নৌকাডুবি

বৃহস্পতিবার, মে ১৪, ২০২০ ১১:০২ AM | বিভাগ : সাহিত্য


অদ্ভুত এক বিষয় আমার ভেতর ঘটছে। জানি না সবার মধ্যে এমন হয় কিনা! অবশ্য এই করোনাকালে চারদিকের নিস্তব্ধতাই বোধ হয় আমাকে সবকিছুর গভীরে নিয়ে যাচ্ছে। যার কারণে, ফেইসবুকের দু‘টো বিষয় পড়ার পর গভীরভাবে বুঁদ হয়ে আছি। প্রথমত কবি তুষার গায়েনের 'রক্তকরবী' নিয়ে লেখাটা পড়ে আমাকে রবীন্দ্র ভাবনা পেয়ে বসে, তার পর পরেই 'বইয়ের হাট' ফেইসবুক পেজে 'শেষের কবিতা' নিয়ে স্মৃতি থেকে উঠে আসা কিছুকথা লিখতে গিয়ে পুরোই নস্টালজিয়াতে ডুবে গেছি। রবীন্দ্রনাথ এমনই এক নাম, যে নামের গভীর সম্মোহন শক্তিতেই তাঁর ধ্যানে বসতে হয়।

তারই রেশ ধরে 'শেষের কবিতা' আবার পড়ে শেষ করি। তারপরেই 'নৌকাডুবি' মুভিটা চোখের সামনে চলে এলো। কলেজে পড়ার সময় 'নৌকা ডুবি' উপন্যাসটি পড়েছিলাম। তারপর এই উপন্যাস অবলম্বনে তৈরি মুভিটাও দেখি। আজকাল স্মৃতিভ্রষ্ট হচ্ছে বলে অনেককিছু আবার নতুন করে ঝালাই করি।এখন রাত জাগাটা অভ্যাসে পরিণত হয়ে যাচ্ছে। কি করবো? ঘুম যে আসে না। আর এদিকে রবীন্দ্রভাবনাটাও মাথায় ঝেঁকে বসে আছে। এমন অবস্থায় 'নৌকাডুবি' নামটা চোখের সামনে আসতেই মন চলে গেলো মুভির দিকে।

রাতভর মুভিটা খুব মন দিয়ে দেখলাম। কথোপকথনের প্রক্ষেপণ যাতে ঠিকমতো কর্ণগোচর হয় তার চেষ্টা করছিলাম। নতুন করে নৌকাডুবি দেখতে গিয়ে মুভির শেষে এসে খুব বিরক্তির উদ্রেক হয়। কাহিনীর ঘনঘটা আর চরিত্র চিত্রণে টুইস্টিংয়ের অর্থাৎ মোচড়ানো ব্যাপারটাই ছিলো বিরক্তির কারণ। তারপরও মুভিটা শেষ করে রবীন্দ্র ভূবনে ঢোকার চেষ্টা করি। রবীন্দ্রনাথ উপনাসটি কেনো এমন জটিল করে উপস্থাপন করেছেন, তা জানার আগ্রহে নতুন করে 'নৌকাডুবি নিয়ে কার কি ভাবনা কিম্বা রবীন্দ্রনাথের নিজের ভাবনার কোনো ছিটেফোঁটা কিছু পাওয়া যায় কিনা তা খুঁজে বের করার জন্য নিজের বুকসেলফ ঘেটে দেখলাম কবিগুরুর সঞ্চয়িতা আর গীতবিতান ছাড়া কিছুই নেই। ঢাকার বাড়ির বুকসেলফে রবীন্দ্রজগত বিরাজ করছে। আর আমার বিদেশ বিভুঁইয়ের জীবনটা, এক ছন্নছাড়া জীবন। তাই নিজের উপর উষ্মা প্রকাশ করে গুগুলের দ্বারস্থ হলাম। অনেক তথ্যই পেলাম। যেখানে রবীন্দ্রনাথ নিজেই বলেছেন, প্রকাশকের অনুরোধের ঢেঁকি গিলেই নাকি এই উপন্যাস লিখেছেন। তাঁর বক্তব্যটাই পুরো তুলে দিচ্ছি। যদিও উপন্যাসের সূচনাপর্বে রবীন্দ্রনাথের এই স্বগোক্তি আছে। তারপরেও দিচ্ছি এই কারণে যে, প্রকাশকের চাপ সৃষ্টিতে মাঝেমাঝে লেখকেরা কেমন নাজেহাল অবস্থায় পড়েন তার দৃষ্টান্ত স্বরূপ রবীন্দ্রনাথের এই বক্তব্য। তাছাড়া নোকাডুবি উপন্যাসে নারীর চরিত্র চিত্রণের বিষয়টাও আমাকে ভাবিয়ে তোলে। সেই ব্যাপারেও রবীন্দ্রনাথের নিজস্ব বয়ানও আছে এই বক্তব্যে।

