প্রমা ইসরাত

আইনজীবী ও মানবাধিকার কর্মী

নারীকে নারীর পাশে দাঁড়াতে হবে

বাংলাদেশে এমনিতেই নারী চলচ্চিত্র নির্মাতার সংখ্যা খুবই কম। যারা আছেন, তারা নাটক চলচ্চিত্র নির্মাণের ক্ষেত্রে নানান সমস্যার সম্মুখীন হন, শুধু মাত্র নারী বলে। আমার যে কয়জন বন্ধু ফিল্ম মেকিং এর সাথে জড়িত তাদের সাথে কথা বলে এমনিতেই বুঝতে পেরেছি, এই দেশে কাজ করাটা আসলেই অনেক চ্যালেঞ্জিং, সেক্ষেত্রে নির্মাতা যদি নারী হয় তাহলে তা যেন একটা পাহাড় খোদাই করার সমান ব্যাপার।

সম্প্রতি মেজর সিনহা হত্যাকান্ডে, সবচেয়ে বেশি যে মানুষটি আক্রমণের শিকার হয়েছে, তিনি শিপ্রা দেবনাথ। বয়সে তরুণ, এখনো শিক্ষার্থী, তার স্বপ্ন দেখার সময় কেবল শুরু। তিনি স্বপ্ন দেখেছিলেন ট্রাভেল ডকুমেন্টারি বানাবেন। স্বপ্ন যাত্রায় মেজর সিনহাকে তিনি বন্ধু হিসেবে পান। আমাদের দেশে অনেক কিছুই ট্যাবু। সেক্ষেত্রে, নর নারীর ভিতরে বন্ধুত্বপূর্ণ কোনো সম্পর্ক যে থাকতে পারে সেটা মানুষ ভাবতেই পারে না। অনেকেই সিনহার মৃত্যুর পর পরই ইউটিউবে ডকুমেন্টারির প্রচারণা চালানোর ব্যপারে সমালোচনা করেছেন। কিন্তু আমার কাছে মনে হয়, তিনি যদি ডকুমেন্ট সংক্রান্ত কোনো কিছু সম্পর্কে প্রচারণা না চালাতো, তো এই সমালোচনাকারীরাই বলতো যে, শিপ্রা মেজর সিনহার সাথে অন্য কোনো কারণে সময় কাটাতে কক্সবাজার-টেকনাফ গিয়েছিলো। তাদের উদ্দেশ্য ছিলো নীল ছবি বানানো, কিংবা আরো মনগড়া  যৌনতা ভিত্তিক কথা তারা বলতো।

সমাজের মানুষদের একটি সাধারণ ভাবনাই হচ্ছে, নর নারীর মধ্যে একটি সম্পর্কই থাকতে পারে, তা হচ্ছে যৌনতা ভিত্তিক।

শিপ্রাকে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে যে পরিমাণ সাইবার বুলিং এর শিকার হতে হয়েছে, তা একজন সুস্থ্য মানুষকে অসুস্থ করে দিতে বাধ্য। তাও একটি আশার বাণী যে, যে পুলিশ কর্মকর্তা দ্বয় শিপ্রার ব্যক্তিগত ছবি ফেসবুকে দিয়ে, তাকে হেনস্থা করেছেন, তাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিতে হাইকোর্টে রিট করা হয়েছে।

কিন্তু সমস্যা হচ্ছে, শুধু এই দুইজন ব্যক্তি নন, এই পোস্টে শিপ্রাকে স্লাট শেইমিং করেছে আরো হাজারো  মানুষ।

সমাজের মানসিকতা হচ্ছে, একজন নারী যদি মদ খায়, সিগারেট খায়, পুরুষের সাথে মেলামেশা করে, তাহলে তার চরিত্র খারাপ। চরিত্র যে খারাপ সেটা প্রমাণ করতেই, এই ইস্যু গুলোকেই বারবার করে প্রচার করা হয়। সমাজে একজন পুরুষের মদ সিগারেট খাওয়া নিয়ে তেমন কোনো মাথা ব্যথা নেই, তাতে সেই পুরুষের চরিত্রের কোনো সমস্যা থাকে না। ব্যপারটা এমন যে, পুরুষের আসলে চরিত্রের প্রয়োজন নেই। চরিত্রের প্রয়োজন হচ্ছে নারীর। এবং সেই চরিত্র নারীর হলে তা যেন কচু পাতার পানির মতো। অল্প টোকাতেই ঝর ঝর করে ঝরে পড়ে। নারী মদের বোতল ধরে ছবি তুললেও তার চরিত্র খারাপ হয়ে যায়।

