শামীম আরা নীপা

এক্টিভিস্ট

নারীর সংগ্রামটাই বেশি মাহাত্ম্যপূর্ণ

আমাদের দেশের কন্যা শিশুদের শৈশব কৈশোর তারুণ্য যৌবন ক্ষেত্র বিশেষে ভিন্ন হয়। কোনো পরিবারে কন্যা শিশু পুত্র শিশুর মতোই সম অধিকার পায় আবার বেশীরভাগ পরিবারেই কন্যা শিশু বৈষম্যের শিকার হয়। একজন কন্যা শিশু পরিবার ও সমাজ থেকে নানামুখী বাঁধার সম্মুখীন হয় তার শিক্ষা এবং জীবনাচরণ নিয়ে। পরিবার ও সমাজব্যবস্থা এমনভাবে কন্যাকে লালন করে যে কন্যা ভাবে, এমন সঙ্কুচিতভাবে রক্ষণশীলভাবে, সীমাবদ্ধতার সাথেই, নিয়ন্ত্রণের ভেতরই তার জীবন চলতে হবে –এটাই নিয়ম। নিজের অধিকারবোধ ও বৈষম্যর বোধ তার ভেতর কাজ করলেও সে তার চারপাশের কোথাও থেকে কোনো সাহায্য ও সমর্থন পায় না বিধায় সাহস করে নিজের ইচ্ছা- অনিচ্ছা- অধিকারের কথা বলতেও পারে না। আমাদের সমাজে নারীকে বড়ো করা হয় পরনির্ভরশীল করে। শৈশব কৈশোরে কন্যাদের নিজস্ব কোনো মতামত ও অভিব্যাক্তি না থাকলেও তারুণ্যে তাদের নিজস্ব মতামত ও অভিব্যাক্তি তৈরি হয় এবং তখন কোনো নারী সাহসী হয়ে উঠে এবং কোনো নারী সঙ্কুচিতই থেকে যায়। তারুণ্যে কিংবা যৌবনে নারী কোন পথে যাবে তার সিদ্ধান্ত নেয়ার সুযোগ তৈরি হয় কিছুটা হলেও। যাদের কোনো সুযোগ তৈরি হয় না তাদের জন্য সুযোগ তৈরি করে দেয়াই আমাদের কাজ। কিন্তু যারা সুযোগ পেয়েও পুরুষতন্ত্রের দাস হয়ে থাকে সামাজিক ও অর্থনৈতিক নিরাপত্তা ও সুবিধার জন্য তাদেরকে মনে করেই আজকের এতো কথা বলা।

লেখাপড়ার ক্ষেত্রে আমাদের দেশে এখনো কন্যা ১৮ পেরুলো মানেই পড়াশুনা বাদ দিয়ে তাকে বিয়ে দিয়ে দিতে হবে। তাও এই দৃশ্যপট শহুরে। গ্রামীন দৃশ্যপটে কন্যা রজঃস্বলা হওয়া মাত্রই তার বিয়ের কথা চিন্তা করা হয়, তার পড়ালেখা কিংবা স্বাবলম্বী হওয়া নিয়ে কোনো চিন্তা ও পরিকল্পনা দেখা যায় না। লেখাপড়া করার থেকে, নিজে কর্মক্ষম হওয়ার থেকে বেশী গুরুত্বপূর্ণ হলো– একজন নারীকে বিয়ে দিতে হবে, তাকে দিয়ে সংসার করাতে হবে, তাকে দিয়ে বাচ্চা জন্মদান ও লালন পালন করাতে হবে। এসবের পেছনের সবথেকে বড় কারণ কন্যাকে যৌন হেনস্থা, ধর্ষণ থেকে রক্ষা করে তাকে সামাজিক নিরাপত্তা দান করা। এখানে ভয় সেই পুরুষতন্ত্রকেই।

লেখাপড়াটা তা প্রাতিষ্ঠানিক হোক কিংবা কারিগরি কতোটা গুরুত্বপূর্ণ একজন মানুষের স্বাবলম্বী হওয়ার জন্য তা আমাদের সমাজে নারীর ক্ষেত্রে দৃষ্টির এবং বোধের অন্তরালেই থেকে যায়। নারীর আত্ম উন্নয়নের জন্য প্রাতিষ্ঠানিক এবং কারিগরি শিক্ষা ও দক্ষতা প্রয়োজন। এসব প্রয়োজন একজন কন্যা নারী হয়ে উঠতে উঠতে অনুভব করে। কেউ এই প্রয়োজন মিটানোর সুযোগ পায়, কেউ পায় না।

