যৌন স্বাধীনতা নাকি যৌনতার শো অফ?

মঙ্গলবার, জুন ২৫, ২০১৯ ১০:০৪ PM | বিভাগ : প্রতিক্রিয়া


নারীর যৌন স্বাধীনতা নারীবাদের একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ। পশ্চিমের নারীবাদ আন্দোলন নারীর যৌনতা ও জরায়ুর স্বাধীনতা নিয়ে বিশেষ সময় পার করেছে। নারীবাদ নারীর যৌনতার উপর পুরুষতান্ত্রিক সমাজের নিয়ন্ত্রণ, বিধিনিষেধ ও পুরুষের আধিপত্যের বিরুদ্ধে আওয়াজ তুলেছে। যৌনতা, মাতৃত্ব, গর্ভধারণ, সঙ্গী পছন্দ করা, সঙ্গী ত্যাগ করা ইত্যাদি সিদ্ধান্ত নারীকে নিতে শিখতে হবে। নারীর যৌনস্বাধীনতা ও জরায়ুর উপর নিজের অধিকার এমন একটি বিষয় যা নারীর জীবনযাপন, এমনকি জীবন মৃত্যুও সাথেও সম্পর্কিত। এটি এতটাই গুরুত্বপূর্ণ যে একে পাশ কাটিয়ে যাবার কোন সুযোগ নাই।

আবার যৌনতা নিয়ে নিজের পছন্দ, রুচি, সেক্সুয়াল আইডেন্টিটি ইত্যাদি নিয়ে কথা বলা জরুরি। যেহেতু সমাজ অবদমিত, মৌলবাদী, গোঁড়া ও রক্ষণশীল, তাই সমাজের মূলে আঘাত দিতে এই কথা বলার কাজটি বড় ভূমিকা রাখে। নারীবাদের অন্যতম কৌশল আঘাত হানা।

নারীবাদ যৌনতা নিয়ে কথা বলা, যৌনতার স্বাধীনতাকে সমর্থণ করে। তেমনি ব্যক্তিস্বাধীনতাও নারীবাদের অন্যতম আগ্রহের বিষয়। ব্যক্তিস্বাধীনতা নারীবাদের আরাধ্য। যৌনতাকে কে কীভাবে দেখবে, কে কীভাবে যাপন করবে সেটি ব্যক্তিস্বাধীনতা। তাহলে যৌনতা নিয়ে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে কোন ব্যক্তি যদি খোলাখুলি লেখে ও যৌনতা প্রদর্শণ করে, তবে নারীবাদ তার ব্যক্তিস্বাধীনতার বিষয়টি সমর্থণ করবে। কিন্তু প্রশ্ন হচ্ছে, যৌনতার স্বাধীনতা যতটা নারীবাদ, যৌনতার প্রদর্শণ কি একইভাবে নারীবাদ? কিংবা যৌনতার অশ্লীল বহিঃপ্রকাশ কি নারীবাদ?

এখন কিছু ব্যক্তি/ গোষ্ঠী প্রশ্ন করতে পারেন আমাকে, অশ্লীলতা নির্ধারণ করবে কে?

এই প্রশ্নের জবাবে আমি শুধু এটুকুই বলতে চাই, নারী পুরুষের সম্পর্ক ও মিলিত হবার প্রক্রিয়ার মধ্যে যে গূঢ় সৌন্দর্যটুকু আছে, সেটুকুকে পাশ কাটিয়ে এটির ভেতর থেকে ক্লেদাক্ত আদিরসটুকুর প্রচার যৌনতাকে অশ্লীল করে তোলে। এখন এই অশ্লীলতা ভাষা বা অডিও ভিজ্যুয়াল যেকোন ভাবেই হতে পারে। সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ব্যক্তিজীবনের সেক্সের ক্লেদাক্ত বর্ণণা যদি ‘চোদাচুদি’ শব্দটি দিয়ে অভিষিক্ত হয়, তবে আমি এই বর্ণণাকে আত্মজীবনী বলতে পারি, চটি সাহিত্যও বলতে পারি। কিন্তু যখনই বিষয়টি নারী স্বাধীনতার ইস্যুতে বর্ণিত হয়, আমার প্রশ্ন থেকে যায়, বিষয় বর্ণণায় ওই শব্দ এবং লেখকের নিজের সেক্স প্রসঙ্গটি কতটা প্রাসঙ্গিক ছিল। এখন আমি একটি অসহায় নারীর গল্প বলছি, তার আর্থিক সামাজিক পারিবারিক বিপন্নতার ও পরাধীনতার কথা বলছি। কিন্তু সেখানে অপ্রাঙ্গিকভাবে আমার নিজস্ব ‘চোদাচুদি’র বর্ণণা শুরুতেই ঢেলে সাজিয়ে পরিবেশন করছি, আমার প্রশ্নটি এখানেই, এ প্রসংগে নারীবাদ কেন এর সাথে সংযুক্ত? কিংবা কেন ঘটনা বর্ণণায় একটি চোদাচুদির গল্প প্রয়োজনীয়? কারণ জীবনে আমরা সবসময়ই কিছু না কিছু করছি। এখন হাগতে বসে একটি ফোন এল, বগলে ডিওডেরান্ট ঘষতে ঘষতে ফোন এলো, এক গ্লাস পানি খেতে খেতে ফোন এল, ঘুমাচ্ছিলাম তখন ফোন এল, মাছ দিয়া ভাত খাচ্ছিলাম ফোন এল- এসব তো চলেই। কোনটার সাথেই ফোনটির যদি সম্পৃক্ততা না থাকে তাহলে কাহিনী বর্ণণায় বারবার ঘুমানো, ভাত খাওয়া, হাগা মোতা, ডিওডেরান্ট ঘষা যেমন উঠে আসে না, তাহলে কেন ‘চুদতেসিলাম তখুনি ফোন এল’- সেটি কেন উঠে আসে?

