ফেসবুকীয় বিচার প্রক্রিয়া; অভিযুক্ত ও ভুক্তভোগীর মনস্তত্ত্ব

শনিবার, এপ্রিল ১৮, ২০২০ ৮:২১ PM | বিভাগ : আলোচিত


কিছুদিন আগে আতিকা রোমা নামে একজন ফেসবুক লাইভে এসে তাঁর করোনার পরীক্ষার জন্য বক্তব্য রাখেন, যে ভিডিও ফেসবুকে ব্যপক ভাইরাল হওয়ার প্রেক্ষিতে তাঁর করোনা পরীক্ষা করা হয়। যদিও নেগেটিভ আসে রেজাল্ট।

গত ১৬ এপ্রিল ফেসবুকে ভাইরাল হয় ফেনীর অভিযুক্ত হত্যাকারীর ভিডিও। এই রেশ কাটতে না কাটতে আজ ১৭ এপ্রিল ভাইরাল হয় একজন গৃহকর্মীর ভিডিও। সেখানে মেয়েটি তার গৃহকর্ত্রীর বিরুদ্ধে নির্যাতনের অভিযোগ আনেন।

এই যে ফেসবুকে এসে বিচার চাওয়া, কোনো কিছুর সমাধান চাওয়া বা অপরাধ করে লাইভে আসা, অর্থাৎ সমাজে এই যে প্রবনতা তৈরি হচ্ছে এটা আদৌ ভালো কিছু ইংগিত করছে কি? নাকি আইন শৃংখলার প্রতি, বিচার ব্যবস্থার প্রতি, প্রচলিত সিস্টেমের প্রতি আস্থাহীনতারই প্রকাশ ঘটছে ?

কেনো ফেসবুকে লাইভে আসার এই প্রবনতা তৈরি হচ্ছে? মানুষ দেখছে একমাত্র উপর থেকে নির্দেশ এলেই দ্রুত বিচার পাওয়া যাচ্ছে, তাই কি ফেসবুকে লাইভে এসে সমাধান খুঁজছে মানুষ?

আজ গৃহকর্মী মেয়েটি বলছেন তিনি থানায় যেয়ে বিচার পাননি তাই লাইভে এসেছেন; এটা কি প্রচলিত ব্যবস্থাকে প্রশ্নবিদ্ধ করছে না? এই ফেসবুক লাইভে আসার এই প্রবণতা তৈরি হওয়া ভালো কিছু ইংগিত করছে না, যদিও অনেকেই এভাবে দ্রুত সমাধানে পৌছাতে পারছেন তাই অন্যরাও এই পথ বেছে নিচ্ছেন!

অনেক ক্ষেত্রেই অভিযুক্ত পক্ষ সমাজের উঁচু মহলের তথাকথিত শিক্ষিত শ্রেণী; এদের মধ্যে জন্ম নিয়েছে দম্ভ আর অহংকারের। লেখাপড়ার মূল উদ্দেশ্য থেকে এরা বিচ্যুত হয়েছেন। তাই আত্মউন্নয়নের বদলে নিজেকে শিক্ষিতের দোহাই দিয়ে এরা আত্মঅহংকারে ডুবে তুচ্ছ করেন সমাজের বঞ্চিত শ্রেনীকে। তাছাড়া আইনের শাসনের যথেষ্ট নজির দৃশ্যমান না থাকাটা আমাদের প্রধান সমস্যাগুলোর একটা। এই সুযোগে প্রভাবশালীরা পার পেয়ে যান;আইন ও বিচারের প্রতিও আমাদের অনেকের মধ্যে আস্থাহীনতার সংকট দেখা দেয়।

গত ১৭ জুলাই ফেসবুকে ভাইরাল হওয়া অভিযোগকারী গৃহকর্মী মেয়েটি সঠিক বিচার পাবেন কিনা সেটা যদিও তদন্তের বিষয়; কিন্তু কথা হচ্ছে গৃহকর্মী নির্যাতন এদেশে নতুন কিছু নয়; তবে অভিযুক্ত যখন সমাজের উঁচু আসনে থাকেন তখন স্বাভাবিকভাবে সেই ঘটনাগুলো আলাদা মাত্রা পায়।

আমরা জানি এর আগেও গায়িকা কৃষ্ণকলি ও তাঁর স্বামীর বিরুদ্ধে গৃহকর্মী হত্যার অভিযোগ উঠেছিলো। কৃষ্ণকলি ও তার স্বামীর গৃহকর্মী নির্যাতনের ঘটনাটি আদৌ বিচারিক আদালতে প্রমাণিত কিনা আমাদের জানা নেই। অথচ তথ্য জানা নাগরিক অধিকার, অধিকার রয়েছে নির্যাতীতের সুবিচার পাওয়ার অধিকার।

সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে করা ট্রায়ালের উপর নির্ভর করে কাউকে দোষী ঘোষণা করে দেওয়ার এই যে সংস্কৃতির তৈরি হচ্ছে সমাজে তা যেমন বিপদজনক তেমনি সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে এসে বিচার চাওয়ার সংস্কৃতির এই ধারাও বিপদজনক।

এখানে বলাটা অপ্রাসঙ্গিক হবে না যে, যে ঘটনাগুলো ফেসবুকে ব্যপক ভাইরাল হয় বা ধর্ষনের ঘটনার ক্ষেত্রে বা সহিংসতার ঘটনার ক্ষেত্রেও আমরা দেখি মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর নির্দেশ দিলেই সেই বিচারগুলো দ্রুত কার্যকরী হয়; অন্যথায় অনেকক্ষেত্রেই বিচার পাওয়ার ব্যাপারটা হয় অলীক কল্পনা!

কিন্তু কেনো এমন হবে? খাদ্য, বস্ত্র, শিক্ষা, ন্যায় বিচার পাওয়ার মৌলিক অধিকারগুলোর মতো সুবিচার পাওয়ার অধিকার ও প্রতিটি নাগরিকদের অধিকার মধ্যেই পরে। একটি রাষ্ট্রের নাগরিক হিসেবে নিশ্চিত ভাবে এই অধিকারগুলো ভোগ করার দাবী রাখি আমরা দেশের আপামর জনগন। সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম ফেসবুকে এসে বিচার চাইতে হবে কেনো?

সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম ফেসবুকে এসে বিচার চাওয়ার যে সংস্কৃতির ধারা তৈরি হচ্ছে ; ফেসবুক ইউজার যারা পরোক্ষ বা প্রত্যক্ষ ভাবেই জড়িয়ে যাচ্ছেন এই কর্মকান্ডে তাঁরা কিন্তু এই ফেসবুকীয় বিচার চাওয়ার ধারাকেই সমর্থন করছেন; ক্ষেত্রবিশেষে পুষ্ট করছেন! কিন্তু অনেকেই ভাবতেও পারছেন না এর পরিণতি কী?

এই প্রবণতা সুফল তো আনবে না দীর্ঘমেয়াদে কুফলই বয়ে আনবে। আমরা যেনো প্রচলিত ব্যবস্থার প্রতি বিশ্বাস না হারাই, আস্থাহীনতার সংকটে না পরি তাই একদিকে যেমন বিচারব্যবস্থায় স্বচ্ছতা আনতে হবে তেমনি ফেসবুকীয় এই প্রবণতাও রোধ করতে হবে। নচেৎ এমনও হতে পারে এই প্রবনতার শিকার হতে পারেন আপনি, আমি, অনেকেই! কে, কখন আপনাকে হেনস্থা করতে ভিডিও করে ছেড়ে দিবে ফেসবুকে!

তবে আমার এই কথা বলার অর্থ এই নয়; অপরাধের পক্ষে সাফাই গাইছি, অপরাধ অপরাধই; প্রমান সাপেক্ষে বিচার হোক। আমি শুধু সামাজিক হেনস্থার দিকটির প্রতি ইংগিত করছি এবং ফেসবুকীয় বিচার চাওয়ার বিপদজনক দিক ও প্রচলিত ব্যবস্থার প্রতি আস্থাহীনতার দিকে ইংগিত করছি।


  • ২৪৯ বার পড়া হয়েছে

পূর্ববর্তী লেখা পরবর্তী লেখা

বিঃদ্রঃ নারী'তে প্রকাশিত প্রতিটি লেখার বিষয়বস্তু, ক্রিয়া-প্রতিক্রিয়া ও মন্তব্যসমুহ সম্পূর্ণ লেখকের নিজস্ব। প্রকাশিত সকল লেখার বিষয়বস্তু ও মতামত নারী'র সম্পাদকীয় নীতির সাথে সম্পুর্নভাবে মিলে যাবে এমন নয়। লেখকের কোনো লেখার বিষয়বস্তু বা বক্তব্যের যথার্থতার আইনগত বা অন্যকোনো দায় নারী কর্তৃপক্ষ বহন করতে বাধ্য নয়। নারীতে প্রকাশিত কোনো লেখা বিনা অনুমতিতে অন্য কোথাও প্রকাশ কপিরাইট আইনের লংঘন বলে গণ্য হবে।


মন্তব্য টি

লেখক পরিচিতি

নাসরীন রহমান

এক্টিভিস্ট ও লেখক

ফেসবুকে আমরা