নির্বাসিত লেখক’কে প্রিভিউ

বুধবার, জানুয়ারী ৩০, ২০১৯ ৫:০৫ PM | বিভাগ : সাহিত্য


মানববাদী লেখক তসলিমা নাসরিন নামটি শুনলেই যেটা সবার আগে মনে আসে, তা হলো একজন নির্বাসিত লেখক, পশ্চিমবঙ্গ থেকে যার নির্বাসন গোটা দেশের মানচিত্রে সেদিন কালিমালিপ্ত করেছিলো। একজন লেখক যিনি কেবলমাত্র সত্যকে সবার সামনে তুলে ধরতে চেয়েছিলেন, কিন্তু রাজনৈতিক ভোট ব্যাঙ্ক পলিসির সামনে একাকী মাথা উঁচু করে লড়াই করেও বিপরীতে তীব্র ক্ষমতায় থাকা সরকার ও প্রশাসনের সামনে অসহায় হয়ে উঠেছিলেন এবং নির্বাসিত হয়ে যান।

একজন লেখক যিনি ডানেরও খায় না, বামেরও খায় না, নিজের খায়, নিজের পরে, অন্যায়ের সামনে আপসহীন থেকেছেন প্রতিমুহূর্তে, সেই একজন লেখকের কলম কেড়ে নিতে, ভয় দেখিয়ে, হুমকি দিয়ে, ফতোয়া জারি করে, লেখকের প্রতি মৌলবাদের হামলা চালিয়ে চিরতরে মুখ বন্ধ করে দিতে সর্বসচেষ্ট থেকেছে ক্ষমতার লালসায় লালায়িত, সুযোগ সন্ধানী বদমাইশেরা। যেখানে জনসমক্ষে কিছু বদমাইশ মাথার দাম ঘোষণা করে খুনের হুমকি দিয়ে পার পেয়ে যাচ্ছে, মানুষ খুন করে পার পেয়ে যাচ্ছে, চুরি করে, ডাকাতি করে পার পেয়ে যাচ্ছে, সেখানে একজন লেখক, একজন মানুষ স্বাধীনতার প্রশ্ন তুললে, বাকস্বাধীনতার প্রশ্ন তুললে, নারীর অধিকারের প্রশ্ন তুললে, নিজের মতকে পরিস্কার করে বইতে লিখলে তাঁকে নির্বাসিত হতে হয়! সরকার, প্রশাসন বদমাইশদের সুরক্ষার ঘেরাটোপে রাখতে পারে, রাজনৈতিক ছায়াতলে তেল দিয়ে চলা মানুষদের বাকস্বাধীনতার দাম দিতে পারে, অথচ একজন মানুষ যে একাকী বেঁচে থেকে, কারোর ছায়াতলে না থেকে নিজের মতো করে চলার ব্রত নিয়ে চলে, তাঁর কথা কিছু মানুষের ধর্মের অনুভূতিতে আঘাত লাগলো বলে তাঁকে এমনভাবে নির্বাসনদণ্ড দেওয়া!

তাহলে কি বাকস্বাধীনতা কেবল মৌলবাদীদের জন্য? আর কারোর জন্য নয়! আসলে সুযোগসন্ধানী ক্ষমতাসীন দলগুলির ক্ষমতা নেই সত্যের মূল্য দেওয়ার। ওরা শুধু ভোটব্যাঙ্ক চেনে।

৯ই আগস্ট, ২০০৭ হায়দ্রাবাদে লেখক তসলিমা নাসরিনের উপন্যাস “শোধ”এর তেলেগু ভার্সনের বইটির উদ্বোধনের দিন অল ইন্ডিয়া মজলিস-ই- ইত্তেহাদুল মুসলিমিন (AIMIM) সংগঠনের জনা বিশেক কর্মী এমএলএ আফসার খান, আহমেদ পাশা এবং মজুম খানের নেতৃত্বে উদ্বোধন পর্বের মুহূর্তে লেখক তসলিমা নাসরিন এবং সভার ওপর আক্রমণ করে এবং ভাঙচুর চালায়। ওনাদের বক্তব্য ছিলো, “আমরা ইসলামের অবমাননা এবং ইসলামের প্রতি অসম্মান বরদাস্ত করবো না।”