তাহলে লেখকের লক্ষ্যটি আসলে কি মেয়েটির বিপন্নতা? নাকি তার লেখাটি যাতে সর্বমহলে ‘ভাইরাল’ আকারে ছড়িয়ে পড়ে সেজন্য ওভাবে শুরু করা? আর যে নারীবাদী পোর্টাল সেটি তুলে নিয়ে ছেপে দিলেন তারা কেন লেখকের এত ছবি থাকতে বেছে নিলো একটি যৌনাবেদনময় ছবি? এর পেছনে তাদের যুক্তিটি জানবার আগ্রহ রইলো। কারণ নারীবাদ নারী শরীরের পন্যকরণকে সমর্থণ করে না।

নারীবাদ কখনও কাউকে নির্দিষ্ট করে দেবে না কে কীভাবে তা চর্চা করবে। তবে নারীবাদ দুটি জিনিস অবশ্যই দাবি করে। একটি হলো পড়ালেখা। অশিক্ষিত মূর্খ নারীবাদ আদতে নারীবাদ ও নারীর সর্বনাশ করে। সেটি আমরা অহরহ দেখতে পাই। আবার নারীবাদ যখন কোন অনগ্রসর মৌলবাদী রক্ষণশীল সমাজে ডানা মেলতে শুরু করে তখন নারীবাদের নানা কৌশল অবলম্বন করতে হয়। এই কৌশল সেই নারীবাদীরাই যথার্থ সুন্দরভাবে গ্রহণ করতে পারেন, যারা শিক্ষিত। পড়ালেখা জানা নারীবাদ আর যাই করুক, বিনা কারণে সেক্স কিংবা শরীর এনে পরিচিত হতে চাইবে না। সেক্সকে পন্য করবে তারাই যারা লোভী ও মূর্খ। এখন এই মূর্খতা ও লোভ দিয়ে তারা কোন্ রাজনীতি করতে চাইছে, সেটি আমাদের বুঝতে হবে। সেই রাজনীতি যদি হয় নারীবাদকে ঘিরে, তবে সত্যই চিন্তার কারণ আছে।

কারো লেখার বিষয় যদি হয় সেক্স, অর্গাজম, ইজাকুলেশন, মাস্টারবেশন, সমকামিতা ইত্যাদি; তবে আমরা তার কাছ থেকে চিন্তাকর্ষক তথ্যসমৃদ্ধ লেখা আশা করবো। এবং এ ধরণের লেখা যথেষ্ট পরিমানে আসুক, তা চাইবো। কিন্তু কারুর লেখা যদি হয় নারীর অর্থৈনতিক পরাধীনতা, তাহলে সেই লেখার সূচনায় লেখকের নিজের সেক্সের রসালো বর্ণণা আমাদের কেন পড়তে হচ্ছে, সেটি আমাদের বুঝতে হবে। এবং আমার জানার আগ্রহ হল, এটি নারীবাদকে কীভাবে সমৃদ্ধ করছে!

একটু আগে আমি যে মেয়েটির সাথে ফোনে কথা বলেছি, সে বরগুনার একটা প্রত্যন্ত অঞ্চলে থাকে। তার স্বামী শ্বশুরবাড়ির লোকেরাই তাকে যে শুধু নির্যাতন করে, তা না। মেয়েটির বাবা মাও তার উপর চুড়ান্ত অত্যাচার চালায়। মেয়েটি পড়তে চায়। কিন্তু কেউ তাকে পড়তে দেয় না। ফোনে কাঁদতে কাঁদতে মেয়েটা আমাকে বলেছে, সে যদি পড়ালেখা করার একটু সুযোগ পায় তাহলে শ্বশুড়বাড়ি ছেড়ে বেরিয়ে আসবে। কিন্তু কে দেবে তার খরচ? বাবা মা তো পাশে নেই!

