বাংলাদেশে ধর্ষণ

মঙ্গলবার, মার্চ ২৪, ২০২০ ১১:৩৩ PM | বিভাগ : সমাজ/গবেষণা


বাংলাদেশে ধর্ষণের ও যৌন হয়রানির বিরুদ্ধে কঠোর আইন আছে। নারী ও শিশু নির্যাতন দমন আইন-২০০০ (সংশোধন-২০০৩) অনুযায়ী ধর্ষণের শাস্তি (ধারা-) –

ধর্ষণের ফলে কোনো নারী বা শিশুর মৃত্যু হলে তার শাস্তি মৃত্যুদণ্ড বা যাবজ্জীবন সশ্রম কারাদণ্ড ও অর্থদণ্ডে দণ্ডনীয় হবে।

একাধিক ব্যক্তি দলবদ্ধভাবে ধর্ষণ করলে তার শাস্তি মৃত্যুদণ্ড বা যাবজ্জীবন সশ্রম কারাদণ্ড ও অন্যূন একলক্ষ টাকা অর্থদণ্ডে দণ্ডনীয় হবে।

ধর্ষণের ফলে কোনো নারী বা শিশু আহত হলে তার শাস্তি যাবজ্জীবন সশ্রম কারাদণ্ড ও অর্থদণ্ডে দণ্ডনীয় হবে।

ধর্ষণের চেষ্টা করলে অনধিক দশ বছর ও অন্যূন পাঁচবছর সশ্রম কারাদণ্ড ও অর্থদণ্ডে দণ্ডনীয় হবে।

পুলিশ হেফাজতে থাকাকালে ধর্ষণের শিকার হলে অনধিক দশ বছর ও অন্যূন পাঁচবছর সশ্রম কারাদণ্ড ও অর্থদণ্ডে দণ্ডনীয় হবে।

নারী ও শিশু নির্যাতন দমন ট্রাইব্যুনালগুলোয় বিচারাধীন ধর্ষণ ও ধর্ষনের পর হত্যা করা সংক্রান্ত মামলা নির্ধারিত সময়সীমার মধ্যে অর্থাৎ বিচার শুরুর ছয় মাসের মধ্যে শেষ করা। শুনানি শুরু হলে তা শেষ না হওয়া পর্যন্ত প্রতি কার্যদিবসে মামলা একটানা পরিচালনা করা। মামলায় সাক্ষীর উপস্থিতি ও নিরাপত্তা নিশ্চিত করাসহ ৭ দফা নির্দেশনা দিয়েছেন হাইকোর্ট। আদালত জানিয়েছে, সংবিধানের ১০৯ অনুচ্ছেদ অনুযায়ী নির্দেশনাগুলো দেওয়া হয়েছে।

হাইকোর্টের ৭ দফা নির্দেশনাঃ

এক. দেশে নারী ও শিশু নির্যাতন দমন ট্রাইব্যুনালে বিচারাধীন ধর্ষণ ও ধর্ষণপরবর্তী হত্যা মামলাগুলো অগ্রাধিকার ভিত্তিতে আইন-নির্দেশিত সময়ের মধ্যে যেনো সম্পন্ন করা যায়, সে বিষয়ে সংশ্লিষ্ট ট্রাইব্যুনালের বিচারকদের সব ধরনের আইনি ব্যবস্থা গ্রহণের নির্দেশ দেওয়া যাচ্ছে।

দুই. ২০০০ সালের নারী ও শিশু নির্যাতন দমন আইনের ২০ ধারা অনুসারে মামলার শুনানি শুরু হলে তা শেষ না হওয়া পর্যন্ত প্রতি কর্মদিবসে একটানা মামলা পরিচালনা করতে হবে ট্রাইব্যুনালগুলোকে।

