাই ফাইভ করলো। মেয়ে সব সাবজেক্টে ফুল মার্কস পেয়েছে!
 
তাদের ভাব দেখে মনে হচ্ছিলো আমিই যেনো টিচার আর তারা দু'জনেই ছাত্র। আমি যেনো মনে মনে মেধাকে কম মার্কস দিতে চাইছিলাম, আর তারা তাদের সম্মিলিত যোগ্যতায় ফুল মার্কস ছিনিয়ে নিচ্ছে! এটা যেনো ছাত্র শিক্ষকের যৌথ লড়াই, আমার আশঙ্কার বিরুদ্ধে!
 
 
অদ্ভুত একটা সম্পর্ক ছাত্র শিক্ষকের! এই দৃশ্য যে কি সুন্দর! এই দেশে না আসলে আমার কখনোই দেখা হতো না!
 
আড়াই বছর বয়স থেকে মেধা প্রতিবেশী অন্য বাচ্চাদের স্কুল যেতে দেখে কান্নাকাটি করতো স্কুলে যাওয়ার জন্য। পীঠে ব্যাগ নিয়ে বেরিয়ে যেতে চাইতো স্কুলে। আমি আটকে দিলে হাত পা ছুঁড়ে জুড়তো কান্না। কিছুতেই থামানো যেতো না। শেষে বাধ্য হয়ে কয়েকটি স্কুলে যোগাযোগ করেও ব্যর্থ হলাম ওকে ভর্তি করাতে। যে বাচ্চার কথা ফোটে নি তাকে কে নেবে? ও তখন ইশারা ইঙ্গিতে কথা বলতো, কথা যা বলতো উঁ..উঁ...জাতীয় শব্দ করে, মা, দাদা, বাব্বা, মতল, চিক চিক (চড়ুইয়ের ডাক) এই ছিলো ওর শব্দ সম্বল।
 
তখন থাকি সিদ্ধেশ্বরীতে। এক প্রতিবেশীর পরামর্শে নিয়ে গেলাম বাসার কাছের এক আর্ট স্কুলে। আঁকাজোঁকা আর্ট স্কুল। দিলাম ভর্তি করে, মেয়ের ভাব দেখে কে? একটু বড় বাচ্চারা ড্রইং করে, সে ঘুরে ঘুরে দেখে, তাকেও দেয়া হয় কাগজ আর কালার, সে আপন মনে আঁকাজোঁকা করে। মন চাইলে ঘুরে ঘুরে অন্যদের আঁকাআকি দেখে। স্কুল ছুটি হয়ে গেলেও মেয়ে আর বাইরে আসে না। সে বাসায় যাবে না, মাঝে মাঝে দরজা ফাঁক করে বাইরে দাঁড়ানো আমাকে দেখে আর বলে -মি দাও, আমাল তুতি নাই.. বলেই আমার মুখের উপর দড়াম করে দরজা বন্ধ করে ভেতরে চলে যায়।
 
এই করে করে মাসখানেকের মধ্যেই মেয়ে টর টর করে কথা বলতে শিখে গেলো। সকালে আমাকে ঘুম থেকে তুলে বলে -আমাতে ইততুলে নি দাও। তখন ওর কথা শুনে আমার কি যে কষ্ট! আহা বাচ্চা! বাসায় আমি আর মটরি ছাড়াতো আর কেউ নেই যে কথা শিখবে! বাপ যখন বাসায় ফিরে তখনতো সে থাকে ঘুমে। থেকেও বা কি করবে, সেতো বোবার চেয়েও বোবা।
 
মাস ছ’য়েক পরে কাছের গেটওয়ে ইন্টারন্যাশনাল স্কুল থেকে ফর্ম নিয়ে এসে ওখানে ভর্তি করে দিলাম প্লে ক্লাসে। অনেকটা আঁকাআঁকি শিখেছিলো আঁকাজোঁকাতে। স্কুল পেয়ে সেতো খুব এক্সাইটেড। ইউনিফর্ম পরে স্কুলে যায়। বন্ধু বানালো অনেক। পড়াশুনায় সে সিরিয়াস। আমি কোনো কাজ করতে পারি না। স্কুলে থেকে এসেই টানাটানি হাত ধরে- মা আসো আমাকে পলাও। বলেই স্কুলের বইখাতা নিয়ে বসে যায়। আমিও মহা উৎসাহে ওকে পড়াই।
 
