ফাহমিদা জামান ফ্লোরা

শিক্ষার্থী (ডিপার্টমেন্ট অফ ফিল্ম অ্যান্ড টেলিভিশন, জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়) এবং নারীবাদী লেখক।

নারীর হাতে জ্বলন্ত সিগারেট, বহুগামিতা এবং চতুর্থ ওয়েভ নারীবাদ

গত বছর বঙ্গীয় অধিকাংশ বিবাহিত, বাচ্চাওয়ালা নারীবাদীগণ 'আমরা নারীবাদরে শাহবাগের অজস্র ঘর্মের বিনিময়ে একটা পবিত্র জায়গায় আইনা দাঁড় করাইছি। ফাহমিদা জামান ওরফে ফ্লোরা এই কষ্টার্জিত পবিত্র নারীবাদকে মদ-সিগারেট, বহুগামিতা আর নগ্নতা দিয়ে নারীবাদের মিনিং পাল্টায়ে ফেলতেছে। সুতরাং, বীর বাঙালী নারীবাদীগণ অস্ত্র ধরেন, ফ্লোরারে দমান।' মার্কা বাণী দিয়ে ফেসবুক সয়লাব কইরালাইছিলেন। কিন্তু আপনারা বুঝতে পারেন নাই অথবা বুইঝাও অপদার্থের ভান কইরা এইসব কাজ করছিলেন। এই বেলায় আপনাদের সুর শিপ্রার ক্ষেত্রে এক্টু পাল্টাইছে দেইখা আমি সত্যিই খুশি হইছি খুব। অবশ্য শিপ্রা স্বঘোষিত নারীবাদী হইলে তখন আপনাদের সুর 'ব্যক্তির কাজের দায়ভার দলের/ বাদের নাই' রকম হইতেই পারতো। এগুলা সিরিয়াস বিষয় না বলেন? ডাবল স্ট্যান্ডার্ড না হইলে কি পিঠ-পেট বাচে তাই না?

আজ মেজর সিনহা হত্যার পর তার সহযোগী শিপ্রার বিরুদ্ধে বাঙালি ফেসবুক নিবাসী নারী-পুরুষেরা কি অভিযোগ আইনা দাঁড় করাইছে? 'সিনহা হত্যা মামলার প্রধান আলোচনার কেন্দ্র' এখন শিপ্রার হাতে বিড়ি আর মদের বোতল, শিপ্রার কাপড় (বাঙালিদের ভাষায় স্বল্প কাপড়) এবং একাধিক পুরুষের কাঁধে -গলায় হাত রাখা ছবি। সিগারেট যখন যে সমাজে পুরুষের স্বাস্থ্যের জন্য ক্ষতিকর এবং এই সিগারেট যখন নারীর চরিত্রের জন্য ক্ষতিকর হয়ে যায়, সেই পরিস্থিতিতে নারীদের উচিত পাড়ার চায়ের দোকানে বসে বাম ঠ্যাংয়ের উপর ডান চ্যাং তুইলা বা দুই ঠ্যাং চ্যাগায়ে বিড়ি টানা এবং সোশ্যাল মিডিয়া জুড়ে #wedonotneeddicktosmoke হ্যাসট্যাগে একটা মুভমেন্ট শুরু করা। তারপরও মোটা মাথার আপনারা অনেকেই বুঝবেন না কেন এবং কেন" নারীর মদ-সিগারেট, বস্ত্রের অধিকার এবং বহুগামিতা" প্রমোট করাটা জরুরি বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে? এইটা অবশ্যই এখনকার সময়ের বাংলাদেশের নারীবাদীদের অন্যতম অবশ্য কর্তব্য।