তিন. ধার্য তারিখে সাক্ষীর উপস্থিতি ও নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে প্রতিজেলায় অতিরিক্ত জেলা ম্যাজিস্ট্রেট, অতিরিক্ত পুলিশ সুপার (প্রশাসন), সিভিল সার্জনের একজন প্রতিনিধি এবং সংশ্লিষ্ট ট্রাইব্যুনালের পাবলিক প্রসিকিউটরের সমন্বয়ে একটি মনিটরিং কমিটি গঠন করতে হবে। কমিটির সমন্বয়কের দায়িত্বে থাকবেন পাবলিক প্রসিকিউটর এবং এর কমিটির কার্যক্রম সম্পর্কে প্রতিমাসে সুপ্রিমকোর্ট, স্বরাষ্ট্র ও আইন মন্ত্রণালয়ে প্রতিবেদন পাঠাবেন। যেসব জেলায় একাধিক ট্রাইব্যুনাল রয়েছে সেসব জেলায় সব ট্রাইব্যুনালের পাবলিক প্রসিকিউটররা মনিটরিং কমিটিতে অন্তর্ভুক্ত হবেন। তাদের মধ্যে জ্যেষ্ঠ যিনি, তিনি সমন্বয়কের দায়িত্ব পালন করবেন।

চার. ধার্য তারিখে রাষ্ট্রপক্ষ সঙ্গত কারণ ছাড়া সাক্ষীকে আদালতে উপস্থিত করতে ব্যর্থ হলে মনিটরিং কমিটির কাছে এর জবাবদিহি করতে হবে।

পাঁচ. সাক্ষীদের ওপর দ্রুত সময়ে যেনো সমন জারি করা যায়, সে বিষয়টিও তদারকি করবে।

ছয়. ধার্য তারিখে সমন পাওয়ার পর অফিশিয়াল সাক্ষী যেমন ম্যাজিস্ট্রেট, পুলিশ, ডাক্তার বা অন্যান্য বিশেষজ্ঞ সন্তোষজনক কারণ ছাড়া সাক্ষ্য প্রদানে উপস্থিত না হলে ট্রাইব্যুনাল ওই সাক্ষীর বিরুদ্ধে বিভাগীয় ব্যবস্থা নেওয়ার সুপারিশ এবং প্রয়োজনে বেতন বন্ধের আদেশ প্রদান বিবেচনা করবেন।

সাত. আদালতের অভিমত এই যে, অবিলম্বে সাক্ষী সুরক্ষা আইন প্রণয়ন করা প্রয়োজন। আদালত এটিও প্রত্যাশা করেন যে, সরকার অতি অল্প সময়ে এ বিষয়ে আইন প্রণয়ন করবে। নির্দেশনা বাস্তবায়নে ও প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নিতে আদালতের এ আদেশের অনুলিপি স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের দুই সচিব, আইন মন্ত্রণালয়ের দুই সচিব ও সুপ্রিমকোর্টের রেজিস্ট্রার জেনারেল বরাবর অবিলম্বে পাঠাতে বলা হয়েছে।

ধর্ষণের ও যৌন হয়রানির বিরুদ্ধে উপরোক্ত কঠোর আইন ও নির্দেশনা থাকার পরও কেনো ধর্ষণ হয় তার উত্তরটা জানতে আমাদের খুব বেশী কষ্ট করতে হয় না- আইনগত কোনো দুর্বলতা নয় বরং শক্তিশালী আইন আছে আমাদের দেশে কিন্তু তার প্রয়োগ নাই। আইন প্রয়োগ নিশ্চিত করা গেলে খুব সহজে আমাদের দেশে অতি দ্রুত ধর্ষণের বিচার ও শাস্তি নিশ্চিত করা সম্ভব। শুধু বাংলাদেশেই নয়, বিশ্বের অনেক দেশেই ধর্ষণ হচ্ছে সবচেয়ে বড় অপ্রকাশিত অপরাধ। প্রায় ৯১.৬ শতাংশ ধর্ষণের ঘটনাই ধামাচাপা পড়ে যায়, যাকে বলা হয় ‘ডার্ক ফিগারস’- অন্ধকারাচ্ছন্ন তথ্য বা জরিপে উঠে না আসা তথ্য-উপাত্ত। বিশ্বের অন্যান্য দেশে আইন প্রয়োগের মাধ্যমে ধর্ষণের বিচার হয়, ধর্ষকের শাস্তি নিশ্চিত করা হয় কিন্তু আমাদের দেশে শাস্তি হয় না ধর্ষকের।

