মুক্তিযুদ্ধের শেষের মাসগুলোর কিছু ঘটনা

রবিবার, অক্টোবর ১৪, ২০১৮ ৭:৪০ PM | বিভাগ : দেশ/রাজনীতি


১৯৭১ এর যুদ্ধ ভারত সেই ৬ ই অগাস্ট থেকেই পরিকল্পনা করেছিলো, যখন সোভিয়েত ইউনিয়নের সাথে এক দ্বিপাক্ষিক চুক্তি 'সোভিয়েত সংহতির বন্ধুত্ব ও সহযোগিতা' চুক্তিতে ভারত স্বাক্ষর করেছিলো। তারপর পুরো তিনটি মাস ভারতের প্রধানমন্ত্রী শ্রীমতী ইন্দিরা গান্ধী সারা বিশ্বের নেতাদের সাথে দেখা করে জানিয়ে দিয়েছিলেন যে প্রায় দুই কোটি শরণার্থী ভারত আর বেশিদিন খাওয়াতে পারবে না, তাছাড়াও বাঙালি গণহত্যা বন্ধ না হলে ভারত পাকিস্তানকে সামরিক ভাবে  বাধ্য করবে সমস্যা সমাধনের জন্যে।

জেনারেল স্যাম মানেকশও (স্যাম বাহাদুর) ছিলেন ভারতীয় প্রথম সামরিক নেতা যিনি ফিল্ড মার্শাল পদে পদোন্নতি প্রাপ্ত প্রথম ভারতীয় সেনা কর্মকর্তা ছিলেন। তাঁর দীর্ঘ সামরিক কর্মজীবন দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধে ব্রিটিশ ভারতীয় সেনাবাহিনীতে চাকরির সাথে শুরু করে চার দশক ধরে পাঁচটি যুদ্ধ পরিচালনা করা।

প্রধানমন্ত্রী ইন্দিরা গান্ধীর সাথে মানেকশও এর এক সময় মতপার্থক্য দেখা দেয় যখন তিনি বলেছিলেন "আমি ভাবছি যে দেশের রাজনৈতিক প্রতিরক্ষার দায়িত্বে থাকা আমাদের রাজনৈতিক মাস্টাররা কোনো মর্টার থেকে একটি মর্টার এর; অথবা একটি গরিলা থেকে একটি গেরিলা পার্থক্য করতে পারে না কেনো"

শ্রীমতি ইন্দিরা গান্ধী মানেকশও'কে তার চেম্বারে ডেকে এনেছিলেন এবং একটি প্রশ্ন করেছিলেন আপনি কি আমার কাছ থেকে ক্ষমতা নেওয়ার চেষ্টা করছেন?

জবাবে তিনি বলেছিলেন, "আপনি জানেন যে আমার কোনো রাজনৈতিক উচ্চাকাঙ্ক্ষা নেই। আমার কাজ আমার সেনাবাহিনী কমান্ড করা এবং এটি একটি মহান ব্রত হিসেবে দেখতে হয়। যেমন আপনার কাজ দেশের সর্বাঙ্গীণ যত্ন নেওয়া"।

১৯৭১ সালে জেনারেল স্যাম মানেকশও ছিলেন ভারতের সশস্ত্র বাহিনীর সর্বাধিনায়ক। ভারত পরিকল্পনা করেছিলো ১৯৭১ সালে ৪ ডিসেম্বরে পাকিস্তানকে আক্রমণ করবে। ঠিক তার আগের দিন সন্ধ্যায় গোটা বিশ্বকে অবাক করে দিয়ে পাকিস্তান ভারত আক্রমণ করে। নভেম্বরের ২৩ তারিখে ভারতীয় সেনাবাহিনী পাকিস্তানী সেনাবাহিনীকে তাড়া করে বয়রা পর্যন্ত ঢুকে পরে। পরদিন তা নিউইয়র্ক টাইমসের হেডলাইন নিউজ হয়। তখনই ইয়াহিয়া ঘোষণা দেয় দশদিন পর এর জবাব দেওয়া হবে।

গত নয় মাস ধরে উত্তরের হলুদ মানে চাইনিজ ও দক্ষিণের সাদা মানে আমেরিকান সরকার পাঞ্জাবী খানসেনাদের যে রসদ ও বাহবা জুগিয়েছিলো, তার একটা চূড়ান্ত পরিণতির জন্য আমেরিকা ও চায়নার অনুমতি তার দরকার ছিলো।

