মুসলিম নারীদের পর্দাপ্রথার সংস্কার প্রয়োজন

সোমবার, জুন ২৫, ২০১৮ ২:০১ AM | বিভাগ : সাম্প্রতিক


কারো কাজে বা কথায় আমার দৈনন্দিন জীবন যাপনে যদি কোনো সমস্যা না হয় সত্যি আমি সেটা নিয়ে বেশী মাথা ঘামাই না, সে যদি আমার অপছন্দের কাজও করে তাও না, তবে কারো কোনো ভুলের জন্য যদি আমাকে শাস্তি পেতে হয়, আমার স্বাভাবিক জীবন যাপন ব্যাহত হয় তাহলে আমি চুপ করে বসে থাকবো না।

সমস্যাটা হয়েছে আজ অফিসে আমাদের হেড অফিসের Q.C ম্যানেজার এসেছে ফ্যাক্টরি ভিজিট করতে, তার চোখ এসে পরে আমার চুলে, তিনি একটু পর তার রুমে আমাকে ডেকে নেন নসীহত করার জন্য, আমাদের আলোচনা ছিলো এমন :

স্যার : আপনাকে আমি প্রায় সময় লক্ষ্য করি আপনি আমাদের সবার মতো নয়, সবার থেকে আলাদা চালচলন আপনার, সুন্দর চুল ছিলো তাও কেঁটে ফেলেছেন! আপনার পার্সোনাল ম্যাটার নিয়ে কথা বলছি, কিছু মনে করবেন না, আসলে আপনি মনে হয় কোরান হাদিস কম জানেন, আপনি কি জানেন মেয়ে মানুষের একটা চুল পরপুরুষ দেখলে কিয়ামতের দিন ঐ একটা চুল সত্তরটা সাপ হয়ে আপনাকে দংশন করবে!

আমি : যতোটা সম্ভব নিজেকে সংবরণ করে, কণ্ঠে বিনয় মিশিয়ে বললাম -স্যার এসব হাদিস মনে হয় তাদের জানা দরকার যারা হাউজ ওয়াইফ, বাইরে বের হতে হয় না, দশ জনের সাথে কাজ করতে হয় না, আমার মতো চাকুরীজীবী মেয়েদের জন্য নয়, আমি যতোটুক কাজ করি আমার পুরুষ সহকর্মীও ঠিক ততোটাই কাজ করে আর একি সমান স্যালারি নেয়, এখন সে যদি কাজ করার সময় সমস্যা হয় এমন জিনিস বয়কট করে তাহলে আমি কেনো করবো না! আমার চুল থাকলে কাজ করতে আমার অসুবিধা হয়, আর হিজাব পরে বেশীক্ষণ কাজ করলে আমার মাথা ঘুরায়। আর নিজেকে সুন্দর দেখাতে সারাক্ষন অস্বস্তিতে থাকার মানে হয় না।

স্যার : আপনি মেয়েমানুষ এটা মনে রাখবেন, ছেলেরা যা করতে পারবে আপনি তা করতে পারবেন না, আপনি মুসলিম পরিবারের মেয়ে, আর মেয়েদের এসব সহ্য করতে হয় হাদিসে আছে, হাওয়া গন্ধম ফল খাওয়ার জন্য এই শাস্তি আল্লা তাকে দিয়েছে।

আমি : আল্লা তাকে তার অপরাধের শাস্তি দিয়েছে বেশ ভালো কিন্তু তার পাপের ফল গোটা স্ত্রীজাতি কেনো ভোগ করবে! আমার তো মনে হয় স্যার হয় সৃষ্টিকর্তা নারীবিদ্বেষী বা এসব কোরান হাসিদ কোনো পুরুষের তৈরি, তাই সবখানে সব ধর্মে শুধু নারীদের আপমান করা হয়েছে, যতো নিয়ম কানুন সব স্ত্রীজাতির জন্য!