আইনের প্রয়োগ না থাকার পেছনে আছে যে কারণগুলো তার একটা ভয়ংকর কারণ হলো আমাদের দেশের পুলিশ (সকল পুলিশকে দায়ী করা হয়নি)। যারা ধর্ষণ ও যৌন নিপীড়ন নিয়ে কাজ করেন তাদের অভিজ্ঞতা থেকেই উঠে এসেছে যে ধর্ষণের মামলা করতে থানায় গেলেই ভিকটিমকে উদ্দেশ্য করে পুলিশ প্রথম যে কথাটি বলে তা হল ‘২৯০’। সাধারণত অবৈধ যৌনকর্মের জন্য যারা গ্রেফতার হয়, তদের বিরুদ্ধে দণ্ডবিধির ২৯০ ধারায় মামলা করে থাকে পুলিশ। একজন ধর্ষণের শিকারকে অবৈধ যৌনকর্মী হিসেবে বিবেচনা করে পুলিশ- কতোটা অমানবিক অসভ্য ইতর ভূমিকা থাকে পুলিশের! অবিশ্বাস্য ও অদ্ভুত হলেও সত্য অধিকাংশ ধর্ষক শাস্তি না পাওয়ার কারণ পুলিশের অসহযোগিতা। পুলিশ ইচ্ছা করেই এমনভাবে চার্জশিট লিখে যেনো মামলাটি দুর্বল হয়ে যায়। পুলিশের উদ্দেশ্য থাকে ধর্ষকের সাথে টাকা-পয়সা লেনদেনের মাধ্যমে নিজেদের পকেট ভরে অপরাধীকে ছাড়া পাইয়ে দেয়া। কতোটা অমানবিক ভূমিকা কোনো কোনো পুলিশ রাখে যে একজন ভিকটিমের প্রতি কোনো সহানুভূতি নয় বরং ধর্ষণকে সামাজিকভাবে গ্রহণযোগ্যতা দিচ্ছে এভাবেই এবং তারা ধর্ষককে টাকার বিনিময়ে পার পাইয়ে দিচ্ছে আর ধর্ষণের শিকার মানুষটির প্রতি তাদের ‘নো মার্সি’ মনোভাব! ভিকটিমের নিরাপত্তা এবং সাক্ষী উপস্থিত করার দায়িত্ব পুলিশের। ভিকটিমের নিরাপত্তা যাতে বিঘ্নিত ও ক্ষতিগ্রস্ত না হয়, সেটি পুলিশকেই নিশ্চিত করতে হবে।

ধর্ষণ মামলায় মাত্র ৩ থেকে ৪ শতাংশের শেষ পর্যন্ত শাস্তি হয়। প্রত্যেকটা জায়গায় একজন ভিকটিমকেই প্রমাণ করতে হচ্ছে যে সে ধর্ষণের শিকার হয়েছে। অথচ আসামিরই প্রমাণ করতে হবে যে সে নির্দোষ। ধর্ষণের মামলায় এমনটাই হওয়া উচিৎ। ধর্ষণের যে বিচার হচ্ছে না এর কারণ হিসেবে ভিকটিম এবং নারী অধিকার কর্মীরা পুলিশের গাফিলতির কথাই বারবারই বলে এসেছেন। থানায় মামলা দায়ের থেকে শুরু করে ভিকটিমের সঙ্গে আচরণ, তদন্ত এবং অপরাধীকে গ্রেপ্তার সবক্ষেত্রেই অভিযোগ ওঠে পুলিশের বিরুদ্ধে।

ধর্ষকের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি নিশ্চিত না হওয়ায় এবং আইনকে ফাঁকি দিয়ে ধর্ষক পার পেয়ে যাওয়ার কারণে ধর্ষণ আমাদের দেশে মহামারীর আকার ধারণ করেছে যা এতটাই বীভৎস যে, শিশু থেকে বৃদ্ধ যে কোনো বয়সের নারী ধর্ষণের শিকার হচ্ছে এবং বেঁচে মরে থাকছে বাকীটা জীবন। ধর্ষক এখন নিজের পরিবারের কেউ কিংবা বহিরাগত কিংবা শিক্ষক কিংবা মসজিদের ইমাম থেকে শুরু করে ধর্মীয় প্রতিষ্ঠানের প্রধান এবং সত্তরোর্ধ্ব বৃদ্ধ পর্যন্ত ঠেকেছে।

