আগুনে দগ্ধ সেক্যুলার বাংলাদেশ; একটি স্বপ্নের নির্মম হত্যাকান্ড

শনিবার, নভেম্বর ১১, ২০১৭ ৬:২৯ PM | বিভাগ : পাঁচমিশালী


দ্বিজাতি তত্ত্ব জন্ম দিয়েছিলো হিন্দুস্তান পাকিস্তান। ভারত নিজে সেক্যুলার দেশ হিসেবে দাবী করে আসছিলো তবুও। মোদীজি সে বদনাম ঘুচিয়েছেন। সাধুবাদ মোদীজি! আপনিই নাম রাখলেন তত্ত্বটির! এই চাষাভুষার এই অঞ্চলটি ‘পূর্ববাংলা’কে আপনারা আকিকা দিয়ে দিলেন ‘পূর্বপাকিস্তান’ হিসেবে। রাতারাতি। এই চাষাভুষারা কিন্তু ধর্মীও আইডেন্টিটির কোনো সঙ্কটে ছিলো না। আপনারা বুঝতে পারেন নাই যে এ অঞ্চলটি ধর্মের আইডেন্টিটিতে আপনাদের মতো ‘পাপী’ ছিলো না। ক্ষমতালুব্ধ লোভী ছিলো না। এ অঞ্চলটি গরম ধোঁয়া ওঠা ভাতে বাগুন সেদ্ধ দিয়া খাইয়া হুকোয় টান দিয়া ভাটিয়ালি গান ধরতো। সারারাত কবির গান শুনে ফজরের নামাজ পড়ে মাঠের দিকে রওয়ানা দিত। চৈত্রের কাঠফাটা রোদে লাঙল ঠেলতে ঠেলতে গান ধরতো, ‘ পরের বাড়ি পরের জায়গা পরের জমি ঘর বানাইয়া আমি রই... আমিতো সেই ঘরের মালিক নই...’! অথচ আপনারা সেই জাতির সাড়ে সর্বনাশ করলেন। তাঁদের কপালে ‘মুসলমান’ এর নূরানি দাগ আঁকিয়া দিলেন। এ সরল সুন্দর জাতিকে আজীবনের জন্য এক অন্যায্য যুদ্ধের ভেতর ঠেলে দিলেন। এদেশের প্রতিটি ইঞ্চি মাটিতে রক্তাক্ত হলো। তবু তারা স্বাধীন হতে পারেনি। তবু তাঁদের পরাজয় হয়েছে। তারা আসলে জিততে পারেনি। এ দেশটির ত্রিশ লাখ শহীদ মাটির নীচে থেকে দেখতে পাচ্ছে তারা জীবন দিয়েছিলো আসলে একটি অলীক স্বপ্নকে সামনে রেখে সে স্বপ্ন তাঁদের সাথেই শহীদ হয়েছিলো। সামনে আসতে পারেনি কখনই। দ্বিজাতি তত্ত্বের কারিগররা এতই সফল এবং ক্ষমতাশীল।
 
একটি চাষাভুষা জাতি তাঁদের ললাটে কত বেদনার চিহ্ন নিয়ে পথ চলছে, চলেছে কিন্তু সবচাইতে বেদনার প্রান্তে তারা এখন। এদেশে ওহাবি মাদ্রাসার শিক্ষা এক অদ্ভুত সফলতায় বিজয় নিশান উড়িয়েছে।
 