হঠাৎ করেই যেনো ফুরিয়ে গেলো ছয় মাস। মেয়ের ক্লাসে পরীক্ষা হলো, বিশ জন বাচ্চা। রেজাল্ট দিলো, প্লে ক্লাস তার আবার হাফ ইয়ার্লি এক্সাম! ক্লাস রুমে যেতেই ক্লাস টিচার সুমি মিস কানের কাছে মুখ এনে বললো -আপনার মেয়েতো ফাস্ট হয়েছে! আরে বলে কি!!! সব প্যারেন্টসদের সামনে দেয়া হলো বাচ্চাদের টেস্ট কপি। তাইতো ও ই একমাত্র বাচ্চা যে সব বিষয়ে এ প্লাস। ফাইনালেও মেয়ে সব বিষয়ে এ প্লাস পেয়ে টপ করলো।
 
স্কুলটা ক্লাস এইট পর্যন্ত। এই সময় আমাকে ভুতে পেলো। মেয়েকে গ্রীন হ্যারাল্ডে দিতে হবে। তার বাবাকে বলতেই সে ফুঃ করে উড়িয়ে দিলো আমার ইচ্ছেকে।
 
এক আত্মীয়াকে বললাম, গ্রীণ হ্যারাল্ডে গিয়ে খোঁজ এনে দাও আমি মেয়েকে ওখানে দিতে চাই। সে এসে বললো -এইটাতো বড়পা জটিল স্কুল। ভেতরেই ঢুকতে পারলাম না। তারপরও সে কিছু খোঁজ যোগাড় করে এনেছে। কোচিং করতে হবে। কোচিং সেন্টারের খোঁজ নিয়ে এসেছে। কিন্তু পাঁচ বছরের আগে তো নেবে না।
 
মেয়েকে নিয়ে বসলাম। ওকে যতটা পারা যায় ‍বুঝিয়ে বললাম যে কি করতে যাচ্ছি। বললাম তোমাকে কিন্তু একটু বেশি পড়তে হবে। ও লক্ষি মেয়ের মতো ঘাড় কাত করে সায় দিলো। মা মেয়ে ঝাঁপিয়ে পড়লাম যুদ্ধে।
 
নিয়ে গিয়ে ভর্তি করিয়ে দিলাম মোহাম্মদ পুরের সেই বিশেষ কোচিংয়ে। মেয়ের বাবা বললো আমিতো গাড়ি দিতে পারবো না অতদূরে। কে চায় তোমার গাড়ি? বলেই সপ্তাহে তিনদিন গেটওয়ে স্কুল ছুটির পর মেয়েকে নিয়ে মালিবাগ মোড় থেকে উঠে পড়তাম তরঙ্গ বাসে। এটা মেয়ের জন্য নতুন অভিজ্ঞতা, এলিট থেকে ধপাস করে সাধারণ হয়ে গিয়ে সে বেঁকে বসলো যে, বাসে চড়বে না। বাসের চিৎকার চেচামেচি ঠেলাঠিলি ভিড় দেখে মেয়ে বাসের মধ্যেই শুরু করতো চেচামেচি কান্না। চিৎকার করে করেই বলতো কেনো বাবা গাড়ি দেবে না? আমার গারি! আমি বোঝাতাম, বলতাম -বাবার গাড়িতো অফিসে কাজে অনেক দূরে থাকে!
 
-কেনো দূরে থাকবে? দেখো আমি একদিন এক ঘুষি দিয়ে বাবার গাড়ি ভেঙে ফেলবো!
 
আস্তে আস্তে মেয়ে আমার বাস্তবতা বুঝে ফেললো, তিন মাস এমনি তরঙ্গ বাসে সিদ্ধেশ্বরী টু মোহাম্মদপুর চললো। বিদ্যা অর্জনের জন্য আরবীয় ভদ্রলোক চিন দেশে যেতে বলেছেন, আর আমরাতো মাত্র মোহাম্মদপুর যাচ্ছি। গেটওয়ে স্কুলের বাচ্চাদের মায়েরা কেউ কেউ এমনও বললো
-এই মহিলা পাগল হয়ে গেছে!
 