স্যার : মুখের দিকে কিছুক্ষণ তাকিয়ে থেকে, ঠিক আছে আপনি আসুন।

বের হয়ে স্যারের সম্পর্কে খোঁজ নিয়ে জানলাম তিনি গতবছর হজ্জে গিয়েছিলেন, আমার বুঝতে আর বাকি নেই এমন সমস্যায় আমাকে আরো পড়তে হবে।

আমি কখনো কোনো ধর্ম নিয়ে সমালোচনা করি নি কারণ আমার কোনোদিন ধর্ম নিয়ে সমস্যা হয় নি, উচ্চবিত্ত আর নিম্নবিত্ত পরিবারগুলোতে এসব সামাজিক নিয়ম কানুন আর ধর্মীয় নিয়ম কানুন নিয়ে কেউ মাথা ঘামায় না, আমি নিম্নবিত্ত পরিবারের মেয়ে হওয়ার জন্য কোনোদিন আমাকে পরিবার জোর করে নি ধর্মীয় আচার মানতে, আমিও আমার নিজের পছন্দ মতো ধর্ম বেছে নিয়েছি, কোনটা মানবো কোনটা মানবো না সেটা আমি নিজেই ঠিক করেছি, কোনো দিন কারো কাছে কৈফিয়ত দেই নি, ছোটবেলা থেকেই আত্মনির্ভরশীল আমি, পড়াশুনা করেছি নিজেই উপার্জন করে, এতোদিন ভালোই ছিলাম কিন্তু ইদানিং আমি সব জায়গায় বাঁধাগ্রস্ত হচ্ছি এই ধর্মীয় নিয়ম নিয়ে, আমার মনে হচ্ছে ইসলাম ধর্মের নিয়মের সংস্কার করা দরকার তা না হলে একদিন ইসলামই জানি অন্ধকারে তলিয়ে যাবে, কেবল মাত্র ধর্মের দোহাই দিয়ে তারা কতো প্রতিভাবান মেয়েদের বন্ধ করে রেখেছে সংসার নামক জেল খানায়।

সব ধর্মেই এক সময় স্ত্রী জাতির অবরোধ প্রথা ছিলো, কিন্তু সময়ের সাথে সব ধর্মের পিতৃতন্ত্রের বিবর্তন ঘটেছে শুধু এই মুসলিম ধর্মের কোনো বিবর্তন ঘটে নি, চৌদ্দশ বছর আগে যে নিয়ম ছিলো এখনো সেই নিয়মই অব্যাহত রাখা হয়েছে, এক সময় হিন্দু ধর্ম বিধানে বিয়ে বাধ্যতামুলক ছিলো নারীদের জন্য, যে প্রক্রিয়ায় নারীকে পরিণত করা হতো দাসীতে, কোনো নারী যদি অবিবাহিত থাকতে চায় তবে হিন্দু পিতৃতন্ত্র তার উপর চরম প্রতিশোধ নিতো, এমন বলা হতো নারী ম'রেও বিয়ের শিকল থেকে মুক্তি পায় না, মহাভারতে সুভরু ঋষি কুণির কন্যা চির কুমারী থাকে, মৃত্যুশয্যায় সে জানতে পারে সে সারাজীবন ধর্ম পালন করেও স্বর্গে যেতে পারবে না, কেননা বিয়ে দ্বারা তার দেহ পবিত্র হয় নি, তাই অসহায় মুমুর্ষ কুমারীটি এক ঋষিকে বিয়ে করতে রাজি করিয়ে এক রাত্রি তার সাথে কাটিয়ে স্বর্গে যাওয়ার ব্যাবস্থা করে, এমন নিয়ম ছিলো যে পুরুষ দ্বারা নারী দূষিত না হওয়া পর্যন্ত নারী পরিশুদ্ধ হয় না, এমন সব ধর্মীয় রীতিনীতি থেকে হিন্দুর্ধম বিবর্তিত হয়েছে, মুসলিম ধর্মেও আমূল সংস্কার প্রয়োজন।।


  • ৯৮৯ বার পড়া হয়েছে

পূর্ববর্তী লেখা পরবর্তী লেখা

বিঃদ্রঃ নারী'তে প্রকাশিত প্রতিটি লেখার বিষয়বস্তু, ক্রিয়া-প্রতিক্রিয়া ও মন্তব্যসমুহ সম্পূর্ণ লেখকের নিজস্ব। প্রকাশিত সকল লেখার বিষয়বস্তু ও মতামত নারী'র সম্পাদকীয় নীতির সাথে সম্পুর্নভাবে মিলে যাবে এমন নয়। লেখকের কোনো লেখার বিষয়বস্তু বা বক্তব্যের যথার্থতার আইনগত বা অন্যকোনো দায় নারী কর্তৃপক্ষ বহন করতে বাধ্য নয়। নারীতে প্রকাশিত কোনো লেখা বিনা অনুমতিতে অন্য কোথাও প্রকাশ কপিরাইট আইনের লংঘন বলে গণ্য হবে।


মন্তব্য টি

লেখক পরিচিতি

সৈয়দা সুমাইয়া ইরা

চাকুরীজিবি, নারীবাদী।

ফেসবুকে আমরা