সোভিয়েত ইউনিয়ন ভারতকে আশ্বাস দিয়েছিলো যে, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র বা চীনের সাথে সংঘর্ষ হলে সোভিয়েত রাশিয়া  পাল্টা ব্যবস্থা নেবে। এই আশ্বাসটি ১৯৭১এর আগস্টে স্বাক্ষরিত ভারত-সোভিয়েত সংহতির বন্ধুত্ব ও সহযোগিতা চুক্তিতে আবদ্ধ ছিলো। শ্রীমতী ইন্দিরা গান্ধী ৯ মাসে সারা পৃথিবীর ক্ষমতাধর দেশগুলো সফর করে সাফ জানিয়ে দিয়েছিলেন যে, বাংলাদেশে পাকিস্তান যদি গণহত্যা বন্ধ না করে তাহলে ভারত যুদ্ধের প্রস্তুতি নিচ্ছে।

৪ ডিসেম্বর ভারতীয় নৌ, বিমান ও পদাতিক বাহিনী সকল পথে পাকিস্তানকে আক্রমণ করে। মাত্র দুইদিনে নৌ বাহিনী সম্পূর্ণরুপে বঙ্গোপসাগরের নিয়ন্ত্রণ নিয়ে নেয়। বিমান বাহিনী ভারতের পশ্চিম অংশের বর্ডার এরিয়ায় পাকিস্তানী বিমান ঘাঁটিগুলোতে বোমা হামলা করে সবগুলো জঙ্গিবিমানকে পুরোপুরি নিশ্চিহ্ন করে দেয়। আর পদাতিক বাহিনী অগ্রসর হতে থাকে ঢাকার দিকে। পুর্ব রণাঙ্গণের বাংলাদেশ ভারতের যৌথ কমান্ডে ছিলেন লে জেনেরেল জ্যাকোভ, লে জেনারেল ওরোরা এবং জেনারেল ওসমানী। 

১৯৭১ সালের স্বাধীনতা যুদ্ধের সময় বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর কমান্ডার-ইন-চীফ ছিলেন জেনারেল আতাউল গনী ওসমানী। তাঁর কর্মজীবনে তিনি ১৯৩২ সালে ব্রিটিশ ভারতীয় সেনাবাহিনীর চাকরির সাথে সংযুক্ত হয়ে  পাঁচ দশক ধরে উপমহাদেশে দক্ষতার সাথে সৈনিক জীবন কাটিয়েছেন। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময় তিনি বার্মায় যুদ্ধ করেছিলেন এবং ১৯৬৭ সাল পর্যন্ত পাকিস্তান সেনাবাহিনীতে কর্নেল হিসেবে চাকরি করেছিলেন। ওসমানীকে ১৯৭১ সালে মুজিবনগর সরকার দ্বারা বাংলাদেশের সশস্ত্র বাহিনীর প্রধান হিসেবে নিয়োগ দেওয়া হয়েছিলো, এবং তিনি বাংলাদেশ সশস্ত্র বাহিনীর প্রতিষ্ঠাতা হিসাবে গণ্য করা হয়। ১৯৭২ সালে অবসর নিয়েছিলেন এই বীর যোদ্ধা জেনারেল ওসমানী!

আমেরিকার তৈরি সবগুলো F-104 জঙ্গিবিমান হারায়ে পাকিস্তান দিশেহারা হয়ে পড়ে। আমেরিকার কাছে সামরিক সাহায্য চায়। নিক্সন সকল প্রকার আইন লঙ্ঘন করে জর্ডান থেকে ২২ টা আমেরিকার তৈরি একই ধরনের জঙ্গিবিমান পাঠানোর ব্যবস্থা করে, খুব গোপনে। বিমানগুলো সৌদি আরব হয়ে পাকিস্তানে আসে। আর অস্ত্র সাহায্য দিতে রাজী করায় ইরানের শাহ সরকারকে। সৌদি আরবও চারটা F-104 জঙ্গিবিমান দিতে রাজী হয়। তুরস্ক অস্ত্র ও চারটা একই ধরণের বিমান পাঠায় আমেরিকার অনুরোধে। আর এই সৌদি আরব এখন বাংলাদেশের বন্ধু।