দাঁতে দাঁত চেপে সহ্য করলাম যাবতীয় টিকা টিপপনি। বাসায় ঝগড়াঝাটি নিয়মিত হয়ে উঠলো। তাও সহ্য করি। মেয়ে ফ্যাল ফ্যাল করে ঝগড়া দেখে। বোঝে এই ঝগড়ার উপলক্ষ্য সে। তার বাবা বলে -মেয়ে ইংলিশ মিডিয়ামে পড়াবো না। আমি বলি
-মেয়ে পড়লে ইংলিশ মিডিয়ামে এবং গ্রীণ হ্যারাল্ডেই পড়বে। সে বলে -
-দেখো আগে চান্স পায় কিনা। অমুক বলেছে ঐ স্কুলে অমুক অমুকের বাচ্চা একে তাকে ধরা ধরি করেও চান্স পায় নি, আমি বললাম -
আমি কাউকে ধরাধরি করবো না, তুমি আমাকে চেনো! পরীক্ষা দিয়ে টিকলে পড়বে না পড়লে নাই।
 
পরীক্ষার আগে আগে কোচিং সেন্টার থেকে জানালো এডমিশন টেস্ট ভাইবাতে বাচ্চার সাথে বাবা মা দু’জনকেই এটেণ্ড করতে হয়। এবং রিসেন্ট ফ্যামিলি ফটো সাবমিট করতে হয়। শুনে তার বাবা ভাইবাতে যেতে রাজি হলেও ফ্যামিলি ফটো তুলবে না স্কুলের জন্য, এমন পণ করে বসলো। কিছুতেই তুলবে না।
 
এর মধ্যে মেয়ে রিটেনে টিকে গেলো কেমনে জানি। এখন যদি ফ্যামিলি ফটোর জন্য ভাইবাতে না বসতে পারে তাহলে তো ওর সাথে অন্যায় করা হবে। কোচিংয়ে যোগাযোগ করলাম। বললাম
-যে বাচ্চার বাবা নেই সে কি লেখাপড়া করবে না? তারা বললো
-নেই মানে কি? মারা গেছে?
-না আ আ.. ধরেন তার সাথে আমার ডিভোর্স হয়ে গেছে.....(সত্যি সত্যি সম্পর্কটা তখন যায় যায়)
 
তারা হতাশ হয়ে বললো -তাহলেতো সমস্যা বাড়বে। এই স্কুল বাচ্চাদের ফ্যামিলি লাইফটাকে খুব গুরত্ব দেয়। এমনও নাকি হয়েছে, ভর্তির পর বাবা মা’র ডিভোর্স হয়ে যাওয়ায় বাচ্চাকে স্কুল থেকে বের করে দেয়া হয়েছে। আমি আবার মেয়ের বাবার সাথে বসলাম- সেই বসা আবার ঝগড়ায় রূপ নিলে সে বাড়ি থেকে ব্যাগ ব্যাগেজ বের হয়ে গেলো। আর ফিরবে না। আমাদের সাথেও আর থাকবে না। এমনই সংকল্প!
 
আমি আমার শাশুড়িকে ফোন দিয়ে সিচুয়েশন জানালাম। তিনিও ছেলে সাথে ঝগড়ায় জড়ালেন। তার বোনরা জড়ালো, সব বন্ধু বান্ধবকে জানালাম
 
-আমার মেয়ে রিটেনে টিকেছে। মন্ত্রী এমপিদের বাচ্চাকাচ্চা টিকে নাই, আমার বাচ্চা টিকেছে। তার বাবার গোয়াতুর্মির জন্য বাচ্চা যদি ওখানে না ভর্তি হতে পারে, তাহলে আমি আর বাঁচবো কেনো? তাতেও পাথর গললো না। তার এক কথা আমি সিরাজগঞ্জের প্রাইমারি স্কুলে পড়ে অমুক তালেবর হয়েছি। তোমার মেয়েকে কেনো ঐ স্কুলেই পড়াতে হবে? আমি তাকে বোঝানোর চেষ্টা করলাম...
দেশের স্কুলগুলোর পরিবেশের কথা কথাও বললাম। সে আমার সব যুক্তি তুড়ি মেরে উড়িয়ে দিলো। এর মধ্যে সে আরেকটা প্যাঁচ কষলো যে স্কলাস্টিকায় দাও। সে নিজে গিয়ে খোঁজ খবরও নিয়ে এলো। শেষ পর্যন্ত সে আঁগা খানে স্থির হলো। আমি বললাম না, মেয়ে যদি এখানে না টিকে তাহলে আমি অন্য কোথাও যাবো। তার গোঁ সে ধরে থাকলো, গ্রীণ হ্যারাল্ডে সে দেবেই না।
 