ধর্ষকের শাস্তি নিশ্চিত না হওয়ার পাশাপাশি ভিকটিমের প্রতি অসহযোগী আচরণ এবং নেতিবাচক মনোভাবের কারণে বাংলাদেশের নারী নিরাপত্তা হুমকির মুখে। ধর্ষণে ভিকটিমের কোনো দোষ থাকে না। তারপরও আমাদের সমাজ ব্যবস্থা ভিকটিমকেই দোষের চোখে দেখে।

আসামীরা আদালত থেকে জামিনে বেরিয়ে আসার পর ভুক্তভোগীদের উপর ভয়-ভীতিসহ নানা ধরণের চাপ প্রয়োগ করে। ফলে একসময় অভিযোগকারী মামলার আপোষ করতে বাধ্য হয়।

পূর্ণাঙ্গ তদন্ত হলেও অনেক সময় ভিকটিম এবং সাক্ষীদের অনাগ্রহের কারণে অপরাধীরা খালাস পেয়ে যাচ্ছে।

অধিকাংশ পরিবার সমাজের ভয়ে ধর্ষণের কথা প্রকাশ ও মামলা করতে চায় না। ধর্ষণের মতো ভয়াবহ অভিজ্ঞতার পর পরিবার পাশে থাকলে ধর্ষকের বিচার নিশ্চিত করা অনেকটা সহজ হতো কিন্তু ধর্ষণের ঘটনা জানাজানি হয়ে যাওয়ার পর অনেক পরিবারের পক্ষ থেকে চুড়ান্ত অবহেলার শিকার হয় ভিকটিম যেন ধর্ষণের জন্য ভিকটিমই দায়ী। অনেকসময় পুলিশ হেফাজতে থাকা ধর্ষণের শিকার মানুষটিকে পরিবারের কেউ দেখতে এবং খোঁজ নিতে যায়না নিজেদের সম্মান নষ্ট হবে ভেবে।

তারপরও যারা লোকলজ্জাকে অতিক্রম করে ধর্ষণের বিচার চায় তাকে অনেক কঠিন পরীক্ষার ভেতর দিয়ে যেতে হয় যার জন্য নার্ভের জোর লাগে, ধৈর্য্য লাগে, শক্তি লাগে। একজন ব্যক্তি ধর্ষণের শিকার হওয়ার পর থানায় মামলা করতে যাওয়া থেকে শুরু করে মেডিকেল পরীক্ষা, পরীক্ষক, পুলিশ, উকিল, বিচারক সবার মাধ্যমে আরো কয়েকশবার মানসিক ধর্ষণ ও যৌন নিপীড়নের সম্মুখীন হয়। বিচার চলাকালীন সময়ে তাকে এমনভাবে জেরা করা হয়, বর্ণনা জানতে চাওয়া হয় তাতে করে সে অন্তত মানসিকভাবে আরেকবার ধর্ষণের অভিজ্ঞতা লাভ করে। এই ক্ষেত্রে একটা প্রবাদ খুব কার্যকর- কাক কাকের মাংস খায়না। এরা প্রত্যেকে একই রসুনের গোড়া।

পুলিশের কাছেই ভিকটিম যেই হয়রানি শিকার হয় তারপর মেডিকেল পরীক্ষা নিয়েও তার ভেতর ভয় কাজ করে।

আইনে বলা আছে, ধর্ষণ হওয়ার চব্বিশ ঘণ্টার মধ্যে ভিকটিম গোসল করতে পারবে না। তার মানে চব্বিশ ঘণ্টা আপনাকে ধর্ষকের বীর্য গায়ে নিয়ে থাকতে হবে- এটা অনেকে জানেও না এবং এমনটা না করলে সঠিকভাবে মেডিকেল পরীক্ষা করাও সম্ভব না। ধর্ষণের শিকার ব্যক্তি পুলিশি হেফাজতে পুনরায় ধর্ষণের শিকার হওয়ার ঘটনাও আমাদের দেশে আছে, ভিকটিমের শরীরে যৌন স্পর্শ করার ঘটনাও আছে আমাদের দেশে – কতটা ভয়ংকর আমাদের দেশের পরিস্থিতি!

