নিপীড়ক কোনোদিন কোনো প্রমাণ রেখে নিপীড়ন করে না

শনিবার, নভেম্বর ১৭, ২০১৮ ১:২৮ AM | বিভাগ : প্রতিক্রিয়া


সেলীম আল দীন যৌন নিপীড়ক ছিলেন কিনা সেই বিষয়ে দুইটা কথা বলা নৈতিক দায়িত্ব মনে করছি। সেই দুইটা কথা বলার আগে নিজের জাবি সংশ্লিষ্ট পরিচয়টা একটু ভালো করে দিয়ে নিই তাহলে বুঝতে সুবিধা হবে। আমার জন্ম জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয় স্টাফ কোয়ার্টাসে। জীবনের আটাশ বছর পার করে এসেছি ক্যাম্পাসে, তার পরে বের হয়েছি। ওনার স্ত্রী মেহেরুন্নেসা ম্যাডাম আমাদের সরাসরি শিক্ষক ছিলেন দীর্ঘ দিন। এই বার ঘটনায় আসি।

সেলি আল দীন যে যৌন নিপীড়ক ছিলেন এইটা কিন্তু ক্যাম্পাস আবাসিক এলাকায় কোনো গোপন বিষয় ছিলো না। আমরা যখন খুব ছোট টু কি থ্রীতে পড়ি, খুব ভালো করে বিষয়টা বুঝিও না, তখন থেকেই বিষয়টা শুনে এসেছি আমরা। অনেক চাচীরাই গোপনে কানাঘুষা করতেন বিষয়টা নিয়ে। তবে কেউ উচ্চবাচ্য করতেন না। উচ্চবাচ্য করতেন না কারণ সেই কালচার আমাদের সমাজে তখনও ছিলো না, এখনও নেই। আমি স্কুলে থাকতে খুব ভালো নাচ করতাম, আবৃত্তি করতাম, মঞ্চ নাটকে দুই দুইবার রৌপ্য পদক পেয়েছি, কাজেই আমার খুবই ইচ্ছা ছিলো নাট্যতত্ব বিভাগে ভর্তি হবো। আমি ভর্তি পরীক্ষায় সম্মিলিত মেধা তালিকায় নাটক ও নাট্যতত্ব বিভাগে প্রথম হই কিন্তু আমার আব্বা এবং মুরুব্বী বোন যিনি জাবি'১৮ ব্যাচ ছিলেন আমাকে কোনো মতেই সেই বিভাগে ভর্তি হতে দেয় নি। ভর্তি হতে দেয় নি কারণ তখন তারা সেলিম আল দীনসহ আরো কিছু শিক্ষক বিষয়ে এই সমস্ত কানকাহিনী জানে।

এইবার আসি বিশ্ববিদ্যালয় জীবনের কথায়। বিশ্ববিদ্যালয়ে ছাত্রফ্রন্ট করার সুবাদে এই সমস্ত ঘটনা অহরহ কানে আসতো। গণরুমে প্রথম বর্ষে পড়ুয়া মেয়েগুলার কাছে অনেক ধরনের স্টোরি শুনতে হতো কিন্তু কখনোই কিছু করা যায় নি। কারণ কোনো ভিকটিম কখনও মুখ খুলতো না উনার বা ওই বিভাগের অন্য শিক্ষকের নামে। মেয়েগুলোর মুখ না খোলার পিছনে প্রধান ভূমিকা রাখতো বিভাগের সিনিয়র ভাই এবং বোনরা যারা উনার বিরাট ভক্ত, উনাকে গুরু মানেন বা বাবা মানেন। সেই গ্রুপটা তখনও সক্রিয় ছিলো এবং আশ্চর্য জনকভাবে এখনও একই ভাবে সক্রিয় আছে।

