নাহিদা আক্তার

ব্যবসায়ী।

যৌন বিকারগ্রস্থ সমাজে #metoo -এর এতো এতো প্রমাণ কিভাবে দেবো?

মিটু নিয়ে অনেকেই নিজের জীবনের অনেক ভয়ংকর কথা বলেছে, আমাকে এক বন্ধু জিজ্ঞাস করলো আমার কোন ঘটনা নাই? আমি কেন বলছি না কিছু? চিন্তা করে দেখলাম অনেক ভয়ংকর কিছু স্মৃতি তো আমার নিজেরও আছে কিন্তুু আমার বলতে ইচ্ছা করে না। সবচেয়ে ভয়ংকর যে স্মৃতি আছে, যে ব্যক্তির কারণে এই স্মৃতি পেয়েছি সে মারা গিয়েছে। আমার এখনও মনে আছে খুব স্পষ্ট ভাবে ঘটনাগুলো। কী করতো তখন ছোট ছিলাম কিছু বুঝিও না, প্রতিবাদ করার তো প্রশ্নই আসে না। বড় হওয়ার পর তাকে কঠিন শিক্ষা দিয়েছিলাম। আমার ভাগ্য ভালো বলবো না, এমন সিচুয়েশান ছিলো যে তাকে ধরা আমার জন্য সহজ ছিল দেখেই হয়ত তাকে আমি শিক্ষাটা দিতে পেরেছিলাম। আমাদের ফ্যামিলিতে এমনও কথিত আছে আমার দেওয়া মানসিক প্রেসার সহ্য করতে না পেরে ডাইল খেতে খেতে মরে গেছে শুয়োরটা। আমার ভয়ংকর স্মৃতি বা যে কোন মেয়ের জীবনের ভয়ংকর সব মানসিক যন্ত্রণা অন্যের কাছে ঘটনা গল্প।

বন্ধুদের ছোট্ট একটা গল্প বলি। আমাদের বাসার সামনের বাসায় এক ছেলে থাকে, আমাদের খাবার ঘর আর ওই ছেলের বাসার বাথরুম মুখোমুখি। আমরা বোনেরা যেই খাবার রুমে যাই না কেন, ওই ছেলে বাথরুমে এসে আমাদের দিকে তাকিয়ে তাকিয়ে মাস্টারবেট করতে থাকে। আমার মেঝো বোনের খেতে যেতে যেতে প্রায়ই একটা বেজে যায়, তখনও ওই ছেলে বাথরুমে এসে এই কাজ করতে থাকে। অথচ, যে বাসার কথা বলছি সে বাসায় প্রতি জুম্মাবারে হাই ভলিউমে নানা ওয়াজের রেকর্ড ছাড়া হয়, ঘন্টাখানেক চলে, তারপর চলে হিন্দি গান, শীলা কি জাওয়ানি। আমাদের খাবার ঘরের সামনে একটা বারান্দা আছে, ওই ছেলেকে এই রকম মাস্টারবেট করতে দেখে আমার বোন বারান্দায় গিয়ে অনেক গালাগালি করছে একদিন, দুইদিন, তিনদিন। এরপর ওই বাসা যাদের মানে যে মালিক তাকে গিয়ে আম্মুও বলে এসেছে, আম্মু আর ওই বাসার আন্টি ওই ছেলের বাসায় গিয়ে বলেও এসেছে। তারপরও ওই ছেলের কোন বিকার নাই। এরপর আম্মু সবসময় বাথরুমের জানালা বরাবার বারান্দায় কিছু একটা দিয়ে রাখে, টাওয়াল, গামছা, চাদর টাইপ কিছু, যাতে আমরা এই দৃশ্য না দেখি। মাঝখানে দুই একদিন বাথরুমের জানালা টেনে দেওয়া ছিলো। গত একসপ্তাহ ধরে আবার শুরু হয়েছে। একটু আগেও আমি পানি পান করতে গিয়ে দেখি ছেলেটি বাথরুমের জানালার সামনে দাঁড়িয়ে আছে আর মাস্টারবেট করছে। আমি খাওয়ার ঘর থেকে বারান্দায় গিয়েছি গালাগালি করার জন্য, আমাকে বারান্দার দিকে যেতে দেখে সে লাইট অফ করে দিয়েছে। কিন্তুু সে যে বাথরুমেই আছে আর এখনও ওই কাজ করছে তা ভালোই বোঝা যাচ্ছে। এতোক্ষণ অকথ্য গালাগালি করলাম, নিজেরই মাথা ব্যথ্যা হয়ে গেছে।

অনেকেই মিটু আন্দোলন নিয়ে এর ফ্লোগুলো নিয়ে কথা বলছে। অনেকেই আবার প্রশ্ন তুলছে এই কথাগুলো বলার সার্থকতা কী? যদি কোনো বিচারই না হয়, সবাই শুধু কার সাথে কি হচ্ছে শেয়ার করছে কিন্তুু সমাধান বলতে পারছে না, তাহলে আঁখেরে ফলাফল কি হবে? 