এর মধ্যেও কিন্তু আমার সাড়ে চার বছরের বাচ্চা পড়া বন্ধ করে নি। মাঝে মাঝে আমি হতাশ হয়ে হাল ছেড়ে দিতাম। দেখতাম ও নিজে নিজেই পড়ছে, একদিকে ওর স্কুলের পড়া আরেক দিকে এডমিশন টেস্টের পড়া।
 
আমি কোচিং কে জানালাম, যা আছে কপালে আমি একাই মেয়েকে নিয়ে ভাইবাবোর্ডকে ফেস করবো। বলবো আমাদের ডিভোর্স হয়ে গেছে। তাতে যদি তারা মেয়েকে না নেয় আমি নিজেকে বোঝাতে পারবো...।
 
ভাইবার আগের দিন বিকেলে মেয়েকে জড়িয়ে ধরে খুব কাঁদলাম। ইচ্ছে করে নয়। জানি না কেনো কান্না পেয়েছিলো! সন্ধ্যায় আমার শাশুড়ি ফোন করে বললেন, পরীক্ষার জন্য রেডি হও। সে যাবে। আমি ভরসা পেলাম না। বেশ রাতে তিনি ফোন করলেন তার অজ্ঞাতবাস থেকে। কয়েকদিন তিনি আমার ফোনও রিসিভ করতেন না। বললেন- রেডি হয়ে অমুক স্টুডিওতে আসো, ছবি তুলবো। (এই ছবি তোলা নিয়েও আরেকটা মহাকাব্য লেখা যাবে। হয়তো লিখবোও কখনও)
 
আমার মেয়ে কৃতিত্বের সাথে ভাইবা উত্তীর্ণ হলো। রেজাল্টের দিন আমার এক বন্ধু ছিলো সাথে, তার মেয়েও পরীক্ষা দিয়েছিলো। তার গাড়িতেই একসাথে সিদ্ধেশ্বরী থেকে রেজাল্টের জন্য রওয়ানা হলাম। মাঝ পথে যেতেই আরেক বন্ধু স্কুল থেকে ফোন করলো সে জানতো মেধার রোল নং, বললো -মেধার নাম আছে। খুশি হতে গিয়েও সাথে থাকা বন্ধুটির মেয়ের রোল আছে কিনা জানতে চাইলাম। সে তার নং খুঁজে পেলো না। বন্ধুটি গাড়িতেই কান্নায় ভেঙে পড়লো। সেবার সাত‘শ বাচ্চা পরীক্ষা দিয়েছিলো, ওরা প্রতি বছর নেয় একশো বাচ্চা। বন্ধুর কান্নায় নিজের মেয়ের চান্স পাওয়ার আনন্দ উবে গেলো। তারপরও সে তার ড্রাইভারকে বললো স্কুলে যেতে।
 
স্কুলে পৌঁছে দেখি হাসি কান্নার এক মিশ্র পরিবেশ। কেউ কাঁদছে কেউ হাসছে। আমার খুব কাছের এক বন্ধুও এসেছিলো মেধার রেজাল্ট জানতে, সে মেধাকে বললো -মাগো তুমি কি করে এই অসাধ্য সাধন করলে? আমার ছেলে দুই দুইবার পরীক্ষা দিয়েছে এখানে, সে চান্স পায় নি। আমার ঐটুকু মেয়ে গম্ভীর হয়ে বললো
 
-মামা, আমার মা’র জন্য আমার চান্স পাওয়া দরকার ছিলো। তাই আমি খুব মনোযোগ দিয়ে পড়েছি। ওর কথা শুনে আমি অবাক বিস্ময়ে আবেগে কেঁদে ফেললাম। আমি নিজেকে একা ভাবতাম। এই যুদ্ধে ও যে এইভাবে এই অনুভব নিয়ে আমার সঙ্গে ছিলো আমি কেনো তা বুঝি নি!
 
