এই নিষ্ঠুরতার গন্তব্য কোথায়

বৃহস্পতিবার, জুন ২৭, ২০১৯ ১১:৫২ PM | বিভাগ : আলোচিত


এখন আর কিছুতে অবাক হই না। এই দেশ সব সম্ভবের। বলছিলাম সদ্য ঘটে যাওয়া বরগুনায় প্রকাশ্য দিবালোকে মর্মান্তিক হত্যাকাণ্ডের বিষয়ে। কেনো, কী কারনে এই হত্যাকাণ্ড তা পরে তদন্তের বিবেচ্য। কিন্তু, এতোটা ভায়োলেন্স, নিষ্ঠুরতা এই জাতির মধ্যে কেনো? কেনো একটা দেশের তরুন প্রজন্মের মধ্যে ঘৃণা, আক্রোশ, এতোটাই চরম পর্যায়ে পৌঁছেছে যে রাস্তাঘাট পাব্লিক প্লেস যেকোনো জায়গায় আপনি ইভ টিজিং, শ্লীলতাহানী, গণধর্ষণ অথবা ভয়ংকরভাবে পুড়িয়ে বা কুপিয়ে হত্যা করতে পারেন, কেউ কিচ্ছুটি বলতে আসবে না। আর যারা এই অপরাধের হোতা বিষয়টা তারাও জানে বলেই, বিশ্বজিৎ, অভিজিৎ, হুমায়ুন আজাদ অথবা পঁচিশ বছরের সদ্য বিবাহিত রিফাত রক্তাক্ত হয়ে, সবার তামাশার কেন্দ্র হয়ে প্রচণ্ড যন্ত্রণা নিয়ে মারা গেলো। এতো এতো মানুষের মধ্যে কেবল তার স্ত্রী তাঁকে বাঁচাতে মরিয়া ছিলো, কিন্তু পুরুষত্বের দাপটে ভরা একজন পুরুষও এগিয়ে আসেনি তাঁর স্ত্রীর পাশে। পালিয়েও যায়নি। লাইভ হত্যাকাণ্ড হয়তো মধ্যরাতের পর্ণো ছবির চেয়েও উত্তেজক।

অনার্স প্রথম বর্ষে পড়ার সময় ইউনিভার্সিটিতে আমাদের এক সুদর্শন সহপাঠী জায়েদকে তার ঘরে ঢুকে এলোপাতারি গুলি করে মেরে ফেলেছিলো সন্ত্রাসীরা। জায়েদকেও তার স্ত্রী বাঁচাতে পারেনি। যেখানে ঘরেই আমাদের নিরাপত্তা নেই সেখানে রাস্তাঘাটে যেকোনো সময় যেকোনো কারণে কেউ কুপিয়ে গেলে নামানুষ (নপুংশক বলতে চাই না) সমাজের কী বা করার আছে!

এই যে এতো কোপাকুপি, মানুষ হয়ে মানুষকে আঘাত করা অপমান করার পৈশাচিক তাড়না তার মূলে কারণ কী? পারিবারিক অবক্ষয়? শিক্ষাব্যবস্থার ত্রুটি? আমরা কি আমাদের সন্তানদের সময় দিতে পারছি না? তাদের কোনটা ভুল, কোনটা ঠিক বোঝাতে ব্যর্থ হচ্ছি? প্রায়ই নানা জায়গায় স্কুল কলেজের ড্রেস পরে শিক্ষার্থীরা ঘুরে বেড়ায়। তারা কেনো ক্লাস করে না। আর যদি নাই করে, কেনো তাদের পরিবারকে বলতে পারে না যে ক্লাসে যেতে ইচ্ছে করছে না। যে মন্দ বা অনাকাঙ্ক্ষিত কাজের প্রতি তাদের আগ্রহ তৈরি হচ্ছে, তা কেনো হচ্ছে, কেনো বাড়ছে পরিবারের সাথে দুরত্ব, ভালবাসার বন্ধন কেনো বিতৃষ্ণায় পর্যবসিত হচ্ছে?

অপরাধ বিশ্লেষক ও সমাজবিজ্ঞানীরা মনে করছেন, দিনের পর দিন অপরাধীদের মানসিকতা বিকৃত হয়ে যাচ্ছে। আর পেছনে কাজ করছে মাদকের কুফল। এছাড়া রাজনৈতিক প্রতিহিংসা, ক্ষমতার লোভ, নারীর প্রতি শ্রদ্ধাবোধ কমে যাওয়া, সম্পত্তির লোভ, হিংসা-প্রতিহিংসা, সামাজিক অবক্ষয় ও নৈতিক স্খলনের কারণে অপরাধপ্রবণতা বাড়ছে। মনোবিজ্ঞানীরা সাহায্য করবেন কি এর সঠিক সমাধান খোঁজায়?