এক আপুর আর্টিকেল দেখলাম, সেখানে বাংলাদেশের যারা শিশু যৌন নির্যাতন নিয়ে কাজ করে তাদের কাছে আসা শিশুদের উপর একটা পরিসংখ্যানে বলা হয়েছে, প্রতি চারজন মেয়ের মধ্যে একজন আর প্রতি ছয়জন ছেলে শিশুর মধ্যে একজন নিজের পরিবারেরই কোনো না কোনো মানুষ দ্বারা যৌন নির্যাতনের শিকার।

আমার নিজের বাবা ভাই খুব ভালো শুধু ভালো না অতিরিক্ত ভালো। কিন্তুু আমার চারপাশের হাজারটা বাবা ভাই কি সুস্থ মানসিক ভাবে? একটা বাচ্চার উপর যৌন নির্যাতন করার জন্য কী ধরণের মানসিক বিকারগ্রস্থতা দরকার চিন্তা করতেছি।

মিটু মুভমেন্ট শুরু হওয়ার পর আমার পরিচিত অনেক ছেলেও তাদের জীবনে ঘটে যাওয়া ভয়ংকর সব স্মৃতির কথা শেয়ার করছে। বেশির ভাগই ছিল কোনো না কোনো ছেলের দ্বারাই।

শুধু ছোট বেলায় না বড় হয়েও আমাদের কোন রক্ষা নাই। বড় হওয়ার পরও শুরু হয় অন্য ধরণের অত্যাচার। কোনো অফিসে যাবো, কারো সাথে একটু সুন্দর করে কথা বলবো, দুই তিনটা কথা বলার পরই শুরু করে নানা নোংরা কথা, গায়ে হাত দেওয়ার চেষ্টা। ইনিয়ে বিনিয়ে আপনার হাসি, আপনার চোখ এত এগ্রেসিভ দেখলেই কেমন জানি লাগে, আপনাকে কাছে পেতে ইচ্ছা করে বলে চেয়ার থেকে উঠে এসে পাশে বসে গায়ে হাত দেওয়ার চেষ্টা করা তো বহু দেখছি নিজেই। সবাই যে এই কাজ করে তাও না তবে সংখ্যাটা করার মানুষেরই বেশি।

কারও বিরুদ্ধে অভিযোগ আনলেই শুধু হয় না তার বিরুদ্ধে প্রমাণও দরকার হয়। আচ্ছা ধরেন আমি কারও অফিসে গেলাম। অফিসে বসদের তো ব্যক্তিগত রুম থাকে, আমার নিজের কাজের জন্যই তো কত এমডি, ডিএমডি, সিইও'র সাথে কথা বলতে যাই। তো এখন আমি এই রকম কারো সাথে কথা বলতে গেলাম, রুমে আমি আর ওই বিশিষ্ট পজিসনের লোক ছাড়া আর কেউ নেই। ওই লোক যদি আমার সাথে এমন কিছু করে আমার গায়ে হাত দেয় বা নোংরা কথা বলে আমি কি প্রমাণ করতে পারবো যে সে কি করছে বা কি বলছে? বাংলাদেশের যেসব আইনি প্রক্রিয়া সেই প্রক্রিয়াতে কী তার বিরুদ্ধে কিছু প্রমাণ করা সম্ভব! আমি আর বিশিষ্টজন এবং আল্লাহ ভগবান ছাড়া তো রুমে  কেউ ছিল না, প্রমাণ দিবো কিভাবে?

এখন যেহেতু মোবাইল ফোনের যুগ এবং ফোন ছাড়াও যেহেতু আরও অনেক ডিভাইস পাওয়া যায় আমার এক ছোট্ট ভাই বললো আপুনি যেখানেই যাও ফোন থাকলে ফোনের রেকর্ডার অন করে রাখবা অথবা একটা রেকডিং ডিভাইস কিনবা। যেখানেই যাবা মিটিং হোক যাই হোক না কেনো সবসময় অফিসে ঢোকার আগেই ডিভাইস অন করে নিবা। এদের প্রমাণ দরকার রেকর্ড করা থাকলে সুবিধা হবে।

বুদ্ধিটা ভালোই কিন্তুু এই বুদ্ধি কাজে লাগাতে পারবে তারাই যাদের দামী ফোনে ভালো রেকর্ডার আছে আর অন্যরা কি করবে! আর কয়টা অফিসে যেয়েই বা রেকর্ড করবো আমরা? কাজ নিয়ে কথায় মন দিবো নাকি রেকর্ডিং হচ্ছে কিনা ঠিক মতো তাতে মন দিবো? কোন কারণে রেকর্ডিং গেজেট নষ্ট হয়ে গেলে বা কাজ না করলে সেদিন কি হবে?

