নারী উদ্যোক্তাদের জন্য আত্মরক্ষা শিক্ষা : কেন গুরুত্বপূর্ণ?

রবিবার, মার্চ ১১, ২০১৮ ৩:২০ AM | বিভাগ : সাম্প্রতিক


বহু বছর ধরে নারীদের আত্মরক্ষা শিক্ষা প্রশিক্ষণ অর্থাৎ সেলফ ডিফেন্স ট্রেইনিং দিয়ে আসছি। নারীদের সমস্যার গভীরতা কখনোই আন্দাজ করা যেতো না! যদি না আমি আত্মরক্ষার প্রশিক্ষণকে আরও সময়োপযোগী এবং কার্যকরি করার লক্ষ্যে qualitative গবেষণায় নিয়োজিত না থাকতাম। আর সেই ধারাবাহিকতায় বহু নারীর নানামুখী সমস্যা পর্যালোচনায় আবিষ্কার করেছি, অর্থনৈতিক পরাধীনতা তাদের জীবন রক্ষা করবার জন্য উপযুক্ত উদ্যোগ নেবার সিদ্ধান্ত গ্রহণের ক্ষেত্রে মূল বাঁধা। তাই সরকারী এবং অলাভজনক প্রতিষ্ঠান এর ভিকটিম সাপোর্ট সেন্টারগুলো নারীদের অর্থনৈতিক মুক্তির লক্ষ্যে বিভিন্ন প্রকল্প হাতে নিয়েছে। তাহলে প্রশ্ন আসে এখানে আত্মরক্ষার প্রশিক্ষণের প্রয়োজনীয়তা কোথায় গুরুত্ব পাচ্ছে?

Self Defence Training এর মূল লক্ষ্য জীবনে নিরাপদ এবং ভালো থাকার পথে সকল ধরনের হুমকি থেকে নিজেকে রক্ষা করবার কৌশল রপ্ত করা এবং ব্যক্তি নিরাপত্তার সচেতনতাকে জীবন চর্চার অংশ হিসেবে অভ্যাসে পরিণত করা। কারণ এই অভ্যাস একজনকে হুমকির শিকার হবার ভয় এবং সম্ভাবনা থেকে মুক্ত করবার সঙ্গে সঙ্গে সেগুলোকে মোকাবেলা করবার সাহস এবং দক্ষতা অর্জনেও সহায়তা করবে। এতে জীবন হবে অনেক বেশি গতিশীল, অমুলক ভয়হীন এবং উৎপাদনশীল। গবেষণায় দেখা গিয়েছে যেসব নারীরা ধর্ষণের শিকার হয়েছে তারাই বারবার ধর্ষণের শিকার বেশি হয়েছে। কেনো? কারণ এটি আরেকটি গবেষণার ফলাফলের সাথে  সম্পৃক্ত;  যাতে  দেখা গিয়েছে যারা ধর্ষণের নিমিত্তে আক্রমণের শিকার হয়েছে তাদের মধ্যে ৮০% প্রতিরোধ করার চেষ্টা করেছিলো যার ৬০%ই সফল হয়েছিলো। বাকি ১১% এর চেষ্টা কোনো পার্থক্য তৈরি করে নি। এবং আরও বাকি ৯% এর ক্ষেত্রে ঘটনা আরও খারাপের দিকে মোড় নিয়েছে। এখানে লক্ষ্য করার বিষয় যে ২০% কোনো ধরণের উদ্যোগই নেয় নি। আর এই ২০% হচ্ছে সেই অংশ যারা ভিকটিম হয়েছে এবং বারংবার ভিকটিম হবে। আমাদের সেলফ ডিফেন্সের ভাষায় আমরা যাদেরকে বলি Soft Target.