বিচার না হওয়া ধর্ষণ ও নারী নির্যাতন বন্ধ না হওয়ার অন্যতম কারণ। সাম্প্রতিক নানা পরিসংখ্যানে দেখা যাচ্ছে ধর্ষণ বন্ধ হওয়া তো দূরের কথা বরং দেশে ধর্ষণ দিন দিন বাড়ছেই। বেসরকারি সংস্থা আইন ও সালিশ কেন্দ্রের সর্বশেষ বার্ষিক প্রতিবেদনে দেখা যায় ২০১৮ সালের তুলনায় ২০১৯ সালে ধর্ষণ ও গণধর্ষণের ঘটনা বেড়ে দ্বিগুণ হয়েছে। আসকের পরিসংখ্যান জানাচ্ছে, ২০১৯ সালে দেশে ১ হাজার ৪১৩ জন নারী ধর্ষিত হয়েছেন। ধর্ষণের পর হত্যার শিকার হয়েছেন ৭৬ জন এবং আত্মহত্যা করেছেন ১০ জন। ২০১৮ সালে ধর্ষণের শিকার হয়েছিলেন ৭৩২ নারী। একইসঙ্গে নারীদের উত্ত্যক্ত করা ও যৌন হয়রানির ঘটনাও বেড়েছে। ২০১৯ সালে উত্ত্যক্ত হয়ে আত্মহত্যা করতে বাধ্য হয়েছেন ১৮ নারী। আরও উদ্বেগজনক ঘটনা হলো- শিশু নির্যাতন ও হত্যার ঘটনাও বেড়েছে। ২০১৯-এ শারীরিক নির্যাতন, ধর্ষণ, অপহরণ ও নিখোঁজের পর মোট ৪৮৭ শিশু নিহত হয়েছে। আগের বছর নিহত হয় ৪১৯ শিশু।

২০১৪ সালের জানুয়ারি থেকে ২০১৭ সালের ডিসেম্বর পর্যন্ত দেশে নারী ও শিশু ধর্ষণসংক্রান্ত ১৭ হাজার ২৮৯টি মামলা হয়েছে। এসব মামলায় ভিকটিমের সংখ্যা ১৭ হাজার ৩৮৯ জন। এর মধ্যে ১৩ হাজার ৮৬১ জন নারী ও ৩ হাজার ৫২৮ জন শিশু। এ সময় ৩ হাজার ৪৩০টি ধর্ষণ মামলার বিচার শেষ হয়েছে। নিষ্পত্তি হওয়া মামলায় ১৭ জনকে মৃত্যুদণ্ড, ৮০ জনকে যাবজ্জীবন কারাদণ্ড, ৫৭৬ জনকে বিভিন্ন মেয়াদে সাজাসহ ৬৭৩ জনকে শাস্তির আওতায় আনা হয়েছে।

২০০১ থেকে ২০১৭ সালের মার্চ পর্যন্ত ৪৩৬১টি ধর্ষণের মামলার সাজা পায় মাত্র ৬৮ জন ধর্ষক। আরেকটি পরিসংখ্যান বলছে, ২০১১ থেকে ২০১৮ সালের জুন পর্যন্ত দেশের ৬টি জেলায় ৪৩৭২টি মামলায় মাত্র ৫ জন ধর্ষকের শাস্তি হয়। এ পরিসংখ্যানই বলে দিচ্ছে, ধর্ষণ অপ্রতিরোধ্য হয়ে ওঠার নেপথ্যের কারণ।

ধর্ষক যেই হোক, তাকে শাস্তির আওতায় আনতেই হবে। যখন একটি দেশে ৬ মাসে ৩৯৯ শিশু ধর্ষণের শিকার হয়, সেই দেশে ধর্ষণের শাস্তি কী হওয়া উচিত তা কাওকে বলে দেয়ার কোন অবকাশ নাই। নিঃসন্দেহে এই হার আরো অনেক বেশি। এটা শুধু কয়েকটি পত্রিকায় প্রকাশিত তথ্য। এই উদ্বেগজনক হারে ধর্ষণ বিশেষ করে শিশু ধর্ষণ বৃদ্ধির ঘটনা বাংলাদেশের মানুষকে অসহায় ও ভীতসন্ত্রস্ত করে তুলেছে। বিক্ষুব্ধ মানুষ ধর্ষকের বিচার দাবি করছে যদিও তাদের সংখ্যা আমাদের দেশের মোট জনসংখ্যার একটা নগন্য অংশ মাত্র। আমরা আপামর জনগণকে ধর্ষণের বিরুদ্ধে এখনো একত্রিত করতে পারিনি, সমন্বিত হতে পারিনি আমরা।