এইটুকু ছিলো এই লেখার উপক্রমণিকা। মেয়ে ভর্তি হলো গ্রীণ হ্যারাল্ডে। কেজি ওয়ান কেটে গেলো এক ঘোরের মধ্যে। নিজের পছন্দের স্কুলে ভর্তি হয়েছে মেয়ে এই আনন্দে। গোল বাঁধলো কেজি টুতে উঠে। তার ক্লাস টিচারের দূর্ব্যবহারে আমার স্কুল পাগল মেয়ে, পড়া পাগল মেয়ের স্কুল থেকেই মন উঠে গেলো। সকাল হলেই তাকে আতঙ্ক পেয়ে বসে।
-রোকসানা মিস আমাকে ডার্টিগার্ল বলে। আমি স্কুলে যাবো না, বাসায় পড়বো। আমি বুঝিয়ে শুনিয়ে নিয়ে যাই। এদিকে ক্লাস টিচার আমাকে ফোন করে বলে
-আপনার মেয়ে ক্লাসে কিছুই পারে না। ওকে আমার বাসায় নিয়ে আসেন। নিলাম। হাফ ইয়ার্লি পর্যন্ত অনেক কষ্টে মেয়েকে টিচারের বাসায় আনা নেওয়া করলাম। কোনো কমপ্লেইন নেই বাচ্চার বিরুদ্ধে।
 
হাফ ইয়ার্লির পর আর দিলাম না টিচারের বাসায়, স্কুলের অনেক খরচ আর আমার সময়ের অভাবও কারণ। টিচারকে সে কথা জানালামও। শুরু হলো আবার মেয়ে উপর বিভিন্নভাবে টর্চার। টিচার আমাকে ফোন করলো কয়েকবার, আমি স্ট্রংলি না করে দিলাম।
 
এর পর সেকশন ইনচার্জের কাছে ডাক পড়লো, মেয়ের বাবা মা দু’জনের। গিয়ে বসলাম বিদেশীনী সেকশন ইনচার্জের সামনে। উনি মেয়ের ক্লাস কপি উল্টে পাল্টে দেখে বললেন -এখানেতো ক্লাস টিচার বলেছে  ওর হ্যান্ড রাইটিং খারাপ। কিন্তু আমিতো দেখছি ঠিকই আছে।
 
উনি হয়তো যা বোঝার বুঝলেন। বললেন -বাসায় হ্যাণ্ড রাইটিং কপি আছে না? বললাম -হ্যাঁ আছে। -সেটা এনে আমাকে দেবে, আমি নিজে ওকে প্রতিদিন হাতের লেখা প্রাকটিস করতে দেবো।
 
পরদিনই মেয়ের বাসার হ্যাণ্ড রাইটিং কপি নিয়ে আমরা বাবা মা দু’জনেই উনার কাছে গেলাম, উনি স্কুলের গেটে দাঁড়িয়েছিলেন। সেখানে দাঁড়িয়েই উনি মেয়ের কপি খুলে দেখেই বললেন -এটা কি! আমিতো এই কপি চাই নি, এটাতেতো ও লিখেছে। আমি বুঝতে না পেরে বললাম
-হ্যাঁ এটাইতো আপনি চেয়েছেন, এটাতে ও বাসায় প্রাকটিস করে। শুনে উনি আমাদের সামনেই কপিটি মেঝেতে ছুড়ে ফেলে দিলেন। এবং আমাদেরকে যাতা বলে ঝাড়তে লাগলেন। তখন আমি বুঝলাম যে তিনি নতুন কপি চেয়েছেন। আমি সাথে সাথেই পাশেই স্কুলের নিজস্ব দোকান থেকে কপি কিনে ফিরে এসে দেখি মেধার বাবা একাই দাঁড়িয়ে আছে, তিনি তার রুমে ঢুকে গেছেন। ব্রাদারকে বললাম যে উনাকে জানান আমি কপি কিনে এনেছি। ব্রাদার ফিরে এসে বললেন- সিস্টার আর দেখা করবেন না।
 
সেদিন মেধার বাবার সাথে আরেক চোট হয়ে গেলো। সে বললো আমি আর কখনওই তোমার মেয়ের স্কুলে আসবো না। তাতে যদি তোমার মেয়েকে স্কুল থেকে বের করে দেয় দেবে। সেদিন তার এই রাগ আমার কাছে খুব যৌক্তিক মনে হয়েছিলো, তাই আমি আর তাকে কোনোদিন স্কুলে যেতে বলি নি।
 
এই নামি স্কুলের যত দামী ঝড়ঝাপটা একাই সামলেছি! আরো অসংখ্য কাল বৈশাখী ঝড় সামলে মেয়ে কেজি টু থেকে ক্লাস ওয়ানে উঠেছে। মুটামুটি খারাপ রেজাল্ট করে। ক্লাস ওয়ান টু’তে সে ভালো ক্লাস টিচার পেলেও আমার মেয়ের যা ক্ষতি হবার তা কে জি টু’তেই হয়ে গেছে।
 