সকল ভিকটিম সাপোর্ট সেন্টারসমূহ এই ২০% দের জীবন পরিবর্তনের লক্ষ্যেই অর্থ উপার্জনের মাধ্যমে স্বাবলম্বী হবার প্রকল্প হাতে নিয়ে থাকে। কিন্তু এই গ্রুপটির যেই চারিত্রিক বৈশিষ্ঠ্যের কারণে অধিক হুমকির সম্মুখীন সেই মৌলিক কারণটিকে চিহ্নিত করে দূর করা না গেলে তারা আসলে এই পৃথিবীতে নিজেদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করে সামনে এগিয়ে যেতে বারংবারই  ব্যর্থ হবে অথবা অনেক বেশি সম্ভাবনা থেকে যাবে অতীতের চেয়েও আরও ভয়ংকর পরিণতির শিকার হবার। কারণ অর্থনৈতিক মুক্তির লক্ষ্যে উদ্যোক্তা বা কর্মী হিসেবে তাকে আগের চাইতে আরও বেশি বহির্জগতের নানা পরিবেশ এবং পরিস্থিতি মোকাবেলা করার চ্যালেঞ্জের মধ্যে পড়তে হবে। অথচ এই ২০% এর সাথে আরও ২০% যারা ব্যর্থ হয়েছিলো অর্থাৎ মোট ৪০% যারা ভিকটিম হয়েছিলো তারা এই জন্যে ভিকটিম হয়েছিলো কারণ তারা জানতো না কিভাবে ঐ সকল হুমকির পরিস্থিতি মোকাবেলা করতে হয়! শুধুমাত্র একটু গলার আওয়াজকে ব্যবহার করেও যে ধর্ষণের মতো ভয়াবহ ঘটনা থেকে নিজেকে রক্ষা করা সম্ভব সেটিও তাদের জানা ছিলো না।

আবার জানা থাকলেও আমাদের দেশের সাংস্কৃতিক পরিমণ্ডলে বেড়ে উঠা মেয়েরা ভিকটিম ব্লেমিং এর আশংকায় প্রতিরোধ গড়ে তুলবার ক্ষেত্রে নিষ্ক্রিয় ভুমিকা পালন করে থাকে। শুধু তাই নয় বিপদজ্জনক কোনো পরিস্থিতে পড়লে জানা থাকা স্বত্তেও মানসিক চাপের কারণে অধিক পরিমান এড্রিনাল হরমন ক্ষরণের ফলে তা প্রয়োগ করতে ব্যার্থ হয়ে যায়। এই প্রধান দুটি কারণ ছাড়াও অবশ্যই আরও অনেকগুলো কারণ নানান ভাবে কাজ করে থাকে।   

সুতরাং অর্থনৈতিকভাবে স্বাবলম্বী করে যেই নতুন কর্মময় জীবন শুরু করবার উদ্যোগ নেয়া হচ্ছে তার সাথে খুব যৌক্তিক ভাবেই যুক্ত হয়ে যাচ্ছে আরও অভিনব এবং অধিক পরিমাণে ভয়ংকর আক্রমণের শিকার হবার সম্ভাবনাটিও। তাই সবার আগে ঐসকল দুর্বল এবং অধিক আক্রমনের শিকার হবার হুমকির মধ্যে থাকা ঝুঁকিপূর্ণ নারীদের মৌলিক চরিত্রগত দুর্বলতাকে দূর করা অতি মাত্রায় জরুরি বলে প্রমাণিত।

একটি উপজুক্ত সেলফ ডিফেন্স প্রোগ্রাম যা বাস্তবসম্মত ও কার্যকরী তা খুব শক্তিশালিভাবে পারে এই দুর্বলতাকে দূর করতে। সেলফ ডিফেন্স ট্রেইনিং এর ৮০ ভাগই থাকে নানা ধরণের তথ্য উপাত্ত দিয়ে সাজানো যা দিয়ে একজন নারী বিপদকে অনেক আগে থেকে চিহ্নিত করতে সক্ষম হয়। যার ফলে বিপদকে এড়িয়ে চলা সহজ হয়। পাশাপাশি এই ট্রেইনিংয়ে সকল ধরনের হুমকিকে মোকাবেলা করার জন্য মৌখিক, আঙ্গিক ও শারিরিক কৌশল ব্যবহার করে সফল আত্মরক্ষার প্রয়োগ সম্পাদনের শিক্ষা এবং প্রশিক্ষণ প্রদান করা হয়। এর ফলে জীবন চলার পথে ভয় থেকে মুক্তি মেলে এবং নিরবিচ্ছিন্নভাবে সব কাজ করে যাবার সক্ষমতা তৈরি হয়।