আরেকটি মেয়ের কথা জানি, যার স্বামী পেটে লাথি মেরে তার গর্ভপাত করে দিয়েছিল। এই মেয়েটার যাবার জায়গা ছিল না। সে জানতোই না দেশে মানবাধিকার সংস্থা বলে কিছু আছে। তার কাছে কোন তথ্যই নেই।

মাত্র দুইটা মেয়ের কথা বললাম। এই দেশে এমন নারীর সংখ্যা কয়েক কোটি। এই কোটি কোটি মেয়ের জীবনে স্বাধীনতা ও সুস্থতার জন্যই নারীবাদ লড়ছে। এই স্বাধীনতা শুধু যৌনতার স্বাধীনতা না, এই স্বাধীনতা সবার আগে অর্থনৈতিক স্বাধীনতা, সামাজিক পারিবারিক জীবনে স্বাধীনতা। রাষ্ট্রীয় পরিধিতে একজন পূর্ণ মানুষ হিসেবে প্রতিটি অধিকার চর্চার স্বাধীনতা। নারীবাদের সংগ্রাম এই নারীদের জন্য। কারণ এই নারীরা সংখ্যাগরিষ্ঠ। এদের বাদ দিয়ে আর কিছু কল্পনা করা যায় না।

শিক্ষিত নারীবাদ এই বিশাল সংখ্যক নারীর জীবনে পরিবর্তন আনতে সুস্থ কৌশলে এগিয়ে যাবে। প্রয়োজনে আঘাত হানবে। যুদ্ধ করবে। বিদ্রোহে ফেটে পড়বে। কিন্তু এমন কিছু করবে না যাতে নারীবাদ নিয়ে ভুল কোন ধারণা প্রতিষ্ঠা পায়। এমন কিছু করবে না যাতে নারীবাদের নামে কোন সুবিধাভোগী ব্যক্তি বা গোষ্ঠী নাম কেনার সুযোগ পায়। এমন কিছু করবে না, একটি অশিক্ষিত সমাজে যা নারীবাদকে আরো ঝঞ্ঝাটের মধ্যে ঠেলে দেবে।

একটি দেশে রাজনীতি করতে হলে সেই দেশ ও মানুষকে বুঝতে হয়। নারীবাদও ঠিক তাই বলে মনে করি। দেশ ও মানুষকে বুঝে কৌশল নির্ধারণ করা জরুরী। দেশের একটি নির্দিষ্ট শ্রেণি বা জনগোষ্ঠীকে বুঝলেও হবে না। শুধুমাত্র নিজের পরিপার্শ্বকে চিনে লাভ নেই। জানতে হবে পুরো দেশকে। চিনতে হবে সব শ্রেণি পেশার মানুষকে। নাহলে নারীবাদ থেকে যাবে শুধুমাত্র নিজের ও নিজের আশেপাশের নারীদের জন্য সুবিধাজনক জীবনচর্চায় ব্যস্ত। আপামর নারী এর বাইরেই থেকে যাবে। তাই যদি আসলেই নারীবাদকে বিপ্লব বলে মানেন ও পরিবর্তণ চান, তবে দক্ষ শিক্ষিত নারীবাদ চর্চা করুন। খ্যাতি না, নারীর কল্যান কামনায় নিজেকে বিলিয়ে দেবার মত মন তৈরি করুন। পড়ালেখা করুন। দেশকে জানুন। মানুষ ও সমাজে থাকুন। বুঝুন। যদি সত্যিই এদেশে নারীবাদ প্রত্যাশা করে থাকেন, তবে প্রতিটি নারীকেই আপনার চিন্তায় ও কর্মের ভেতরে রাখতে হবে।

ফেসবুকের পাতায় শৃঙ্গার ও সঙ্গম করলে আপনার কিছু অর্গাজম হতে পারে, নারীবাদের না।


  • ৪২৩ বার পড়া হয়েছে

পূর্ববর্তী লেখা পরবর্তী লেখা

বিঃদ্রঃ নারী'তে প্রকাশিত প্রতিটি লেখার বিষয়বস্তু, ক্রিয়া-প্রতিক্রিয়া ও মন্তব্যসমুহ সম্পূর্ণ লেখকের নিজস্ব। প্রকাশিত সকল লেখার বিষয়বস্তু ও মতামত নারী'র সম্পাদকীয় নীতির সাথে সম্পুর্নভাবে মিলে যাবে এমন নয়। লেখকের কোনো লেখার বিষয়বস্তু বা বক্তব্যের যথার্থতার আইনগত বা অন্যকোনো দায় নারী কর্তৃপক্ষ বহন করতে বাধ্য নয়। নারীতে প্রকাশিত কোনো লেখা বিনা অনুমতিতে অন্য কোথাও প্রকাশ কপিরাইট আইনের লংঘন বলে গণ্য হবে।


মন্তব্য টি

লেখক পরিচিতি

শারমিন শামস্

সমাজকর্মী শারমিন একজন ফিল্মমেকার ও সাংবাদিক।

ফেসবুকে আমরা