শিক্ষিত অশিক্ষিতি নির্বিশেষে অর্থনৈতিকভাবে স্বাবলম্বী হওয়ার পরও আমাদের দেশে নারীরা শারীরিক ও মানসিক নির্যাতন নিপীড়নের শিকার হয়। পুরুষের তুলনায় নারীর ভোগ করা শারীরিক ও মানসিক নির্যাতনের হার আমাদের দেশে অনেক বেশি। বাংলাদেশের শতকরা কতোভাগ নারী শারীরিক ও মানসিক অত্যাচার থেকে রেহাই পায় তার ধারণা করতে গিয়ে দেখি যে ঠগ বাছতে গাঁও উজার হয়ে যাচ্ছে। আবার শিক্ষা-অশিক্ষা, সক্ষমতা-অক্ষমতা নির্বিশেষে কিছু নারী নির্যাতন নিপীড়ন না সয়ে সম্মানের সাথে বেঁচে আছেন নিঃসন্দেহে– উনারা ব্যতিক্রম এবং এই ব্যতিক্রম অংশ সামাজিক প্রেক্ষাপটে কোনো দৃষ্টান্তের অধিকারী হতে পারে না।

অনেক কষ্ট এবং বাঁধা ডিঙিয়েও আমাদের দেশের নারীরা শিক্ষা অর্জন করে এবং কাজ করে জীবন গুজার করে, স্বাবলম্বী হয়, প্রতিষ্ঠিত হয় আবার তাদের পাশাপাশি একদল নারী সুযোগ থাকা সত্ত্বেও লেখাপড়া করে না, প্রতিষ্ঠা লাভ করে না, অর্থনীতিতে নিজের ভূমিকা রাখে না। তারা নিজের সাথেই প্রতারণা করে সংসারের শান্তি ও সন্তানের দেখভালের কথা বলে। তারা আর কিছু না, তারা স্বার্থপর ও সুবিধাভোগী। এসব নারীদের নিয়ে কথা বললে কিংবা প্রশ্ন তুললে ‘নারীবাদী‘ বলে গালমন্দ শুনতে হয়।

আমি সবসময় মানবতাবাদের পক্ষে বলেই একটা সময় পর্যন্ত নারীবাদের থেকে মানবতাবাদকেই বেশি মূল্যায়ন করেছি। তারপর একসময় মনে হলো যে কেনো নারীবাদ আসলো, কেনো নারীবাদ বিরাজমান! ভেবে ভেবে প্রশ্নের উত্তরটা আমি নিজেই বের করে নিয়েছি। সংকট যদি স্বীকার না করি তবে সেই সংকটের মোকাবিলা এবং সমাধান সম্ভব নয়। নারী যেহেতু ‘নারী‘ বলেই ঘরে বাহিরে সবখানে সংকটের মুখে ভূপাতিত, সেহেতু নারীর সংকটকে আগে চিহ্নিত করে তার প্রতিরোধ ও সমাধানের পথে এগুতে হবে। নারী ‘নারী‘ বলেই যে সকল নির্যাতন নিপীড়নের শিকার তাকে চিহ্নিত করা এবং সেই সংকটের নিরসনের জন্যই নারীবাদ বিরাজমান এবং নারীবাদ খারাপ কিছু নয়। নারীবাদী বলে কেউ যদি গালি দেয় আমাদেরকে তাতে আমাদের লজ্জা কিংবা রাগের কিছুই নাই বরং তাকে কমপ্লিমেন্ট কিংবা প্রশংসা হিসেবে দেখি আমি। মানবতাবাদ এবং মানুষের অধিকার অর্জন গুরুত্বপূর্ণ বলেই নারীবাদের উত্থান ও প্রসার, যাকে অস্বীকার করার কোনো সুযোগ নাই। যেসব সংকটকে ঘিরে নারীবাদের উত্থান তার অবসান হলেই আর নারীবাদের অস্তিত্ব আলাদা করে স্বীকার করার প্রয়োজন পরবে না বরং তখন মানবতাবাদ নিয়ে অবস্থান নেয়াটা সহজ ও সুন্দর হয়ে উঠবে।