সব পক্ষ থেকেই বারবার বলা হচ্ছে ধর্ষণ ও যৌন হয়রানির বিচার হয় না বলেই অপরাধীরা সক্রিয় হয়ে উঠছে। প্রথম আলো জুলাই ২০১৯ এ জানিয়েছিলো পুলিশ সদর দপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, তার আগের পাঁচ বছরে দেশের বিভিন্ন থানায় ১৮,৬৬৮টি ধর্ষণের মামলা হয়েছে। এসব মামলার মধ্যে প্রতিবছর গড়ে ৪ শতাংশ আসামির সাজা হয়। বাকিদের অধিকাংশই মামলা থেকে অব্যাহতি পেয়েছে।

ওয়ান স্টপ ক্রাইসিস সেন্টার এর সূত্র মতে ২০০১ থেকে ২০১৫ সাল পর্যন্ত ধর্ষণ ও নির্যাতনের শিকার হয়ে চিকিৎসা সহায়তা নিতে আসেন ২২,৩৮৬ নারী। এরমধ্যে মামলা হয় ৫,০০৩টি ঘটনায়। রায় হয়েছে ৮০২টি ঘটনার। শাস্তি পেয়েছে ১০১ জন। রায় ঘোষণার হার ৩.৬৬ ভাগ আর শাস্তির হার ০.৪৫ শতাংশ।

ঢাকা ট্রিবিউনে প্রকাশিত হয়েছিলো- ইনজেকশনের মাধ্যমে রাসায়নিক প্রক্রিয়ায় শিশু ধর্ষণকারীদের যৌন ক্ষমতা নষ্ট করে দেবে ইউক্রেন। ধর্ষণ ও শিশু নিপীড়নকারী হিসেবে প্রমাণিত হলে ১৮ থেকে ৬৫ বছরের পুরুষের জন্য এই শাস্তি প্রযোজ্য হবে। ২০১৭ সালে ৩২০ শিশু ধর্ষণের শিকার হয়েছিলো বলে, যৌন অপরাধের বিরুদ্ধে কঠোর এই আইনটি সেদেশের পার্লামেন্টে পাশ হয়েছে। তারা বলেছে কারাগার থেকে বের হয়ে অপরাধীরা আবার সেই পুরনো অপরাধ করে। ইউক্রেন শিশুর প্রতি যৌন হয়রানি করা অপরাধীদের একটি কালো তালিকা করবে এবং সরকারের একটি শাখা জেল থেকে বের হওয়ার পর এই অপরাধীদের উপর নজর রাখবে। সাবেক সোভিয়েত রাষ্ট্র কাজাখিস্তানেও রাসায়নিকভাবে যৌন ক্ষমতা নষ্ট করার বিধান আছে।

পাকিস্তানের মতো একটি দেশেও ধর্ষণের শাস্তি জনসম্মুখে মৃত্যুদণ্ড করছে বলে পত্রিকায় খবর প্রকাশিত হয়েছে। ১০ বছরের এক ছেলে শিশুকে যৌন নির্যাতন ও খুনের অভিযোগে জনসম্মুখে ৩ জনের মৃত্যুদণ্ড কার্যকর করেছিলো ইয়েমেন।

বাংলাদেশেও গত ৫ বছর ধরে ধর্ষণ, শিশু ধর্ষণ, যৌন হয়রানি ও নিপীড়ন এতোটাই মারাত্মক আকার ধারণ করেছে যে মানুষ এর বিরুদ্ধে কঠোর শাস্তি দাবি করেই যাচ্ছে। ফেইসবুকে আমিসহ অনেকেই ধর্ষকের সরাসরি ফাঁসি চেয়েছে জনতার সামনে, ধর্ষককে নপুংসক করে দিতে চেয়েছে, মেরে হাত পা ভেঙে ফেলতে চেয়েছে- ক্ষোভ এবং ভয়ংকর বেদনা থেকে মানুষ ধর্ষকের বিচার ও মৃত্যুদণ্ডের শাস্তি কার্যকর দেখতে চায়।