ধর্মের নামে উগ্র স্লোগান দিয়ে মানুষের মস্তিষ্ক, শিরা, উপশিরাতে মত্ততা খুব সহজেই ছড়িয়ে দেওয়া যায়। তসলিমা নাসরিনের নামে একটি ট্যাবু ভীষণ প্রচলিত আছে যে তসলিমা নাসরিন মানেই ইসলাম বিদ্বেষী মন্তব্য করবেন, ইসলামকে কটাক্ষ করবেন। লেখক তসলিমা নাসরিন সেদিন হায়দ্রাবাদের সভাতে ইসলাম তো দূরের কথা, ধর্ম কথাটিও একটিবারের জন্য উচ্চারণ করেন নি। এরপরও হামলা হয় ধর্মবিদ্বেষী মন্তব্য করার অপরাধে। এই হামলার প্রভাব শুধু হায়দ্রাবাদেই সীমিত থাকে নি। ক্রমেই তা ছড়িয়ে পড়ে পশ্চিমবঙ্গেও।

পশ্চিমবঙ্গ যে কালচারাল স্টেট হিসেবে পরিচিত, সেই রাজ্যেও তসলিমা নাসরিনের নামে ফতোয়া জারি হয়, মাথার দাম ঘোষণা করা হয়। সিকিউরিটি দেওয়ার নামে লেখক তসলিমা নাসরিনকে গৃহবন্দী করা হয়। বারে বারে বিভিন্নভাবে লেখক তসলিমা নাসরিনকে বোঝানো হতে থাকে যে এখানে বড়সড় ঝামেলা বা দাঙ্গা হতে চলেছে এবং তাঁকে হত্যা করার ছক তৈরি করে ফেলা হয়েছে। তাই লেখক তসলিমা নাসরিনের উচিৎ দ্রুত কিছুদিনের জন্য পশ্চিমবঙ্গ ছেড়ে অন্যত্র চলে যাওয়া।

তৎকালীন পুলিশ কমিশনার প্রসূন মুখার্জী বারে বারে নানান কৌশলে লেখককে শীতল হুমকি দিতে থাকেন। কবির সুমন (সুমন চট্টোপাধ্যায়) লেখককে অনস্ক্রিনে হুমকি দেন। এরই মধ্যে কলকাতায় একটি চাঞ্চল্যকর ঘটনা ঘটে যায়। রিজয়ান খুনকে কেন্দ্র করে, সিঙ্গুর আন্দোলনকে কেন্দ্র করে যখন কলকাতার মৌলালি, পার্কসার্কাস এলাকা উত্তেজিত হয়ে ওঠে, সেই সুযোগে তৎকালীন মুখ্যমন্ত্রী বুদ্ধদেব ভট্টাচার্যের নির্দেশে একদল ভাড়াটে গুন্ডা রাস্তায় প্ল্যাকার্ড হাতে নেমে পড়ে তসলিমা নাসরিনকে পশ্চিমবঙ্গ থেকে বেরিয়ে যাওয়ার দাবি তুলে। ঘটনার প্রচার হয় “সংখ্যালঘুরা আওয়াজ তুলেছে তসলিমা নাসরিনের বিরুদ্ধে।” তাই তসলিমা নাসরিনকে বেরিয়ে যেতে হবে এবং একদিন লেখকের সাথে প্রতারণা করে, দু’দিনের জন্য পশ্চিমবঙ্গের বাইরে থাকতে হবে বলে কলকাতা পুলিশের একটি দল জোর করে লেখক তসলিমা নাসরিনকে রাজস্থানের ফ্লাইটে তুলে দিয়ে আসে।

নাটকের শেষ এখানেই নয়। পশ্চিমবঙ্গের মুখ্যমন্ত্রী কর্তৃক রাজস্থানের মুখ্যমন্ত্রীকে বলা হয় লেখক তসলিমা নাসরিন একটি অনুষ্ঠানে যোগ দিতে যাচ্ছেন। আদতে সেখানে এমন কোনো অনুষ্ঠান ছিলোই না, লেখক তসলিমা নাসরিনও এই বিষয়ে কিছু জানতেন না। রাজস্থানে পৌঁছানোর পর এই ঘটনা জানাজানি হতেই রাজস্থান সরকারের নির্দেশে পরের দিন ভোর রাতেই লেখক তসলিমা নাসরিনকে রাজস্থান ছাড়তে বাধ্য করা হয়।