নারীর প্রতি যতো অন্যায় অত্যাচার তার প্রধান কারণ পুরুষতান্ত্রিক দৃষ্টিভঙ্গি। সমাজের প্রচলিত ধারা অনুযায়ী নারী যতোই অর্থনৈতিকভাবে স্বাবলম্বী হয়ে উঠুক না কেনো, পুরুষের আধিপত্য তার ওপর প্রভাব বিস্তার করে রাখবেই। পুরুষতন্ত্রকে টিকিয়ে রাখে ধর্ম, সংস্কৃতি, প্রথা এবং বিভিন্ন এজেন্ডাধারী গোষ্ঠী। পুরুষ পরিবার থেকে শুরু করে ধর্ম সংস্কৃতি সাহিত্য সমাজ দেশ সবকিছু ব্যাবহার করেছে শুধুমাত্র পিতৃতন্ত্রকে কায়েম রাখার জন্য। পুরুষতন্ত্রকে উজ্জীবিত রাখে পুঁজিবাদ ও গণমাধ্যম। পুঁজিবাদ ও গণমাধ্যম ছাড়াও পুরুষতন্ত্রকে প্রতিহত করতে না পারার বড়ো কারণ হলো, নারী-পুরুষের সমতার যে আন্দোলন তার সাথে বেশীরভাগ নারীর কোনো সম্পৃক্ততা নাই। বেশিরভাগ নারীরা সংগ্রামের চেয়ে, নারীবাদী হওয়ার চেয়ে বেশী উৎসাহী সুবিধাভোগী হয়ে থাকতে।

আমাদের সমাজে প্রতিটা মানুষেরই নিজস্ব সংগ্রাম আছে। নারীকে যেহেতু পুরুষতন্ত্রের অধীনে টিকে থাকার লড়াই করতে হচ্ছে প্রতিনিয়ত তাই নারীর সংগ্রামটা কে আমার কাছে বেশি মাহাত্ম্যপূর্ণ মনে হয়। পরিবার কিংবা সমাজ কিংবা দেশে যেহেতু নারী পুরুষ সমতা নাই এবং নারীকে দ্বিতীয় লিঙ্গ হিসেবে দেখা হয় তাই নারীর শারীরিক ও মানসিক পীড়ন নিঃসন্দেহে বেশী। যেসব নারী পুরুষতন্ত্রের চর্চা করে তাদের নিয়ে শংকা বেশি লাগে। পুরুষতান্ত্রিক সমাজে পুরুষকে নিয়ে যতোটা না বিপর্যস্ত বোধ করি তার চেয়ে অনেক বেশী বিপর্যস্ত বোধ করি একজন পুরুষতান্ত্রিক নারী কে নিয়ে। কারণ এইসব পুরুষতান্ত্রিক নারীদের জন্যই নারীবাদ হেরে যায় বারবার, গালির সম্মুখীন হয়, নারীবাদ আন্দোলন গতি হারায় এবং সংকটের সম্মুখীন হয়।

আমাদের দেশের এমন অনেক নারী আছে যারা লেখাপড়ার সুযোগ থাকা সত্ত্বেও লেখাপড়া করে না, চাকরী করার সুযোগ থাকা সত্ত্বেও চাকরী করে না, ব্যবসা করার সুযোগ থাকা সত্ত্বেও ব্যবসা করে না। স্বাবলম্বী ও প্রতিষ্ঠিত হওয়ার সুযোগ ও সম্ভাবনা থাকা সত্ত্বেও তারা সেই চেষ্টা করে না, সেই পথ মারায় না। যেই নারীটির কোনো সুযোগ নাই তাকে সুযোগ করে দেয়ার লড়াই লড়তে হবে আমাদের যেইখানে, সেইখানে কিছু নারী নিজের ‘নারী‘ হওয়াকে ব্যবহার করে! নারী শরীরকে ব্যবহার করে! মাতৃত্বকে ব্যবহার করে! এমন সব নারীকে আমার ভয় লাগে বেশী।