"পাঠক যে ভার নিলে সঙ্গত হয়, লেখকের প্রতি সে ভার দেওয়া চলে না। নিজের রচনা উপলক্ষে আত্মবিশ্লেষণ শোভন হয় না। তাকে অন্যায় বলা যায় এইজন্যে যে, নিতান্ত নৈর্ব্যক্তিকভাবে একাজ করা অসম্ভব- এইজন্য নিষ্কাম বিচারের লাইন ঠিক থাকে না। প্রকাশক জানতে চেয়েছেন নৌকাডুবি লিখতে গেলুম কী জন্যে? এ-সব কথা দেবা ন জানন্তি কুতো মনুষ্যঃ। বাইরের খবরটা দেয়া যেতে পারে, সে হলো প্রকাশকের তাগিদ। উৎসটা গভীর ভিতরে, গোমুখী তো উৎস নয়! প্রকাশকের ফরমাশকে প্রেরণা বললে বেশি বলা হয়। অথচ তা ছাড়া বলবো কী? গল্পটায় পেয়ে বসা আর প্রকাশকের পেয়ে বসা সম্পূর্ণ আলাদা কথা। বলা বাহুল্য ভিতরের দিকে গল্পের তাড়া ছিল না। গল্প লেখার পেয়াদা যখন দরজা ছাড়ে না তখন দায়ে পড়ে ভাবতে হলো কী লিখি। সময়ের দাবী বদলে গেছে। একালে গল্পের কৌতূহলটা হয়ে উঠেছে মনোবিকলনমূলক। ঘটনা-গ্রন্থন হয়ে পড়েছে গৌণ। তাই অস্বাভাবিক অবস্থায় মনের রহস্য সন্ধান করে নায়ক-নায়িকার জীবনে প্রকাণ্ড একটা ভুলের দম লাগিয়ে দেওয়া হয়েছিল-অত্যান্ত নিষ্ঠুর কিন্তু ঔৎসুক্যজনক। এর চরম সাইকোলজির প্রশ্ন হচ্ছে এই যে, স্বামীর সম্বন্ধের নিত্যতা নিয়ে যে সংস্কার আমাদের দেশের সাধারণ মেয়েদের মধ্যে আছে তার মূল এতো গভীর কি না যাতে অজ্ঞানজনিত প্রথম ভালোবাসার জালকে ধিক্কারের সঙ্গে সে ছিন্ন করতে পারে। কিন্তু এ-সব প্রশ্নের সার্বজনিন উত্তর সম্ভব নয়। কোনো একজন বিশেষ মেয়ের মনে সমাজের চিরকালীন সংস্কার দুর্নিবাররূপে এমন প্রবল হওয়া অসম্ভব নয় যাতে অপরিচিত স্বামীর সংবাদমাত্রই সকল বন্ধন ছিঁড়ে তার দিকে ছুটে যেতে পারে। বন্ধনটা এবং সংস্কারটা দুই সমান দৃঢ় হয়ে যদি নারীর মনে শেষ পর্যন্ত দুই পক্ষের অস্ত্র-চালাচালি চলতো তাহলে গল্পের নাটকীয়তা হতে পারতো সুতীব্র, মনে চিরকালের মতো দেগে দিত তার ট্র্যাজিক শোচনীয়তার ক্ষতচিহ্ন। ট্র্যাজেডির সর্বপ্রধান বাহন হয়ে রইল হতাভাগ্য রমেশ- তার দুঃখকরতা প্রতিমুখী মনোভাবের বিরুদ্ধতা নিয়ে তেমন নয় যেমন ঘটনাজালের দুর্মোচ্য জটিলতা নিয়ে। এই কারণে বিচারক যদি রচয়িতাকে অপরাধী করেন আমি উত্তর দেব না। কেবল বলব গল্পের মধ্যে যে অংশে বর্ণনায় এবং বেদনায় কবিত্বের স্পর্শ লেগেছে সেটাতে যদি রসের অপচয় না ঘটে থাকে তা হলে সমস্ত নৌকাডুবি থেকে সেই অংশে হয়তো কবির খ্যাতি কিছু কিছু বাঁচিয়ে রাখতে পারে। কিন্তু এও অসংকোচে বলতে পারি নে, কেননা রুচির দ্রুত পরিবর্তন চলছে।"