স্থলপথে রাজস্থান থেকে দিল্লীতে লেখককে নিয়ে যাওয়ার সময় পুলিশবাহিনী গাড়ির নম্বর প্লেট খুলে, পুলিশি পোশাক পাল্টে অযথা লেখকের মনে ভীতি তৈরি করে। লেখক বারে বারে পুলিশের কাছে বিভিন্ন প্রশ্ন করলেও ওরা একটিও উত্তর দেয় না। এবং লেখককে যে সাংবাদিকরা পেছনে একটি গাড়িতে করে অনুসরন করছিলো, তাদেরকেও মাঝপথে গাড়ি থেকে নামিয়ে একটি হোটেল রুমে আটকে রাখা হয়। লেখকের কাছে থাকা ফোনটিও বন্ধ করে দেওয়া হয় এবং একসময় লেখকের মনে হতে থাকে যে এরা পুলিশের বেশে অন্য কেউ। হয়তো তাঁকে অপহরণ করা হয়েছে। হয়তো কোনো নির্জন স্থানে নিয়ে গিয়ে হত্যা করা হবে।

এরপর দিল্লির মাইলফলক থেকে যখন গাড়ি ঘুরিয়ে সম্পূর্ণ উল্টোদিকে একটি ফাঁকা মাঠের মধ্য দিয়ে নিয়ে যাওয়া হয়, তখন লেখক সম্পূর্ণ নিশ্চিত হয়ে যান যে তাঁকে অপহরণ করা হয়েছে। কিন্তু সে যে কারোর সাহায্য নেবে, এমন উপায় নেই। এরপর একটি জায়গায় গিয়ে লেখককে জানানো হয় যে ওরা চায় নি কেউ পেছন থেকে ওদের অনুসরণ করুক। তাই সিভিল পোশাকে এবং গাড়ির নম্বর প্লেট খুলে এই পথে আসা। এরপর দিল্লির রাজস্থান হাউজে অনেক ঘটনা ঘটে।

লেখককে সম্পূর্ণ প্রতারণা করে সেদিন পশ্চিমবঙ্গের বাইরে বার করে দেওয়া হয়। লেখকের ওপর এরপর নিষেধাজ্ঞা জারি হয়ে যায়। সম্পূর্ণ অনৈতিক, অসাংবিধানিকভাবে সমস্তটা করা হয়। এই সমস্তটার মধ্যে লেখকের যে রুদ্ধশ্বাস জীবন কেটেছে, সেই জীবনটা আমার গায়ে কাঁটা দিয়ে ওঠে। “নির্বাসিত লেখক’কে” বইটি শুধুমাত্র একটি বই নয়, বইটিতে লেখক তসলিমা নাসরিনের বাংলার প্রতি, বাংলা ভাষার প্রতি প্রেম, আবেগ, ভালোবাসা, শ্রদ্ধা, বাংলা ভাষার জন্য নির্বাসন জীবনে প্রতিমুহূর্তে হাহাকার, রওডন স্ট্রিটের বাড়িটা অনাথ হয়ে শহরের এক প্রান্তে একাকী পড়ে থাকা, সমস্ত কিছুর দলিল তুলে ধরা আছে। তুলে ধরা আছে “গেরন” কবিতাটির সেই বাচ্চা মেয়েটি থেকে একজন ডাক্তার হয়ে শেষে আদর্শের জন্য, মানবাধিকারের জন্য, নারীর অধিকারের জন্য কলমকে আপস না করে ডাক্তারির চাকরিতে পর্যন্ত ইস্তফা দিয়ে দেয়, এবং সেখান থেকে আবার পথ চলা শুরু করে একজন আন্তর্জাতিক লেখক হওয়া, ইউরোপের পার্লামেন্টে বাঙালির হয়ে প্রতিনিধিত্ব করা এই এতোটা পথ চলা জীবনে বারে বারে কখনো নিজে নির্বাসিত হয়েছেন, কখনো তাঁর লেখা বই নির্বাসিত হয়ে গেছে, কখনো তাঁর মাথার দাম ঘোষণা করা হয়েছে। লেখক তসলিমা নাসরিন নামটি আমার তীব্র আবেগ, আমার শ্রদ্ধা, আমার ভালোবাসা, আমার প্রেম, আমার তীব্র সুখ।

সুভাষ চন্দ্র বসু বলেছিলেন, “Freedom is not given – it is taken.”