একজন নারী যার উচ্চশিক্ষা নেয়ার, চাকরী খোঁজার, চাকরী কিংবা ব্যবসা করার সমূহ সুযোগ ও সম্ভাবনা আছে সেই নারীটি টুপ করে বিয়ে করে বসে। তাকে হাজার অনুরোধ করা হয় অন্তত লেখাপড়াটা এগিয়ে নেয়ার জন্য কিন্তু তার সেসবে মন নাই, সে মজে গেছে স্বামীর রুপ- সোহাগ- পয়সার কাছে। শ্বশুরবাড়ি থেকে লেখাপড়া করতে দিবে না পাছে সুন্দরী বৌ এর চোখ ফুটে যায় এবং সে আরেকজনের হাত ধরে চলে যায়! নারীর অবস্থানটা কোথায় বুঝা গেলো? সংসারের শান্তির কথা বলে সেই নারী আর লেখাপড়া করে না। তারপর সন্তান আসে, সেই সন্তানের দেখভালের দায়িত্ব কর্তব্যের কথা বলে সে তার লেখাপড়াকে উপেক্ষা করে! স্বামী মারে, মাইর খেয়ে সে স্বামীকে সাময়িক ভয় দেখায় নালিশ বিচার কিংবা পুলিশে জিডি করে কিন্তু সেই স্বামীকে প্রশ্রয় দিতে সে পিছপা হয় না। স্বামীর নির্যাতনকে প্রশ্রয় দিয়ে সে নিজের ও স্বামীর ভাবমূর্তি বজায় রাখে!

কিছু নারী স্বাবলম্বী হওয়ার যোগ্যতা থাকা সত্ত্বেও স্বামীর উপার্জনকে নিজের অধিকার মনে করে, স্বামীর পয়সায় দামী গাড়ী, দামী বাড়ী, দামী পোশাক, দামী সাজসজ্জা, দামী জুয়েলারি নিয়ে অহংকার করে, প্রতিযোগিতা করে, বড়ো বড়ো গালগল্প করে! অথচ স্বামীর অনুমতি ছাড়া তার এক চুল পরিমাণ নড়ার ক্ষমতা নাই। এমন দাসত্ব স্বীকার করে নিয়েই এসব নারী নিজের ও স্বামীর ভাবমূর্তি বজায় রাখে।

একদল নারী আছে যাদের কন্ট্রিবিউশন সংসারে প্রয়োজন, তারা শিক্ষিত হয়েও বেকার বসে থাকেন। বাবা কিংবা স্বামীর উপর দায়িত্ব ছেড়ে দিয়ে দায়িত্বজ্ঞানহীনের মতো বেকার বসে থাকে আর আপঝাপ কাহিনী শুনিয়ে নিজের ভাবমূর্তি ধরে রাখে।

আবার অনেক নারী আছে যারা স্বামী সংসার টাকা পয়সা সবকিছু কুক্ষিগত করে রাখে, স্বামীর উপর নির্যাতন চালায়, নিজের কোনো অবদান ছাড়াই সবকিছুকে তারা নিজের অধিকার মনে করে নিজেদেরকেই ছোট করে কিন্তু তারা কতোটা স্বামী সোহাগী সেসব জাহির করে নিজেদের ভাবমূর্তি বজায় রাখে!

একদল নারী বাবা মা’র উপর অত্যাচার করে, স্বেচ্ছাচারীতা করে, লেখাপড়া করে না, সঠিক চিন্তা চেতনা নাই, শুধু বেয়াদবি করে বেড়াবে আর এটা নাই সেটা নাই অজুহাতে নিজের অসভ্যাচরণকে স্বীকৃতি পাওয়ানোর চেষ্টা করবে। নিজেকে অর্থহীন কাজে ব্যস্ত দেখিয়ে নিজের ভাবমূর্তি বজায় রাখার চেষ্টা করবে।

একদল নারী খুব শর্টকাটে প্রাচুর্যপূর্ণ জীবনযাপনের জন্য পরিশ্রম না করে, নিজের যোগ্যতায় সক্ষমতা অর্জন না করে নিজের নারী শরীরকে ব্যবহার করে যাবে। হাজার মিথ্যা কথা বলে, প্রতারণা করে তারা তাদের ভাবমূর্তি বজায় রাখে।

