লক ডাউনে বেড়েছে নারী নির্যাতন

সোমবার, এপ্রিল ৬, ২০২০ ৯:৩৬ PM | বিভাগ : সাম্প্রতিক


সারা বিশ্ব যখন করোনা ভাইরাসের প্রতিষেধক আবিষ্কারের চেষ্টাসহ নানাভাবে এটি মোকাবিলা করার চেষ্টায় মশগুল, তখন ভিন্ন একটি বিষয়ের প্রতি সবার দৃষ্টি আকর্ষণ করেছেন জাতিসংঘের মহাসিচব আন্তোনিও গুতেরেস। তা হচ্ছে, এই দুর্যোগের সময় নারীর প্রতি পারিবারিক সহিংসতার ঘটনা হু হু করে বাড়ছে। যেখানে তাদের সবচেয়ে নিরাপদে থাকার কথা এই সময়ে, সেটি নারীদের জন্য বিভীষিকাময় হয়ে ওঠছে। পরিসংখ্যান বলছে বাংলাদেশেও উল্লেখযোগ্য হারে নারীনির্যাতন বেড়েছে করোনা সংক্রামনের মধ্যেই!

সংবাদ মাধ্যম থেকে জানা যায়, করোনাভাইরাসের বিস্তারের মধ্যেই গত ১০ দিনে ঢাকা মহানগরে ধর্ষণ, যৌতুকের দাবিতে নির্যাতন, যৌন নিপীড়ন ও অপহরণের ২৮টি মামলায় গ্রেপ্তার হয়েছেন ৩৭ জন। ঢাকার চিফ মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেট (সিএমএম) আদালত সূত্রে এই তথ্য জানা গেছে।

অন্যান্য জেলার কথা না হয় বাদই দিলাম; আজ ৬ এপ্রিল সংবাদ মাধ্যমে দেখা যাচ্ছে, মাদারীপুরে পুলিশের পিএসআই অনিমা বাড়ৈকে কুপিয়ে হত্যারচেষ্টার ঘটনা ঘটেছে। রবিবার রাত সাড়ে ১১টার দিকে শহরের লেকেরপাড়ের পৌর শিশুপার্কের পাশে এ ঘটনা ঘটে। যেখানে পুলিশের পিএসআই এর এই অবস্থা সেখানে সাধারণ নারীদের কথা বলাই বাহুল্য কতটা নিরাপত্তা ঝুঁকিতে আছেন তারা।

অবাক হতে হয় যখন সংবাদমাধ্যমে দেখি এই সংকট কালেও জামালপুরে করোনাভাইরাসের তথ্য সংগ্রহের কথা বলে পুলিশ পরিচয়ে ঘরে ঢুকে এক কিশোরীকে তুলে নিয়ে গণধর্ষণ করে ৫ বখাটে।

এসবই খবর সংবাদ মাধ্যমে আসছে। কোনো বিচ্ছিন্ন ঘটনা নয় এগুলো বরং সংকটকালীন পরিস্থিতিতে নারী নির্যাতন বৃদ্ধিরই ইংগিত! বৈশ্বিক এই দুঃসময়ে এসব নির্যাতনের ঘটনা অধিকাংশ বাঙালি পুরুষের চিরায়ত গোষ্ঠীগত বৈশিষ্ট্য! মননেই লালন করেন তাঁরা ধর্ষমনোবৃত্তি, নারী নির্যাতন!

ধর্ষণ ও নারীর প্রতি আগ্রাসী যৌনাত্মক আচরণ তাঁদের অপরিশীলিত অনিয়ন্ত্রিত মনোবৃত্তির বহিঃপ্রকাশ। তাইতো বৈশ্বিক এই দুঃসময়েও তাঁরা মেতে উঠতে পারেন, নারী নির্যাতন, যৌন হয়রানি ও ধর্ষণের মতো জঘন্য অপরাধে!

