মৌরী সিদ্দিকা

একটিভিস্ট।

নারীর কোনো বাড়ি নেই, নারীর কোনো ঘর নেই

সমাজে নারীরা অবহেলিত প্রাচীনকাল থেকে হয়ে আসলেও এখনো তেমন কোনো পরিবর্তন আনা সম্ভব হয় নি। মেয়ে মানেই সবার আগে দাসী, ভোগ্যপণ্য, নিরীহ একটি প্রাণী। যাকে দিয়ে সব কাজ করানো যাবে, গায়ে হাত তোলা যাবে, বিয়ে করলে যৌতুক পাওয়া যাবে। মানে সকল কিছুই নারীর থেকে পাওয়া সম্ভব।

একজন চাকুরিজীবী নারী ৮-১০ ঘণ্টা অফিস করে এসে ঠিকই বাচ্চা, রান্নাঘর, শশুর-শাশুড়ি, বাবা-মা, স্বামী সবই সামলান। যেটা করতে নারী বাধ্য হয়। তাদের বুঝানো হয়, ‘যারা চুল বাঁধে, তারা রান্নাও করে’। মানেটা খুবই পরিষ্কার অর্থ্যাৎ প্রত্যেকটা নারী বাহিরে যতো বড়ো পদেই কাজ করুক না কেনো তাকে বাসায় এসে ঘরের কাজ, রান্না করতেই হবে। এটাই আমাদের স্বাভাবিক জীবন।

ছোটো থেকে সমাজ, পরিবার, পরিবেশ এটাই বোঝায় যে নারীর কাজ ঘরে এবং বাচ্চা লালন-পালন, সংসারের কাজ করার জন্যই জন্ম নারীর। যেমন, পরিবারের স্বামী-স্ত্রী একই সময়ে অফিসে যায় এবং প্রায় একই সময়ে অফিস থেকে ফেরে। অফিস থেকে আসার পর পুরুষটির চা, কফি, সামুচা, সিংগারা, নুডলস, স্যুপ যেটা খেতে ইচ্ছে করবে তার স্ত্রীকে অর্ডার করলেই মুখের কাছে হাজির হবে। কিন্তু মেয়েটি ওই একই সময়ে অফিস থেকে কাজ করে ফিরেছে। মেয়েটারও ইচ্ছে হতে পারে একটু শুয়ে থাকার, কেউ এসে এক কাপ কফি দেবে বা তাকে কেউ বিরক্ত করবে না। প্রকৃতিতে জন্ম নিয়েছে মেয়ের রূপ নিয়ে। সুতরাং তার কোনো আশা, আকাঙ্খা, চাওয়া-পাওয়া একদমই থাকতে নেই।

এবার মেয়েটি স্বামীর আবদার রেখে কাজ শুরু করলো রান্নাঘরে, এরপর তার বাচ্চাকে সামলানো, পড়তে বসানো, শশুর-শাশুড়ি থেকে সব কিছুই তাকে সামলাতে হবে।

এদিকে সিংহ পুরুষটি সারাদিন অফিস করে খুবই ক্লান্ত, অবসাদে ভুগছে। তাকে বাইরে যেতে হবে বন্ধুদের সঙ্গে আড্ডা দিতে, একটু মুক্ত হাওয়া গায়ে লাগাতে। আবার তার একটু ট্যুর দেয়া খুব জরুরি, সেটাও তিনি বন্ধুদের সঙ্গে একাই চলে যাচ্ছেন। বাসায় মেয়েটির অবসাদ, ভালো-খারাপ লাগা, অসুস্থ হওয়া এগুলো একদমই চলবে না। ঘরের বউয়ের রোগ-বালাই হতে নেই।

এটা হলো একই পরিবারের স্বামী-স্ত্রী চাকুরিজীবী হলে। এরপর বেকার ছেলেদের দিকে তাকালে দেখা যায় তারা ঘরে, বাইরে কোনো জায়গাতেই কাজ করে না। কিন্তু পুরুষত্ব বলে তাকে পূজা করতে বাধ্য হয় ঘরের নারীটি। এরকমই আমাদের প্রত্যেকটি নারীর ঘরের গল্প।

এরপরও দেখুন নারীর কোনো ঘর নেই, বাড়ি নেই। বিয়ের আগে বাপের বাড়িই নারীর বাড়ি, বিয়ের পর শ্বশুরবাড়িই নিজের বাড়ি। বাঙালি প্রায় প্রত্যেকটি ঘরে নারীকে পৈতৃক ভিটে থেকে বঞ্চিত করা হয়। হিন্দু, মুসলমান যে সমাজই হোক না কেনো নারীকে হয় বিয়ের সময় গহনা, টাকা, আসবাবপত্র দিয়ে মিটিয়ে দেয়া হয়। অথবা বিয়ের পর এক সময় নারীর বাবা-ভাই মেয়েটিকে বলে, সামান্য টাকা-পয়সার বিনিময়ে তার বাবার ভিঁটেমাটি থেকে বঞ্চিত করে।