ধর্ষকের বিচার করতে হবে দ্রুত বিচার আইনে। ধর্ষককে জামিন দেয়া যাবেনা। প্রমাণসহ হাতেনাতে যেসব অপরাধী ধরা পড়ছে এবং যারা নিজেরাই ধর্ষণের কথা স্বীকার করছে তাদের শাস্তির জন্য কোন সময়ক্ষেপণ, নিয়ম-কানুন দরকার নেই। আমাদের প্রত্যেককে মনে রাখতে হবে ধর্ষণ নারী বা শিশুর একার সমস্যা নয়, এটা জাতীয় সমস্যা। আমরা আশা করছি ধর্ষণের বিচার প্রক্রিয়া আরো সহজ করা হবে, যাতে দীর্ঘসূত্রিতার সুযোগে ধর্ষক পালিয়ে যেতে না পারে।

নারী ও শিশু নির্যাতনের দায়ের করা মামলার বিচারের জন্য দেশে পৃথক আদালত রয়েছে নারী ও শিশু নির্যাতন দমন ট্রাইব্যুনাল নামে। সারাদেশে বর্তমানে ৯৫টি নারী ও শিশু নির্যাতন দমন ট্রাইব্যুনাল সক্রিয় রয়েছে। উচ্চ আদালতের প্রতিবেদন অনুযায়ী, এসব ট্রাইব্যুনালে বিচারাধীন আছে প্রায় ১ লাখ ৬০ হাজার মামলা। এর মধ্যে প্রায় ৩৭ হাজার মামলা বিচারাধীন আছে ছয় বছরেরও বেশি সময় ধরে। অথচ আইনে বিচার শুরু হওয়ার পর ছয় মাসের মধ্যে এসব মামলার বিচারকাজ শেষ হওয়ার কথা বলা হয়েছে। অধিকাংশ ধর্ষণ মামলার ক্ষেত্রেই ছয় মাসে বিচারকাজ সম্পন্ন করা অনেক দুরের কথা, বছরের পর বছর তদন্তের টালবাহানায় পার হয়ে যায়। যথাসময়ে দোষীর দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি না হওয়ায় ধর্ষণের মতো হীন প্রবণতা রোধ করা সম্ভব হচ্ছে না বরং দিন দিন বাড়ছে।

সামাজিক অবক্ষয় রোধ করতে হবে, ঘরের ছেলে সন্তানকে শিখাতে হবে মেয়ে সন্তানকে মানুষ হিসেবে বিবেচনা করতে এবং সম্মান করতে কিন্তু তার আগে এখন আমাদের সমাজে ধর্ষকের মৃত্যুদণ্ড নিশ্চিত করা প্রয়োজন। বিচারহীনতার কারণেই ধর্ষণ বেশি হচ্ছে। আইনে আছে ১৮০ দিনের মধ্যে বিচার শেষ করতে হবে, বিশেষ ক্ষেত্রে কারণ দেখিয়ে কিছুটা সময় নিতে পারে। কিন্তু, বাস্তবে দেখা যাচ্ছে মামলা শেষ হতে দশ বছর, বিশ বছরও লেগে যাচ্ছে। আমরা দেখেছি ধর্ষণের বিচার ও রায় কার্যকর হতে ৫ কিংবা ১০ কিংবা ১২ কিংবা ১৮ বছর সময়ও লাগে-বিচারের দীর্ঘসূত্রিতার জন্য আইন দায়ী নয়, আইন প্রয়োগকারীরা যদি আন্তরিক হন তবে অবশ্যই খুব দ্রুত ধর্ষণের মামলা নিষ্পত্তি করা সম্ভব। গুরুত্বপূর্ণ আরেকটি বিষয় হল, আমাদের দেশে যে পরিমাণ মামলা হচ্ছে সেই পরিমাণ বিচারক এবং অবকাঠামো নাই। আরও বেশি পরিমাণ অবকাঠামো তৈরি এবং বিচারক নিয়োগ হলে পাশাপাশি আইনের সঠিক প্রয়োগ নিশ্চিত করা গেলে ধর্ষকের রেহাই পাওয়ার কোনো সুযোগ নেই।