ডিসেম্বরের ৮ তারিখে হেনরি কিসিঞ্জার চায়নার রাষ্ট্রদূতের সাথে গোপন বৈঠক করেন নিউইয়র্কে। যে মিটিং এ আরও উপস্থিত ছিলেন সিনিয়ার বুশ, ১৯৯০ সালে আমেরিকার প্রেসিডেন্ট ছিলেন। প্রস্তাব দেওয়া হয় চায়নার সরকার যেনো দেশটির সেনাবাহিনীকে পাকিস্তানের পক্ষে যুদ্ধে অংশ নেয়। কিন্তু চায়না জানতো, রাশিয়া তার আগেই রীতিমতো মিলিয়ন সৈন্যের সমাবেশ ঘটিয়েছে তার সীমান্তে। তাই চায়না যদি ভারত আক্রমণ করে তবে রাশিয়া চায়না দখল করে নেবে।

উপায়হীন হয়ে আমেরিকা সপ্তম নৌবহর পাঠায় হাওয়াই দ্বীপপুঞ্জ থেকে। যার এডমিরাল ছিলেন জন এস ম্যাককেইন, যার পুত্র Senator John S. McCain জুনিয়র ভিয়েতকং দের হাতে ধরা পড়ে মৃত্যুর খুব কাছে থেকে ফিরে যুক্তরাষ্ট্রের রাজনীতিতে ঢোকে এবং ২০০৮ সালে আমেরিকার প্রেসিডেন্ট প্রার্থী ছিলেন। ১৫ তারিখে যখন সপ্তম নৌবহর থাইল্যান্ড অতিক্রম করে তখন বিশ্ব আরেকটা বিশ্বযুদ্ধের দ্বারপ্রান্তে।

বিশ্বের প্রায় সবকটি মুসলিম দেশ পাকিস্তানের হত্যাযজ্ঞকে সমর্থন করেছিলো। সাথে ছিলো আমেরিকাসহ চার পরাশক্তি। জাতিসংঘে ভারতের পক্ষ নিয়ে ভেটো দিয়েছিলো রাশিয়া, তাকে অনুসরণ করেছিলো শুধুমাত্র পোল্যান্ড। বাঁকি ১০৪ টা দেশ গণহত্যাকে সমর্থণ করে বাঙ্গালির বাংলাদেশের জন্মকেই স্তব্ধ করে দিতে চেয়েছিলো। কিন্তু কেনো?
আমরা ভারত ও রাশিয়ার কাছে চিরঋণী। 

আর বাংলাদেশ এর সবচেয়ে নিকৃষ্টতম প্রাণীটি হচ্ছে কোচবিহার থেকে আসা এবং পুরো যুদ্ধকালিন সময়ে পাকিস্থান সেনাবাহিনীতে কর্মরত হোসেন মোহাম্মদ এরশাদ। যখন পৃথিবীর সকল মুসলিম রাষ্ট্র পাকিস্তানের গণহত্যার সাপোর্ট করেছিলো, তখনো তিনি পাকিস্তানিদের পক্ষে বাঙালির বিরুদ্ধে যুদ্ধে লিপ্ত ছিলেন, আর এই এরশাদ পরে স্বৈরশাসক হয়ে, বাংলাদেশের রাষ্ট্র ধর্ম ইসলাম করলো।

তথ্যসূত্রঃ মুক্তিযুদ্ধের আর্কাইভ 


  • ৩৮৬ বার পড়া হয়েছে

পূর্ববর্তী লেখা পরবর্তী লেখা

বিঃদ্রঃ নারী'তে প্রকাশিত প্রতিটি লেখার বিষয়বস্তু, ক্রিয়া-প্রতিক্রিয়া ও মন্তব্যসমুহ সম্পূর্ণ লেখকের নিজস্ব। প্রকাশিত সকল লেখার বিষয়বস্তু ও মতামত নারী'র সম্পাদকীয় নীতির সাথে সম্পুর্নভাবে মিলে যাবে এমন নয়। লেখকের কোনো লেখার বিষয়বস্তু বা বক্তব্যের যথার্থতার আইনগত বা অন্যকোনো দায় নারী কর্তৃপক্ষ বহন করতে বাধ্য নয়। নারীতে প্রকাশিত কোনো লেখা বিনা অনুমতিতে অন্য কোথাও প্রকাশ কপিরাইট আইনের লংঘন বলে গণ্য হবে।


মন্তব্য টি

লেখক পরিচিতি

মোনাজ হক

সম্পাদক আজকের বাংলা ডট কম

ফেসবুকে আমরা