একদল নারী শুধু পজিটিভ কথা বলে স্বামী সংসার নিয়ে অথচ স্বামী ও সংসারের মাধ্যমে অপমানিত নিপীড়িত হওয়া ছাড়া তাদের আর কোনো অর্জন নাই। তারা পজিটিভ মোটিভেশনের মাধ্যমে নিজেদের ভাবমূর্তি ধরে রাখে।

কিছু নারী আছে যারা নিজেদেরকে নারী অধিকার ও নারীবাদের ধারক ও বাহক বলে তারাই নিপীড়কের ধর্ষকের বাহুডোরে বাঁধা থাকে– এমন নারীকে বিপদজনক মনে হয়, মনে হয় এরাই নারীবাদ আন্দোলনকে পিছিয়ে দিচ্ছে, ভেঙে দিচ্ছে।

সংসারে নারী পুরুষ দুইজনেরই সমান অবদান থাকার কথা, কেউ কারোরটা মেরে খাবে তাতো হওয়ার কথা না। দুইজনই কর্মক্ষম– যে যেখানে পারদর্শী সে সেইখানে কাজ করবে, ত্যাগ করবে দুইজনে সমান পরিস্থিতির প্রেক্ষিতে। পারস্পরিক সম্মান বোধের সাথে ঘরে বাহিরে সমাজে নারী পুরুষ সহাবস্থান করবে সেই চাওয়াটা তো অমূলক নয় বরং খুব যৌক্তিক সুন্দর একটা চাওয়া। কিন্তু এই চাওয়াকেই নারী পুরুষ সকলে মিলে খারিজ করে দিতে চায় কারণ তারা পুরুষতন্ত্রের ধারক ও বাহক!

সম্মানজনক জীবনের সুযোগ থাকা সত্ত্বেও অসম্মানজনক জীবনকে স্বীকার করে নিয়ে অনেক নারী সামাজিক ও অর্থনৈতিক নিরাপত্তা ভোগ করে, তারা লোভী, অলস এবং ব্যক্তিত্বহীন। নিপীড়ন নিষ্পেষণ নির্যাতনের বিরুদ্ধে যদি নারী প্রতিবাদী হয়ে উঠতো তবে কি আজ নারীকে শিক্ষিত অশিক্ষিত নির্বিশেষে এমন অসম্মানের জীবন যাপন করতে হতো?

এমন অনেক ঘটনা আছে আমাদের চারপাশেই যাদের আদতে ভাবমূর্তি তো দূর, কোনো নিজস্ব অস্তিত্বই নাই তারাই ভাবমূর্তির পুজো করে এবং তারাই পুরুষতন্ত্রের ধারক ও বাহক। এমন সব নারীদেরও সাহায্য প্রয়োজন, নিজেদের আত্মসম্মানবোধ রক্ষা করতে পারার পথে উনাদের সাহায্য প্রয়োজন। এই মানুষগুলোকে নিয়ে আমি শংকিত ও লজ্জিত। খুব চাই তাদের বোধের দ্বার খুলুক।

আমাদের দেশের নারীরা নিজেদের অবস্থান থেকে নিজেদের সম্মানজনক জীবনের কথা যদি না ভাবেন তবে কেউ কেনো তাদের জন্য সেই সম্মানজনক স্বাধীন জীবন বয়ে আনবে?

আমাদের দেশে এমন সাহসী নারীও তো আছে, যে চার সন্তান নিয়ে লেখাপড়ার সাথে সংসার করে নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করেছে এবং এসবের ভেতর স্বামীর নির্যাতনও ভোগ করেছে এবং নিজে প্রতিষ্ঠিত হয়ে সেই স্বামীকে সমুচিৎ জবাব দিয়েছে।

বাধ্য হয়ে যে নারী পতিতালয়ে আশ্রয় নেয় সেই নারী ও তার কন্যাসন্তানও লেখাপড়া করে সম্মাজনক জীবনের স্বপ্ন দেখে এবং স্বপ্ন পূরণ করে। আর যারা সুযোগ থাকা সত্ত্বেও নিজেদের অসম্মানজঙ্ক জীবনের পথে টেনে নিয়ে যায় তাদেরকে নিয়ে বিপর্যস্ত লাগে বেশী।