একটি দেশে যখন অন্যায়ভাবে ক্ষমতা দখল করে রাখতে হয়, তখন কিছু ঘটনা ঘটাতে হয়। তার ভেতর যেটি সবচাইতে দরকারি, মানুষকে ধর্মের অন্ধকারে রাখা। তাতে শাসক শ্রেণী থাকে সবচাইতে নিরাপদ। এ আফিমের থেকে শক্তিশালী আফিম আর একটিও নেই। ধর্মের অন্ধকারে মানুষকে ডুবিয়ে দিতে পারলে সরকারকে কিছুই আর করতে হয় না। ডিম ফুটে একদিন যে ড্রাকুলা বের হয় তাতেই তাদের কাযসিদ্ধি ঘটে পুরোপুরি। আর কিছু লাগে না। এদেশে এ ঘটনাই ঘটে চলেছে বিভিন্ন ফর্মে। কখনও সামরিক শাসক কখনও ‘ভোটের’ সরকার। ‘ক্ষমতা’ যেখানে সেন্ট্রাল পয়েন্ট! আর নিহত হয় একটি দেশের স্বপ্ন, একটি জাতির স্বপ্ন, একটি কণ্ঠের স্বপ্ন, একটি মুক্তির স্বপ্ন, একটি মুক্তিযুদ্ধের স্বপ্ন।
 
একটি তরুণ সম্প্রদায় যুদ্ধে জীবন দিয়েছিলো একটি স্বপ্নকে বুকে নিয়ে। একটি মুক্ত দেশের জন্য। একটি আলোকিত দেশের জন্য। একটি সেক্যুলার দেশের জন্য। নিজের শেকড় রক্ষার জন্য। একটি পলিমাটির জন্য। একটি বাউল গানের জন্য। একটি ফুলের জন্য। এর সবই আমরা হারিয়েছি। এ নিয়ে আজ আর কোনো বিতর্ক নেই। এটি সবচাইতে সত্য শাসক হিসেবে বঙ্গবন্ধুর কন্যার শাসনে। এক বিন্দু ‘রিস্ক’ তিনি নিতে রাজী নন। সেখানে ভেসে গেছে তার ‘বাবা’ এবং আমার তরুণ ‘বাবা’। একটি তরুণ সমাজের স্বপ্ন। আহা! সেইসব তরুণ! সেইসব স্বপ্ন!
 
২২% হিন্দু ছিলো। ৫% ক্রিশ্চিয়ান। বৌদ্ধ। আর পাহাড়। যদিও পাহাড়ে আমরা মসজিদ বানায় ফেলছি। বাঙালি মুসলমান রোপণ করে ফেলছি। পাহাড় আমরা চাই। পাহাড়িদের জুতোর নীচে ফালায় বাঙালি মুছলমান বানায় ফেলবো ইনশাহল্লাহ। এতগুলো হিন্দু বুদ্ধিস্টস খেরেস্তান কমাইতে হইলে তাদের খেদাইতে হবে। এই খেদানির পেছনে আপনারা দেখেন বাড়িতে আগুন দেওয়া। তাদের নারীদের ধর্ষণ করা। তাদের জমি দোকান দখল করে নেওয়া। তাদের মেয়েদের জোর করে তুলে নিয়ে যাওয়া। আর আমি দেখি একটি নিহত সংবিধান।
 
একটি সংবিধানকে হত্যা করলে উপরের কাজগুলোকে রাষ্ট্রীয়ভাবে স্বীকৃতি দেওয়া হয়। একটি দেশ যখন রাষ্ট্রীয়ভাবে তথা সাংবিধানিকভাবে বলে এটি একটি ‘মুসলিম দেশ’ অটমেটিক্যালি মুসলমানরা হয়ে যায় সে দেশের ‘মূল সিটিজেন’। অন্যরা কি হয়? তারা কি নাগরিক? না। সাংবিধানিক ডেফিনেশনে নয়। সাংবিধানিক স্ট্যাটাসে মুসলিমরাই আসল নাগরিক। এটি একটি রাষ্ট্রীয় ট্রুথ। এ সত্যতা নিয়েই এ দেশের প্রশাসন গড়ে ওঠে। বিদ্যালয়, বিশ্ববিদ্যালয়, শিক্ষানীতি, সাহিত্য বদলে যায়। বদলে যায় শেকড়। আমদানি করা হয় ধর্মীও শাসক, শিক্ষক, সাহিত্য, সংস্কৃতি এবং সমাজের মাথা হয়ে ওঠে একটি ধর্মের ধর্মগুরু। টোটালিটেরিয়ানিজম যখন একটি স্টেটের ক্ষমতার উৎস হয়, ভোটের উৎস হয়ে ওঠে তখন সে দেশে এমন কি ‘সংখ্যালঘু’ করে রাখা শ্রেণীকেও ক্লিন করার কাজে সরাসরি ক্ষমতা প্রয়োগ করতে হয় স্বয়ং রাষ্ট্র প্রধানকে। এখানে বঙ্গবন্ধু কন্যা রোহিঙ্গাদের পাশে দাঁড়িয়ে নোবেল প্রাইজের দাবিদার হন আর সুচিকে নোবেল ফেরত দিতে হয়। রংপুরে যে হিন্দু পরিবারগুলোকে পুড়িয়ে দেওয়া হলো তার জন্য এখন বাংলাদেশের রাস্ট্রপ্রধানের কোনো প্রাইজ কেড়ে নেওয়া হবে বলবেন?
 