আমাদের দেশে বিগত বছরগুলোতে ধর্ষণ এমন ভয়াবহ আকার ধারণ করেছে যে আমরা যদি এখনই এর প্রতিরোধ গড়ে না তুলি, প্রতিকারের ব্যবস্থা না করি তবে সমাজের প্রত্যেকটা ঘর, নারী পুরুষ নির্বিশেষে প্রত্যেকটা মানুষ অনিরাপদ হয়ে পরবে। ধর্ষণের বিরুদ্ধে সোচ্চার না হওয়ার কোন সুযোগ নাই, ধর্ষণ বন্ধ হওয়ার যে আন্দোলন তার কোন বিকল্প নাই। ধর্ষণের ক্ষেত্রে ভিকটিমকে দায়ী করা ধর্ষককে উস্কে দেয়ার, ধর্ষকের প্রতি সহানুভূতিশীল হওয়ার সামিল যা কোন সুস্থ বিবেকবান মানুষ করতে পারেনা। কোন ভাবেই ধর্ষকের প্রতি কোন প্রকার মায়া দেখানো যাবেনা এবং ধর্ষককে উদ্বুদ্ধ করা যাবেনা। ধর্ষণের জন্য কেবল ধর্ষকই দায়ী, অন্য কেউ না। ধর্ষক যখন আমাদের দেশে বিনা সাজায় সমাজে ঘুরে ফিরে বেড়ায় তখনই আরো হাজার হাজার ধর্ষকের জন্ম হয়। বিচারহীনতা মানুষের বিকৃতিকে আরো বাড়িয়ে দেয়, সমাজে ধর্ষণের মতো ভয়ংকর হীন কাজকে বাড়িয়ে দেয়। মানুষ আইনকে অবজ্ঞা করার সুযোগ পাচ্ছে এই বিচারহীনতার কারণে। আইনের সঠিক প্রয়োগ নিশ্চিত করলে ধর্ষণ, যৌন নির্যাতন- নিপীড়ন এর মতো ভয়াবহ মহামারী থেকে আমাদের দেশের মানুষ বেরিয়ে আসতে পারবে এবং আইনের প্রতি তারা শ্রদ্ধাশীল হবে, আস্থা ফিরে পাবে এবং সামাজিক অবক্ষয় রোধ হবে। সকলে মিলে সমন্বিতভাবে ধর্ষণের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ ও প্রতিরোধ ও প্রতিকারের মাধ্যমে নারী ও শিশুদেরকে একটা নিরাপদ বাসভূম দিবে সেই প্রত্যাশা করি।

(এই লেখার সকল তথ্য উপাত্ত বিভিন্ন সময় বিভিন্ন পত্রিকায় প্রকাশিত হয়েছে সেখান থেকে নেয়া এবং অনেকগুলো ফিচার পড়ার পর এই লেখাটি লিখেছি, আরো কিছু লেখার ছিলো কিন্তু গুছিয়ে উঠতে পারিনি বলে দুঃখিত...)


  • ১০৬ বার পড়া হয়েছে

পূর্ববর্তী লেখা পরবর্তী লেখা

বিঃদ্রঃ নারী'তে প্রকাশিত প্রতিটি লেখার বিষয়বস্তু, ক্রিয়া-প্রতিক্রিয়া ও মন্তব্যসমুহ সম্পূর্ণ লেখকের নিজস্ব। প্রকাশিত সকল লেখার বিষয়বস্তু ও মতামত নারী'র সম্পাদকীয় নীতির সাথে সম্পুর্নভাবে মিলে যাবে এমন নয়। লেখকের কোনো লেখার বিষয়বস্তু বা বক্তব্যের যথার্থতার আইনগত বা অন্যকোনো দায় নারী কর্তৃপক্ষ বহন করতে বাধ্য নয়। নারীতে প্রকাশিত কোনো লেখা বিনা অনুমতিতে অন্য কোথাও প্রকাশ কপিরাইট আইনের লংঘন বলে গণ্য হবে।


মন্তব্য টি

লেখক পরিচিতি

শামীম আরা নীপা

এক্টিভিস্ট

ফেসবুকে আমরা