নারী যখন নারীকে বলে যে পুরুষ নাদান তাকে বুঝিয়ে সংসারে বেঁধে রাখতে হয় তখন মনে প্রশ্ন আসে নারীও কি নাদান হতে পারে না, নারীরও কি যত্নের প্রয়োজন নাই? নারীকেই কেনো তার শরীর, তার সন্তান, তার চাতুরী, তার সেবাযত্ন দিয়ে পুরুষকে সংসারমুখী করে রাখতে হবে? পুরুষেরও কি দায়িত্ব নাই নারীকে সম্মান দেয়ার? তার প্রাপ্য অধিকার বুঝিয়ে দেয়ার? পুরুষ নারীকে অধিকার দিবে এমনও না ব্যাপারটা, নারীকেই তার নিজের সম্মান ও অধিকার অর্জন করে নিতে হবে মানুষ হওয়ার অধিকারবলে এবং নিজ যোগ্যতা অর্জনের বলে। পুরুষকে তার অধিকার সম্মান অবস্থানের জন্য নারীর মতো লড়াই করতে হচ্ছে না। তবে নারীকে কেনো এমন লড়াই চালিয়ে নিতে হচ্ছে সেই প্রশ্নটা নারী পুরুষ সকলের মাথায় আসা উচিৎ।

সকলের যে সুযোগ আছে তা বলবো না, যাদের সুযোগ নেই সম্মানজনক জীবনের তাদের জন্য সেই সুযোগ এনে দেয়াই সচেতন মানুষের কাজ এবং সেই সচেতনতা ছড়িয়ে দিতে চাই। সকল নারীর জন্য সম্মানজনক জীবনের দুয়ার খুলে দেয়ার জন্যই নারীবাদ কাজ করে চলেছে সেইখানে উল্লেখিত ভাবমূর্তিবাদী নারীকূল নিজেদের এবং আমাদের সকলের জন্য অসম্মান ও দুর্ভোগ বয়ে আনছে নিরন্তর। শিক্ষিত ও অর্থনৈতিকভাবে স্বাবলম্বী হওয়ার পরও যেখানে নারীরা তাদের প্রাপ্য অধিকার ও সম্মান পাচ্ছে না সেইখানে ভাবমূর্তিবাদী নারীরা নিজেদের প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষ স্বার্থচিন্তায় মগ্ন থেকে নিজেদেরই ক্ষতি করছে সাথে ক্ষতিগ্রস্ত করছে নারীবাদীদেরকে এবং নারী অধিকার আন্দোলনকে। এই অবর্ননীয় সমূহ ক্ষতি থেকে নারীরা মুক্তি পাক সেই প্রত্যাশা রাখি। পরিবারের অনিচ্ছায় এবং তাদের সমর্থন ছাড়াই যেসব নারী নিজেদের শিক্ষা ও কর্মক্ষেত্রকে অর্জন করে নিচ্ছে সংগ্রামের মাধ্যমে তাদের প্রতি সম্মানে মাথা নত করি।

বহুমুখী প্রতিকুলতার সাথে সংগ্রাম করে নিজের অধিকার ও সম্মান রক্ষায় যেসব নারী নিরন্তর এগিয়ে চলছে তাদের প্রতি কৃতজ্ঞতা জানাই এবং আহবান জানাই প্রতিটা নারীকে যেনো তারা সবাই মিলে প্রাপ্য অধিকার নিশ্চিত করে সম্মানজনক জীবনের পথে এগিয়ে নিয়ে আসতে পারে।

618 times read

নারী'তে প্রকাশিত প্রতিটি লেখার বিষয়বস্তু, ক্রিয়া-প্রতিক্রিয়া ও মন্তব্যসমুহ সম্পূর্ণ লেখকের নিজস্ব। প্রকাশিত সকল লেখার বিষয়বস্তু ও মতামত নারী'র সম্পাদকীয় নীতির সাথে সম্পুর্নভাবে মিলে যাবে এমন নয়। লেখকের কোনো লেখার বিষয়বস্তু বা বক্তব্যের যথার্থতার আইনগত বা অন্যকোনো দায় নারী কর্তৃপক্ষ বহন করতে বাধ্য নয়। নারীতে প্রকাশিত কোনো লেখা বিনা অনুমতিতে অন্য কোথাও প্রকাশ কপিরাইট আইনের লংঘন বলে গণ্য হবে।