সেলিম আল দীন অসম্ভব প্রতিভাবান একজন নাট্যকার ছিলেন উনার নাটক যে দেখে নি সে আসলে বুঝবে না উনার প্রতিভা কোন স্তরের। কিন্তু তাতে উনি যে যৌন নিপীড়ক ছিলেন সেটা খারিজ হয়ে যায় না। প্রতিভার সাথে যৌন নিপীড়নের কোনো বিরোধ নাই। যিনি বিরাট প্রতিভাবান তিনি বিরাট মাপের যৌন নিপীড়ক হতেই পারেন। 

আর হ্যাশট্যাগ মি টু আন্দোলন কোনো বিচার চাই আন্দোলন না, যে আইনের কাছে প্রমাণ দিতে হবে। হ্যাশট্যাগ মি টু আন্দোলন মেয়েদের যৌন নিপীড়নের বিরুদ্ধে কথা বলার জন্য সাহসী করে তোলার আন্দোলন। এই্ আন্দোলন বলে নিপীড়কের নামটা বলে দাও, নিপীড়ক কে অন্তত সামাজিক লজ্জায় ফেলো। এই আন্দোলন যৌন নিপীড়নের বিরুদ্ধে সমাজ কে সচেতন করে তোলার আন্দোলন। এই আন্দোলন দেখিয়ে দিচ্ছে আমাদের সমাজে যৌন নির্যাতন কী ভয়াবহ আকারে আছে। কী পরিমাণ মুখোশ পরা সাধু লোকজন আসলে কী কুৎসিত চরিত্রের হতে পারে। মি টু আন্দোলনে ভিকটিম তার পূর্ব অভিজ্ঞতাই শেয়ার করছে। পরিতাপ নিয়ে শিক্ষিত সমাজ কে বলতে হচ্ছে যৌন নিপীড়ক কোনোদিন কোনো প্রমাণ রেখে নিপীড়ন করে না। প্রমাণ থাকার সম্ভাবনা থাকলে সে নিপীড়ন করবে না । কাজেই যৌন নিপীড়নের প্রমাণ চাহিয়া লজ্জা দিবেন না, নিজেও লজ্জায় পড়িবেন না।


  • ৩৯০ বার পড়া হয়েছে

পূর্ববর্তী লেখা পরবর্তী লেখা

বিঃদ্রঃ নারী'তে প্রকাশিত প্রতিটি লেখার বিষয়বস্তু, ক্রিয়া-প্রতিক্রিয়া ও মন্তব্যসমুহ সম্পূর্ণ লেখকের নিজস্ব। প্রকাশিত সকল লেখার বিষয়বস্তু ও মতামত নারী'র সম্পাদকীয় নীতির সাথে সম্পুর্নভাবে মিলে যাবে এমন নয়। লেখকের কোনো লেখার বিষয়বস্তু বা বক্তব্যের যথার্থতার আইনগত বা অন্যকোনো দায় নারী কর্তৃপক্ষ বহন করতে বাধ্য নয়। নারীতে প্রকাশিত কোনো লেখা বিনা অনুমতিতে অন্য কোথাও প্রকাশ কপিরাইট আইনের লংঘন বলে গণ্য হবে।


মন্তব্য টি

লেখক পরিচিতি

দিলশানা পারুল

জাহাঙ্গীর নগর বিশ্ববিদ্যালয় থেকে পরিসংখ্যানে পড়াশোনার পাশাপাশি লম্বা সময় ধরে সাংস্কৃতিক অঙ্গনের সাথে যুক্ত ছিলেন দিলশানা পারুল। দশ বছর বামপন্থি রাজনীতির সাথে ‍যুক্ত ছিলেন, তারপর দশ বছর এনজিওতে শিক্ষা গবেষনা এবং বাস্তবায়ন নিয়ে কাজ করেছেন। বর্তমানে অস্ট্রেলিয়ায় এডুকেশন সেক্টরে কাজ করছেন। এর পাশাপাশি অনলাইনে লিখালিখি করেন।

ফেসবুকে আমরা