এই মিটু আন্দোলনের হয়তো অনেক ভুল আছে কিন্তুু এই আন্দোলনের জন্য সাহস করে কিছু মেয়ে যে আমাদের চোখে আঙ্গুল দিয়ে দেখিয়ে দিচ্ছে আমরা কত ভয়ংকর স্মৃতি নিয়ে জীবন পার করছি। আশেপাশে কত জঘণ্য পশুরা ভালো মানুষ সেজে বসে আছে, এটা কি দরকার ছিলনা আমাদের জানার!

ছোট্ট আরেকটা আপনাদের গল্প/ঘটনা দিয়ে আমার আউলা ঝাউলা লেখা শেষ করি। আমার পরিচিত ছোট্ট একটা মেয়ে সামনের বছর ইন্টারমেডিয়েট পরীক্ষা দেবে। এই বাচ্চাটার জীবনে ঠিক এই মুহূর্তে ভয়ংকর ঘটনা ঘটতেছে। সে প্রেগনেন্ট আর এর জন্য দায়ী ওরই ফ্যামিলির খুব আপনজন। বাবা মা সবই জানে, ও কাউকে কিছু বলতে পারছে না কারণ তার কাছে কোন প্রমাণ নাই। কে বিশ্বাস করবে ওর কথা? ওর নিজের বাবা-মা'ই বলবে  অন্য কোথাও যেয়ে কিছু করে আসছে, নয়তো তাকে পাগল প্রমাণ করবে। আমি অনেক চাচ্ছি ওকে সাহায্য করতে কিন্তুু এই ভয়াবহ পরিস্থিতি থেকে তাকে মুক্ত করা সম্ভব না। তার মা কিছু একটা ঔষুধ খেতে দিয়েছে। এখন অনেক ব্লিডিং হচ্ছে দেখে চুপচাপ। তার বাবা-মা তাকে হাসপাতালে নিয়ে গেলো, আমাকে বলেছে, "আপু আমি কোন আইনি ব্যাপারে যাবো না, আমার জীবন, পড়ালেখা সব শেষ হয়ে যাবে। যদি আমি ফেরত আসি তাহলে পরীক্ষা দিয়ে বাইরে চলে যাবো, আমার বাবা অনেক প্রভাবশালী, ওরা আমি কিছু প্রকাশ করলে মেরে ফেলবে। আর সবচেয়ে বড় কথা প্রমাণ, প্রমাণ করার কিছু নাই আমার কাছে।"

একটা গল্প বলবো বলেছিলাম প্রমাণের কথা বলতে গিয়ে। আরেকটা গল্প মনে পড়লো। ব্র্যাকের এক ছেলে প্রেম ভেঙেছে দেখে মেয়েকে বাসা থেকে ডেকে নিয়ে সেই মেয়ের বাসার সামনেই তাকে মারছিলো, প্রমাণও আছে কিন্তুু মেয়ের বাবা-মা কোন কেইস করতে রাজি না কারণ তাহলে মেয়ের আর বিয়ে দিতে পারবে না। বিয়ে করতে গেলে এই অতীত তার জীবন নষ্ট করে দিতে পারে, তাই বাবা-মা নীরব থাকার সিদ্ধান্ত নিয়েছে। মিটু ঘটনা কত বিচিত্র তাই না।

চারপাশে এতো এতো মিটু, এতো এতো নিপীড়ণ, এতো এতো ভয়ংকর সব অভিজ্ঞতার মধ্য দিয়ে বেড়ে উঠছে আমাদের মেয়েরা, নারীরা। গোটা সমাজটাই তো যৌন বিকারগ্রস্থ, এতো এতো মিটু'র প্রমাণ দেবো কিভাবে?

1394 times read

নারী'তে প্রকাশিত প্রতিটি লেখার বিষয়বস্তু, ক্রিয়া-প্রতিক্রিয়া ও মন্তব্যসমুহ সম্পূর্ণ লেখকের নিজস্ব। প্রকাশিত সকল লেখার বিষয়বস্তু ও মতামত নারী'র সম্পাদকীয় নীতির সাথে সম্পুর্নভাবে মিলে যাবে এমন নয়। লেখকের কোনো লেখার বিষয়বস্তু বা বক্তব্যের যথার্থতার আইনগত বা অন্যকোনো দায় নারী কর্তৃপক্ষ বহন করতে বাধ্য নয়। নারীতে প্রকাশিত কোনো লেখা বিনা অনুমতিতে অন্য কোথাও প্রকাশ কপিরাইট আইনের লংঘন বলে গণ্য হবে।