ধরা যাক, মেয়েটি অল্প শিক্ষিত এবং তিনি ঘর সামলান অর্থ্যাৎ উনি কোনো চাকুরি করেন না। এমতাবস্থায় তার বাবার বাড়ির সম্পত্তি থেকে সে বঞ্চিত। এখন স্বামীই একমাত্র ভরসা। এই পরিবারটিতে হঠাৎ কর্মক্ষম পুরুষ সদস্যটি দু'টি ছোটো বাচ্চা মেয়ে রেখে মারা গেলেন। সেক্ষেত্রে ওই নারীটিকে তার শ্বশুরবাড়ি বেশিরভাগ সময় কোনো সাহায্য না করে দূরে ঠেলে দেন। যদিও মেয়েগুলো প্রাপ্তবয়স্ক হলে সেই সম্পত্তি পায় তবুও সেটা সময় সাপেক্ষ এবং ছোট থেকে তাদের অনেক সংগ্রাম করতে হয়। এরকম পরিবারগুলোর মেয়েদের আমরা বাসা-বাড়িতে কাজ করতে দেখি, অনেক সময় তারা তাদের আত্মীয়-স্বজনের বাড়িতেই কাজ করে। শেষে দেখা যায়, নারীর মূলত কোনো আশ্রয়স্থলই নেই। অথচ সে সব জায়গায় নিজের জীবন দিয়ে খেটে আসছে।

সরকারিভাবে দেখা যায় ভূমিহীনদের সরকার তার নিজের জায়গাগুলো দিয়ে দেন। অথচ কানে আসে না কোনো নারী ভূমিহীনকে সরকার তার খাস জায়গা দিয়েছে। আমরা সব জায়গায় দেখি, ভূমিহীন কৃষককে সরকার বাড়ি করে দিচ্ছে, জমি দিচ্ছে ইত্যাদি। যদিও এখন মিডিয়ার বদৌলতে মাঝে মাঝে দু’একজন পৌঢ় বিধবাকে সরকারের তরফ থেকে ঘর তুলে দিচ্ছে দেখা যায়। এটা গড়ে খুবই কম সংখ্যক। আসলে নারীদের কোনো ঘর নেই।

গ্রামের একজন নারী বিয়ের আগ পর্যন্ত বাপের বাড়ি নিজে বাড়ি, বিয়ের পর শ্বশুরবাড়ি নিজের বাড়ি। এরপরের পর্বটা অনেক সময় আরও ভয়ানক রূপ নেয়। যখন নারীর সম্পদ বলতে কিছু থাকে না, নিজে কোনো চাকুরি করে না তখন সে বাপের, স্বামীর এবং ছেলে-মেয়েদের কাছেও বোঝা হয়ে যায়। ছেলে-মেয়েরা নারীটিকে দিয়ে শুধু কাজের লোকের কাজ করান তা নয়, তাদের আচরণেও ঔদ্ধত্য প্রকাশ পায়।

নারী চাকুরি করলে, মোটা অংকের পৈতৃক সম্পত্তি পেলে সে সমাজের সবার ভালোবাসার পাত্র। অথচ, ওই একই নারী চাকুরি, সম্পদ না থাকায় সমাজ ও পরিবারের ঘৃণার পাত্র হয়ে উঠে। বয়স হলে সন্তানরাও তাকে বোঝা মনে করে। রাস্তায়, জঙ্গলে ফেলে আসছে জন্মদাত্রী মাকে। তার কারণ হিসেবে একটায় উঠে আসে নারীর কোনো সম্পদ নেই, নারীর কোনো বাড়ি নেই।

আবার যারা চাকুরি বা সঞ্চয় করেন তারাও দিন শেষে দেখা যায়, বাবা-মা, ভাই-বোন, ছেলে-মেয়ে, স্বামী, শশুরবাড়ির জন্য সর্বস্ব দিয়ে দেন। এরপরই তিনি নিঃস্ব হয়ে হাত পাতেন অন্যের দরজায়। আবার অনেক মায়ের জায়গা হয় বৃদ্ধাশ্রম বা রাস্তা।

আমি গ্রামের এক চাচীর সঙ্গে কথা বলছিলাম, উনার তিন ছেলে, দুই মেয়ে। এক সময় সুখের সংসার ছিলো। এখন বয়স হয়েছে, নাতি-নাতনিরা বড় হয়েছে। সংসারে তার প্রয়োজনও ফুরিয়েছে। ওই চাচা তাকে বলেছে, বাড়ি থেকে চলে যা। তার মানে হচ্ছে এ সংসার তোমাকে ছাড়াও চলবে। কিন্তু এই নারীটি এতদিন বাচ্চাদের মানুষ করা, বিয়ে দেয়া সব করেছেন।

নারীটি এখন কোথায় যাবে কেউ জানেন? চাচী কাঁদতে কাঁদতে বলছে, বিয়ার সময় ডিমান্ড(যৌতুক) নিছিলো। আমার বাপ টাকা দিছে, ভাইদের বয়স হইছে, ভাস্তা-ভাস্তি(ভাইয়ের ছেলে-মেয়ে) আমাকে দেখবে কেনো?

উনি ঠিকই বলেছেন। যেখানে স্বামী, নিজের সন্তানরা বাড়ি থেকে বের হয়ে যেতে বলে সেখানে অন্যরা কেনো বোঝা বয়ে বেড়াবে!

1236 times read

নারী'তে প্রকাশিত প্রতিটি লেখার বিষয়বস্তু, ক্রিয়া-প্রতিক্রিয়া ও মন্তব্যসমুহ সম্পূর্ণ লেখকের নিজস্ব। প্রকাশিত সকল লেখার বিষয়বস্তু ও মতামত নারী'র সম্পাদকীয় নীতির সাথে সম্পুর্নভাবে মিলে যাবে এমন নয়। লেখকের কোনো লেখার বিষয়বস্তু বা বক্তব্যের যথার্থতার আইনগত বা অন্যকোনো দায় নারী কর্তৃপক্ষ বহন করতে বাধ্য নয়। নারীতে প্রকাশিত কোনো লেখা বিনা অনুমতিতে অন্য কোথাও প্রকাশ কপিরাইট আইনের লংঘন বলে গণ্য হবে।