সেলফ ডিফেন্স ট্রেইনিং এর উপকারিতা নিয়ে গবেষণায় দেখা গিয়েছে, এই প্রশিক্ষণ গ্রহণে নারীরা হতাশা থেকে মুক্তি পেয়ে আশাবাদী হয়ে উঠে। আত্মবিশ্বাস বৃদ্ধি পায়। সমস্যা সমাধানের দক্ষতা তৈরি হয়। ক্রিয়া এবং প্রতিক্রিয়াকে নিয়ন্ত্রণ করতে সক্ষম হয়। তারা নিজেদের ভয়কে শক্তিতে রুপান্তরিত করে ফলাফল নিয়ন্ত্রণ করতে পারে। সর্বোপরি প্রোডাক্টিভিটি বৃদ্ধির জন্য প্রয়োজনীয় মানসিক ভারসাম্য রক্ষা করতে সক্ষম করে তুলে।  

এই প্রসঙ্গে একটি বিষয় পরিষ্কারভাবে বলে নিচ্ছি যে, এখানে মার্শাল আর্টের কথা বলা হচ্ছে না। আমি সেই সেলফ ডিফেন্সের কথা বলছি যার ৬০ ভাগ তাত্ত্বিক, ২০ ভাগ মনস্তাত্ত্বিক এবং ২০ ভাগ শারীরিক- যেই তিনটি বিষয়কে একত্র করেই সম্ভব সর্বাধিক সফল এবং পরিপূর্ণ আত্মরক্ষার প্রক্রিয়া সম্পাদন করা। যাদের কোনো একটি বিষয়ের অনুপস্থিতি আত্মরক্ষার প্রশিক্ষণ পর্বটিকে অপরিপূর্ণ, ত্রুটিপূর্ণ এবং অনেক ক্ষেত্রে আরও অধিক ঝুঁকিপূর্ণ করে তুলে। অপরদিকে একটি মানসম্মত সেলফ ডিফেন্স প্রোগ্রাম এর মাধ্যমে নিজেকে রক্ষা করতে পারবার এই বিশেষ দক্ষতাটি  নারীর মধ্যে তৈরি করে এক আত্মবিশ্বাসী সচেতন মানসিকতা। যাতে রয়েছে নবজন্মের স্বাদ নেবার অভিজ্ঞতা। মনে রাখা জরুরি যে নিরাপত্তার শিক্ষা গ্রহণ করতে পারবার সুযোগ যে কোনো মানুষের মৌলিক অধিকারগুলোর মধ্যে অন্যতম।  

তাই ব্যক্তি পর্যায় থেকে শুরু করে প্রাতিষ্ঠানিক পর্যায়ে প্রত্যেক নারীর জন্য সেলফ ডিফেন্স এর প্রশিক্ষণ নিশ্চিত করার মাধ্যমে অর্থনৈতিক স্বাধীনতা ও নারী মুক্তির লক্ষ্যকে দ্রুততম সময়ে অর্জন করা সম্ভব। প্রতিটি নারী এই নবজন্মের স্বাদকে উপভোগ করবার সুযোগ পাবে এই প্রত্যাশাই রইলো।


  • ৭৮৭ বার পড়া হয়েছে

পূর্ববর্তী লেখা পরবর্তী লেখা

বিঃদ্রঃ নারী'তে প্রকাশিত প্রতিটি লেখার বিষয়বস্তু, ক্রিয়া-প্রতিক্রিয়া ও মন্তব্যসমুহ সম্পূর্ণ লেখকের নিজস্ব। প্রকাশিত সকল লেখার বিষয়বস্তু ও মতামত নারী'র সম্পাদকীয় নীতির সাথে সম্পুর্নভাবে মিলে যাবে এমন নয়। লেখকের কোনো লেখার বিষয়বস্তু বা বক্তব্যের যথার্থতার আইনগত বা অন্যকোনো দায় নারী কর্তৃপক্ষ বহন করতে বাধ্য নয়। নারীতে প্রকাশিত কোনো লেখা বিনা অনুমতিতে অন্য কোথাও প্রকাশ কপিরাইট আইনের লংঘন বলে গণ্য হবে।


মন্তব্য টি

লেখক পরিচিতি

তমাল সাইফুল্লাহ

তমাল সাইফুল্লাহ বাংলাদেশের ট্যাকটিক্যাল ক্রাভ মাগার সার্টিফাইড প্রশিক্ষক। বর্তমানে সেল্ফ ডিফেন্স ফর উইমেন এন্ড চিলড্রেনের ফাউন্ডার। দীর্ঘদিন ধরে তিনি সেল্ফ ডিফেন্স এবং মিক্সড মার্শাল আর্টের প্রশিক্ষণ দিয়ে যাচ্ছেন।

ফেসবুকে আমরা