গত বৃহস্পতিবার (২ এপ্রিল) রাতে মোহাম্মদপুরের টাউন হল থেকে হেঁটে বাসায় ফিরছিলো একটি শিশু তখন জাকির হোসেন (২৪) নামের এক যুবক ওই শিশুটিকে জোর করে রিকশায় ওঠানোর চেষ্টা করে। এই সময় শিশুটির চিৎকার শুনে টহল পুলিশ ঘটনাস্থলে এসে আসামি জাকিরকে হাতেনাতে গ্রেপ্তার করে। ভুক্তভোগী শিশুটি ঢাকার সিএমএম আদালতে নারী ও শিশু নির্যাতন দমন আইনের ২২ ধারায় জবানবন্দি দেয়।

ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের ওয়ান–স্টপ ক্রাইসিস সেন্টারের প্রতিদিনই ভুক্তভোগী দু'একজন নারী সেবা নিতে আসছেন, তারা নির্যাতনের শিকার। ধর্ষণের শিকার, কেউবা যৌন নিপীড়নের শিকার। কিন্তু কেনো হটাৎ করে এই নারী নির্যাতন বেড়ে যাওয়ার প্রবনতা?

অপরাধবিজ্ঞানী, মানবাধিকার সংগঠন গুলো বলছে, "কোনো দুর্যোগের সময় অপরাধের হার অনেক গুণ বেড়ে যায়। এর সঙ্গে বাড়ে নারী ও শিশু নির্যাতনও"। বাংলাদেশের পরিপ্রেক্ষিতে বিচার করলে দেখা যাচ্ছে এখানে নারী নির্যাতন, নারীর প্রতি যৌনহয়রানি, ধর্ষণের মতো ঘটনা এমনিতেই উর্ধ্বমুখী। সেখানে যোগ হয়েছে করোনায় উদ্বুদ্ধ পরিস্থিতি! দেশের আইন শৃঙ্খলা বাহিনীর উল্লেখযোগ্য অংশকে ব্যস্ত থাকতে হচ্ছে করোনা মোকাবেলায়। এই পরিস্থিতিতে অপরাধী প্রবনতা সম্পন্ন লোকজনের পোয়াবারো!

তাঁরা ভাবছেন, হয়তো এখন অপরাধ করে পার পাওয়া যাবে ; বা লকডাউনের কারনে রাস্তা ঘাটের নির্জনতাকে তাঁরা অপরাধ ঘটানোর মোক্ষম পরিবেশ ভাবছেন! বা বিভিন্ন মানসিক চাপ, গৃহে লক ডাউনের কারনে আগের চাইতে বেশি সময় একসাথে অবস্থান ইত্যাদি বিভিন্ন কারনে নারী নির্যাতন বাড়ছে।

বিশেষজ্ঞরা আশংকা করছেন, করোনাভাইরাসের এই সংকট যদি দীর্ঘ সময় থাকে, তাহলে অপরাধ আরও বেড়ে যাবে।

তাই এখনই এই বিষয়ে পদক্ষেপ নিতে হবে। নিতে হবে দীর্ঘ পরিকল্পনাও ; করোনা সংক্রামন রোধের সাথে সাথে নারীর নিরাপত্তার দিকটিও সরকারকে ভাবতে হবে।


  • ৩৭৩ বার পড়া হয়েছে

পূর্ববর্তী লেখা পরবর্তী লেখা

বিঃদ্রঃ নারী'তে প্রকাশিত প্রতিটি লেখার বিষয়বস্তু, ক্রিয়া-প্রতিক্রিয়া ও মন্তব্যসমুহ সম্পূর্ণ লেখকের নিজস্ব। প্রকাশিত সকল লেখার বিষয়বস্তু ও মতামত নারী'র সম্পাদকীয় নীতির সাথে সম্পুর্নভাবে মিলে যাবে এমন নয়। লেখকের কোনো লেখার বিষয়বস্তু বা বক্তব্যের যথার্থতার আইনগত বা অন্যকোনো দায় নারী কর্তৃপক্ষ বহন করতে বাধ্য নয়। নারীতে প্রকাশিত কোনো লেখা বিনা অনুমতিতে অন্য কোথাও প্রকাশ কপিরাইট আইনের লংঘন বলে গণ্য হবে।


মন্তব্য টি

লেখক পরিচিতি

নাসরীন রহমান

এক্টিভিস্ট ও লেখক