এই পুড়িয়ে দেওয়া কোন কাকতালীয় ঘটনা নয়। ফেসবুক পোোষ্টও নয়। এটি সেদিন শুরু হয়েছে যেদিন অফিসিয়ালি একটি সেক্যুলার রাষ্ট্র এবং সংবিধানকে পুড়িয়ে দেওয়া হয়েছিলো। সে আগুনে একটি স্বপ্ন পুড়ে গিয়েছিলো। স্বপ্নের সেক্যুলার বাংলাদেশ ভস্মিভুত হয়ে গেছে। এখন আর কিইবা বাকী আছা! ক্ষুদ্র হতদরিদ্র পুড়ছে। আর এ আগুন একটি রাষ্ট্রযন্ত্রের দেওয়া আগুন। কিভাবে লড়বে তাঁরা? একটি রাষ্ট্রের বিরুদ্ধে লড়বে কিভাবে ওরা? কোন ক্ষমতায়?
তোরা মরে যা! মরে যারে বাছারা! মরে যা!

  • ১১৪৩ বার পড়া হয়েছে

পূর্ববর্তী লেখা পরবর্তী লেখা

বিঃদ্রঃ নারী'তে প্রকাশিত প্রতিটি লেখার বিষয়বস্তু, ক্রিয়া-প্রতিক্রিয়া ও মন্তব্যসমুহ সম্পূর্ণ লেখকের নিজস্ব। প্রকাশিত সকল লেখার বিষয়বস্তু ও মতামত নারী'র সম্পাদকীয় নীতির সাথে সম্পুর্নভাবে মিলে যাবে এমন নয়। লেখকের কোনো লেখার বিষয়বস্তু বা বক্তব্যের যথার্থতার আইনগত বা অন্যকোনো দায় নারী কর্তৃপক্ষ বহন করতে বাধ্য নয়। নারীতে প্রকাশিত কোনো লেখা বিনা অনুমতিতে অন্য কোথাও প্রকাশ কপিরাইট আইনের লংঘন বলে গণ্য হবে।


মন্তব্য টি

লেখক পরিচিতি

শেখ তাসলিমা মুন

শেখ তাসলিমা মুন বর্তমানে সুইডেন প্রবাসী। সুইডিশ রাজনীতিতে সোসাল ডেমক্রেট হিসেবে সক্রিয়ভাবেই যুক্ত আছেন। সুইডেনের ডিস্ট্রিক্ট কোর্টে জুরিমেম্বার হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন। তাসলিমা সুইডেনের স্টকহোম বিশ্ববিদ্যালয় থেকে আইন বিষয়ে পড়াশোনা করেছেন। এক্টিভিজম ছাড়াও নারী অধিকার এবং ধর্মীয় গোড়ামীর বিরুদ্ধে এই লেখক সোশ্যাল মিডিয়ায় লেখালেখি করেন।

ফেসবুকে আমরা