শুধুমাত্র 'গ্রামে গ্রামে স্যানিটারি ন্যাপকিন বিলানো, স্বামী কেনো পরকীয়া করে এবং নারীর চাকরির অধিকার চাই' এর মধ্যে নারীবাদ সীমাবদ্ধ থাকবে না। অবশ্য আপনারা কয়দিনের আর নারীবাদী? কবে থাইকা, কোন পরিস্থিতিতে আইসা এবং কোন বয়সে আইসা নিজেরে 'নারীবাদী' ঘোষণা করছেন? আমি বয়স ১৫ থাইকা সোশ্যাল মিডিয়ায় নিজেরে নারীবাদী বইলা পরিচয় দিয়ে আসছি, সোশ্যাল মিডিয়াহীন জীবনে আরো আগে থাইকা নারীবাদী আমি। 'পরিস্থিতির শিকার' নারীবাদী আমি না। শাহবাগে আন্দোলন কইরা ফুটেজ পাওয়া বা ঘটনা এ্যারেঞ্জ কইরা বিদেশ যাবো মার্কা উদ্দেশ্য নাই আমার। আমি অবজারভেশন এবং পড়ালেখা করার মধ্য দিয়ে হওয়া নারীবাদী। সুতরাং, আপনাদের বাণী, আপনাদের দৌঁড় এবং আমার দৌঁড় সমান না, দৃশ্যত সমান হওয়ায় কথাও না।

"দ্যা পলিটিক্যাল ইজ পারসোনাল" বইলা একটা আরগুম্যান্ট আছে সেকেন্ড ওয়েব ফেমিনিজমের। এর অর্থ এমন আপনার ব্যক্তিগত ছোট ছোট অভিজ্ঞতা, ঘটনা পুরো সোশ্যাল সিস্টেমের সঙ্গে ওতপ্রোতভাবে জড়িত। নারীর জীবনের অতিব্যক্তিগত বিষয় যেমন -তার হাজবেন্ড তাকে সেক্সুয়ালি স্যাটিসফাই করতে পারতেছে না থেকে তার শাশুড়ি দুইবেলা তার গায়ে হাত তোলে পর্যন্ত প্রত্যেকটা ঘটনার রাজনৈতিক গুরুত্ব আছে। এগুলো আপনার ব্যক্তিগত বিষয়, এগুলো কারো লগে বলার দরকার নাই, এগুলো মাইনা নেন, আইন-বিচারের দরকার নাই, মুভমেন্টের দরকার নাই ইত্যাদি ইত্যাদি করে চেপে আপনি যাইতেই পারেন কিন্তু যে নারী এসব নিয়ে কথা বলতে আসে, প্রতিকার চায়, অন্যদের জানাইতে চায় -সেই নারীর মুখের উপরে ঢিল ছোঁড়ার অধিকার আপনার নাই।

আজ ২০২০। ২০১২ থাইকা 'ফোরথ ওয়েভ ফেমনিজম' শুরু হয়ে গেছে। আপনারা জানেন কি না জানি না, জানলে কইতেন না' শাহবাগে রোদ বৃষ্টি উপেক্ষা করে নারীবাদ করা লোক আমরা। দুইদিনের ফ্লোরা কি বালডা ফালাইছে?'। আসলেই আপনারা যে পদ্ধতিতে বাল ২০০০ তে ফালাইছেন ওই পদ্ধতিতে বাল ২০২০ এ আইসা আমি ক্যান ফেলাবো? আমি জন্মাইছিই ২০০০ এ। ২০১২ তে আমার বয়স যখন ১২ তখনই নারীদের চতুর্থ ওয়েভ অর্থাৎ ফেসবুক, টুইটার, ইন্সটাগ্রাম, ব্লগ, ইউটিউব ইত্যাদি মাধ্যমে পুরুষতান্ত্রিকতার বিরোধিতা, নারীর শিক্ষা, শরীর, হাটাচলা, দৌঁড়, কাপড় ইত্যাদির অধিকার, চাকরি, ব্যবসা, রাজনীতির বাজারে সমান অধিকার, ট্রান্স জেন্ডারদের অধিকার, রাত বারোটায় আকাশের দিকে তাকায়ে নারীর রাস্তায় হাটার অধিকার, পাড়ার চায়ের দোকানে সিগ্রেট খাওয়ার স্বাধীনতা, পুরুষের ফুল-রান্না-ধোয়া ইত্যাদিকে নরমালাইজ করা, এলজিবিটি ইত্যাদি বিষয়ক কথাবার্তা বলা, ক্যাম্পেইন করা, মুভমেন্ট করা ইত্যাদি শুরু হয়ে গেছে।