অথচ মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ আইন ২০১৮ খুলে দেখুন, সেখানে অ্যালকোহল সেবন, বহন করাই নিষিদ্ধ। অথচ পুরুষ সেটা করলে, সেটা অপরাধ, আর নারী করলে অপরাধ তো বটেই, পাশাপাশি তার চরিত্র খারাপ, এবং সেই নারী একটি পাবলিক প্রোপার্টি, যাকে নিয়ে যা ইচ্ছা তাই করা যায়। তাকে বেশ্যা বলা যায়, তার ব্যক্তিগত ছবি নিয়ে নোংরামি করা যায়, এবং শুধু মাত্র এই জন্যেই সমস্ত কিছুর দায়ভার তার কাঁধে দিয়ে দেয়া যায়।

যদি ইউটিউবে ক্যামেরার সামনে সেই ভিডিওতে শিপ্রা না দাঁড়িয়ে সিফাত দাঁড়াতেন, তাহলে হয়তো এতো সমালোচনা হতো না। পাবলিক একটা ব্রাদারহুড অনুভব করতেন। একজন নারীর পাশে নারীর দাঁড়ানোটা সে জন্যেই গুরুত্বপূর্ণ। পুরুষ পুরুষের পাশে দাঁড়ালে সেটা ব্রাদারহুড হয়, আর নারী কোনো পুরুষের পাশে দাঁড়ালে সমাজ বানায় মনগড়া গল্প, নিশ্চয়ই মেয়েটির পুরুষটির সাথে  গোপন সম্পর্কে ছিলো। প্রিজাম্পশন, মানে পুরোটুকুই রক্ষণশীল, পুরুষতান্ত্রিক মানসিকতা নির্ভর অনুমান।

এই পুরো ঘটনাটি, আমাদের সমাজের অনেকগুলো দিক তুলে এনেছে আবারো। নারীর স্বপ্ন দেখার এবং তা পূরণের জন্য কাজ করার বিষয়টির দিকে আঙুল তোলা হয়েছে। শুধুমাত্র নারী হওয়ার জন্য, কিংবা শুধু মাত্র ঘটনার মোড় অন্যদিকে প্রবাহিত করার জন্য উদ্দেশ্য প্রণোদিত ভাবে শিপ্রার উপর ভার্চুয়ালি আক্রমণ করা হচ্ছে। শিপ্রা এবং সিফাতের মতো তরুণ এবং সম্ভাবনাময় দু‘টি তরুণের ভবিষ্যৎকে হুমকির মুখে ঠেলে দেয়া হয়েছে।

মেজর সিনহাকে হত্যা করে শুধু মেজর সিনহার জীবন নিয়ে নেয় নি হত্যাকারীরা, বিপন্ন করেছে তার সাথে সংশ্লিষ্ট আরো মানুষের জীবন।

#Justice for Sinha

#Justice for Shipra

#Justice for Sifat

বিঃদ্রঃ নারী'তে প্রকাশিত প্রতিটি লেখার বিষয়বস্তু, ক্রিয়া-প্রতিক্রিয়া ও মন্তব্যসমুহ সম্পূর্ণ লেখকের নিজস্ব। প্রকাশিত সকল লেখার বিষয়বস্তু ও মতামত নারী'র সম্পাদকীয় নীতির সাথে সম্পুর্নভাবে মিলে যাবে এমন নয়। লেখকের কোনো লেখার বিষয়বস্তু বা বক্তব্যের যথার্থতার আইনগত বা অন্যকোনো দায় নারী কর্তৃপক্ষ বহন করতে বাধ্য নয়। নারীতে প্রকাশিত কোনো লেখা বিনা অনুমতিতে অন্য কোথাও প্রকাশ কপিরাইট আইনের লংঘন বলে গণ্য হবে।