- অগ্রাহায়ণ ১৩৪৭ রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর

রবীন্দ্রনাথের পুরো বক্তব্যে নৌকাডুবির প্রেক্ষাপট এবং তৎকালীন অবস্থা ফুটে উঠেছে। সেইসাথে প্রকাশ পেয়েছে কবির দায়সারাগোছের লেখার তাগিদ অনুভূতি। প্রেম বা সামাজিক উপন্যাস হলেও এটি একটু রহস্যপুর্ণ উপন্যাস ক্যাটাগরিতে ফেলা যায়। সব কাহিনীর মতো টুইস্ট-টার্ন আছে, ভালোবাসা আছে, রহস্য আছে, কিছু কুসংস্কারও আছে! রমেশ ও কমলার নৌজীবনের অংশটা আমার সবথেকে প্রিয়। তবে কমলা চরিত্রের মধ্য দিয়ে যেভাবে সনাতনী নারীদের স্বামীর প্রতি ধ্যান-ধারণা-বিশ্বাস কবিগুরু তুলে ধরেছেন তা অভাবনীয়। অনেকটা অলৌকিকও মনে হয়েছে। শেষের দিকে টুইস্ট ও কম যায় না! কেউ শুধু মুভিটি দেখে উপন্যাসটি সম্পর্কে ধারণা করে বসলে ভুল হবে, বইয়ের তুলনা বই হতে পারে! তবে এটাও সত্য, রবীন্দ্রনাথের অকপট স্বীকারোক্তিতে নৌকাডুবি উপন্যাসটির আড়ম্বরপূর্ণ প্রাঞ্জলতা আরো বেড়ে গেছে।


  • ৩৭৪ বার পড়া হয়েছে

পূর্ববর্তী লেখা পরবর্তী লেখা

বিঃদ্রঃ নারী'তে প্রকাশিত প্রতিটি লেখার বিষয়বস্তু, ক্রিয়া-প্রতিক্রিয়া ও মন্তব্যসমুহ সম্পূর্ণ লেখকের নিজস্ব। প্রকাশিত সকল লেখার বিষয়বস্তু ও মতামত নারী'র সম্পাদকীয় নীতির সাথে সম্পুর্নভাবে মিলে যাবে এমন নয়। লেখকের কোনো লেখার বিষয়বস্তু বা বক্তব্যের যথার্থতার আইনগত বা অন্যকোনো দায় নারী কর্তৃপক্ষ বহন করতে বাধ্য নয়। নারীতে প্রকাশিত কোনো লেখা বিনা অনুমতিতে অন্য কোথাও প্রকাশ কপিরাইট আইনের লংঘন বলে গণ্য হবে।


মন্তব্য টি

ফেসবুকে আমরা