প্রথম, দ্বিতীয় এবং তৃতীয় ওয়েভ নারীবাদ নারীর লিবারেশন, সোশ্যাল মোবলিটি, ইন্ডিভিজুয়্যালিজম নিয়ে কথা বলা শেষে চতুর্থ ওয়েব নারীবাদ কথা বলে ইন্টারসেকশনালিটি নিয়ে কথা বলে। উদাহরণ দিলে আপনাদের বুঝতে সুবিধা হবে৷ হ্যাশট্যাগ দিয়ে বিভিন্ন মুভমেন্ট যেমন- মিটু, ফ্রি দ্যা নিপল, গার্লগ্যায, নট ইউর এশিয়ান সাইডকিক, ব্রিং ব্যাক আওয়ার গার্লস, ইয়েস অল উইম্যান ইত্যাদি ফোরথ ওয়েভ ফেমনিজমের অংশ। যথারীতি আমিও জন্মের পর থাইকা, বোধ-বুদ্ধির উদয় হওয়ার পর থাইকা চতুর্থ ওয়েব নারীবাদ করি। কিন্তু আমি জানি, বাংলাদেশ এখনো সুইজারল্যান্ডের ১৯৭২ এ পইড়া আছে। সুতরাং, এই দেশে প্রথম, দ্বিতীয়, তৃতীয় ওয়েভের নারীবাদীদেরও দরকার। আমি আপনাদের খারিজ কইরা দিতাছি না যেমনটা আপনারা চতুর্থ ওয়েভে চলা নারীবাদী আমারে খারিজ করছেন।

শেষত আমি কইতে চাই, আপনার কাছে গ্রামের নারীদের স্যানিটারি প্যাড, স্বামী ক্যান বউয়ের ভরণপোষণ দিতাছে না, নারীশিক্ষা চাই ইত্যাদি ইত্যাদি যতখানি গুরুত্বপূর্ণ, আমার কাছে শহুরে নারীর বহুগামিতা চর্চা, প্রকাশ্যে ধুমপানের অধিকার, হোমোসেক্সুয়ালিটি, নারীর পোশাকের অধিকার, রাত দুইটায় নারীর রাস্তায় হাটার স্বাধীনতা ইত্যাদি ততখানি গুরুত্বপূর্ণ। সুতরাং আমি চাই আপনারা মৌলবাদী না হয়ে সহনশীল হন। মনে রাখবেন নারীবাদ কোনো 'সাংগঠনিক ধর্ম' না এবং কোনো পবিত্র এক পুস্তক এবং নবী-রাসুল কর্তৃক পরিচালিত নয়, এটা সামাজিক এবং রাজনৈতিক আন্দোলন যেটা সমাজ-দেশ-পরিস্থিতের আদলে বদলাইতে থাকবে।

1028 times read

নারী'তে প্রকাশিত প্রতিটি লেখার বিষয়বস্তু, ক্রিয়া-প্রতিক্রিয়া ও মন্তব্যসমুহ সম্পূর্ণ লেখকের নিজস্ব। প্রকাশিত সকল লেখার বিষয়বস্তু ও মতামত নারী'র সম্পাদকীয় নীতির সাথে সম্পুর্নভাবে মিলে যাবে এমন নয়। লেখকের কোনো লেখার বিষয়বস্তু বা বক্তব্যের যথার্থতার আইনগত বা অন্যকোনো দায় নারী কর্তৃপক্ষ বহন করতে বাধ্য নয়। নারীতে প্রকাশিত কোনো লেখা বিনা অনুমতিতে অন্য কোথাও প্রকাশ কপিরাইট আইনের লংঘন বলে গণ্য হবে।