মেয়ে আর স্কুল পছন্দ করে না। মেয়ে বাসায় ঠিক ঠাক পড়াশুনা করলেও ক্লাস টেস্টে সে কিছুই প্রায় লেখে না। অনেক ‍বুঝিয়েও কোনো লাভ হয় না। এক্সামগুলোতে সে ফেল করে না ঠিকই, কোনো মতে পাস করে। এমনও হয়েছে মেয়ের খারাপ রেজাল্টের কারণে স্কুলের অন্য পেরেন্টসদের টিকা টিপ্পনিও হজম করতে হয়েছে আমাকে। অনেকে এমনও বলেছে- আপনার মেয়ে রেজাল্ট খারাপ করছে আর আপনি চাকরি করছেন দিব্যি! আসলে ততদিনে মেধার বাবার সাথে সম্পর্কটা এই পর্যায়ে গিয়ে ঠেকেছে যে আমার চাকরি না করে উপায়ও ছিলো না। ততদিনে আমাদের জীবনে জোনাকও এসে গেছে।
 
অনেক প্যারেন্টের এর চোখ আবার আমার এই ছোটো মেয়েটার উপরও গিয়ে পড়লো।
-আপনি চাকরী করে একটা বাচ্চা সামলাতে পারেন না আবার আরেকটা নিয়ে আসছেন। আপনার অফিস, শাহবাগ, আর ঐ পালক বাচ্চাটাই আপনার মেয়ের জীবন শেষ করতেসে ভাবী! আপনার বাচ্চা রেজাল্ট খারাপ করবে নাতো কি করবে? অনেকে এমনও বলেছে
-ঐটাকে যেখান থেকে আনছেন ঐখানে ফিরাই দিয়ে আসেন।
 
অফিস থেকে ফিরে রাতে ক্লান্ত শরীরে মেয়েকে নিয়ে পড়তে বসেছি, মেয়ে আমার দিকে অসহায় চোখে তাকিয়ে থাকে। পড়া হয় না। প্রায় দিনই দুই বাচ্চা নিয়ে অফিস করেছি। বাচ্চারাও ক্লান্ত হয়ে পড়ে। পরীক্ষার আগে আগে আমার অফিসেই বাচ্চাকে টিচার দিয়েছি। আমার অফিসে এসেই টিচার বাচ্চাকে পড়িয়ে যেতো। এইসব দুর্দিনেই চলতো আমার এক্টিভিজম! লেখালেখি যা কিছু সব।
 
আজ পৃথিবীর উন্নত একটা দেশের উন্নত শিক্ষা ব্যবস্থার স্পর্শে আমার সেই ছোট্ট এক রত্তি জিনিয়াস মেয়েটাকে তার সব যোগ্যতায় ফিরতে দেখে বুকের ভেতর আনন্দ উপচে উপচে পড়ছিলো। ঠিক এমনি সময় কক্স’স বাজারের একরামুল হত্যার অডিও টেপ আর তার তার মেয়েদের কান্না আমার আনন্দের উপর বঙ্গোপসাগরের ঢেউ হয়ে আছঁড়ে পড়ছে। আমার নিজেকে খুব অপরাধী লাগছে! 

  • ৫৪১ বার পড়া হয়েছে

পূর্ববর্তী লেখা পরবর্তী লেখা

বিঃদ্রঃ নারী'তে প্রকাশিত প্রতিটি লেখার বিষয়বস্তু, ক্রিয়া-প্রতিক্রিয়া ও মন্তব্যসমুহ সম্পূর্ণ লেখকের নিজস্ব। প্রকাশিত সকল লেখার বিষয়বস্তু ও মতামত নারী'র সম্পাদকীয় নীতির সাথে সম্পুর্নভাবে মিলে যাবে এমন নয়। লেখকের কোনো লেখার বিষয়বস্তু বা বক্তব্যের যথার্থতার আইনগত বা অন্যকোনো দায় নারী কর্তৃপক্ষ বহন করতে বাধ্য নয়। নারীতে প্রকাশিত কোনো লেখা বিনা অনুমতিতে অন্য কোথাও প্রকাশ কপিরাইট আইনের লংঘন বলে গণ্য হবে।


মন্তব্য টি

লেখক পরিচিতি

চৈতী আহমেদ

প্রধান সম্পাদক, নারী

ফেসবুকে আমরা