স্বাধীনতার ৭১ বছর পরও যদি আমাদের মত প্রকাশের স্বাধীনতা না থাকে, মত প্রকাশের জন্য, বাকস্বাধীনতার জন্য যদি এখনও লড়াই করতে হয়, নির্বাসিত হতে হয় তবে কিসের স্বাধীন দেশ! কিসের স্বাধীনতা!

কোন মানবিক আইনে তসলিমা নাসরিন আজও নির্বাসিত

কোথায় গেলো ডেমোক্রেসি? কোথায় ফ্রি –টকিং রাইট?

কোথায় হিউম্যানিটি?

দোহাই দেখাও ডোমেস্টিক ভায়লেন্সের, আর –তার আড়ালে চলে ভোট ভবিষ্যৎ!

লুটে যাক মানবতা, লুটে যাক লেখক,

লুটে যাক সত্যের পরিচয়,

চেয়ার বাঁচলেই মওকা মাত।

আমি সজ্ঞানে চাই লেখক তসলিমা নাসরিনের ওপর থেকে নির্বাসনদণ্ড প্রত্যাহার করা হোক, আমার দেশকে কলঙ্কের কালি থেকে মুক্ত করা হোক, প্রতিটা মানুষ নিজস্ব স্বাধীনতায় বেঁচে থাকুক, চলুক, ফিরুক, ভালোবাসায় বাঁচুক। আমি চাই আমার ভারত একদিন সকলের সেরা হয়ে উঠুক। ভারত আমার প্রাণ, আমার প্রশ্বাস, আমার আশ্বাস, আমার বেঁচে থাকার উপাদান। আমি চাই আমার ভারত সমস্ত গোঁড়ামি থেকে মুক্ত হয়ে উঠুক, সকলকে সমানাধিকারে বেঁচে থাকার প্রেরণা দিক। আমি মুক্তকণ্ঠে চিৎকার করে বলতে চাই, “বন্দে মাতরম!”

“নির্বাসিত লেখক’কে” বইটির মাধ্যমে লেখক তসলিমা নাসরিনের প্রতি এই আবেগ, শ্রদ্ধা, ভালোবাসা, প্রেম, সুখ আপনাদের সকলের সাথে ভাগ করে নিলাম। ভালো থাকুন, প্রেমে বাঁচুন। বইটিকে আপনারা ভালোবেসে আপন করে নিন। আপনাদের সমালোচনাও আমি মাথা পেতে নেবো চিন্তাভাবনার জন্য। নিজেদের মত প্রকাশ করুন মুক্তকণ্ঠে।

লেখক তসলিমা নাসরিন, আমি আমার সাধ্যমতো চেষ্টা করে তোমায় প্রণাম জানালাম এই বইটির মাধ্যমে। আমার প্রণাম স্বীকার কোরো। সুস্থ, সুন্দর বেঁচে থেকো শ্রদ্ধায়, ভালোবাসায়।


  • ৩৫৬ বার পড়া হয়েছে

পূর্ববর্তী লেখা পরবর্তী লেখা

বিঃদ্রঃ নারী'তে প্রকাশিত প্রতিটি লেখার বিষয়বস্তু, ক্রিয়া-প্রতিক্রিয়া ও মন্তব্যসমুহ সম্পূর্ণ লেখকের নিজস্ব। প্রকাশিত সকল লেখার বিষয়বস্তু ও মতামত নারী'র সম্পাদকীয় নীতির সাথে সম্পুর্নভাবে মিলে যাবে এমন নয়। লেখকের কোনো লেখার বিষয়বস্তু বা বক্তব্যের যথার্থতার আইনগত বা অন্যকোনো দায় নারী কর্তৃপক্ষ বহন করতে বাধ্য নয়। নারীতে প্রকাশিত কোনো লেখা বিনা অনুমতিতে অন্য কোথাও প্রকাশ কপিরাইট আইনের লংঘন বলে গণ্য হবে।


মন্তব্য টি

লেখক পরিচিতি

সৌম্যজিৎ দত্ত

লেখক, ব্লগার, আইএসআই তে লেকচারার এবং গবেষণারত ছাত্র।

ফেসবুকে আমরা