এইসব ক্রমবর্ধমান ঘটনা বার বার জানান দিচ্ছে, আমরা কেউ নিরাপদ নই। যে কেউ যেকোনো কারণে আপনার উপর নাখোশ হতে পারে। আপনি যতই বোবা থাকুন, কালা থাকুন, নিরাপদ দুরত্বে থেকে অন্যের জখম হওয়ার তামাশা দেখুন, আপনার উপর সন্ত্রাসী হামলা হলে কী করবেন? আপনি কি এ দেশের আইন শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর উপর পূর্ণ আস্থা রেখে চলাচল করেন? নাকি আশা করেন আশেপাশের মানুষ আপনার চিৎকারে এগিয়ে আসবেন। যদি এমনটা ভেবে থাকেন, তাহলে আপনি আশির দশকের বাংলা সিনেমায় আটকে আছেন। এদেশে এতোগুলো হত্যাকাণ্ড প্রকাশ্যে হয়, সিসি টিভি ফুটেজে প্রমান মিললেও বেকসুর খালাশ হয় মাস্টারমাইন্ড খুনি, আর আপনার প্রতিবেশী, সহপাঠী আপনার বিপদে এগিয়ে আসবে সেটা এখন আশা করাটাই অন্যায়।

উপস্থিত হয়ে যারা রিফাতের হত্যাকাণ্ড ‘উপভোগ’ করলেন তারা খুনির সহযোগী কিনা খতিয়ে দেখা প্রয়োজন। যিনি ভিডিও করেছেন তাকে বের করে জিজ্ঞাসাবাদ করলে হয়তো আরও অনেক কিছু বেরিয়ে আসতে পারে।

একজন সাধারণ নাগরিক হয়ে আতঙ্কিত এবং হতবিহ্বল হয়ে আছি। দুর্ঘটনা, হত্যা, ভয়ঙ্কর অন্যায় যেকোনো সমাজে ঘটতে পারে। কিন্তু, আমি কি আমার দেশে আইনের সঠিক প্রয়োগ আশা করতে পারি না? আমার শুধু মনে হচ্ছে আইনের সঠিক প্রয়োগ, বিচার ব্যবস্থায় দুর্নীতির প্রকোপ, পারিবারিক ও মানবিক শিক্ষার অভাব আমাদের দিন দিন অমানুষ করে ফেলছে। তারপরও, বিশ্বজিৎ, তনু, সাগর-রুনি, অভিজিৎ, অনন্ত, নুসরাত, এতো এতো হত্যাকাণ্ডের রক্তাক্ত ভূমিতে দাঁড়িয়ে এখনও আস্থা রাখতে চাই এ দেশের আইন ও বিচার ব্যবস্থার প্রতি। কারণ আমরা চাই আমাদের সন্তানদের এদেশের মাটিতে বড় করতে। আমরা আমাদের মাতৃভূমি ছেড়ে অন্য কোথাও যেতে চাই না। আর সবার তো সেই সামর্থ্যও থাকে না। কিন্তু, এই অস্থির সময়ের সাথে পাল্লা দিয়ে চলা, অপরাধপ্রবণ আর নির্লিপ্ত বিকারহীন অমানবিক সমাজের গন্তব্য কোথায়? ‘আমরা নিরাপদ’ এই কথাটি কি কখনও বলতে পারবো? নাকি আমাদেরকেও ত্যাগ করতে হবে নিজ দেশ, আপন ঠিকানা। এই রুগ্নসমাজের ওষুধ আর তার সঠিক যত্ন কি কেউ সত্যিকার অর্থে দিতে পারবেন?


  • ২৩৪ বার পড়া হয়েছে

পূর্ববর্তী লেখা পরবর্তী লেখা

বিঃদ্রঃ নারী'তে প্রকাশিত প্রতিটি লেখার বিষয়বস্তু, ক্রিয়া-প্রতিক্রিয়া ও মন্তব্যসমুহ সম্পূর্ণ লেখকের নিজস্ব। প্রকাশিত সকল লেখার বিষয়বস্তু ও মতামত নারী'র সম্পাদকীয় নীতির সাথে সম্পুর্নভাবে মিলে যাবে এমন নয়। লেখকের কোনো লেখার বিষয়বস্তু বা বক্তব্যের যথার্থতার আইনগত বা অন্যকোনো দায় নারী কর্তৃপক্ষ বহন করতে বাধ্য নয়। নারীতে প্রকাশিত কোনো লেখা বিনা অনুমতিতে অন্য কোথাও প্রকাশ কপিরাইট আইনের লংঘন বলে গণ্য হবে।


মন্তব্য টি

লেখক পরিচিতি

নায়না শাহ্‌রীন চৌধুরী

সঙ্গীত আর লেখালেখি’র সাথে দীর্ঘদিন পথ চলা। বাংলাদেশ বেতার ও টেলিভিশনের তালিকাভুক্ত শিল্পী ও গীতিকবি। কাজ করছেন অডিও শিল্প, মঞ্চ ও ফিল্মেও। এ পর্যন্ত তিনটি বই প্রকাশিত হয়েছে। জীবিকা নির্বাহে জ্বালানী ক্ষেত্রে রাষ্ট্রায়ত্ত একটি প্রতিষ্ঠানে কর্মরত।

ফেসবুকে আমরা